জাহানারা ইমামের যুদ্ধ |194112|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
যুদ্ধোত্তর পর্বে মুক্তিযুদ্ধ
জাহানারা ইমামের যুদ্ধ

জাহানারা ইমামের যুদ্ধ

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ইতিহাসের অন্য অধ্যায়। তার সঙ্গে একাত্তরের ঘাতক দালালদের বিচারের দাবিতে সংগ্রাম করেছেন শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী। এই শহীদ জায়া জাহানারা ইমামের স্মৃতি তুলে ধরেছেন রানা মিত্রের কাছে। ছবি তুলেছেন সাহাদাত পারভেজ

‘শহীদ জননী’ জাহানারা ইমামের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পরই। তাকে আমি চিনতাম, কিন্তু আগে আমাদের আলাপ হয়নি। তিনি তখন স্বামী ও পুত্র একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার ও নির্মম নির্যাতনে শহীদ শরীফ ইমাম  এবং শাফী ইমাম রুমীর শোকে কাতর। আমি আমার স্বামী শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরীর শোকে কাতর। আমাদের প্রথম আলাপ ১৯৭২ সালের মাঝামাঝিতে। আমরা তখন ঢাকার ইস্কাটনে থাকি। বাংলাদেশ সরকারের প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই সময় শহীদ পরিবারগুলোকে বাড়ি দিয়েছিলেন থাকতে। হঠাৎ দেখি তিনি তার ছেলে জামিকে নিয়ে আমাদের বাসায় এসেছেন। তিনি তার শোক সামলে আমাকে সান্ত্বনা দিতে হাজির হয়েছেন। আমার দুই মেয়ে তখন ছোট। আমার কাছে অনেকক্ষণ তিনি ছিলেন। অনেক সাহস ও সান্ত্বনা দিয়েছেন সেদিন। তবে তার ছোটবেলা, জীবনের সুদূর অতীত তিনি সেভাবে কখনো আমাদের বলেননি বা আলোচনা করার সুযোগও হয়ে ওঠেনি নানা পরিস্থিতিতে। তিনি আমাদের সঙ্গে নিজের ও অন্যদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিগুলো রোমন্থন করতেন কেবল।

তিনি খুব সার্থক ও সফল একজন শিক্ষক ছিলেন। তার সময়ে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী গার্লস হাই স্কুল খুব ভালো চলেছে। তিনি ছিলেন প্রধান শিক্ষক। তখন আমি তার কথা শুনেছি, স্বাধীনতার আগে; আমাদের পরিচয় ছিল না। আমাদের শহীদ পরিবারগুলোর সদস্যদের সবচেয়ে কষ্টের সময় গিয়েছে পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর। তার শাহাদাতের পর স্বাধীনতাবিরোধীরা বাংলাদেশের ক্ষমতায় এলো। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে ট্রাইবুন্যাল গঠন করেছিলেন। তখন আমাদের শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে এই আশার সঞ্চার হয়েছিল যে, হয়তো আমরা আপনজনদের হত্যার বিচার পাব, কিন্তু তার করুণ ও নির্মম মৃত্যুর পর সব আশা হারিয়ে ফেললাম সবাই। তখনই শুরু হলো ইতিহাস বিকৃতি। অনেক শহীদ পরিবারকে বাড়িছাড়া করা হলো। আমিসহ অন্যরা হতাশ হয়ে গেলাম ও ভয় পেয়ে গেলাম এই দেখেÑস্বাধীনতাবিরোধীরা তাদের সরকারি গাড়িতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা প্রবল ক্ষমতাধর হয়েছেন। সরকারের অংশও আছেন। তারা জাতীয় সংসদের সদস্য হয়ে কথা বলছেন। তারা তো চাননি স্বাধীন বাংলাদেশ হোক। তারা তো এই দেশের স্বাধীনতা চাননি। বরং আমাদের রাষ্ট্রের জন্মের বিরুদ্ধে সব ধরনের ষড়যন্ত্র করেছেন, ধরে ধরে আমাদের পরম আত্মীয়কে মেরেছেন। এখনো সেই সময়গুলো ভীষণ যন্ত্রণা দেয়। আমি অঝোরে কাঁদি আজকের মতো। শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী হিসেবে নাম করলেও আমাদের আসলে অনেক কষ্ট আছে। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ পরিবারগুলো তখন কীভাবে সেই দৃশ্যগুলো দেখেছে আর কী ধরনের মানসিক যন্ত্রণা পেয়েছে, তাদের জীবন কীভাবে নষ্ট হয়েছে কোনোদিন বলা সম্ভব নয়। বড় মেয়ে একদিন তার এই মাকে বলেছিল, ‘আমার বাবার রক্তে ভেজা পতাকা যখন স্বাধীনতাবিরোধীরা গাড়িতে লাগিয়ে ঘুরে বেড়ান আর সেই গাড়ির ধুলো এসে আমাদের গায়ে লাগে কী যে খারাপ লাগে মা। এর চেয়ে কষ্টের আর কিছুই হতে পারে না।’

শহীদ জাহানারা ইমাম খুব ভালো গান করতেন। খুব ভালো লিখতেন। লেখক হিসেবে ভীষণ কৃতী। তার বিখ্যাত বই ‘একাত্তরের দিনগুলি’। একাত্তরের স্মৃতিময় বইটি আমার খুবই প্রিয়। সরকারিভাবে মাধ্যমিক পর্যায়ের নবম শ্রেণির পাঠ্য বাংলা বইতে কিছুটা অংশ দেওয়া আছে। ছাত্রছাত্রীদের পড়াই আমি। তারা খুব বিহ্বল হয়ে যায়। একাত্তরে ফেরে। পড়াতে, পড়াতে শিক্ষক হিসেবে সার্থকতা অনুভব করি। পড়াতে পড়াতে আমি শহীদ জননীর সঙ্গে আমার জীবনের যৌথ দিনগুলোর স্মৃতি তাদের জানাই। অনন্য এই বইটি ছাড়াও গল্প, উপন্যাস ও দিনপঞ্জি ইত্যাদি মিলিয়ে আরও কটি উল্লেখযোগ্য বই আছে শিক্ষাবিদ ও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে নেতৃত্ব দেওয়া মুক্তিযোদ্ধার  এই মায়েরÑ ‘অন্য জীবন (১৯৮৫)’, ‘বীরশ্রেষ্ঠ (১৯৮৫)’, ‘জীবন মৃত্যু (১৯৮৮)’, ‘চিরায়ত সাহিত্য : শেক্সপিয়ার ট্র্যাজেডি (১৯৮৯)’, বুকের ভিতরে আগুন (১৯৯০), ‘নাটকের অবসানে (১৯৯০)’, ‘দুই মেরু (১৯৯০)’, ‘নিঃসঙ্গ পাইন (১৯৯০)’, ‘নয় এ মধুর খেলা (১৯৯০)’, ‘ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস (১৯৯১)’, ‘প্রবাসের দিনলিপি (১৯৯২)’। তার অনুবাদ সাহিত্য লেখার মতো খুবই অসাধারণ। নদীর তীরে ফুলের মেলা অসাধারণ একটি বই। পড়লেই চমকে যেতে হয়। বারবার বলি আমি সব বই-ই খুব ভালো লিখেছেন তিনি। ১৯৮৮ সালে সম্মানিত হয়েছেন ‘বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ সাহিত্য পুরস্কার’ ইত্যাদি। ১৯৯১ সালে পেয়েছেন ‘বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার’।

শহীদ জননী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে প্রথম  সক্রিয় হয়েছেন এক যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে বাতিল হওয়া বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আবার দেওয়ার ফলে। এরপর থেকে তিনি আন্দোলনে গিয়েছেন সব কষ্ট সয়ে। তার মুখে ক্যানসার হয়েছিল। মরণ রোগ ক্যানসার নিয়েই নেতৃত্ব দিয়েছেন, সবসময় কাজ করেছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে। বিক্ষোভের অংশ হিসেবে ১৯৯২ সালের ১৯ জাননুয়ারি ১০১ সদস্যদের ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ গঠিত হয়েছিল তারই নেতৃত্বে। তাকে আমরা সর্বসম্মতিতে কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচন করলাম। তিনি বলতে লাগলেন, কাজ করতে লাগলেন সবাইকে নিয়ে। মুক্তিযোদ্ধারা আগে থেকেই সঙ্গে আছেন। এবার চলে এলেন প্রয়োজন ও বিচারের প্রশ্নে সারা বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ, শহীদ পরিবারগুলো। আমাকে তিনি নিজে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। আমি কোনো বাধা মানিনি। চলে গিয়েছি। তার পেছনে এত মানুষ সম্মিলিতভাবে থাকার ও ভয়াবহ আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ তিনি ছিলেন শতভাগ সৎ। এই মাতৃভূমি বাংলাদেশকে সবার ওপরে স্থান দিতেন। সবাইকে নির্দেশ ও নির্দেশনা দিতে তার জুড়ি ছিল না। এই ক্ষমতাটি তার অসাধারণ। অনেক কষ্টে মুখে ক্যানসার নিয়ে শহীদ জননী চষে বেড়িয়েছেন পুরো বাংলাদেশ। তাদের সবাইকে সবখানে বাংলাদেশের জন্য খুব দরকারি এই আন্দোলনে এক করেছিলেন তিনি। আন্দোলন করতে গিয়ে বাড়িটি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। দিয়েছিলেন। বই লিখতেন তিনি, কারণ তাকে আন্দোলনের খরচ জোগাতে হবে, নিজেকে চলতে হবে। খুব কষ্টে খুব অসুখে লেখার পাওয়া টাকা দিয়েছেন হাসিমুখে। এতটুকু চিন্তা না করে সবসময়। তবে কোনোদিন যাদের জন্য তার জীবন হয়েছে বিবর্ণ, শোকে, বেদনায় সারাজীবনের ভার; সেই স্বামী ও সন্তানের শহীদ হওয়া বা তাদের নিয়ে কখনো সেভাবে কোনোদিনই বলেননি তিনি। নিজের শোককে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম কোনোদিন বড় করে দেখেননি। বরং সব শোকে ও কষ্টে বুকে পাথর বেঁধে আমাদের সবাইকে সর্বক্ষণ সাহস দিয়েছেন। হাজার বিপদ মাথায় নিয়ে আমরা কাজ করে চলেছি। খালাম্মা আমাদের প্রধান সহায় হয়েছেন তার জীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত আদর্শ ও ভালোবাসায়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ও মুক্তিযুদ্ধের পরের জীবনে তার অবদান বিরাট ও চির অবিনশ্বর। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকা ও আশপাশের যেসব পুল, কালভার্ট ধ্বংস করেছেন, সেগুলো কীভাবে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে তার স্বামীর ডিজাইনে করা। নিজে গাড়ি চালিয়ে অভিজাত ও বনেদী এবং নামকরা শিক্ষাবিদ জাহানারা ইমাম অস্ত্র পেয়ে সেগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তবে সারা জীবনই মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে তাকে কষ্ট পেতে হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধীদের বিপক্ষে আন্দোলন করতে গিয়ে অসংখ্য অত্যাচার, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন খালাম্মা জাহানারা ইমাম। পুলিশ লেলিয়ে অসুস্থ এই মানুষটিকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। তাতে তিনি একবিন্দু আন্দোলন থেকে সরে যাননি কখনো। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তিনি সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন, যাতে স্বাধীন দেশে আপনজনদের হারানোর কারণগুলোকে বিচারের মুখোমুখি করতে পারা সম্ভব হয়। আমাদের তখন অনেক উড়ো চিঠিও দেওয়া হয়েছে। আমি ও আমার ছোট মেয়েদের মেরে ফেলা হবেÑভয় দেখানো হয়েছে অনেকবার। তবে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আমরা কেউ কোনোদিন দমিনি। লড়াই করেছি বারবার। সেই অবিস্মরণীয় দিনটির কথা কোনোদিন ভুলব না। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার দিন। ভোরে উঠেই চলে গেলাম বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়া সেই রেসকোর্স ময়দানে। মানুষের তিল ধারণের কোনো জায়গাও নেই। মানুষ আর মানুষ; কোথায় নেই তারা? আমরা প্রতীকী বিচারের মাধ্যমে তাদের নেতা গোলাম আযমের ফাঁসি দিলাম। নরঘাতকের ঐতিহাসিক এবং বিশ্ব ইতিহাসের অংশ বিচার হলো জনতার আদালতে। তার বিরুদ্ধে আমাদের সুনির্দিষ্ট ১০টি অভিযোগ আছে। ১২ সদস্যের বিচারক কমিটিতে যারা আছেন, তারা সবাই নামকরা; সফল ও সৎ। এই গণআদালতের সদস্য ছিলেন ভাষাসৈনিক অ্যাডভোকেট গাজীউল হক, বিখ্যাত শিক্ষাবিদ ড. আহমদ শরীফ, মাজহারুল ইসলাম, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, কবি সুফিয়া কামাল, বিখ্যাত লেখক অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ কলিম শরাফী, সাহিত্যিক শওকত ওসমান, সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কাজী নুরুজ্জামান, সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী এবং নামকরা ব্যারিস্টার শওকত আলী খান। এই দেশে তাদের কারও অবদান কোনোদিন ভোলা যাবে না। তাদের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম শহীদ জননী। তারা গোলাম আযমকে মৃত্যুদন্ডের যোগ্য ঘোষণা দিলেন বিচারের পর। সত্যিকারের মানুষের আবেগ ও বিচার প্রক্রিয়ায় সেদিন শান্তিতে থেকেছি অনেক অপেক্ষার পর। এরপর আমাদের নেতা এই গণ-আদালতের রায় কার্যকর করতে যুদ্ধাপরাধীদের সরকারের কাছে দাবি জানালেন, কিন্তু সেই সরকার গণ-আদালতের পর এই দেশের ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে অ-জামিনযোগ্য মামলা দায়ের করল। আমাদের অন্যতম ভরসা হাইকোর্টে আবেদনের পর সবাই জামিন পেলেন। লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে নিয়ে হেঁটে অসুস্থ এই মা ১৯৯২ সালের ১২ এপ্রিল গণআদালতের রায় কার্যকর করার দাবিতে স্মারকলিপি নিয়ে জাতীয় সংসদে গেলেন। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা ও স্পিকারের কাছে দাবি পেশ করলেন। পরে সংসদে মোট ১শ সংসদ সদস্য গণ-আদালতের রায় কার্যকর করার সমর্থন ঘোষণা করলেন। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আমাদের একের পর এক আন্দোলনে পুরো দেশে একাত্তরের ঘাতকদের বিরুদ্ধে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, সারা দেশে গণসমাবেশ, মানববন্ধন, জাতীয় সংসদের পথে পদযাত্রা, অবস্থান ধর্মঘট, মহাসমাবেশ নানা মূল্যবান কর্মসূচি পালন করা সম্ভব হয়েছে। ফলে আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়েছে। বাধ্য হয়ে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার ১৯৯২ সালের ৩০ জুন সংসদে চার দফা চুক্তি স্বাক্ষর করলেন। তারপরও ১৯৯৩ সালের ৩০ মার্চ আমাদের একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সমাবেশে পুলিশ নির্মম ও পরিকল্পিত হামলা করল। চরম লাঠিচার্জে আহত হলেন গুরুতরভাবে জাহানারা ইমাম। ঢাকার পিজি হাসপাতালে (এখন বিএসএমএমইউ) তার জীবন বাঁচানোর চিকিৎসা করতে ভর্তি করতে হলো। পরের বছরের স্বাধীনতা দিবসে গণ-আদালত বার্ষিকী হলো। অসীম সাহসী এই নেত্রীর নেতৃত্বে আমাদের ‘গণতদন্ত কমিটি’ ঘোষণা করা হলো। আমরা যে আরও আটজন যুদ্ধাপরাধীকে তাদের কর্মসূত্রে নির্বাচন করেছিলাম, তাদের নামগুলো তিনি ঘোষণা করলেন ও বিচার দাবি করলেন বাংলাদেশের মানুষের কাছে, সরকার ও আদালতের দুয়ারে। তারা হলেন মাওলানা আব্বাস আলী খান, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, আবদুল আলীম, মাওলানা  দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, মওলানা আবদুল মান্নান, আনোয়ার জাহিদ এবং আবদুল কাদের মোল্লা। ১৯৯৪ সালের স্বাধীনতা দিবসে গণআদালতের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হলো। সেদিন আমাদের গণতদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান ও নামকরা কবি এবং সমাজসেবী বেগম সুফিয়া কামাল ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনের রাজপথের বিশাল জনসমাবেশে এলেন। তিনি শহীদ জননীর হাতে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্ট তুলে দিলেন। এই কমিশনের সদস্যদের সবাই চেনেন ও জানেন সাহিত্যিক শওকত ওসমান, বিচারপতি কে এম সোবহান, সালাহ উদ্দিন ইউসুফ, শিক্ষাবিদ ড. অনুপম সেন, বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য্য, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ, কবি শামসুর রাহমান, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, আবদুল খালেক ও সদরুদ্দিন।
সমাবেশে আরও আটজন যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে গণতদন্তের ঘোষণা দিলাম আমরা। তবে খালাম্মার শরীর খুব খারাপ, তিনি আরও অসুখে পড়লেন। শরীর খুব খারাপ হয়ে গেল। কোনো কথাই তিনি বলতে পারেন না। তারপরও ছোট ছোট টুকরো কাগজে তিনি তার কথা, যোগাযোগ আমাদের সঙ্গে করেন। তবে আন্দোলন চলেছে। ১৯৯৪ সালের ২২ জুন থেকে তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে গেলেন। কোনো খাবারই খেতে পারতেন না। ওষুধেও কোনো কাজ হয় না। তখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে। ২৬ জুন ১৯৯৪ সাল সন্ধ্যা ৭টায় মিশিগানের ডেট্রয়েট শহরের এক হাসপাতালে ৬৫ বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন। আমরা এখনো লড়ছি।