ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় |194117|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
যুদ্ধোত্তর পর্বে মুক্তিযুদ্ধ
ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায়
উৎপল রায়

ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায়

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্যের সব তথ্য, উপাত্ত, দলিল ইতিহাসের অংশ দেশ ও দেশের বাইরে যাচ্ছে। নানা দেশে এখন এমন বিচার কার্যক্রমে বাংলাদেশের মামলাগুলো সুস্থ বিচারের প্রক্রিয়ায় ব্যবহার হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম নিয়ে গবেষণা চলছে। ১০ বছর পূর্ণ করতে চলা এই অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারে গড়া বিশেষ আদালত হলেও তার এবং সংস্থাগুলোর এক দশকের কর্ম ও অর্জন নিয়ে সারা বিশ্বে চলছে নানা ধরনের বিশ্লেষণ। লিখেছেন  উৎপল রায়। ছবি তুলেছেন সাহাদাত পারভেজ

বাংলাদেশে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের সঙ্গী মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিটি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী সরকারের তরফে বিভিন্ন সময় এ দেশের রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তিবাহিনীর দালালদেরও বিচার আলোচনায় এসেছে। স্বাধীনতা লাভের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ সরকার। তার সরকারের উদ্যোগে ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি ‘দালাল আইন বা ‘কলাবরেটর অ্যাক্ট’ জারি হয়। সংশোধনীর মাধ্যমে পর আইনটি চূড়ান্ত করা হয়। জাতীয় সংসদে বিল আকারে পাস হওয়ার পর ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৩৭ হাজারের বেশি স্বাধীনতাবিরোধীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ‘বিশেষ ট্রাইব্যুনাল’ বা ‘বিশেষ বিচারালয়’ স্থাপন করে তাদের বিচারে গঠন করা হয় ৭২টি ট্রাইব্যুনাল। এভাবে ওদের বিচার শুরু হলো। ২২ মাসে ২ হাজার ৮৪৮টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। রায়ে ৭৫২ জন দণ্ডিত হন। লঘু অপরাধে সাধারণ ক্ষমায় ২৬ হাজার অপরাধী মুক্তি লাভ করেন। তবে সরকারি প্রেসনোটে বলা হয় ‘যাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, খুন চেষ্টা ও ঘর, বাড়িতে অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই সাধারণ ক্ষমা প্রযোজ্য হবে না।’ ফলে প্রায় ১১ হাজার একাত্তরের আসামির বিচার চলতে থাকল। গণহত্যা, ধর্ষণের মতো অপরাধের বিচারে ১৯৭৩ সালের ২১ জুলাই ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস’ বা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালস’ আইন তৈরি করা হলো। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলো বাংলাদেশে। এরপর সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান দালাল আইন বাতিল করলেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধের খুনিদের বিচারের পথ বন্ধ হয়ে গেল। সেই ১১ হাজার আসামির পক্ষে আপিল করা হলো এবং বিচারে তারা ছাড়া পেয়ে গেলেন। ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইনের অধীনে তাদের বিচারের জন্য প্রায় চার দশক দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হলো। তাই মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে দীর্ঘ সময় পেরিয়েছে। এই বিচার আটকাতে সামরিক ও স্বৈরশাসকদের নেতিবাচক ভূমিকায় বিচার চাওয়ার পথ ছিল রুদ্ধ। যদিও এ নিয়ে মাঠে-ময়দানে শহীদ পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের বিবেকবান মানুষদের লড়াই চলেছে। এত কিছুর পরও বিচার পাওয়া ছিল অধরা। নানা জটিলতায় আন্তর্জাতিক আদালতেও বিচার চাওয়ার তেমন পথ ছিল না।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তের আলোকে ঘোষিত ‘রোম সনদ’-এ উল্লেখ আছে আন্তর্জাতিক অপরাধ যে দেশে সংঘটিত হয়, সে দেশ যদি বিচারের আয়োজনে অপারগ, ব্যর্থ ও অনিচ্ছুক থাকে; তাহলে অন্য কোনো দেশ জাতিসংঘে আবেদন করলে এই অপরাধগুলোর বিচার আন্তর্জাতিক আদালতে হবে। তবে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গঠন করা হয় ১৯৯৯ সালে, কার্যকর হয় তিন বছর পর ২০০২ সালে। নিয়ম অনুযায়ী সে বছরের ১ জুলাইয়ে আগে যেসব যুদ্ধাপরাধ নানা দেশে সংঘটিত হয়েছে, সেগুলোর বিচারের এখতিয়ার এই আন্তর্জাতিক আদালতের নেই। ফলে, বাংলাদেশ নিজস্ব আদালত গঠনের মাধ্যমে এসব অপরাধের বিচারের উদ্যোগ নেয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে। ভিত হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে তাদের একটি মৌলিক আইন ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস)’ ছিল। সংবিধান অভিভাবক হিসেবে আইনকে ছায়া দিয়ে চলেছে। ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গড়ে তোলে বাংলাদেশ। বহুল আলোচিত, সারা বিশ্বে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে দেশের আদালতে স্থাপিত ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’। ইংরেজিতে আদালতের নাম ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল’, সংক্ষেপে ‘আইসিটি’।

২০০৮ সালে সাধারণ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও পুরনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অন্যতম রাজনৈতিক ইশতেহার ছিল রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কাজ করা যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের তারা বিচার করবেন। তারা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় লাভ করেন। এই প্রতিশ্রুতি পূরণে আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্য ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়ারি দেশের জাতীয় সংসদে যুদ্ধ ও মানবাধিকার বিরোধীদের বিচারে আইন পাসের বিল প্রস্তাব করেন। সর্বসম্মতিতে বিল পাস হয়। স্বাধীনতার ৩৯ বছর পর দেশ এই অভিযোগের আসামিদের বিচারে নামে। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আলাদা ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল ও তদন্ত সংস্থা গড়ে তোলা হয়। তারা পূর্ণ উদ্যমে কাজ শুরু করেন। ২০১০ সালে এই ট্রাইব্যুনাল গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় ভীষণভাবে যুক্ত ছিলেন তখনকার আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। দেশের অন্যতম প্রবীণ আইনজীবী জানান, ‘মানবতাবিরোধীদের বিচারের আইনটি আগেই তৈরি করা ছিল। এ সময় আইনে বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল কেমন হবে, বিচারকাজের স্বচ্ছতা, বিচারকদের দক্ষতা, আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থন ও তাদের সমান আইনি সুযোগ নিশ্চিত করা, বিচার প্রক্রিয়া দেশ ও বিদেশে আন্তর্জাতিক মানের করে তোলা, গ্রহণযোগ্য করার কাজগুলো আমরা করেছি। এই বিচার নিয়ে দেশ-বিদেশে ষড়যন্ত্র তো কম হয়নি। পুরো কর্মযজ্ঞ বিশাল চ্যালেঞ্জ ছিল আমাদের জন্য।’ এমন অনন্য আদালত কর্মের শুরুর ইতিহাস বহু পুরনো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান নাৎসি বাহিনীর নানা দেশে চালানো গণহত্যা, সে জন্য তাদের শাস্তি দিতে মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোর অভিযোগের বিচারে গঠিত হয়েছিল ‘ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালস’। হিটলারের শাসনামলের নাজি জার্মানির প্রধান রাজনীতিবিদ, সমর নায়ক, বিচারক এবং অর্থনৈতিক নেতাদের বিপক্ষে মামলা ও তাদের বিচারের জন্য এই আদালতগুলো বিখ্যাত ও স্মরণীয় হয়ে আছে। এরপর রুয়ান্ডা, উগান্ডা, লাইবেরিয়া, যুগোস্লাভিয়াসহ পৃথিবীর অনেক দেশে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধগুলো বিচারকাজ হয়েছে, হচ্ছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একমাত্র বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়া ছাড়া অন্য দেশে কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটলেও অপরাধগুলোর বিচার করা যায়নি বা হয়নি। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল চার বছর পর্যন্ত কম্বোডিয়ায় খেমাররুজদের শাসনামলে অন্তত ১৭ লাখ নাগরিক গণহত্যার শিকার হয়েছেন। অসংখ্য মানুষ ক্রীতদাসের জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের এহেন অন্যায় কর্মে পরিণত করা, নারী ও শিশুদের নির্যাতনের মতোও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেন খেমাররুজ গেরিলা বাহিনী। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগে ২০০৬ সালে যৌথ বিচারিক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এসব মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু করেন কম্বোডিয়া। শীর্ষ কয়েকজন অপরাধীর বিচারের রায়ে সাজা হয়। বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের সহযোগিতা নিতে হয়েছে কম্বোডিয়দের। বিচারের মান নিয়ে ছিল প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একক প্রচেষ্টায় উদ্যোগ নিতে পেরেছে।

শ্রীলঙ্কায় তামিলদের বিরুদ্ধে সে দেশের সরকারের পদক্ষেপ নিয়েও নানা আলোচনা আন্তর্জাতিক মহলে হয়েছিল। সেই দেশে সংখ্যালঘু ও যুদ্ধবাজ তামিলদের ওপর গণহত্যার মতো আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। জাতিসংঘ থেকে এ অভিযোগে বিচারের চাপ ছিল দেশটির সরকারের ওপর। যদিও বিষয়টি সামনে আর আসেনি। এখন মিয়ানমারে সে দেশের সরকারি ক্ষমতায় থাকা সেনাবহিনীর বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর অভিযোগে বিশ^জুড়ে সমালোচনা চলছে। যদিও মিয়ানমার সরকার গণহত্যা ও ধর্ষণের অন্যায় অপরাধ সুকৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছে। হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে তাদের রোহিঙ্গা গণহত্যায় গাম্বিয়ার করা মামলার শুনানি হলেও সেখানে গণহত্যা, ধর্ষণের বিচার নয়, বিচার হচ্ছে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা হয়েছে কি না, সে অভিযোগ নিষ্পত্তিতে। রুয়ান্ডায় সংখ্যালঘু হুতু জনগোষ্ঠীর ওপর টুটসি সম্প্রদায়ের চালানো গণহত্যার বিচারের জন্য ‘গাসাসা ট্রাইব্যুনালস (সামাজিক আদালত)’ গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে বিচারের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মামলার পরিচালনায় সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও জনবলের ঘাটতি ছিল। আন্তর্জাতিক আদালতে স্বীকৃত এ ধরনের বিচার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ওই দেশগুলোর মতো যুক্ত হয়েছে। আমাদের ট্রাইব্যুনালাসের বিচারকর্ম দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে নতুন ধারার সূচনা করেছে নিশ্চিতভাবে। বিচারের প্রেক্ষাপট, স্বচ্ছতা, দক্ষতা, আন্তর্জাতিক মান ও বিচারিক পদ্ধতি বিবেচনায় বাংলাদেশ অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একই সঙ্গে দেশে একাত্তর সালে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারীদের বিচারের নতুন পথ দেখিয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী এ দেশের রাজাকার, আলবদর, শান্তিবাহিনীসহ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধীদের বিচার, সামাজিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব ইতিবাচক আছে। এ বিচারের মাধ্যমে ভবিষ্যতে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের আশঙ্কা ও সম্ভাবনা বিচারকার্য রোধ করবে। ট্রাইব্যুনালসে যে ধরনের অপরাধের মামলার বিচার হচ্ছে, সেগুলো সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ নয়। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইন (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল জুরিসপ্রুডেন্স) অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধ শুধু একটি গোষ্ঠী বা দেশের বিরুদ্ধে নয়, মানবতার বিরুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশে গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, দেশান্তরিতকরণের মতো গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটানো হয়েছে। সে জন্য বিচারের কাঠামো তৈরিতে শক্তিশালী ভিতের প্রয়োজন ছিল। ভবিষ্যতে যাতে বিচার নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে না পারেন, বিবেচনায় রাখতে হয়েছে। সর্বদিক চিন্তা করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের সব কাঠামো ঠিক রেখে বিচার প্রক্রিয়ার শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের আন্তর্জাতিক ‘সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা সনদ’, ১৯৪৮ সালের ‘গণহত্যা কনভেনশন’, ১৯৪৯ সালের ‘জেনেভা কনভেনশন’, দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর ১৯৫০ সালের ‘ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালস প্রিন্সিপালস’, ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল জুরিসপ্রুডেন্স (আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন) ’ ও ‘বাংলাদেশ সংবিধান’র চুলচেরা বিশ্লেষণে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের আলোকে ট্রাইব্যুনালটি গঠন করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের আরও বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিচারকরা সবাই উচ্চ আদালতের (হাইকোর্ট)। আইনজীবীরা প্রত্যেকে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সার্টিফিকেটধারী। পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মামলার তদন্ত করেছেন, করছেন। এই জঘন্য ধরনের অপরাধের বিশ্বের অনেক জায়গায় যেখানে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও আইনি সুযোগ খুব নেই, সেখানে তাদের পক্ষে এমনকি পলাতক আসামিদের পক্ষেও আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তরা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার সুযোগ পেয়েছেন, পাচ্ছেন। স্বচ্ছতায় ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ খুব নেই।

অথচ একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী এ দেশীয় অপরাধীদের বিচারের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবার ও মুক্তিযুদ্ধকামীদের। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জয়লাভ করার পর ক্ষমতাশীল আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদারদের দোসর এ দেশীয় রাজাকার, আলবদর তথা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রস্তাব (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস অ্যাক্ট ১৯৭৩-অনুযায়ী) ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। সেই আইন অনুসরণ করে বিচার ও প্রসিকিউটর প্যানেলসহ তদন্ত সংস্থাগুলো তৈরি করে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ কাজ শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। শুরু হয় বাংলাদেশের তার ইতিহাসের দায় শোধের পালা। একই সঙ্গে অকল্পনীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। স্বাধীনতার চার দশক পর এসব অপরাধে বিচারের জন্য সাক্ষী হাজির ও সেই সময়ে সঠিক তথ্য, উপাত্তগুলো উপস্থাপন করা যথেষ্ট সময়সাপেক্ষ ও কঠিন কর্ম। শুরুর দিকে দায়িত্বশীলদের আন্তরিকতা ও নিরলস শ্রমে সব বাধা উতরানো সম্ভব হয়েছে। সব প্রক্রিয়া মেনে বিচার হয়েছে। মামলার সংখ্যা বেশি, মামলাগুলোর তুলনামূলক গুরুত্ব বিবেচনা ও পুরো বিচারকাজে গতি আনতে ২০১২ সালে গঠন করা হয় আরেকটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মামলার আধিক্য কমে আসায় ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুটি ট্রাইব্যুনালকে এক করে একটি ট্রাইব্যুনাল করা হয়।

এই আদালতের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের প্রাপ্তির খাতায় যেমন অনেক কিছু আছে, তেমনি অপ্রাপ্তির বেদনা ও হতাশা বেশ রয়েছে। নানা ধরনের প্রতিকূলতা পেরিয়ে শীর্ষ কজন যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও রায় কার্যকর করা হয়েছে। অন্যদের বিচার চলছে। ১০ বছর আগে যে গতিতে বিচারকাজ শুরু হয়েছিল, এখন অনেকটাই মন্থর। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে প্রথম রায়ে একাত্তরের অপরাধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের রুকন আবুল কালাম আজাদ ওরফে ‘বাচ্চু রাজাকার’কে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয় ট্রাইব্যুনাল। একই বছরে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে আরও ৯টি মামলার রায় হয়, কিন্তু বিচারের সে গতি বজায় থাকেনি। ১০ বছরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৪১টি মামলার রায় হয়েছে। ৯৫ জন অপরাধীর দণ্ডদান হয়েছে। মামলাগুলোর রায়ে মোট মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন ৬৯ জন আসামি। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় আসামির রায়ের দণ্ড কার্যকর হয়েছে। আমৃত্যু কারাদণ্ড ঘটেছে ২৪ জনের। যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে একজনের। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ৩৩ জন কারাগারে আছেন। দণ্ডপ্রাপ্তদের আপিল বিভাগে এ পর্যন্ত ৯টি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে। আরও কটি মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাতটি রায়ে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সাবেক আমির ও মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, নির্বাহী পরিষদের সাবেক সদস্য, ধনকুবের মীর কাসেম আলী, সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল ও মন্ত্রী আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য ও সাংসদ এবং মন্ত্রী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (সাকা চৌধুরী), জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মন্ত্রী আবদুল কাদের মোল্লা, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলামকে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর বহাল রাখে সর্বোচ্চ আদালত। পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে মৃত্যুদণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) সুযোগ পাবেন তিনি। এ বছরের ১৪ জানুয়ারি যুদ্ধাপরাধী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের মৃত্যুদণ্ডের রায় সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বহাল থেকেছে। পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে তিনি মামলা ও রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনের সুযোগ পাবেন। জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির ও অন্যতম প্রভাবশালী নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টে আপিলের পর চূড়ান্ত রায়ে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দলের সাবেক আমির, বহু বিতর্কিত ও রাজাকার বাহিনীর প্রধান গোলাম আযম ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবদুল আলীমের আমৃত্যু কারাদণ্ড হওয়ার পর তারা আপিল করেছেন। আপিলের বিচারের সময় কারাগারে তারা মারা যান। আদালতের আপিল বিভাগে অন্তত ৩০টি আপিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।

নানা প্রতিকূলতা, সীমিত জনবল নিয়ে শীর্ষ কজন যুদ্ধাপরাধীসহ যেভাবে বিচারকাজ চলছে, তা কম অর্জন নয়। তবে বাংলাদেশের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের রায়ের পর এখন যে হারে মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে, তাতে কবে নাগাদ বিচার প্রক্রিয়া শেষ করা যাবে সে বিষয়ে নিশ্চিত নন কেউ। প্রধান অপ্রাপ্তি এখনো মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগঠন হিসেবে অপরাধী জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের এখনো বিচার করতে না পারা, একাত্তরে এই দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যাযজ্ঞে মূল নেতৃত্ব, পরিকল্পনা ও অংশগ্রহণ করা কুখ্যাত ও গুপ্তঘাতক ‘আলবদর’ বাহিনীর অন্যতম দুই নেতা চৌধুরী মঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানকে (নায়েব আলী) বিদেশ থেকে ফিরিয়ে এনে ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করতে না পারা। যেসব পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা একাত্তরের ভয়াল নৃশংসতায় জড়িত ছিলেন, তালিকাভুক্ত সেই ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করতে না পারা অন্যতম ব্যর্থতা। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যাকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি প্রদানের লড়াই চলছে আমাদের।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘আদালত গঠনের ১০ বছর পর মনে হচ্ছে, কাজ বেশ সফলভাবে আমরা সম্পন্ন করতে পেরেছি। পৃথিবীর অনেক দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হয়েছে, এখনো হচ্ছে, কিন্তু বিচারকার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্যান্য অনেক দেশের চেয়ে আমাদের ট্রাইব্যুনালকে এগিয়ে রাখব। এই আদালতের ইতিবাচক প্রভাব দেশ ও আন্তর্জাতিকভাবে থাকবে। বিচার প্রক্রিয়া দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে, বহির্বিশবে গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।’ ব্যারিস্টার শফিক আহমেদেরও মত, ‘যে গতিতে মামলা পরিচালনা শুরু হয়েছিল, সে গতিতে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম পরে এগোতে পারেনি। এই দেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দীর্ঘদিন পর হলেও উতরানো গেছে। বিচার না হলে বরং আন্তর্জাতিকভাবেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ত।’

ট্রাইব্যুনালকে নানা সময় প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করার চেষ্টা কম হয়নি। ট্রাইব্যুনালের একজন বিচারপতির স্কাইপ কেলেঙ্কারি, যুদ্ধাপরাধের আসামির সঙ্গে দুজন প্রসিকিউটরের যোগাযোগের ঘটনা ছিল তুমুল আলোচনায়। অন্যতম যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদেরের (সাকা চৌধুরী) রায় ঠেকাতে রায় ফাঁসের ঘটনাও ঘটেছে বিচারে বিঘ্ন ঘটানোর ধারাবাহিকতায়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শারীরিকভাবে নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, দেশান্তরিতকরণ এই অপরাধগুলোকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করার বিতর্ক তোলা হয়েছে, এই দেশের আইনগুলোর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত আদালতটি আন্তর্জাতিক অপরাধগুলোর বিচার করার মতো আদর্শ মানদণ্ডের নয় এই বিতর্ক তোলা হয়েছে, কিন্তু অপরাধ বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞদের চুলচেরা বিশ্লেষণ কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করতে সুপরিকল্পিত গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, দেশান্তরিতকরণ ইত্যাদি অপরাধ অবশ্যই আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য। আমাদের আদালতের আইন সেভাবে তৈরি করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সিনিয়র প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেছেন, ‘ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলোর কোনোটিই সাধারণ মামলা নয়। যেহেতু মামলাগুলো দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ এবং মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতায়; মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব চিরস্থায়ী বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্যক্রমের প্রভাবও চিরস্থায়ী দেশ ও দেশের বাইরে। আর পৃথিবীতে গণহত্যার ইতিহাস বন্ধ হয়ে যায়নি। বহু দেশে রাষ্ট্র, গোষ্ঠী তাদের মতামত, সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে মানতে বাধ্য করে যুদ্ধাবস্থার পরিস্থিতি তৈরি করে নৃশংসতায় লিপ্ত হয়েছে, হচ্ছে। নিকট অতীতে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ঘটেছে। ভবিষ্যতে পৃথিবীর কোনো অঞ্চলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ও গণহত্যা হলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্যক্রম নির্দ্বিধায় তাদের গণহত্যার বিচারে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত ও নজির হবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সাধারণ মানুষের কাছে যেন ফিকে হয়ে না যায়, সে জন্য পদক্ষেপ নেওয়া যেমন রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব, তেমনি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্যক্রম ইতিবাচক করে তুলে ধরার দায়িত্ব রাষ্ট্র, সরকার, রাজনীতিবিদদের। মামলাগুলোর বিচারের মাধ্যমে আলাদা ঐতিহাসিক দলিল তৈরি হচ্ছে। পৃথিবী থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধ করতে মামলাগুলোর দলিলপত্র নজির হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে জানতে, বুঝতে; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরতে মামলার নথিগুলো সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সরকারের। তাতে বহু বছর পরও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দলিলগুলোর মাধ্যমে অকথিত ইতিহাস জানতে পারবেন।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর (প্রশাসন) জেয়াদ আল মালুম বলেন ‘প্রাপ্তি যদি বলি, ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্যক্রম দেশ-বিদেশে অনন্য দৃষ্টান্ত হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়গুলো আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে কর্মগুণে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনালের রায় ও মামলার কার্যক্রমে রুয়ান্ডা, কম্বোডিয়া বহুবার আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তারা আমাদের ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্যক্রম বিশ্লেষণ করে অনুসরণ করছেন। দেশ ও দেশের বাইরে ট্রাইব্যুনালের বিচারকার্যক্রম ষড়যন্ত্র ও প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে করতে হচ্ছে। অনেক বছর পর হলেও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সান্ত¡না পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক এই অপরাধগুলোর ঘটনাস্থল বাংলাদেশ। বিচারক, আইনজীবী, তদন্ত কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা নিজ দেশের। পেশাগত দিক থেকে তারা দক্ষ, প্রতিষ্ঠিত। বহুমাত্রিক এই বৈশিষ্ট্য অন্য কোনো দেশের এমন বিচার প্রক্রিয়ায় নেই।

এভাবেও আমাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অনন্য উচ্চতায় গিয়েছে। আদালতে যুক্ত হয়ে, কাজ করে অভিজ্ঞতা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধী তালিকাভুক্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বিচার আমাদের আইনের মাধ্যমে করতে আর বাধা নেই। সময় ও সুযোগে সেসব উদ্যোগও নেওয়া হবে। সে জন্য কাজ করছি আমরা। মুক্তিযুদ্ধে রংপুরে গণহত্যার অভিযোগে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার (ওয়াহিদুল হক) বিচার ট্রাইব্যুনালে চলছে। তবে ট্রাইব্যুনাল আইনের কিছু ধারায় সংশোধন না হলে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের বিচার করা সম্ভব হবে না। এরপর জামায়াত, তাদের মুখপত্র সংগ্রামের বিরুদ্ধে বিচার ও ব্যবস্থা নিতে পারা সম্ভব হবে।’