দোরগোড়ায় মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন|194123|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
যুদ্ধোত্তর পর্বে মুক্তিযুদ্ধ
দোরগোড়ায় মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন
সত্যজিৎ রায় মজুমদার

দোরগোড়ায় মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন

অনন্য ইতিহাস ও সংগ্রহ ব্যতিক্রমভাবে গড়ে তুলছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। কী আছে এতে, কীভাবে তারা পৌঁছায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, ছাত্রছাত্রীরা কী দেখেন ঘুরে ঘুরে; পরে তারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গড়ে দেন যেভাবে। লিখেছেন সত্যজিৎ রায় মজুমদার। ছবি : মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে শুরু থেকেই ‘শিক্ষা কর্মসূচি’কাজে যুক্ত আছি আমি। এই কর্মসূচির সবচেয়ে বড় এবং খুবই ফলপ্রসূ উদ্যোগগুলোর একটি হলো ‘ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’। শিক্ষা ও সচেতনতা এবং বাংলাদেশের ইতিহাস শিক্ষা, জানা ও চর্চার এই কাজের মাধ্যমে সংগ্রহ হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মহান ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য’। আর ‘নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধকরণ’ প্রকল্পটির মাধ্যমে ‘ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’র দুটি ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পৌঁছে যাচ্ছে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল্যবান, গুরুত্বপূর্ণ, অনন্য প্রচুর স্মারক, প্রামাণ্যচিত্রসহ আরও কিছু কার্যক্রম আছে ভ্রাম্যমাণ জাদুঘরগুলোর। সেগুলোর মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে ভালোভাবে জানানো এবং এ দেশের এই নতুন প্রজন্মকে একটি সহনশীল, অসাম্প্রদায়িক জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করাই কর্মসূচির আসল উদ্দেশ্য। আমরা প্রথমবার সারা দেশের সবগুলো জেলা পরিভ্রমণ শেষে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা জেলায় দ্বিতীয়বারের মতো গিয়ে নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাদুঘর ও কার্যক্রমের প্রদর্শনী করেছি। ফলে দুবার শেষ হয়েছে বাংলাদেশ ঘোরা।

একটি বড় বাসের ভেতরে এক পলকে দেখার মতো মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মারক দিয়ে সাজিয়ে তৈরি করা হয়েছে ‘ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’। ছাত্রছাত্রীরা লাইনে দাঁড়িয়ে বাসের পেছনের বাম পাশের সিঁড়ি দিয়ে উঠে ভেতরে গিয়ে একে একে সব স্মারক দেখে, বুঝে ডান পাশ দিয়ে বাস থেকে নেমে আসতে পারেন। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জুলাই পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার ‘সিপাইপাড়া দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়’ থেকে এই জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়েছে। আজ ১৬ বছর হলো প্রকল্পটি চালু আছে। এত দীর্ঘকাল এক বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মোবাইল পাঠাগার ছাড়া আর কোনো উদ্যোগ এভাবে সারা দেশের ছেলেমেয়েদের কাছে পৌঁছেছে বলে আমার জানা নেই। দেশের ৬৪ জেলায় পরিচালিত হয়েছে আমাদের এই কাজ। অনেক জেলায় আবার বাসে জাদুঘর যাচ্ছে তাদের প্রয়োজনে।

কীভাবে কাজ করি প্রথমে কোনো জেলায় ধারাবাহিকভাবে গিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হই আমরা। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের বিদ্যালয়ে নির্ধারণ করি জাদুঘর কর্মসূচির দিনক্ষণ। তার মধ্যে অন্য বিদ্যালয়ে যাই। পরে ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর নিয়ে প্রকল্পের কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী দল পরিচালনা করে সে বিদ্যালয়ে কার্যক্রম। এই কাজের প্রধান কয়েকটি দিক হল ‘শিক্ষার্থীদের গাড়ির মধ্যে স্থাপিত স্মারক প্রদর্শন’, ‘বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস : ১৯৪৭-১৯৭১’ প্রদর্শন ও শিক্ষা, ‘মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট প্রামাণ্যচিত্রগুলো প্রদর্শন’, ‘বরেণ্য শিল্পী ‘রনবী (রফিকুন নবী)’র কাজ মানবাধিকারের পোস্টারসহ ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের ঘোষণা করা সর্বজনীন মানবাধিকার নিশ্চিত করতে মানবাধিকারের ৩০টি প্রধান ধারা এবং তাদের আলাদা রঙিন পোস্টার প্রদর্শন’, ‘বরেণ্য শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য্যরে আঁকা শান্তি-সম্প্রীতিবিষয়ক ‘পৃথিবী যদি হতো একটি গ্রাম’ শীর্ষক পোস্টারের প্রদর্শন’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী ভাষ্য সংগ্রহের জন্য শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানানো’।

বিরাট এই কাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে এসেমব্লিতে বা তাদের বড় হলরুম থাকলে শিক্ষার্থীদের আমরা কর্মসূচি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানাই। তারাও প্রশ্ন করে। আলোচনায় বলি, ‘তোমরা নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি, মুক্তিযুদ্ধ দেখোনি, কিন্তু যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তোমাদের জানতে হবে। আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রাম কীভাবে কৃষক, ছাত্র, জনতা যুদ্ধ করে এনেছেন জানতে হবে। মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের জীবনদান ও দুই লাখ নারীর নির্যাতন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা না থাকলে দেশের প্রতি মমতাবোধ তৈরি হবে না। যে মানুষ তার জন্মভূমিকে ভালোবাসতে পারবেন না, দেশের প্রতি দায়িত্ব পালনও তার পক্ষে সম্ভব নয়। একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের বাংলাদেশি সঙ্গীরা যেসব অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছিলেন আমাদের ওপর, এর ফলে তারা যেসব মৌলিক মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিলেন, সেগুলোও জানতে হবে ভবিষ্যতে প্রশ্নে। কেননা এসবের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদের জন্য এগিয়ে আসতে হবে নতুন প্রজন্মকেই। ভবিষ্যতে যুদ্ধ ও রক্তপাতহীন পৃথিবী নিশ্চিত করার জন্যও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কারণ তোমাদের জানা উচিত।’ এরপর তারা নড়েচড়ে বসে। আমরা তখন বলি, কীভাবে তারা একে একে এই জাদুঘরের স্মারকগুলো, পোস্টাররাজি, প্রামাণ্যচিত্রগুলো পরিদর্শন করবে। এরপর তাদের কাজ নতুন দেশ গড়ার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রত্যক্ষদর্শী ভাষ্য সংগ্রহ করে পাঠানো। সে কাজ কীভাবে করতে হবে এবং আমাদের হাতে এসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পৌঁছাবে জানানো হয়। এই লেখাটি তোমরা পড়ছো। তাই তোমাদেরও বলে রাখি সহজ সেই উপায় প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য সংগ্রহের নিয়ম হচ্ছে, একজন বয়স্ক মানুষকে নির্বাচন করবে, যিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন। মা-বাবা, চাচা-জেঠা, নানা-নানি, দাদা-দাদি, প্রতিবেশী, শিক্ষক, আত্মীয় যেকেউ তিনি হতে পারেন। তার কাছে আন্তরিকতা ও মায়া দিয়ে শুনবে ‘একাত্তরের দিনগুলি’। তার বর্ণনা যেভাবে বলছেন সেভাবে সাদা কাগজের একপাশে লিখলে ভালো। লেখার শুরুতে তার নাম, বয়স, তার সঙ্গে সম্পর্ক, তার ঠিকানা, সম্ভব হলে তার সঙ্গে যোগাযোগের ফোন নম্বর লিখতে হবে। আর এই শেষে লিখতে হবে সংগ্রহকারী হিসেবে তোমার নাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম, শ্রেণি, রোল নম্বর, বিভাগ, ডাক যোগাযোগের ঠিকানা, ফোন, মেইল, ফেইসবুক থাকলে সেগুলো। ইচ্ছে হলে নিজের ও মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনা দেওয়া মানুষের ছবি দিতে পারো। তার কাছে মুক্তিযুদ্ধের কোনো ছবি বা স্মারক থাকলে উল্লেখ করতে পারো। লেখার সময় তিনি যেভাবে বলছেন, সেভাবে বা নিজের মতো করে লিখে পাঠাও। লেখাটি জমা দিতে হবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী ‘নেটওয়ার্ক শিক্ষক’র কাছে। তোমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষক লেখাটি নিজ দায়িত্বে ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দেবেন। নিজেও সরাসরি জাদুঘরে লেখা পাঠাতে পারবে। আজ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা থেকে ৫১ হাজার প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য এভাবে জাদুঘরের আর্কাইভে জমা হয়েছে।
এরপর তাদের সুবিধা হয় এমন কোনো স্থানে আমাদের জাদুঘর, পোস্টার ও প্রামাণ্যচিত্রগুলো প্রদর্শন করা। যতক্ষণ শিক্ষার্থীদের দেখা শেষ না হয় আমরা থাকি। তারা ভালোভাবে দেখে বলে সাধারণত চার-পাঁচ ঘণ্টা সময় লাগে। তবে কখনো বেশি সময় লাগে। সুযোগ থাকলে অনেক সময় আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এলাকার জনগণও যোগ দেন প্রদর্শনীতে। প্রদর্শনীর সবকিছু দেখা হলে শিক্ষার্থীরা মন্তব্য খাতায় মতামত লেখেন। অসাধারণ সাড়া মেলে এরপর, সব সময়ই। এই কর্মসূচি পালনের কয়েক দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে জাদুঘরে ডাকযোগে আসতে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক প্রত্যক্ষদর্শীর একে একে অনেক ভাষ্য। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আর্কাইভে জমা হওয়া ভাষ্যের কটি নমুনা উপস্থাপন করছি “ভাষ্য ১. ক্রমিক নম্বর : ১৫৭২৮ মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে গিয়ে আমি জানতে পারলাম এক মায়ের চোখের জল আর এক বোনের আর্তনাদ। আমি সেই মায়ের কাছে তার ছেলের কথা জানতে পেরেছি। বাবা উপেন্দ্রনাথ অধিকারী ও মা গুরুদাসী অধিকারীর তৃতীয় সন্তান ছিলেন সরোজ অধিকারী। তিনি বান্দা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে বাগেরহাট জেলার বাগেরহাট সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে পরিবারের সঙ্গে ভারতে চলে যান, কিন্তু দেশের প্রতি প্রাণের টানে তার অন্য তিনজন সঙ্গীকে সঙ্গে নিয়ে দেশে ফিরে আসেন জুন মাসের ২ তারিখে। তার সঙ্গীরা ছিলেন সুভাষ মণ্ডল, সমরেশ বিশ্বাস ও শেখর বিশ্বাস। দেশে ফিরে তারা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় পাশের গ্রামের গুটুদিয়া স্কুলের একজন সহকারী শিক্ষক প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই অংশের সঙ্গী দল শান্তি কমিটির কমান্ডার। ৬ জুন, ১৯৭১ সাাল, সকাল ১১টার দিকে তিনি সরোজ অধিকারী ও তার অন্য তিন সঙ্গীকে তার বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানান। তবে সরোজ তার বাড়ির কাছের মাত্র একজন বন্ধু বিশ্বজিৎ মণ্ডলকে সঙ্গে করে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যান। তারা জানতেন না, এ ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর ষড়যন্ত্র। তারা কমান্ডারের বাড়ি থেকে ফেরার পথে কমলপুর নামক স্থানের কাছে নদী পার হওয়ার জন্য নৌকায় ওঠেন। এমন সময় পাক সেনারা তাদের লক্ষ্য করে গুলি করেন। প্রথম গুলিটি এসে লাগে বিশ্বজিতের বুকের মাঝখানে। তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। অন্য একটি গুলি সরোজের মাথার কাছে এবং হাতে লাগে। তিনি অনেকক্ষণ মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করে মারা যান। তার শরীর রাত পর্যন্ত নদীর তীরে পড়ে ছিল।

যখন বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়, তখন সরোজের পরিবার দেশে ফিরল কিন্তু সরোজ আর ফেরেননি। তাই তার জননীর চোখের জল এখনো শুকায় না, তার বোনের কান্না থামে না। এখন তার মায়ের একটাই সান্ত্বনা তার ছেলের পরিবর্তে তিনি এই দেশের স্বাধীনতা পেয়েছেন। তৎকালীন সরকার পরিবারটিকে এক হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা করেন। সরোজ অধিকারীর বাবা ছেলের শোকে পাগলের মতো হয়ে যান। তিনি তার ছেলের জন্য গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি বেদমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তার ছেলের নামে স্থাপন করেন একটি গ্রন্থাগার। এখন ‘সরোজ গ্রন্থাগার’-এ তার জননী ছেলেকে খোঁজেন প্রতিটি ছেলের ভেতরে।” সংগ্রহকারী : অনামিকা মণ্ডল, বান্দা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, দ্বাদশ শ্রেণি, গ্রাম :+ ডাক : ঘোনাবান্দা, থানা: ডুমুরিয়া, জেলা : খুলনা। বর্ণনাকারী : উষা রাণী মল্লিক, গ্রাম : বান্দা, পোস্ট : ঘোনাবান্দা, উপজেলা: ডুমুরিয়া, জেলা : খুলনা। বয়স : ৬২ বছর। ‘ভাষ্য ২. ক্রমিক নম্বর : ১৬০৬৯ ঘটনাটি আমার দূরসম্পর্কের দাদার কাছ থেকে শোনা। সে সময় তিনি একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। যখন মুক্তিযুদ্ধ হয় তখন বয়স ছিল ২০। মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক মানুষের সময় কেটেছে খুব কষ্টে। দাদা ছিলেন ৩ নম্বর সেক্টরে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থানার অধিবাসী। যখন বাড়ি থেকে বের হয়ে ব্যবসার মাল কেনার জন্য ছড়ার চরে যাচ্ছিলেন, শোনা গেল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণের বিকট আওয়াজ। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বাড়িতে ফিরে এলেন। পাকিস্তানি বাহিনী ছড়ারচর থেকে এসে ক্যাম্প করেছিল বাজিতপুর ডাকবাংলোয়। সেখানেই তাদের অবস্থান। রাতে সেখানে অবস্থান করে আর দিনে চালায় নৃশংস হত্যাকাণ্ড। পাকিস্তানি বাহিনী গুলিবর্ষণ শুরু করে বাজিতপুর থানার সব গ্রামে। তাদের গুলি পড়ে দাদার ঘরের চালে। তিনি তার ছোট ভাই ও দাদিকে নিয়ে যে দিকে পারেন, জীবন বাঁচাতে ছুটেছেন। এ সময়ের একটি প্রত্যক্ষ ঘটনা, দাদার গ্রামের প্রতিবেশী রহিম দাদার মেয়ে ঘাটে পানি আনতে গেলে পাকিস্তানি বাহিনী মেয়েকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। রহিম দাদা হাতে দা নিয়ে বের হলে পাকিস্তানি বাহিনী তাকে গুলি করে হত্যা করে। এ সময় আমার দাদা পাশের গ্রামে আশ্রয় নেওয়ার সময় দেখেন, কোলের শিশুকে আছাড় দিয়ে মেরে ঘর থেকে একজন মহিলাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে পাক সেনারা। আমার দাদার আশ্রয় নেওয়া গ্রামেও সেই বাহিনী আসছে শুনে তিনি সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম ত্যাগ করেন। চারদিকে মানুষের দৌড়াদৌড়ি। দাদা পাশের গ্রামে যাওয়ার জন্য নৌকা নিয়ে গেলে দেখতে পান কলাগাছের ভেলার মতো মানুষ ভাসছে। তাদের রক্তে পানি লাল হয়ে যাচ্ছে। দাদা পাশের গ্রাম পাটুনীতে অবস্থান করলে দেখতে পান বিশ থেকে ত্রিশজন পাক সেনা ছয়-সাতজন লোককে ধরে কাতার করে একসঙ্গে গুলি করে মেরেছে। দেখে দাদা তার ছোট ভাইকে নিয়ে আখাউড়া যাচ্ছিলেন মুক্তিবাহিনীতে অংশগ্রহণ করতে। মিলিটারিরা খবর পেয়ে তাদের যাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে। পরে দাদা আবার ছুটে পালান। বাঙালি এসব সহ্য করে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। বাঙালির মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় যৌথবাহিনীর আক্রমণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দিশাহারা হয়ে পড়ে। অসীম সাহস ও বীরত্বের জন্য আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ।’

সংগ্রহকারী : জুয়েল রানা, রাজা জিসি উচ্চবিদ্যালয়, ৭ম শ্রেণি, ক শাখা, রোল : ১, সিলেট বর্ণনাকারী, শরীয়তউল্লাহ, গ্রাম : শাহপুর, জেলা : কিশোরগঞ্জ, সম্পর্ক : দূরসম্পর্কের দাদা।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে প্রত্যক্ষদর্শী ভাষ্য এসে পৌঁছানোর পর প্রথমে ভাষ্যগুলোকে শনাক্তকরণের জন্য রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেওয়া হয়। প্রকল্প-পরিচালক ভাষ্য প্রেরণকারী প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ‘প্রাপ্তি স্বীকারপত্র’ পাঠিয়ে শুভেচ্ছা জানান। জেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে ভিন্ন ভিন্ন ফাইলে কম্পিউটারে কম্পোজ করে প্রুফ দেখা হয়। সম্পাদনায় বর্ণনাকারী ও সংগ্রহকারীর বক্তব্যের শব্দ-বাক্যের ধারা অর্থাৎ স্টাইল রক্ষার চেষ্টা থাকে। কম্পোজ হলে ভাষ্যকে শিট প্রটেক্টরে ইনক্যাপসুলেশনের পর সংরক্ষণ করা হয় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আর্কাইভে। কম্পোজ করা ভাষ্য বাইন্ডিং করে ডাকযোগে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। অনেক ক্ষেত্রে আশপাশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ভাষ্য একসঙ্গে করে পাঠানো হয়। তারা নিজের এবং অন্য প্রতিষ্ঠানের ভাষ্যও পরস্পর পড়তে ও তুলনা করতে পারেন।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর লক্ষ্য রাখেন যেন সব ভাষ্য অবলম্বন করে স্থানীয়ভাবে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। ভাষ্যে বলা মুক্তিযোদ্ধাদের শনাক্ত করতে, সংবর্ধনা দিতে, কোনো বধ্যভূমির উল্লেখ থাকলে, সেগুলো সংরক্ষণ এবং প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে উৎসাহ দেন জাদুঘর।

যেসব শিক্ষার্থী ভাষ্য প্রেরণ করেন, তাদের নামে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগে ‘সংগ্রাহক-তালিকা’ প্রকাশ করা হয়। এ পর্যন্ত ২৫টি তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। নির্বাচিত ভাষ্যের সংকলন ‘ছাত্রছাত্রীদের সংগৃহীত মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী-ভাষ্য’ নামে প্রকাশিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক লেখক ও গবেষকরা ভাষ্যগুলো প্রামাণ্যকরণের কাজে ব্যবহার করছেন নিয়মিত।
শিক্ষার্থীদের সংগৃহীত এই মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ভাষ্য যেভাবে, যে পরিমাণে জাদুঘরে এসেছে বিস্ময়কর। ভাষ্যগুলো বিচিত্র। বৈচিত্র্য উপস্থাপন, ঘটনা, আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার ও মতামতে। আছে যুদ্ধের বর্ণনা, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা, হত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর বাহিনী সাধারণ বাঙালিদের নির্যাতনের জন্য গ্রামে গ্রামে যেই বীভৎস পদ্ধতিসমূহ ব্যবহার করেছিলেন, ভাষ্যগুলোতে খুব ভালোভাবে আছে। একাত্তরে বাংলার গ্রাম্যজীবনের সমাজচিত্র সাবলীল। বরিশালের বাকেরগঞ্জ থানার সেন্ট আলফ্রেড হাইস্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় ডালিয়া নামের এক ছাত্রী লিখেছিলেন, ‘অনেক জায়গায় মৃত মানুষের স্তূপ। পুলিশ ক্যাম্পের পেছনে পুল ছিল। সেখানেও শত শত লাশ পড়ে আছে। কুকুরে দেহগুলো পানি থেকে তুলে এনে খাচ্ছে।’ বর্ণনাকারী শিক্ষিকা সিস্টার অনু একাত্তরে বরিশাল বালিকা কলেজে পড়তেন। এলাকার পাকিস্তানি বাহিনীতে খ্রিস্টান থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।

নওপাড়া নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, দিনাজপুর থেকে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ভাষ্য পাঠিয়েছিলেন শিরিন আক্তার ‘আমার দাদির চাচাতো এক ভাই জীবনের ভয়ে ল্যাট্রিনে নেমে পালিয়েছিলেন। পাক সেনারা সেখান থেকে তাকে বের করে এনে আমবাগানে হাত-পা বেঁধে গায়ের মাংস কেটে তাকেই খাওয়ান এবং কাটা গায়ে লবণ লাগিয়ে দেন।’
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রচলিত জাদুঘরের চার দেয়ালে থেমে থাকেননি। শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনা বাস্তবায়নের সুদূরপ্রসারী প্রভাব তাদের এই প্রকল্পের অভিনবত্ব। ছাত্রছাত্রীদের মননে তাদের দেখা, লেখা ও জানা আদর্শ স্থায়ী রূপলাভ দেওয়ার জন্য যে পরিকল্পনা ও পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, দেশ-বিদেশে বহুল প্রশংসিত হয়েছে। কম্বোডিয়ায় খেমাররুজ বাহিনীর গণহত্যা-সম্পর্কিত টিউল সেলং জাদুঘর (ঞঁড়ষ ঝষবহম এবহড়পরফব গঁংবঁস) আমাদের প্রকল্পের অনুসরণে একটি কার্যক্রম চালু করেছিলেন। এর প্রভাব নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস পাঠের প্রভাব থেকে কর্মসূচি নতুন প্রজন্মকে বহুভাবে মুক্ত করছে খুব দ্রুত।

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে ‘মৌখিক ভাষ্য’ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমাদের স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বহু প্রকল্প এভাবে আঞ্চলিক ইতিহাস রচনা করছে। তাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রকল্পের পার্থক্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর প্রভাব ও তাদের অংশগ্রহণ। শিক্ষার্থীরা ভাষ্য সংগ্রহের জন্য কারও কাছে একাত্তরের অভিজ্ঞতা শুনতে গেলে উভয় পক্ষের অন্তর্জগতে ‘একাত্তর’ নতুন করে বিশেষ আসন লাভ করে। একাত্তরের সঙ্গে সংগ্রহকারীর অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্র তৈরি হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও এমন কারও কাছে শিক্ষার্থীরা ভাষ্য সংগ্রহের জন্য গিয়েছেন, যাদের কাছে কেউ এ বিষয়ে কখনো শুনতেই চাননি। প্রায়ই শিক্ষার্থীরা তাদের পরিচিত, আত্মীয়দের কাছেই এই ইতিহাস শুনতে চেয়েছেন। ফলে তার ও ছাত্র বা ছাত্রীর কোনো স্বার্থ কাজ করেনি। তিনি নিজের মনের সত্যি অকপটে প্রকাশ করেছেন। ইতিহাসের বাইরে গিয়ে অযথা নিজেকে বড় করে দেখাননি। ভাষ্যগুলোতে রক্ষিত হয়েছে বাস্তবতা। হয়েছে হৃদয়-উৎসারিত, কোনো কোনো সময় ভয়ংকর ও নিষ্ঠুর সত্যের বাস্তব প্রকাশ। সাক্ষাৎকারের এমন মুহূর্তে শিক্ষার্থীর মনে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিভ্রান্তি থাকলে দূর হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে এভাবে নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-সচেতন করা এবং বিকৃত ইতিহাস বা বিভ্রান্তি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে।

প্রকল্পে শিক্ষার্থীরা সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী হিসেবে অভিজ্ঞ হচ্ছেন। হাজার, হাজার মানুষ তাদের সংগৃহীত ভাষ্য বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হতে দেখে ভীষণ উৎসাহ পাচ্ছেন। প্রকল্প পরিচালনার পর নেটওয়ার্ক শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক বজায় থাকছে। এভাবে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা দেশব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিশাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

প্রকল্প ছাত্রছাত্রীদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানার আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। ছাত্রছাত্রীরা স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করছেন, সম্মান করছে। পুরো এলাকা ও দেশ এবং বিশ্ব তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। তারা এলাকার বধ্যভূমিগুলো সরেজমিনে দেখছেন ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নিচ্ছেন। মানবাধিকার নিয়ে ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবকরা নতুন করে ভাবতে শুরু করছেন।
পরবর্তী প্রজন্মের সত্তায় মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ সঞ্জীবিত করার জন্য ‘ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’ কর্মসূচির বিকল্প নেই। এমন প্রকল্প চালু রাখা এবং উন্নয়নের জন্য সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। সারা দেশের মানুষের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কর্মসূচিগুলোর ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে।

লেখক : ব্যবস্থাপক শিক্ষা ও প্রকাশনা, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ঢাকা; গবেষক।