হাসান হাফিজুরের দলিল|194138|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২০ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
যুদ্ধোত্তর পর্বে মুক্তিযুদ্ধ
হাসান হাফিজুরের দলিল
কামরুল আহসান

হাসান হাফিজুরের দলিল

হাসান হাফিজুর রহমানকে জানা এই জন্যই গুরুত্বপূর্ণ, তার নামটি বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। তাকে জানা মানে স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র নামের অসামান্য মূল্যবান কাজগুলো সম্পর্কে জানা। ষাট-সত্তরের দশকের কবি-সাহিত্যিকদের চেনা, যারা গড়েছিলেন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি। লিখেছেন কামরুল আহসান


ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশের এক সাক্ষাৎকারের প্রশ্ন ‘প্রত্যেক কবি-সাহিত্যিককেই এমন অন্তত পাঁচটি বাক্য লিখতে হবে যেন ভবিষ্যতের মানুষ তাকে স্মরণ রাখে।’ তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল ‘আপনি কী এমন পাঁচটি বাক্য লিখেছেন?’ ‘না, আমি একটা বাক্য লিখেছি।’ ‘কী সেই বাক্য’ প্রবল আগ্রহে জানতে চাইলেন সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী। উত্তরে বললেন, ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি হিসেবে বিবেচিত মানুষটি, ‘মাহমুদ দারবিশ’!
এ কথা সত্য, আমাদের বিখ্যাত ‘কবি হাসান হাফিজুর রহমান’র ক্ষেত্রেও। তিনিও এই একটি বাক্যই লিখেছেন সারাটি জীবন ভরে। দারবিশের মতো তিনিও প্রতিরোধ, বিপ্লবের কবি। তবে, কবিই তার একমাত্র পরিচয় নয়। একাধারে কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, সমালোচক, দৈনিক পত্রিকা, সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদক, শিক্ষক ও সংগঠক। কোনো পরিচয়ই তার ছোট নয়। তিনি বিরাট মাপের মানুষ।
আশ্চর্য হলেও সত্য, সাহিত্যের বর্ণিল ভুবনে হাসান হাফিজুর রহমানের আত্মপ্রকাশ প্রকাশক হয়। ১৯৫০ সালে ‘দাঙ্গার পাঁচটি গল্প’ প্রকাশ করেছিলেন। তখন বয়স তার মাত্র ১৮। নিজে সব কাজ করলেও সম্পাদক হিসেবে দিয়েছিলেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ও আলাউদ্দিন আল আজাদের নাম। তখন পূর্ববাংলা ও ভারতের পাঁচ নামি গল্পকারের দাঙ্গা নিয়ে লেখা পাঁচটি গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল তার সংকলনে। হাসান হাফিজুর রহমান নিজেও একটি গল্প অনুবাদ করেছিলেন। সেটি খুব বিখ্যাত কৃষণ চন্দরের ‘পেশওয়ার এক্সপ্রেস’। তবে তাকে অমরতা দিয়েছে ১৯৫৩ সালের ‘একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলন’। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর প্রথম কাজ; বিরাট মাপের ও মানের এই সংকলন সারা জীবনভর বাঙালির গর্ব, অহংকার ও অর্জন হয়ে আছে। এ দেশের সাহিত্যের ইতিহাসেও বিরাট একটি মাইলফলক। কারণ, এই সংকলনে যারা লিখেছেন, পরে তারা নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশের সাহিত্যের। এই সংকলনেই কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ সৈয়দ শামসুল হকের। এক পৃষ্ঠা বরাদ্দ করে সৈয়দ হককে কবিতা লিখতে বাধ্য করেছিলেন হাসান। এই সংকলনেই আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেন তার বিখ্যাত অমর ও খ্যাতি এনে দেওয়া কবিতা, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি?’
হাসান হাফিজুর রহমান এক অসামান্য নাম। আগে আগেই বলে রাখা ভালো যে, প্রথমত তিনি ছিলেন আপাদমস্তক কবি। বাংলাদেশের প্রথম আধুনিক-রাজনৈতিক কবি তিনি। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বিমুখ প্রান্তর’, ১৯৬৮ সালে ‘আর্ত শব্দাবলী’, ১৯৬৯-এ ‘অন্তিম শরের মত’, ১৯৭২ সালে ‘যখন উদ্যত সঙ্গীন’, ১৯৭৬ সালে ‘বজ্রেচেরা আঁধার আমার’, ১৯৮২ সালে ‘শোকার্ত তরবারি’, ১৯৮৩ সালে ‘আমার ভেতরের বাঘ’ এবং পরে ‘ভবিতব্যের বাণিজ্যতরী’। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয় হাসান হাফিজুর রহমানের লেখা সমালোচনার বই ‘আধুনিক কবি ও কবিতা’। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয়েছে একমাত্র গল্পগ্রন্থ ‘আরো দুটি মৃত্যু’।
‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র’-এর সম্পাদক হিসেবে তার অসামান্য, মৌলিক ও অমর অবদান আছে। কবি, সম্পাদক পরিচয় ছাপিয়েও তিনি সবচেয়ে বেশি খ্যাতি লাভ করেছেন স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রের সম্পাদক হিসেবে। নিরপেক্ষতা প্রশ্নাতীত। সম্পাদকের পেছনে আত্মত্যাগ কিংবদন্তিতুল্য।
‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র’র সম্পাদক হিসেবে মহৎ কর্মে যোগদানের আগে হাসান হাফিজুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি সরকারি মালিকানার ‘দৈনিক বাংলা’র সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন। এই বছরের মে মাস নাগাদ পত্রিকার সমস্ত দায়িত্ব তার কাঁধে চলে এসেছিল। তবে মাত্র আটটি মাস সম্পাদক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করতে পেরেছিলেন। কারণ ১৯৭৩-এর ১ জানুয়ারি ঘটে গিয়েছিল একটি ইতিহাস আশ্রয়ী ঘটনা। সেদিন ঢাকার আমেরিকান তথ্য কেন্দ্রের সামনে ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী সাধারণ মানুষের মিছিলে পুলিশ গুলি চালাল। নিহত হলেন দুজন মানুষ। এই প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো মিছিলের ওপর পুলিশের প্রথম এমন গর্হিত গুলিবর্ষণ হলো। তাতে আরও প্রবল বিক্ষোভে বিস্ফোরিত হয়ে উঠলেন সাধারণ মানুষ। হাসান হাফিজুর রহমান সেদিন বিকেলেই একটি বিশেষ টেলিগ্রাম বের করলেন সমস্ত রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সরকারি তার পত্রিকাতেই। পরদিন দৈনিক বাংলার সম্পাদকীয়তে লেখা হলো তার অমর সাহসী কলাম ‘আদর্শ শাস্তি দিতে হবে’। তিনি জানতেন কী ঘটবে এরপর। ফলে পরোয়া করলেন না। আর এটিই হলো দৈনিক বাংলায় লেখা বিখ্যাত সম্পাদক ও সাহিত্যিক হাসান হাফিজুর রহমানের শেষ সম্পাদকীয়। শেষ হয়ে গেল তার সাংবাদিক জীবন। সরকারি পত্রিকায় সরকারবিরোধী বক্তব্যের জন্য তাকেসহ দৈনিক বাংলার নির্বাহী সম্পাদক তোয়াব খানকে চাকরিচ্যুত করা হলো। পত্রিকা থেকে সরে গেলেও মহান মানুষ বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের দুজনকেই ফেলে দিলেন না। এই হলো অন্যদের সঙ্গে শেখ সাহেবের পার্থক্য। তিনি তাদের সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন আরও ভালো জায়গায়। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কোতে বাংলাদেশ দূতাবাসের মহাগুরুত্বপূর্ণ ‘প্রেস কাউন্সিলর’র চাকরি পেলেন হাসান হাফিজুর রহমান তার চেয়ে বড় মানুষের সাহায্যে। চাকরি নিয়ে তিনি পরিবার নিয়ে ঢাকা থেকে মস্কো চলে গেলেন ১৯৭৩ সালের ৩০ এপ্রিল। এরপর সেখানে ভালোভাবে কাজ করেছেন তিনি। তবে হঠাৎ দেড় বছরের মাথায় ঢাকায় তলব হলেন তার শেখ সাহেবের কাছে। ফলে ১৯৭৪ সালের ১১ ডিসেম্বর সংসার গুছিয়ে মস্কো থেকে আবার প্রিয় স্বদেশের রাজধানী ঢাকায় ফিরে এলেন। ফেরার পর এক বছর বসিয়ে রেখেই বেতন দিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত একেবারে বেকার হয়ে জীবন কাটাতে বাধ্য হলেন বাংলাদেশের এই মহৎ কবি। তার মেয়ে এষা হাসান বাবার এই দিনগুলোর কথা মনে করে আজও ফুঁপিয়ে কাঁদেন। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক ভেঙে ‘আমাদের সংসার চালাতে এমনও হয়েছেÑ মস্কো থেকে কিনে আনা শখের জিনিসপত্র একে একে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন মা’।
১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হাসান হাফিজুর রহমানকে মূল্যায়ন করলেন। তাকে তিনি অনুরোধ করলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কোনো প্রকল্প চালু করে কাজ করতে। তাতে কবির জীবন ও সংসার বাঁচল। তিনি কাজ করতে পারলেন। মেধা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারলেন। ফলে তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৯৭৭ সালের ১ জুলাই হাসান হাফিজুর রহমান ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও মুদ্রণ প্রকল্প’র ভারপ্রাপ্ত অফিসার হিসেবে যোগ দিলেন। তবে চিরকালের স্বাধীনচেতা, সংগ্রামী ও সৃষ্টিশীল মানুষটি শর্ত দিলেন, ‘আমাদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। কোনো সরকারি হস্তক্ষেপ চলবে না।’ সরকার মেনে নিল তাকে পেয়ে। ফলে মাত্র ৩৩ লাখ ৬৩ হাজার টাকায় এক বছর মেয়াদে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখার কাজ তার মাধ্যমে শুরু হলো। ঢাকার বিখ্যাত সেগুনবাগিচা এলাকায় পাঁচটি কক্ষের একটি ছোট অফিস ভাড়া নেওয়া হলো। হাসান হাফিজুর রহমান নিয়োগ দিলেন চারজন গবেষককে। তারা সবাই খুব বিখ্যাত ‘সৈয়দ আল ঈমামুর রশীদ’, ‘আফসান চৌধুরী’, ‘শাহ আহমদ রেজা’ ও ‘ওয়াহিদুল হক’কে। আরও অনেকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে এবং অস্থায়ীভাবে নিয়োগ লাভ করে কাজ শুরু করলেন। তাদের অন্যতম আমাদের বিখ্যাত কবি ‘ত্রিদিব দস্তিদার’।
প্রামাণ্য কমিটির চেয়ারম্যান হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপ-উপাচার্য এবং প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মফিজুল্লাহ কবীর। এই কমিটির অন্যান্য সদস্য হলেন ১. ড. সালাহউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২. ড. আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ৩. ড. সফর আলী আখন্দ, পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, রাজশাহী বিশববিদ্যালয়, ৪. ড. এনামুল হক, পরিচালক, জাতীয় জাদুঘর, ৫. ড. কে এম করিম, পরিচালক, জাতীয় আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার, ঢাকা, ৬. ড. কে এম মহসীন, সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ৭. ড. শামসুল হুদা হারুন, সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৮. হাসান হাফিজুর রহমান, সদস্যসচিব। এই কমিটি ও তাদের কাজ নিয়ে বিখ্যাত সাংবাদিক ও গবেষক আফসান চৌধুরী বলেন, ‘তাদের প্রামাণ্যকরণ কমিটি গঠন ছিল যথেষ্ট নাজুক ও জটিল কাজ। যারা সদস্য ছিলেন সবাই খুব সম্মানিত গবেষক, অধ্যাপক। তারা দেয়াল হিসেবে আমাদের কাজ করেছিলেন। তা না হলে পুরো কাজ আলোর মুখ দেখত না। তারা ছিলেন বলেই কাজের আলাদা ভার ছিল। সবাই মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।’ গবেষক-সম্পাদকের সঙ্গে প্রামাণ্যকরণ কমিটির কোন কোন বিষয়ে বাগ্বিতণ্ডা হয়েছে জানতে চাইলে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, ‘হ্যাঁ, অনেক সময় আমাদের তর্ক-বিতর্ক হয়েছে কাজের স্বার্থে। পক্ষে-বিপক্ষে আমরা যুক্তি দিয়েছি। পরে আলাপের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
তাদের প্রথমে সিদ্ধান্ত ছিলÑ ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও মুদ্রণ প্রকল্প’র গবেষণা কর্ম মোট ছয় খণ্ড বই আকারে প্রকাশিত হবে। চার খ- দলিল, দুই খণ্ড ইতিহাস বই। কাজ করতে গিয়ে তারা নানা উপাত্ত সংগ্রহে স্বাভাবিকভাবেই নামলেন। ফলে পাঁচ ঘরের অফিসের চারটিই পুরো ভরে গেল দলিলপত্র নামের প্রমাণে। তারও আগে অনেকেই জানেন ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ ও রচনা’র প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। ‘জাতীয় স্বাধীনতার ইতিহাস রচনা পরিষদ’ গঠিত হয়েছিল। এই প্রকল্পের মেয়াদে কর্মীরা কাজ করে সারা দেশ থেকে প্রচুর তথ্য ও দলিল সংরক্ষণ করেছেন। বারবার তাদের কাজ দেশের পরিস্থিতিতে পিছিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৭৩ সালে পরিষদের যাবতীয় দায়িত্ব এবং তথ্য-উপাত্ত বাংলা একাডেমির নতুন গড়া ‘ইতিহাস ও পুরাতত্ত্ব বিভাগ’-এ দিয়ে দেওয়া হলো। করা হয়। একাডেমি কাজটি নিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর জাতির আকাশে কালো মেঘ নামল। সেই বছরের অক্টোবরেই কাজ বন্ধ হয়ে গেল।
‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও মুদ্রণ প্রকল্প’র মাধ্যমে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র’র কাজ শুরু হওয়ার পর বাংলা একাডেমি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পের সংগৃহীত দলিলপত্র এই প্রকল্পের গবেষকদের কাছে হস্তান্তর করলেন। তারাও বসে থাকলেন না। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুল দলিলপত্র সংগ্রহ করলেন। মোট সাড়ে তিন লাখ পৃষ্ঠার বেশি দলিল তারা সংগ্রহ করেছিলেন। অসংখ্য দরকারি দলিলপত্র দেখে এবং কাজ করে তারা গভীর আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নিলেন, সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে ইতিহাস রচনা কঠিন। সেখানে থাকবে অবিশ্বাস, সন্দেহ-ই। বিস্তর আলাপ-আলোচনার পর তাদের সিদ্ধান্ত হলো ইতিহাস রচনা বাদ দিয়ে তারা শুধু দলিলই ছাপাবেন। এই দলিলগুলোই হবে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস। শুধু দলিল প্রকাশ করলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ওপর মোট ১৫টি ধারাবাহিক খণ্ড হিসেবে। প্রতি খণ্ডে আছে ৯০০ পৃষ্ঠা, মোট পাতার সংখ্যা ১৫ হাজার। এরপর আরেকটি বাড়তি খণ্ড ছাপানো হলো প্রতিটি খণ্ডের সারসংক্ষেপ, সূচিপত্র, নির্ঘণ্ট হয়ে। যাতে পাঠকের নির্দিষ্ট তথ্য খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।
তাদের কাজ ছিল দক্ষের যজ্ঞ। অর্থবরাদ্দ সে তুলনায় নেহাতই হাতখরচা ছিল। বছর ঘুরতেই পয়সা ফুরিয়ে যেত। সরকারের কাছে নতুন বাজেটের আবেদন করে তারা বেকার বসে থাকতেন। টাকা আসত না। অনেক দেরি করে বাংলাদেশ সরকার নতুন বিল পাস করতেন। আবার কাজ শুরু করতে হতো তাদের। এই ছিল মহামূল্যবান বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক কাজের প্রধান বিড়ম্বনাও। সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের বারবার দেনদরবার করতে হতো। এই ছিল আরেক মহাযন্ত্রণা ও সময় নষ্ট। স্বীকার করেছেন প্রামাণ্যকরণ কমিটির সদস্য জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, প্রকল্পের গবেষক বিখ্যাত সাংবাদিক আফসান চৌধুরী।
দুজনেই বলেছেন আরেকটা বড় প্রতিবন্ধকতার কথ আমরা বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর কোনো দলিল পাইনি। বহুবার ধরনা দেওয়ার পরও সেনাবাহিনী কোনো দলিল হস্তান্তর করেনি। তবে সেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দলিল আছে। সেগুলো না পাওয়ায় বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদানকে তুলে ধরা যায়নি। এই একমাত্র দলিলাদির অসম্পূর্ণ দিক। আরেক বিরাট সমস্যা তারা ভোগ করেছেন, সরকারি গোয়েন্দা বাহিনীর কর্মকর্তারা প্রায়ই ছাপা ফর্মা নিয়ে যেতেন এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার নামে অনেক দিন রেখে দিতেন। তাতে কাজ অনেক পিছিয়েছে, তারা হতাশ হয়েছেন, ভয় পেয়েছেন। ‘মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র’ নামটি চাইলেও রাখা সম্ভব হয়নি বিশাল প্রকল্পটির। সে সময়ের সরকার রাজি হননি। সরকার থেকে জানানো হয়েছিল চূড়ান্ত নির্দেশস নাম হবে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র’। তারা দুজনেই এবং ইতিহাস গবেষকরা পুরোপুরি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করেছেন বিরাট এই কাজ, অসামান্য দলিল ঠিকমতো সংগ্রহ ও প্রকাশ এগিয়েছে হাসান হাফিজুর রহমানেরই অমানুষিক শ্রম ও অসামান্য প্রেরণায়। জীবনকে হাতে নিয়ে তিনি আরেক যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সেরা দালিলিক প্রমাণাদি এভাবেই উপস্থাপন করছেন সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। হাজার বছর ধরে এই জাতিকে প্রমাণপত্রগুলো বাংলাদেশের মানুষকে পথ দেখাবে। আফসান চৌধুরী জানিয়েছেন, ‘হাসান ভাই ছাড়া এ কাজ আর কেউ করতে পারতেন না। কারণ তার সততার অসামান্য ক্ষমতা ছিল। তার ওপর মানুষের যে আস্থা, আর কারও ওপর ছিল না। আরেকটা ব্যাপার খেয়াল করে দেখেছি, হাসান ভাইয়ের নাম বললেই যে কারও দরজা খুলে যেত। এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে আমরা কোনো দিনই পৌঁছাতে পারতাম না, কিন্তু সেখানে হাসান ভাইয়ের নাম ম্যাজিকের মতো কাজ করত। এমনই ছিল মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা।’
‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র’ আমাদের মহাসমুদ্র, অসামান্য ভাণ্ডার। খুঁজলে অনেক অজানা রত্নাভাণ্ডার মিলবে নিশ্চিত। সেসব নিয়ে অতীতে খাপছাড়া অনেক আলোচনা হয়েছে। অনেকের কাছে এখন অনেক কিছু হারিয়ে গিয়েছে বই করে না রাখায়। তবে স্বাধীনতাযুদ্ধের পেছনে রয়েছে বিরাট পটভূমি। সেই পটভূমি-সংক্রান্ত দলিলপত্র দুটি খণ্ডে বিভক্ত। প্রথম খণ্ডটি শেষ হয়েছে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক নায়ক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের সময়সীমায়। দ্বিতীয় খণ্ডটি ১৯৫৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। পটভূমির বেলায় যে ধরনের দলিল ও তথ্যাদি ব্যবহার করা হয়েছে : ‘গেজেট বিজ্ঞপ্তি’, ‘পার্লামেন্ট কার্যবিবরণী’, ‘কোর্টের মামলা সম্পর্কিত রিপোর্ট ও রায়’, ‘কমিশন রিপোর্ট’, ‘রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ও প্রস্তাব’, ‘জনসভার প্রস্তাব’, ‘আন্দোলনের রিপোর্ট’, ‘ছাত্রদলগুলোর প্রস্তাব ও আন্দোলন’, ‘গণপ্রতিক্রিয়া’, ‘সংবাদপত্রের প্রতিবেদন’, ‘বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রামাণ্য সমীক্ষা ও প্রবন্ধ’, ‘রাজনৈতিক পত্র’, ‘সরকারি নির্দেশ ও পদক্ষেপ’ ইত্যাদি। স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্রের তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ খণ্ডে রয়েছেÑ ‘১৯৭১ সালের প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের প্রশাসন’, ‘নানা দেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রবাসী বাঙালিদের তৎপরতা’, ‘বেতারমাধ্যম ও গণমাধ্যমে যুদ্ধপরিস্থিতির বর্ণনা’।
মুজিবনগর সরকারের দলিলপত্র সংগ্রহ প্রসঙ্গে হাসান হাফিজুর রহমান তৃতীয় খণ্ডের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘মুজিবনগর সরকারের দলিলপত্র সংগ্রহ করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ ছিল, কারণ এসব দলিল সংরক্ষণের জন্য কোনো মহাফেজখানা সৃষ্টি করা হয়নি। একই সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি দলিল-দস্তাবেজ ঢাকায় আনায়নের দায়িত্বও কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার ওপর অর্পণ করা হয়নি। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি বিভিন্নভাবে এসব দলিল নিয়ে আসেন এবং সব দলিল সংগ্রহের কেন্দ্রীয় দায়িত্ব কারও হাতে না থাকায় অনেক দলিলপত্র নষ্ট হয়ে যায়। অতএব, সংগ্রহের ব্যাপারে আমাদের প্রধানত নির্ভর করতে হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সংগৃহীত তথ্যাদি এবং বিভিন্ন ব্যক্তির নিজস্ব সংগ্রহের ওপর। বলা বাহুল্য, এর ওপর ভিত্তি করেই সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।’
২৫ মার্চ রাতে স্বাধীন বাংলা প্রচার কেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের নামে প্রচারিত স্বাধীনতার ঘোষণা এবং জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা পরপর রেখে দেওয়া হয়েছে। তথ্যসূত্র হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার উল্লেখ আছে, ‘বাংলাদেশ সরকার, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহির্বিশ্ব প্রচার বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত পুস্তিকা ‘বঙ্গবন্ধু স্পীকস’, তারিখ দেওয়া হয়েছে ‘২৬ মার্চ ১৯৭১’। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণাটির তথ্যসূত্র আছে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার প্রচারিত অনুষ্ঠানমালার টেপরেকর্ড, ২৭ মার্চ, ‘১৯৭১, দি স্টেটসম্যান, দিল্লী, ২৭ মার্চ, ১৯৭১’। তবে জিয়াউর রহমানের ঘোষণার দলিলটির পাদটিকা দেওয়া হয়েছে ‘মেজর জিয়াউর রহমান ২৭শে মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠের ঐতিহাসিক মূল কপিটি নিরাপত্তার কারণে নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল।’
বিতর্ক এড়াতে স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্রের প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় সম্পাদক হাসান হাফিজুর রহমান উল্লেখ করতে বাধ্য হয়েছেন, ‘এ কাজে একটিই আমাদের প্রধান বিবেচ্য ছিল যে, সঠিক ঘটনার সঠিক দলিল যেন সঠিক পরিমাণে বিন্যস্ত হয়। আমাদের কোনো মন্তব্য নেই, অঙ্গুলিসংকেত নেই, নিজস্ব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নেই।’
এই দলিলাদির সপ্তম খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে ‘পাকিস্তানি দলিলপত্র : সরকারি ও বেসরকারি’, অষ্টম খণ্ডে আছে ‘গণহত্যা, শরণার্থীশিবির ও প্রাসঙ্গিক ঘটনা’, নবম খণ্ডে রয়েছে ‘সশস্ত্র সংগ্রাম (১)’, দশম খণ্ডে আছে ‘সশস্ত্র সংগ্রাম (২)’, একাদশ খণ্ডে লেখা ‘সশস্ত্র সংগ্রাম (৩)’, দ্বাদশ খণ্ডে আছে ‘বিদেশি প্রতিক্রিয়া : ভারত’, ত্রয়োদশ খণ্ডে আছে ‘বিদেশি প্রতিক্রিয়া : জাতিসংঘ ও বিভিন্ন রাষ্ট্র’, চতুর্দশ খণ্ডে আছে ‘বিশ্ব জনমত’ এবং সর্বশেষ পঞ্চদশ খণ্ড হলোÑ ‘মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষদর্শী বিশিষ্টজনের সাক্ষাৎকার’। এটি মূল দলিলপত্রগুলোর সম্পূরক খণ্ড।
এই কৃতী মানুষদের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রকাশের কাজ শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রায় এক দশক পর। তত দিনে কিন্তু অনেক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষদর্শী এবং আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের অনেক বিখ্যাত নেতাÑ বঙ্গবন্ধু নিজে; প্রধান চার মুক্তিযোদ্ধা তাজউদ্দীন আহমদরা মৃত্যুবরণ করেছেন রাজনীতির করাল গ্রাসে। অনেক দলিল পাওয়াও যায়নি। সেগুলো নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। আর অনেকগুলো পেলেও ব্যাখ্যার অপর্যাপ্ততা রয়েছে। ফলে ওইসব ঘটনার যারা সাক্ষী তাদের সাক্ষাৎকারই একমাত্র ভরসা ছিল। সাক্ষাৎকার গ্রহণের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘসাপেক্ষ হওয়া সেখানেও অনেক বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত এই কাজ শেষ হতে হতে ১৯৮৩ সাল লেগে যায়। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানও বঙ্গবন্ধুর মতো নিহত হলেন। ফলে হাসান হাফিজুর রহমানদের কাজ থেমে গেল বাংলাদেশের ভাগ্যের মতো। সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসায় আবার নতুন করে তাদের বিল পাস করাতে হলো। এই কাজ করতে করতে হাসান হাফিজুর রহমান পৌঁছে গেলেন তার শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার অন্তিমপর্যায়ে। মস্কো থাকতেই তিনি অসুস্থ ছিলেন। ডায়াবেটিস রোগী ছিলেন। রাত-দিন পরিশ্রমের কারণে শরীরের দিকে মনোযোগ দিতে পারেননি। তার কিডনি, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস সবই বিকল হয়ে গেল। মাঝেমধ্যেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো জীবন বাঁচানো ধরে রাখতে। কিছুদিন কাটল পিজি হাসপাতালের রোগ শয্যায়। তারপর বাসায়। তত দিনে তার জাতিকে উপহার দিতে চাওয়া হাতের কাজও প্রায় শেষ, টাকাও। দিন কাটতে থাকল অস্বাদে-অসুখে। লিখলেন বিখ্যাত ও সেরা বাঙালি এই কবি মৃত্যুর সঙ্গে বোঝাপড়ার মতো কটি বিষাদময় কবিতা। একটির অংশবিশেষÑ ‘সারা দেহে বিষ নিয়ে,/সারা মনে আঘাতের ক্ষত নিয়ে/সারাক্ষণ চারপাশে ঘরপোড়া ছাই নিয়ে/তবুও কেন যে বহতা নদীর মতো বয়ে যেতে চাই।’ (তবুও কেন, ভবিতব্যের বাণিজ্য তরী)
তার অসুস্থতার খবর পেয়ে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক নেতা খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা, রাষ্ট্রপতি এরশাদ সবাই তাকে দেখতে ও শ্রদ্ধা জানাতে বাসায় গেলেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য আবার তাকে সরকারিভাবে সেই মস্কোতে পাঠানো হলো। যেখানে সংবাদ প্রকাশের দায়ে মহান এই সাংবাদিক বাধ্য হয়ে জীবন বাঁচাতে গিয়েছিলেন এক যুগ আগে। তবে এবার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজনহীন। হাসপাতালের নিভৃত কক্ষে ১৯৮৩ সালের ৩ এপ্রিল কবি হাসান হাফিজুর রহমান মারা গেলেন নিঃসঙ্গ। মস্কোতে তার একমাত্র বন্ধু তখন বৃক্ষসখা দ্বিজেন শর্মা। প্রতি শনিবার তিনি নিয়মিত কবিকে দেখতে যেতেন। মাঝখানে কয়েকটা দিন তিনি কাজে ব্যস্ত থেকে যেতে পারেননি। ২৩ মার্চ বিকেলে দ্বিজেন শর্মার সঙ্গে শেষ কথা হলো বন্ধু হাসান হাফিজুর রহমানের, টেলিফোনে। কবি বলেছিলেন, ‘আজ মেঝেতে পড়ে গিয়ে পিঠে বড় ব্যথা পেয়েছি, পায়ের পানিটা এবার আর যাচ্ছে না। আর শনিবার নাগাদ যদি কোরেন্টাইন উঠে যায়, তাহলে পঞ্চাশটি রুবল সঙ্গে আনিস।’ ৩ এপ্রিল দ্বিজেন শর্মা সেই মর্মান্তিক সংবাদটি শুনলেন : কবি হাসান হাফিজুর রহমান আর বেঁচে নেই।
কফিনবন্দি হাসান হাফিজুর রহমান ফিরে এলেন আপন দেশে। শেষ বিদায় জানাতে বাড়ি থেকে তার লাশ নিয়ে যাওয়া হলো বাংলা একাডেমিতে। জীবিত অবস্থায় যেমন হাসান হাফিজুর রহমান সবাইকে এক করেছেন বহুবার, কর্তব্য মনে করেছেন; মৃত্যুর পরও তেমন তার জানাজায় শরিক হলেন দলমত-নির্বিশেষে সর্বস্তরের সব মানুষ। বনানীর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হলো। তিনি চিরকালের মতো ঘুমিয়ে পড়লেন।
তার সুখ ছিল মৃত্যুর আগে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র’-এর কয়েকটি খণ্ড প্রকাশিত অবস্থায় দেখে গেছেন। সব কাজ তিনি শেষ করে গিয়েছিলেন। ফলে সব কটি খণ্ডেই সম্পাদক হিসেবে তার নামই বহাল থাকল। ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাকি খণ্ডগুলো প্রকাশিত হতে শুরু করল। প্রথম দফায় প্রতিটির পাঁচ হাজার কপি ছাপানো হয়েছিল। ২০০৩ সালে খণ্ডগুলো বিক্রি হয়ে গেল বলে পুনর্মুদ্রণের দায়িত্ব দেওয়া হলো ঢাকার হাক্কানী পাবলিশার্সকে। দলিলগুলো আমাদের জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত ছিল দীর্ঘদিন। সেখানে আরও অনেক দলিল ছিল, যেগুলো বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। আফসান চৌধুরী এই বিষয়ে জানিয়েছেন, ‘শুনেছি, সম্প্রতি জাতীয় জাদুঘর ডিজিটালাইজ পদ্ধতিতে এগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন।’
ড. আনিসুজ্জামান এবং তিনি একমত, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ : দলিলপত্র’ সংরক্ষণ ও গবেষণার জন্য আলাদা মহাফেজখানা তৈরি করা প্রয়োজন। তাতে ভবিষ্যতের গবেষকদের বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাস জানতে খুব সুবিধা হবে। আমাদের সম্পাদক হাসান হাফিজুর রহমানেরও ইচ্ছে ছিল।
তার মৃত্যুর পরপরই ছোট ভাই খালেদুর রহমান ভাইয়ের স্মৃতি সংগ্রহ করে একটি স্মারকগ্রন্থ নিজে প্রকাশ করলেন। বিক্রি হলো সবগুলো কপি বিলুপ্ত হয়ে শিগগিরই। বহু বছর পর, ২০০০ সালের জুন মাসে তার মেয়ে এষা হাসান আরেকটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করলেন আরও বেশি পাতার, ড. আনিসুজ্জামান এবং কবি বেলাল চৌধুরী সম্পাদক হলেন। সেটিও এখন আর বাজারে পাওয়া যায় না। না পাওয়া যাওয়ার কারণে কেউ পড়েন না। ফলে কোনো প্রকাশক বিক্রি করেন না। ২০০ কপি মেয়ে ছাপিয়েছিলেন, ৫০-৬০টি কপি এখনো এষা হাসানের কাছে রয়েছে। কেউ তার বাবার খোঁজে বাসায় গেলে উপহার দেন। এষা জানালেন, আমার বাবা কে ছিলেন, কী ছিলেন এই খবর তো এখন এই দেশের কেউ রাখেন না। তারপরও বাবাকে মনে রাখতে ১৯৯৫ সালে তারা গড়ে তুলেছেন ‘হাসান হাফিজুর রহমান সংসদ’। ২০০০ পর্যন্ত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা করতেন। কিন্তু প্রচার ও সহযোগিতার অভাবে দর্শক থাকতেন না। ডাকলেও গুরুত্বপূর্ণরা ব্যস্ত বলে আসতেন না। ফলে কার্যক্রম একেবারেই বন্ধ। তবে হাসান হাফিজুর রহমানের গ্রন্থগুলো বাংলা একাডেমিসহ আরও কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান নতুন করে প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানালেন মেয়ে। তিনিও বেসরকারি পর্যায়ে নতুন কিছু কাজ শুরু করবেন আশা করছেন। হাসান হাফিজুর রহমানকে আরও ভালোভাবে জানার জন্য ‘হাসান হাফিজুর রহমান স্মারকগ্রন্থ’টি অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। লিখেছেন তার সবচেয়ে কাছের বন্ধুরা, বাংলাদেশের নামকরা কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা।
তাকে নিয়ে ভালো কাজ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর ‘ভবিষ্যতের সাঁকো’। পড়লে জানা যাবে হাসান হাফিজুর রহমানের গল্প, কবিতা, সামাজিক সত্তার বিস্তারিত আলোচনা। তাকে নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন বাবুল বিশ্বাস। বেশ সমৃদ্ধ। ইউটিউবে পাওয়া যায়। হাসান হাফিজুর রহমানের কবিতাগুলোও আছে। সময় প্রকাশনী তার কাব্যসমগ্র প্রকাশ করেছেন।