ক্রিকেটে ‘বীর চূড়ামণি’|194448|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
ক্রিকেটে ‘বীর চূড়ামণি’
মোহাম্মদ খাইরুল আমিন

ক্রিকেটে ‘বীর চূড়ামণি’

যুদ্ধংদেহি বোলিংয়ে ক্যারিয়ারের শুরুতেই সবাইকে মুগ্ধতায় জড়িয়েছেন। লড়াকু মানসিকতায় অদম্য এবং আপসহীন থেকে লাখো-কোটি মায়ের ছেলে হয়েছেন। অদৃশ্য কোটি কোটি ঘর গড়েছেন মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। সবখানে তার উপস্থিতি অনুভব করা যায়। লিখেছেন মোহাম্মদ খাইরুল আমিন

মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা যেন সেই ফিনিক্স পাখি। আগুনে পুড়ে ছারখার। অদৃশ্য থেকে মেলে অবিশ্বাস্য প্রাণশক্তি। ছাইভস্ম থেকে ফিনিক্স আবার কীভাবে কে জানে নতুন প্রাণ নিয়ে উড়াল দেয় আকাশে। আর মাশরাফী? দুই হাঁটুতে সাতটি অস্ত্রোপচার নিয়ে দেড় যুগ ধরে বাংলাদেশকে সেবা দিয়ে যাওয়া এক ক্রিকেট বীর। শল্যশাস্ত্রকে চমকের পর চমক উপহার দেওয়া এক অলৌকিক মানব। হয়তো সেই ফিনিক্স পাখির বদলে অনাগত সময়ে মাশরাফীকে নিয়ে উপকথায় বলা হবে শেষ থেকে বারবার চোখ কপালে তোলা নতুন শুরুর কথা।

বয়স ৩৬। শেষটায় এসে গো ধরেছেন ক্রিকেটে ২০টি বছর পার করেই প্রাণের খেলাটাকে বিদায় বলার। গেল বছর নড়াইল-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের আইনপ্রণেতা। সেও এক বিস্ময়কর যাত্রা। বিশ্বকাপের পর থেকে সবকিছু তুলে রেখে সাংসদ মাশরাফী ছুটে বেড়িয়েছেন। সেটা মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রণালয়। ঢাকা থেকে নড়াইল। সংসদ ভবন থেকে নিজের এলাকা। নতুন এক চ্যালেঞ্জ তার। মাদকমুক্ত জেলা গড়তে হবে জেলাকে। আধুনিক শহরের প্রকৃত মডেল না বানালে চলবে না। চিকিৎসা ও প্রযুক্তি আর যোগাযোগ ব্যবস্থায় অনুপম নজিরের অঞ্চল গড়ে তোলার জেদ রক্তে বয়ে বেড়ায় নিত্য।

মাশরাফীর এই জেদ বড় অন্যরকম। এখনো যে ক্রিকেটার তার মূলে সেই জেদ। নইলে চিকিৎসাশাস্ত্র তো হাল ছেড়ে দিয়ে বসেছিল সেই কবে। নিজের ওপর বিশ্বাস থেকে অজানাকে চ্যালেঞ্জ করে বসা মাশরাফী বারবার হাঁটু ভেঙে পড়েছেন এবং প্রতিবার ভেতরে প্রবল হুঙ্কারে জেগে উঠে শেষে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বিশ্বদরবারে দিয়েছেন নতুন এক পরিচয়। তার হাত ধরেই তো অবহেলার পাহাড় ডিঙিয়ে এই পাললিক বদ্বীপের ক্রিকেটের সত্যিকারের ‘টাইগার’ বা বাঘের খেতাব মেলা। যে বাঘ কাউকে তোয়াক্কা করে না। যখন-তখন যার-তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। তার সামনে নিরাপদ নয় কেউ। এমনকি তাকে কোণঠাসা করে ফেললেও শেষটায় হঠাৎ কোনো মুহূর্তে এক লাফে উড়ে এসে দ্বিতীয় সুযোগটা আর দেয় না প্রতিপক্ষকে। চোখের পলকে ঘাড় মটকায়। মাশরাফী শুধু ব্যক্তি হিসেবে নয়, শুধু আদর্শ দলনেতার সর্বোচ্চ উদাহরণ।

ক্যারিয়ারের শুরুতে আগুনে গতি নিয়ে এসেছিলেন। ক্যারিবিয়ান গ্রেট অ্যান্ডি রবার্টস সামান্য দেখেই তার মধ্যে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ২০০১ সালে টেস্ট দিয়ে আন্তর্জাতিক অভিষেক। সেই টেস্ট শেষে জীবনের একমাত্র আক্ষেপ হয়ে রয়ে যায়। প্রথম বড় দুর্ঘটনা মাঠে চট্টগ্রামে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। ২০০৩। দেশের অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর সেই টেস্টেই সর্বনাশ। ২০০৯। ক্যারিবিয়ানে আবার হাঁটু গেল। আর টেস্টে ফেরা হলো না।

প্রথম টেস্টে নেতৃত্ব গিয়েই চোটে পড়েছিলেন। পরে আর ফেরা হয়নি ওই সংস্করণে। সব মিলে সাফল্যের বিচারে ও পরিসংখ্যানে অবশ্য অনন্যকীর্তি মাশরাফীর ওয়ানডেতে। দেশের সবচেয়ে সফল অধিনায়ক। ৮৫ ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়ে জিতিয়েছেন ৪৭টিতে। ইতিহাসের অনেক বড় দেশের অধিনায়কেরও এমন সাফল্য নেই। ২৮ টি-টোয়েন্টিতে তার নেতৃত্বে জয় ১০টিতে।

২০১১ বিশ্বকাপ চোখের জলে ভেসেছিল। ইনজুরি থেকে ফিরে বিশ্বকাপ দলে থাকার প্রত্যাশা ছিল। সুযোগ না পেয়ে মাশরাফী এও বলেছিলেন, জানেন না আর ফিরতে পারবেন কি না। সে এক অভিমানী মাশরাফী তখন।

প্রথম পৃষ্ঠার পর

মাশরাফী থেকে বেরিয়ে আসা ডাকনাম ‘কৌশিক’ হয়তো। আবার নিজেতে ফিরতেই হাঁটু জোড়া লাগিয়ে যুদ্ধে ফেরা এবং সবচেয়ে রোমাঞ্চকর শেষে ফেরার এই অধ্যায়টা।
প্রশ্ন হতে পারে, বাংলাদেশের জন্য মাশরাফী শব্দটা কী রকম মানে রাখে? আসলে এই মানুষটি ছিলেন এক কথায় এই ভূখণ্ডের ১৬ কোটি মানুষের সবার পছন্দের। এমন একটা সময় ছিল যখন মুখে মুখে এমন কথাও ঘুরত যে দেশের প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও মাশরাফীর জনপ্রিয়তা বেশি। তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রশ্নহীন। কেউ একটু আগ বাড়িয়ে মাশরাফীর রূপক অবস্থান বোঝাতে বলতেন, প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করলে নড়াইলের ছেলেটার সঙ্গে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর আকাশ-পাতাল ব্যবধান থাকবে। মানে ক্রিকেটার থাকবেন হিমালয় উচ্চতায়, বাকিরা ভূভাগে।
‘ছিল’ শব্দটা ব্যবহার না করে উপায় নেই। রাজনীতি এমন জিনিস, যা আপনকেও পর করে তুলতে জানে। গেল বছরের শেষটায় সেই রাজার নীতিতে যোগ দেওয়ার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মাশরাফী আর শুধু ক্রিকেটার থাকেননি। নির্বাচন করে জিতে এসে এখন পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ। সুতরাং, বাংলাদেশের সব মানুষের পছন্দ আর তিনি থাকতে পারেননি। একটি পক্ষ আর মাশরাফীকে ঘরের মানুষটি থেকে পরের মানুষ করে দিয়েছে।
তাতে অবশ্য এতকাল পর্যন্ত ক্রিকেট মাঠে যোদ্ধা মাশরাফী যা করে এসেছেন তার একবিন্দুও মিথ্যা হয়ে যায়নি। বিচার করবে মহাকাল। ২০১৪ সালের কথা। বাংলাদেশ দল তখন সব সংস্করণে দলিত হয়ে চলেছে। কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। টানা হার কিছুটা ভালো ওয়ানডেতেও। এ সময় মাশরাফীর কাঁধে আবার নেতৃত্ব তুলে দেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। সেই একটি সিদ্ধান্ত ইতিহাসে বারবার সাধুবাদ পাবে নিশ্চিত। কারণ, ওখান থেকে মাশরাফীর জাদুকরী নেতৃত্বে অল্প সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ায় জাতীয় দল। ওয়ানডেতে এরপর বিশ্বকাপে চমকের পর ঘরের মাঠে জায়ান্ট-বধের খেলায় মাতে। ওয়ানডেতে প্রতিপক্ষ হিসেবে সবচেয়ে ভয়ংকর এক দলে বদলে যায় বাংলাদেশ। কি বিস্ময়!
অস্ট্রেলিয়ার শল্যচিকিৎসক ডেভিড ইয়াং এসেছিলেন বাংলাদেশে। তার অভিজ্ঞতায় চিকিৎসাশাস্ত্রের জন্য অনন্য এক উদাহরণ মাশরাফী। একবার অবশ্য নিজেও খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। ছেলেটার বাঁ হাঁটুতে মিনিসকাস একদমই নেই। মাশরাফী সবকিছুকে বেশ উপভোগের মাত্রা দিয়ে সহজ করে তুলতে পারেন। নিজের শত্রু ও বন্ধু হয়ে থাকা লাগাতার চোট নিয়েও তার রসিকতার শেষ নেই। ‘আমি মনে হয় দুনিয়ার একমাত্র মানুষ, যার মিনিসকাস নেইÑ ‘যেন এই না থাকাটাও বেশ এক ব্যাপার।’
টিনএজ পেরোনোর পর বারবার তার ছুরির নিচে নিয়ে যাওয়া মাশরাফীকে ২০১১ সালে ইয়াং বলেছিলেন, ‘এবার ক্ষান্ত দাও। খেলাটা ছাড়ো।’ যে মানুষটি বরাবর সাহস দিয়ে গেছেন, তার এ অবস্থা দেখে চমকে গেলেও দ্রুত সামলে নিয়ে ক্রিকেটারের জবাব ছিল, ‘এই দফা পা ঠিক করে দেন। পরেরটা আমি দেখব।’ দেখতে দেখতে ২০২০।
সেই পরেরটা পুরো দুনিয়াও দেখেছে। অবিশ্বাস্য ফেরায় রাজার বেশে রাজ্য জয় করার মতো। সবচেয়ে কঠিন যে কাজ সেই হৃদয় জয়ের খেলা তো মাশরাফী খুব ভালো জানেন। যুদ্ধংদেহী বোলিংয়ে ক্যারিয়ারের শুরুতেই সবাইকে মুগ্ধতায় জড়িয়েছেন। লড়াকু মানসিকতায় অদম্য এবং আপসহীন থেকে লাখো কোটি মায়ের ছেলে হয়েছেন। বাবার সন্তান। অদৃশ্য কোটি কোটি ঘর গড়েছেন মাশরাফী। সবখানে তার উপস্থিতি অনুভব করা যায়।
দেশের নেতৃত্ব দ্বিতীয়বার মাথায় তুলে নেওয়ার পর ওরকম বড় ইনজুরিতে আর কখনো পড়েননি। টি-টোয়েন্টি ছেড়ে দিয়েছেন ২০১৭ সালে। শুধু ওয়ানডেতে আছেন। কিন্তু ভবিষ্যৎ কি হাঁটুর?
সেই যে ইয়াং তাকে খেলাটা ছেড়ে দিতে বলেছিলেন, তা তো আর এমনি নয়। প্রায় এক দশক আগেই মাশরাফীকে জানিয়ে রেখেছেন, এভাবে শরীরকে অগ্রাহ্য করে খেলে যেতে থাকলে শেষটায় তার হাঁটু বলে কিছু থাকবে না। বয়স ৪০-৪৫ হলে হুইলচেয়ারে বসে যেতে হবে। এখন অবশ্য সন্তানতুল্য মাশরাফীর জন্য ভিন্ন একটা ভাবনা ভেবে রেখেছেন। খেলা ছাড়লে এখন যে হাঁটুজোড়া আছে, তা খুলে ফেলে কৃত্রিম এক জোড়া হাঁটু লাগিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা।
প্রায় ৩৫ বছর হলো এই কাটাছেঁড়ার কাজ করে আসছেন ইয়াং। একবার মাশরাফীর প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘ওর মতো অবিশ্বাস্য ক্রীড়াবিদ আর দেখিনি। দুই হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ার পরও ১১ বছর খেলা চালিয়ে যাওয়া অলৌকিক ঘটনার মতোই।’ এই কথাটা পাঁচ বছর আগে বলেছিলেন। তাহলে ব্যাপার কী দাঁড়াল? ১৫ বছর ধরে মাশরাফী তার ধ্বংসপ্রায় হাঁটু নিয়ে ক্রিকেট মাঠে যা করে আসছেন তা কি অলৌকিকতাকেও হার মানায়!
মাশরাফীর প্রত্যেকটা বড় ইনজুরি মানে মেজর অস্ত্রোপচার এবং প্রত্যেকবার এমন দুর্ঘটনায় পড়ার পর তার শেষে দেখে ফেলেছেন অনেকে। কিন্তু হেরে যাওয়া মানুষদের মধ্যে যে তিনি নন। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অগাধ টান তার। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অসীম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। একবার বলেছিলেন, পায়ে-শরীরে গুলি হজম করেও কত মুক্তিসেনা সেই ১৯৭১-এর ভয়াল সময়ে দেশের জন্য লড়ে গেছেন। সেই তুলনায় তার জখম তো সামান্য! দেশের জন্য এইটুকু করতে না পারলে চলে?
মানুষ আসলে জানেই না তার ক্ষমতা কেমন অপরিসীম। বাংলাদেশ দলটাও কি জানত তাদের শক্তিমত্তা, সম্ভাবনা? হারতে হারতে সমালোচনায় বিদ্ধ, হৃদয়ক্ষরণে ক্লান্ত যখন-তখন ত্রাণকর্তার ভূমিকায় মাশরাফী। শুরু হয় নতুন লড়াই।
প্রথমবার নেতৃত্ব পেয়েই চোটে পড়েছিলেন। এরপর সুস্থ হয়ে নেতৃত্ব ফিরে পেয়ে আবার ইনজুরিতে মাঠের বাইরে। মাশরাফী আবার দেশকে নেতৃত্ব দেবেন সেটা একসময় ভাবা সম্ভব হয়নি। কারণ, নিয়মিত বিরতিতে ফিরে আসা ইনজুরির কারণে ক্যারিয়ারে মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরে তাকে থাকতে হয়েছে বেশি। তবু ঝুঁকি নিয়েছিল বাংলাদেশ বোর্ড। তখন অবশ্য উপায়ও খুব ছিল না। শেষ কার্ডটা তাই খেলে ফেলা এবং তাতেই বাজিমাত।
নেতা হিসেবে মাশরাফী অতুলনীয়। কোনো ক্রিকেটারের বন্ধু, কারও অভিভাবক, কারওবা বড় ভাই। সবার জন্য খুব কাছের কেউ। অদ্ভুত তার প্রেরণা জোগানোর শক্তি। ২০০৭ বিশ্বকাপের কথা মনে করা যায়। ক্যারিবিয়ানের সেই বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের আগে ছেলেবেলার প্রিয় বন্ধু মানজারুল ইসলাম রানার দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংবাদ শুনলেন। তখন সহ-অধিনায়ক। অধিনায়ক হাবিবুল বাশার। ঠিক করলেন, বন্ধুর জন্য বিশেষ কিছু করতে হবে বিশ্বমঞ্চে। পুরো দলকে উৎসাহিত করলেন সেই মন্ত্রে। আর মাঠে সামনে থেকে বোলিং আক্রমণের নেতৃত্ব দিলেন। গুরুত্বপূর্ণ শিকারে সৌরভ গাঙ্গুলি, শচিন টেন্ডুলকার, রাহুল দ্রাবিড়, বিরেন্দর শেবাগের ভারতকে করলেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বাংলাদেশের কাছে ওই প্রথম কোনো বড় মঞ্চে হারে শিরোপাপ্রত্যাশী ভারত। সেই ধাক্কা আর কাটিয়ে উঠতে না পারায় পরে প্রথম রাউন্ড থেকে বাদ হয়ে যায় জায়ান্ট দলটি।
তারও আগে ২০০৬ সালের কথা। ডেভ হোয়াটমোরের কোচিংয়ে লড়াই করতে শিখছে বাংলাদেশ। মাশরাফীকে ডেভ বলতেন ‘পাগাল’। অদ্ভুত কিম্ভূত সব কাণ্ড ঘটাতেন দুঃসাহসী খেলোয়াড়। তবে মাঠে সবার চেয়ে আলাদা এবং তুখোড় যোদ্ধা। স্নেহ করে তার ওই ডাক। আর হোয়াটমোরের দলের প্রধান অস্ত্র মাশরাফী। আর বিশ্বের সব দল বিশেষ সমীহ করেন পেসারকে। এমন দেশে মাশরাফীর মতো নিখুঁত নিপুণ আগ্রাসী বোলারে মুগ্ধ ক্রিকেটবোদ্ধারাও। তো সেই বছর মাশরাফী পুরো মৌসুম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে পারলেন। তার ফল হলো দারুণ। বাংলাদেশ আগের তুলনায় বেশ কিছু ম্যাচ জিতল। আর এক পঞ্জিকাবর্ষে ২৭ ম্যাচে ৪৯ উইকেট নিয়ে ফাস্ট বোলার নিজেকে নিয়ে গেলেন নতুন উচ্চতায়। ওয়ানডে ইতিহাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এক পঞ্জিকাবর্ষে ৪০ বা তার বেশি উইকেট শিকারের রেকর্ড ৭০টি। ওই তালিকার ২০তম স্থানে মাশরাফী। বাংলাদেশ থেকে আর একজন খেলোয়াড় ২০১০ সালে তালিকাটিতে ঢুকতে পেরেছেন। ২৭ ম্যাচে ৪৬ উইকেট নিয়ে সাকিব আল হাসান সেখানে ৩২তম।
তো সব ছাপিয়ে মাশরাফীকে বাংলাদেশ ও বিশ্ব ক্রিকেট সব সময় উদাহরণ দেবে একটি ডুবতে থাকা দলকে অল্প সময়ে সমীহজাগানিয়া করে তোলার জন্য। ২০১৫ বিশ্বকাপে কি কাণ্ডটাই না করল বাংলাদেশ! মাহমুদউল্লাহও দলের অন্যদের মতো মাশরাফীর কাছ থেকে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপলগ্নে একটা চিরকুট পেয়েছিলেন। সেখানে ব্যাটসম্যানের সামর্থ্যরে ওপর প্রবল আস্থার কথা লেখা ছিল। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ানের নাম এরপর মাহমুদউল্লাহ। দুটি সেঞ্চুরি করেছিলেন। ইংল্যান্ড ডুবেছিল। ক্রিকেটের জনকদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে সুপার এইটে উঠে গিয়েছিল সেই দল, যাদের নিয়ে তার কিছু আগেও নাক শিটকানো ব্যাপার ছিল অভিজাত ঘরানায়! মাশরাফীর জাদু বলে কথা।
আসলে ওটা ছিল শুরু। ধাপে ধাপে বাংলাদেশ বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ের ৬ নম্বরে উঠে আসে। ২০১৫ বিশ্বকাপের পর তো পুরো বিশ্ব বাংলাদেশ থেকে চোখ সরাতে পারেনি। নিজেদের দেশের মাঠে ‘টাইগার’ নামে পরিচিত বাংলাদেশ অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করে। দক্ষিণ আফ্রিকাকে সিরিজ হারায়। অপ্রতিরোধ্য ভারতকে সিরিজ হারিয়ে চিরকালীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মোহর এঁকে দেয় দুই দলের লড়াইয়ে।
মাশরাফীর নেতৃত্বে সে এক অদ্ভুত ঘোর লাগা সময় বাংলাদেশ ক্রিকেটের। এমন প্রাপ্তি অর্জন আর খ্যাতির বছর বাংলাদেশের তার আগে ও পরে কখনো আসেনি। কমার্শিয়ালের টাকার বাজার থেকে শুরু করে ফুটপাতে ঘুমানো শিশুর মনের পুরোটা দখল করে নেন মাশরাফী। বিশ্ব মিডিয়ায় এই নেতার চর্চা আর প্রশংসা।
কি এক অদ্ভুত পরিবর্তন! যে পরিবর্তনের পথ ধরে টেস্ট দলও বধ করে ফেলে দানবীয় একাধিক শক্তিকে। মাশরাফী তখন সত্যিকারের এক ‘মিথ’। রূপকথার নায়ক তিনি। তিনিই রূপকথা। বিশ্ব ক্রিকেটের লড়াইয়ের মঞ্চ থেকে সাধারণের সঙ্গে আচরণে কিংবা আড্ডার টেবিল থেকে গণভবনে, এমন সহজাত প্রতিভা বাংলাদেশ আর দেখেনি কখনো।
সময়ের পরিক্রমায় মাঠের মাশরাফী নড়াইলের জনগণের ‘নিতা’। আঞ্চলিক উচ্চারণে নেতা ওখানে ‘নিতা’ বটে এবং রাজনীতিতে পা রেখে গেল ২০১৯ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের কিছুদিন আগে দেশের চিকিৎসকদের চক্ষুশূল মাশরাফী। রাজনীতিতে নামার পর মুদ্রার উল্টাপিঠও দেখতে শুরু করলেন। ওসব হিসেবে ছিল না। নড়াইল সদর হাসপাতালে নিয়মিত ডিউটি ফাঁকি দেওয়া এক চিকিৎসকের সঙ্গে মাশরাফীর মোবাইল কথোপকথনের ভিডিও ভাইরাল হয়। যে ভঙ্গিতে মাশরাফী কথা বলেছেন, তা ডাক্তারদের পছন্দ হয়নি। তারা মুণ্ডুপাত করেছেন। কিন্তু মাশরাফী অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আপস করবেন না সাফ জানিয়ে দেন।
ওটা হয়তো ভিন্ন মাঠ থেকে জীবনের নতুন এক অধ্যায়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জনের শুরু ছিল। বিশ্বকাপে দল প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। বোলার মাশরাফীও পারফর্ম করতে পারছিলেন না। ক্যাপ্টেন না হলে দল থেকে বাদ পড়ার কথা। শেষটায় তেমন হচ্ছিলও বটে। কিন্তু মাশরাফী সব ম্যাচ খেলে আসেন এবং একটি আসরে এমন মøান পারফরম্যান্সের পর নড়াইলের মানুষের সঙ্গে পথ হাঁটতে হাঁটতে রক্তাক্ত হন। সেই রক্তক্ষরণ তাকে নিয়ে বোর্ডের আচরণেও। এমন কথা চলল যার মানে মাশরাফী এখন বোঝা হয়ে উঠেছেন। মানে মানে অবসর নিয়ে চলে গেলেই বাঁচে বোর্ড!
সময় যে কি নিষ্ঠুর! যে ক্রিকেটারদের বুকে আগলে রাখার জন্য তার সুনাম, যে দলকে গড়ে তোলার প্রধান কারিগর তিনি সেই দলের খেলোয়াড়রাও বিশ্বাস হারায়! তা নয় তো কি? নইলে সাকিবের নেতৃত্বে মুশফিক-মাহমুদউল্লাহসহ দেশের শীর্ষ ক্রিকেটাররা যে এক দুপুরে হঠাৎ ধর্মঘটে চলে গেলেন, তা মাশরাফী জানলেন না কেন? পরে ফেইসবুকের স্ট্যাটাসে কষ্ট ঝরেছে মাশরাফীর লেখা স্ট্যাটাসের অক্ষরগুলো। যদিও সব ভুলে তিনিও ক্রিকেটারদের সঙ্গে একাত্ম থাকার ঘোষণা দেন। তিনিও প্রতীকী ধর্মঘটী।
তবে তখনো ‘শক’ বাকি। ২০১৯-২০ বিপিএল-বিশেষ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে তার নামে। সেই বিপিএলের আইকন মাশরাফীও। দেশের ওয়ানডে অধিনায়ক। আগের ৬ বিপিএলের চারটি জিতেছেন ক্যাপ্টেন হিসেবে। কিন্তু এবারের বিপিএলের নিলামে প্রথম রাউন্ডে আইকন বেছে নেওয়ার সুযোগ যখন-তখন কেবল মাশরাফীকে ৭ দলের কেউ নিল না। এভাবে ৭ রাউন্ড পেরিয়ে গেল। মাঝে বিশেষ বৈঠক হয়েছে বিরতিতে। ঢাকা প্লাটুন অষ্টম রাউন্ডে মাশরাফীকে দলে টানে। এক দলে তাতে দুই আইকন। বিষয়টা বিস্ময়কর।
এভাবে চলতে চলতে ওজন কমিয়ে বিপিএলে খেললেও ফর্ম নেই তেমন। মার্চের আগে ওয়ানডে নেই। সামনে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বলে ওয়ানডে খেলা কম। আর এই সংস্করণ না হলে তো মাশরাফীর আন্তর্জাতিক মাঠে উপস্থিতি নেই। আবার খেলার দিন গুনছেন। কিন্তু সময় তার পক্ষে আর নেই। যদিও মাঠের অবসরের সুযোগটা প্রাপ্য। কী আছে মনে তা শুধু মাশরাফী নিজে জানেন।
কিন্তু ওই যে জেদ! মাশরাফীকে সাফল্যের পথ দেখিয়েছে যা সব সময়। মাঠ থেকে সম্মানের বিদায়ের জন্য শেষটায় নিশ্চিতভাবে আবার জ্বলবেন একসময়ের ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’।
তা শেষটায় জ্বলতে ব্যর্থ হলেওবা কি। কিছু এসে যায়? ভঙ্গুর একটা দেশের ক্রিকেটে প্রাণ ভরে দেওয়া মানুষটি মাশরাফী। জাতীয় বীর। এমন বীর হয়তো শতবর্ষে একজন আসে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে ‘বীর চূড়ামণি’ মাশরাফী। শ্রদ্ধাভরে এক দিন হয়তো জাতি প্রাতঃস্মরণীয় বানাবে শিক্ষাকার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করে। একজন মাশরাফী মানেই যে একটি বাংলাদেশ।