বাংলাদেশ ফুটবলের প্রথম মেগাস্টার|194455|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
বাংলাদেশ ফুটবলের প্রথম মেগাস্টার
জগন্নাথ বিশ্বাস

বাংলাদেশ ফুটবলের প্রথম মেগাস্টার

চোখে স্বপ্ন আর বুকে আশা নিয়ে বড় ফুটবলার হতে চেয়েছিলেন কাজী সালাউদ্দিন। বিএএফ শাহীন কলেজের ছোট্ট মাঠের গণ্ডি পেরিয়ে দেশ-দেশান্তরে কৈশোর আর প্রখর যৌবন কাটিয়েছেন। হয়ে উঠেছেন ফুটবলের সোনালি সময়ের নায়ক। লিখেছেন জগন্নাথ বিশ্বাস

কাজী সালাউদ্দিন নিজেই গল্পটা বলেছেন। আমরা তার বয়ানে আগে গল্পটা শুনি, ‘১৯৭৭-৭৮ সালে একটা টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল ফুটবলে পেশাদারিত্ব আসা উচিত কি না। সেখানে অনেক সিনিয়র খেলোয়াড় এবং কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন। সেই উন্মুক্ত বিতর্কনির্ভর সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাই বলেছিলেনÑ খেলাধুলায় পেশাদারিত্ব আসা উচিত নয়। টাকা-পয়সা ভিন্ন ব্যাপার। খেলোয়াড় হবে অ্যামেচার। তখন একমাত্র আমি বলেছিলাম, আপনাদের সঙ্গে একমত নই। উপস্থিত সবাই এটাকে আমার ঔদ্ধত্য হিসেবে নিয়েছিলেন। তারা সবাই ছিলেন আমার চেয়ে বয়সে বড়। তবু আমি পেশাদারিত্বের পক্ষে জোর গলায় যুক্তি দিয়েছিলাম। তারা আমার যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলেন, রাশিয়ার দিকে তাকান! তখন রাশিয়া ছিল সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কমিউনিস্ট রাষ্ট্র চীনের কথাও তারা বলেছিল। তখন আমি প্রত্যুত্তরে বলেছিলাম, রাশিয়া এবং চীন কিন্তু ফুটবলে কিছু জিততে পারেনি।’

এরপরই একটা ঘটনা ঘটে। কোনো একটা ম্যাচে বাংলাদেশ খুব বিশ্রীভাবে হেরেছিল। মিডিয়াতে দারুণ শোরগোল। লেখা হলো এই দলটাকে পাঁচ বছর দেশের বাইরে যেতে দেওয়া উচিত নয়। এরা দেশে ট্রেনিং করুক। তারপর খেলতে যাক। তখন একমাত্র কাজী সালাউদ্দিনই জোর গলায় বলেছিলেন, ‘এটাও কাজ করবে না।’ যুক্তি দিয়েছিলেন, ‘যে পাঁচ বছর আমি দেশে ট্রেনিং করব সেই সময় ফুটবলের মান পড়তে থাকবে। যে দেশগুলো আমাদের মানের ফুটবল খেলত তারা বাইরে অপেক্ষাকৃত বেশি মানসম্পন্ন দলের সঙ্গে খেলে এগিয়ে যাবে। ফলে আমাদের সঙ্গে ফুটবল মানের পার্থক্য ক্রমশ বাড়তেই থাকবে।’

দেশের ফুটবল সমাজ এবং মিডিয়া তখন সালাউদ্দিনের কথা মানতে চায়নি। কারণ সংবাদপত্রে পাঁচ বছর খেলতে না দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তখন যে রিপোর্ট লেখা হয়েছিল তার উৎস ছিল চীন। কমিউনিস্ট শাসিত দেশটি  তখন কোনো এক ম্যাচে বিশ্রীভাবে হেরে যাওয়ার পর তাদের ফুটবল দলকে পাঁচ বছরের জন্য বাইরে খেলা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। তারাও নিজের দেশে ট্রেনিং করা ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে ফুটবল খেলেনি। পাঁচ বছর বাদে চীন খেলতে এসে দেখে, অন্য দলের তুলনায় তাদের ফুটবল মানের উন্নতি দূরের কথা, মান আরও পড়ে গেছে। আগে যে দলের সঙ্গে তারা ৩-০ গোলে হারত, পাঁচ বছর বিরতির পর খেলতে নেমে তারা দেখল গোলের ব্যবধান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫-০। বাইরে খেলে খেলে অন্যান্য দলের ফুটবল এগিয়ে যাওয়া দেখে চীন বুঝতে পেরেছিল তারা ভুল করেছে। এটা বুঝতে পারার পর চীনা ফুটবল আবার পেশাদারিত্বের পথে হেঁটেছে। ৩০ বছর পথ হাঁটার পর অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চীন বিশ্বকাপে খেলে ২০০২ সালে।

এত কিছু লেখার কারণ একটাই, কাজী সালাউদ্দিনের ফুটবল মস্তিষ্ক কতটা ক্ষুরধার সেটা বোঝানো। দক্ষতা এমনি এমনি আসে না। মাঠে পায়ের কারুকাজের পেছনে বুদ্ধির দীপ্তিও থাকে। এখনকার প্রজন্ম হয়তো জানেই না জাপানের বিপক্ষে গোল করেছেন তিনি। সেই স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নিজেই বলেছিলেন, ‘আশি-নব্বইয়ের দশকে জাপানের বিপক্ষে আমি নিজে গোল করেছি। এখনকার জাপানের সঙ্গে তুলনা করতে গেলে খুব অবাক লাগে। তারা খেলাটা ধরে রেখেছিল বলেই আজ এত দূর এগিয়ে যেতে পেরেছে। একটা ঘটনার কথা আমার এখনো মনে আছে। ওটা যতদূর সম্ভব ১৯৯৩ সালের ঘটনা। জাপানে যেদিন প্রথম পেশাদার লিগ চালু হয়, টোকিওতে সেদিন আমি স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলাম। প্রথম ম্যাচে আলোর ফোয়ারার কথা আমার এখনো মনে আছে। পরে জানতে পেরেছিলাম সেদিন শুধু আলোর পেছনে ব্যয় হয়েছিল ৫ মিলিয়ন ডলার, মানে ৩৫ কোটি টাকা। শুধু উদ্বোধনের একটা অংশের পেছনেই যদি এমন ব্যয় হয়, তাহলে পরিকাঠামো তৈরি এবং জাতীয় লিগ মাঠে নামানোর প্রস্তুতির পেছনে কত ব্যয় হয়েছিল ভাবতে পারেন। খুব সহজে কিছু হয় না। সবকিছুর পেছনে অনেক ঘাম, অর্থ, অনেক পরিশ্রমের ইতিহাস থাকে। একটা স্বপ্ন থাকতে হয়।’

চোখে স্বপ্ন আর বুকে আশা নিয়েই বড় ফুটবলার হতে চেয়েছিলেন কাজী সালাউদ্দিন। সেই সময় বিএফ শাহীন কলেজের মাঠ ছিল ছোট। ঘন সবুজ গাছপালায় ঘেরা। সেই মাঠেই প্রথম বলে পা ছোঁয়ালেন এক কিশোর। তারপর ছোট্ট মাঠের গণ্ডি পেরিয়ে দেশ-দেশান্তরের কৈশোর আর প্রখর যৌবন কাটিয়ে দিয়েছেন। হয়ে উঠেছেন ফুটবলের সোনালি সময়ের নায়ক। দেখেছেন ক্রমশ উজ্জ্বল হতে হতে ফুটবলের জৌলুস হারাতে। কিন্তু ওই দৈন্যদশা মেনে নেননি। না মাঠে না মাঠের বাইরে। সেই মানসিকতা তার ছিল না। তাই ফুটবলের ক্রান্তিকালে আবার সংগঠক হিসেবে এগিয়ে এসেছিলেন। চেয়েছিলেন ফুটবলে নব্বইয়ের দশকের উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু পথে পাহাড় সমান বাধা। নিন্দুকেরও অভাব নেই। আছেন ঘরের শত্রু বিভীষণ কর্মকর্তারাও। তার বিরুদ্ধে স্বজনপোষণ ও প্রশাসনিক স্বৈরাচারের অভিযোগ এনে এক সময় ফিফার কাছে গোপন চিঠিও দেওয়া হয়েছিল। এতকিছুর পরও তিনি ফুটবল ছেড়ে যাননি। স্বার্থপর রাজনীতির জটিল আবর্ত থেকে দেশের ফুটবলকে উদ্ধারের চেষ্টা করেছেন নিরন্তর। পেরেছেন কি?

ফুটবলার সালাউদ্দিন যদি দশে দশ হন, প্রশাসক সালাউদ্দিন কত মার্ক পাবেন? দেশের ফুটবলের হতশ্রী দশা দেখে কেউ হয়তো সব দায় চাপিয়ে দেবেন তার প্রশাসনিক ব্যর্থতার ওপর। কিন্তু ফুটবলে উন্নতির দায় কি একা ফুটবল ফেডারেশনের। কাজী সালাউদ্দিন তা মানতে রাজি নন, ‘আমাদের দেশে একটা ভুল ধারণা আছে যা ফুটবল-শক্তিধর দেশগুলোর ধারণার সঙ্গে মেলে না। আমাদের দেশে ফুটবল ফেডারেশনকে বলা হয় ফুটবলার তৈরি করতে। কিন্তু পৃথিবীর কোনো ফুটবল ফেডারেশনই খেলোয়াড় তৈরি করে না। তাদের কাজ হলো টুর্নামেন্টগুলোর আয়োজন করা। তারা শুধু খেলাটার ডিসিপ্লিন মেনটেন করে। ল অ্যান্ড অর্ডার তৈরি করে খেলাটার মার্কেটিং করে কিন্তু খেলোয়াড় তৈরির আসল কাজটা করে ক্লাব। যেমন আয়াক্স আমস্টারডাম নেদারল্যান্ডসের একটা ক্লাব। সে দেশের জনসংখ্যা বড়জোর ৮ থেকে ১০ মিলিয়ন। কিংবা ধরুন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ... এদের প্রডাকশন লাইনটাই আলাদা। আমরা তো ওদের মতো পেশাদারিত্বের কথা কল্পনাও করতে পারি না। আমাদের দেশের ক্লাবগুলোর তো কোনো শক্তিশালী পদ্ধতি নেই। সেই পেশাদারি মনোভাব, পরিকাঠামোও আমরা এদের কাছ থেকে আশা করতে পারি না। কিন্তু ফুটবলার তৈরির মূল কাজটা তাদেরই। পৃথিবীর অন্য দেশগুলোর থেকে আমাদের ফেডারেশনের পার্থক্য হলো, একই সঙ্গে দুটো কাজ করতে হয়। আমরা খেলাটার আয়োজনও করি আবার খেলোয়াড় তৈরি করাও আমাদেরই দায়িত্ব। কিন্তু ফুটবলার তৈরি করা ফেডারেশনের কাজ নয়। আমি পেশাদারি ফুটবল কী এটা জানি বলেই এই কথাগুলো বলতে পারছি। পৃথিবীর সব ফুটবল সংগঠন কীভাবে কাজ করে আমি জানি। তাদের দেখেছি, শুনেছি। ফেডারেশনের বড় কর্তব্য হলো ক্লাবগুলোকে সব দিক দিয়ে শক্তিশালী করা। আমি স্পন্সরের সব টাকাই ক্লাবগুলোকে দিতে চাই। আমি কথায় কথায় বলি ক্লাবগুলোকে বড় করো। ক্লাব হলো যেকোনো দেশের ফুটবলের মেরুদণ্ড।’

ক্যাসিনো কালচার, আর্থিক দুর্নীতি, রাজনৈতিক অসততায় বাংলাদেশ ফুটবলের সেই মেরুদ-টাই ভেঙে গেছে। তাহলে কি কোনো আশা নেই? বহুমুখী বিপন্নতার মধ্যেও স্বপ্ন দেখেন তিনি, ‘আমি জেগে স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। আমি যখন বিছানায় যাই, ঘুমিয়ে পড়ি এবং জেগে উঠে দেখি ভোর হয়ে গেছে... তখন কোনো স্বপ্নের কথা মনে করতে পারি না। সারা রাতের ঘুমের ঘোর থেকে জেগে ওঠার পর দেখি আলো আসছে...। আমি উঠে বসি... তারপর কাজ আর স্বপ্নের মধ্যে সারা দিন কেটে যায়। সবার মতো আমারও নিজস্ব একটা জীবন-দর্শন আছে। আমি খুব বিশ্বাসও করি। ছোটবেলায় বলত না, আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা... এটা ছিল একটা গল্প... চাঁদ কখনো চাঁদের কপালে টিপ দিতে আসে নাকি? কিন্তু এই ছড়া শুনে হয়তো কেউ একজন... হতে পারে আমেরিকায় কিংবা আফ্রিকায়... কোনো কোলাহলময় শহরে কিংবা জঙ্গলে... কোনো একজন হয়তো ভেবেছিল চাঁদে যাওয়া যায় না? তার পাশের লোকটা তাকে নিয়ে নিশ্চয়ই হাসাহাসি করেছিল। অনেক বছর হলো সেই স্বপ্ন তো সত্যি করেছে মানুষ। স্বপ্ন এখন বাস্তব। কাজেই স্বপ্ন দেখতে হয়। আমিও ফুটবল নিয়ে এখনো খুব বড় স্বপ্ন দেখি।’

বাংলাদেশ ফুটবলে একমাত্র সালাউদ্দিনের কণ্ঠেই এমন স্বপ্নের কথা মানায়। কারণ ফুটবল পায়ে তিনি এক সময় দেশ স্বাধীনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। মার্চের কালরাত্রির বীভৎসতা দেখে মাকে বলেছিলেন, ‘আমি যুদ্ধে যেতে চাই।’ মা নিষেধ করলেন। বাবা বলেছিলেন, ‘ছেলে যুদ্ধে না গেলে কে স্বাধীন করবে দেশ।’ তাই ১৯৭১-এ আগরতলায় গিয়ে ট্রেনিং শুরু করলেন সালাউদ্দিন। রাইফেল হাতে যুদ্ধে যাবেন এমন সময় কলকাতা থেকে ডাক এলো ফুটবল পায়ে যুদ্ধে নামার। তৈরি হলো স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। মুক্তিযুদ্ধের নতুন রণাঙ্গন। কাজী সালাউদ্দিন সেই রণাঙ্গনের সেনাপতি। বাংলাদেশ ফুটবলের উত্তরণের আশ্বাস তিনি দিয়ে থাকলে তার কথায় আমাদের বিশ্বাস রাখা উচিত। কারণ ব্যবসা, সংসার, সংগঠকÑ সব শেষে মনের গভীরে কাজী সালাউদ্দিন একজন খাঁটি ফুটবলার। যার চারপাশে ঘিরে থাকে তুঙ্গস্পর্শী স্টারডমের আভিজাত্য।