আবাহনী : দেশের সবচেয়ে সফল ক্লাব|194460|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
আবাহনী : দেশের সবচেয়ে সফল ক্লাব
সুদীপ্ত আনন্দ

আবাহনী : দেশের সবচেয়ে সফল ক্লাব

আবাহনী। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক অনন্য নাম। অতি অল্প সময়ের মধ্যে সাফল্যের চূড়া স্পর্শ করে আজ আবাহনী বাঙালির হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। এখনো দেশের তুমুল জনপ্রিয় দু’টি ক্লাবের একটির নাম আবাহনী। ফুটবল, ক্রিকেট এবং হকি। দেশের প্রধান তিনটি খেলায় আবাহনীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠাকাল থেকে শুরু করে আজ অবধি অটুট আছে। অথচ এই ক্লাবটির জন্মই হয়েছিল এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে। লিখেছেন সুদীপ্ত আনন্দ। ছবি : নাজমুল হক

আবাহনী। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক অনন্য নাম। অতি অল্প সময়ের মধ্যে সাফল্যের চূড়া স্পর্শ করে আজ আবাহনী বাঙালির হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। এখনো দেশের তুমুল জনপ্রিয় দু’টি ক্লাবের একটির নাম আবাহনী। ফুটবল, ক্রিকেট এবং হকি। দেশের প্রধান তিনটি খেলায় আবাহনীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠাকাল থেকে শুরু করে আজ অবধি অটুট আছে। অথচ এই ক্লাবটির জন্মই হয়েছিল এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে। রূপান্তর ও আধুনিকতার বার্তা নিয়ে আবির্ভূত হওয়া আবাহনী দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে যুগে যুগে করেছে সমৃদ্ধ। ধানম-ির এই ক্লাবটি আজও ধরে রেখেছে তাদের অতীত আভিজাত্য। তাই তো দেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে লাখো আবাহনী সমর্থক। ফুটবলাঙ্গনে আবাহনীর উজ্জ্বল পদযাত্রা থাকলেও ক্রিকেট, হকি, টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টনেও অসংখ্য সাফল্য সংরক্ষিত ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটির শো-কেসে। অথচ এই ক্লাবটি প্রতিষ্ঠালগ্নে দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হবে সেটা ভাবার লোকের ছিল বড্ড অভাব। মূলত একটি মাঠকে দখলমুক্ত করার লক্ষ্যেই জন্ম আবাহনী শব্দটির।

ষাটের দশকে ধানম-িতে এত মানুষের বসতি ছিল না। সুউচ্চ দালান, দোকানপাট সেভাবে হয়নি। বাঙালি-বিহারি মিলিয়ে রাজধানীর এই অঞ্চলে তখন ৫০-৬০টি পরিবারের বসবাস। সারা দিন চাকরি-বাকরি করে সে সব পরিবারের মানুষরা সাত তাড়াতাড়ি বাসায় ঢুকে পড়তেন। পরিবারগুলোর মধ্যে সেভাবে মেলামেশাও ছিল না। সাত মসজিদ রোডে তখন কে ডি এস ফার্মাসিউটিক্যালস ল্যাবরেটরির সামনের মাঠের এক ধারে ছিল ধানম-ির কিছু উঠতি তরুণের আড্ডা। সত্যি বললে সে সময় খেলার মাঠটিতে খেলার পরিবেশ ছিল না। পরিত্যক্ত ইট-বালু-সুরকিতে ভরা ছিল। সেই মাঠেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিয়ে কাটত হারুনুর রশীদ, জি এম ইকবাল, জি এম ফারুক, কে এম মোজাম্মেল, বাচ্চু, ওমর, কে এম হক মন্টু, শাহবুদ্দিন সেন্টু, সিরাজুল ইসলামসহ আরও বেশ ক’জন। তাদের বেশিরভাগই স্কুল পেরিয়ে কলেজের আঙিনায় পা রেখেছেন। একদিন আড্ডার মধ্যেই তারা জানতে পারলেন সরকার এই মাঠ ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও সরকারি নকশায় আছে এখানে থাকবে খেলার মাঠ। ১৯৬৬ সালে তারা জানতে পারেন একজন ব্যবসায়ী মাঠ কিনে নেওয়ার জন্য সরকারি কোষাগারে ২৬৮ টাকা জমা দিয়েছেন। শুনেই তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার জোগাড়। নিজের প্রিয় মাঠটা দখল হয়ে যাবে! এটা ভাবতেই পারছিলেন না তারা। ধনুভাঙা পণ করলেন, এই মাঠ বেদখল হতে দেবেন না। যেই কথা সেই কাজ। শুরু করলেন স্থানীয় মানুষকে মাঠ বাঁচানোর আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে। ধানম-িতে তখন থাকতেন দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। বিভিন্ন মাধ্যমে তার কাছে গেলেন সেই তরুণরা। খুলে বললেন সব কিছু। মানিক মিয়াও সহমত প্রকাশ করলেন। ততদিনে ওই তরুণদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে শেখ কামাল। মানিক মিয়া পরের দিন তার পত্রিকার খেলার মাঠ দখলের খবর ফলাও করে ছাপানোর ব্যবস্থা করেন। মর্নিং নিউজ পত্রিকায় ছাপা হয় মাঠের ইট-বালু ফেলে রাখার ছবি। পত্রিকার প্রতিবেদনের মাধ্যমে তারা চেয়েছিলেন এলাকাবাসীকে মাঠ দখলের চক্রান্ত রুখে দেওয়ার আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা। একই সঙ্গে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরেও যোগাযোগ শুরু করেন তারা। তাদেরই একজনের বাবা ছিলেন সিঅ্যান্ডবি অফিসের প্রকৌশলী। তার কাছে বিষয়টি নিয়ে যাওয়ার পর তিনি একটা নাটক সাজানোর বুদ্ধি দেন। তরুণদের বলেন মাঠ বেদখল না করার দাবিতে তার সরকারি অফিস ভাঙচুর করতে বলেন। মহাউৎসাহে ভাঙচুরের কাজটা করে ফেলেন রক্তগরম তরুণরা। তাতেই কাজ হয়। তরুণদের ভাঙচুরের খবর পেয়ে তৎকালীন মোনায়েম খান সরকার মাঠ বিক্রির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। এরপরই প্রশ্ন আসে সরকারের সঙ্গে মাঠ দখলমুক্ত রাখার দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করার। সরকারও রাজি হয়ে যায় তাতে। কিন্তু সময় দাঁড়ায় চুক্তিটা হবে কার সঙ্গে। সরকার তো কোনো ব্যক্তির সঙ্গে চুক্তি করবে না, করবে কোনো সংগঠনের সঙ্গে। সেই তরুণ দলের নেতৃত্বে ছিলেন হারুনুর রশীদ। স্বাধীনতা পরবর্তী যিনি আওয়ামী লীগের ব্যানারে নোয়াখালীতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। আর এখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ক্রীড়া সম্পাদক এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সদস্য। তিনি বলেন, ‘চুক্তির প্রস্তাবটা আমরাই দিয়েছিলাম। কিন্তু যখন সরকার তাতে রাজি হয়ে গেল, তখন নতুন বিপত্তি বাধল। ব্যক্তির সঙ্গে তো চুক্তি হবে না। চুক্তি করতে হলে গড়তে হবে সংগঠন। সেই চিন্তা থেকেই আমরা একটা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। সে মতে এলাকাবাসীর কাছে ক্লাবের নামও চাইলাম। অনেকেই পাকিস্তানি এবং উর্দু নাম জমা দিলেন। লালমাটিয়া কলেজের বাংলার অধ্যাপক মতিউর রহমানের দেওয়া ‘আবাহনী’ নামটি সবার পছন্দ হয়ে গেল। সবাই মিলে আমরা প্রথম কোনো বাংলা নামের গড়ে তুললাম আবাহনী সমাজ কল্যাণ সমিতি। যে সমিতির ছিল তিনটি বিভাগ- ক্রীড়া চক্র, সাংস্কৃতিক চক্র ও সাহিত্য চক্র। ধীরে ধীরে আমরা সদস্য সংগ্রহে নেমে পড়লাম। তখন শেখ কামাল আমাদের সঙ্গে পুরোপুরি মিশে গেছেন।’ আবাহনী সমাজ কল্যাণ সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হারুন আরও বলেন, ‘ধীরে ধীরে আমাদের সংগঠনের পরিচিতি বাড়তে লাগল। মোহাম্মদপুরের কিছু তরুণ-তরুণী আমাদের ক্লাবের সদস্য হলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানাসহ আরও কয়েকজন ২ টাকা চাঁদা দিয়ে আমাদের ক্লাবের সদস্য হলেন। এভাবেই আবাহনী পরিণত হলো ধানম-ি অঞ্চলের তরুণ-তরুণীদের প্রাণের সংগঠনে।’

আবাহনী সমাজ কল্যাণ সংসদের আবাহনী ক্রীড়াচক্রে বদলে যাওয়ার গল্পটা বলতে গেলে চলে আসবে শেখ কামালের প্রসঙ্গ। তার প্রসঙ্গটা আসতেই হারুনুর রশীদ ডুব দিলেন স্মৃতির পাতায়, ‘১৯৬৭ সালের কথা, আমরা তখন আবাহনী মাঠ নিয়ে আন্দোলন করছি। আবাহনী মাঠের পাশেই ছিল তাজউদ্দীন সাহেবের বাসা। একদিন বঙ্গবন্ধু এবং তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মর্নিং ওয়ার্ক করছিলেন। ছাত্ররাজনীতি করতাম বলে আমায় চিনতেন বঙ্গবন্ধু। আমাকে ডেকে বললেন, ‘তোরা এখানে কিছু ছেলে-পুলে দেখছি নিয়মিত জড়ো হস। তোরা আরও একটু সংঘবদ্ধ হয়ে মোহাম্মদপুরে নন-বেঙ্গলিদের প্রতিহত করতে পারিস। নন-বেঙ্গলিরা লালমাটিয়ায় যেই বাঙালি পরিবারগুলো থাকে, তাদের মাঝে মাঝে আক্রমণ করে। তোরা যদি একত্রিত থাকিস, তাহলে মাঝে মাঝে তাদের প্রতিহত করতে পারিস।’ তখন কথা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বললেন, তোদের সংগঠনটা ভালো। আমি কামালকে বলব তোদের এখানে চলে আসতে। সেদিন বিকেলেই শেখ কামাল চলে এলেন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। শেখ কামালের সঙ্গে সেদিনই প্রথম পরিচয় এবং সেদিনই তিনি আমাদের সবাইকে মোহাচ্ছন্ন করে তুললেন খেলাধুলা নিয়ে তার ধ্যান-ধারণা, চিন্তাগুলো প্রকাশ করে। তার বিভিন্ন কথা শুনে আমরা বিমোহিত হয়ে গেলাম। দেশের খেলাধুলার মান কী, কীভাবে উন্নতি করা যায় এগুলো নিয়ে ওর কথা শুনে, ওর দূরদর্শিতা দেখে তিনি হয়ে গেলেন আমাদের অলিখিত ক্রীড়া-নেতা।’ তিনি যোগ করেন, ‘স্বাধীনতার পর শেখ কামাল বললেন, যুদ্ধের সময় একটা স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠিত হয়েছিল। যার ম্যানেজার ছিল আমাদের ক্লাবের তান্না (তানভীর মাজহার)। আমরা এক কাজ করি, আমাদের ক্লাবের সমাজ চক্র ও সাংস্কৃতিক চক্র বাদ দিয়ে শুধু ক্রীড়াচক্রকে নিয়েই থাকি। যাতে একটা ভালো দল গড়তে পারি। ওর কথায় ১৯৭২ সালে আবাহনী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পদার্পণ করল। ক্লাব তো হলো, কিন্তু আমরা ফুটবল লিগে কীভাবে খেলব? তখন ইকবাল স্পোর্টিং ক্লাব নামে মোহাম্মদপুরের একটা ক্লাব ছিল, যারা সদ্য দ্বিতীয় বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে উঠেছে। স্বাধীনতার আগে এই ক্লাবের বেশিরভাগ নন-বেঙ্গলি যুদ্ধের সময় আমাদের অনেক নির্যাতন করেছে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ক্লাবের বেশিরভাগ সংগঠক চলে গেছে, তাই আমরা চিন্তা করলাম এর নাম পরিবর্তন করে আবাহনী ক্রীড়া চক্র নামকরণ করে লিগে খেলব। এরপর স্থায়ীভাবে আমরা ফুটবলে পদার্পণ করলাম। এরপর অবশ্য ১৯৭৩ সালে ইস্পাহানী ক্লাব থেকে ক্রিকেট ও হকি দল দুটি নিয়ে নিলাম। ইস্পাহানীর সঙ্গে তখন আমাদের ভালো সম্পর্ক ছিল। একদিন কামাল বললেন, ইস্পাহানী তাদের ক্রিকেট ও হকি দল দুটি দিতে চায়। আমরা সম্মতি দিলাম। তারা তখন আমাদের কিছু আর্থিক সহায়তাও দিল দল দুটি পরিচালনার সুবিধার্থে। কামাল প্রতিষ্ঠাতা হলেও ও কিন্তু শুরুতে সভাপতি ছিলেন না। আসলে আমরা তখন কেউই পদপদবি চাইতাম না। কামাল ক্লাবের সভাপতি হন ১৯৭৫ সালে।’

শেখ কামাল চেয়েছিলেন আবাহনীকে একেবারে অন্যভাবে গড়ে তুলতে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় ক্লাবটিকে যেমন অন্যদের চেয়ে আলাদা করতে চেয়েছিলেন, বিদেশ থেকে কোচ উড়িয়ে এনে চেয়েছিলেন দেশের ফুটবলে আধুনিকতার ছোঁয়া দিতে। হারুনের কথায়, ‘আমাদের দেশে আগে খুব নিম্নমানের ফুটবল খেলা হতো। লম্বা লম্বা পাস দিয়ে খেলা। আসলে তখন ফুটবলে আধুনিকতার কোনো ছোঁয়াই লাগেনি। শেখ কামাল কিন্তু চেয়েছিলেন ফুটবলের মানটা বাড়ক, তাতে লাগুক আধুনিকতার ছোঁয়া। ও একদিন বললেন, আমরা এখন থেকে ইউরোপিয়ান ঘরানার ফুটবল খেলব। সেই লক্ষ্যেই ১৯৭৪ সালে কামালের উদ্যোগে দলের জন্য নিয়ে আসা হলো ব্রিটিশ কোচ উইলিয়াম বিল হার্টকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আবাহনীই প্রথম বিদেশি কোচ আনার সাহস দেখিয়েছিল। সেটি শেখ কামালের উদ্যোগে। এই কোচ এসেই ওয়ান টাচ, টু টাচ ফুটবল শেখালেন। এরপর থেকেই আবাহনীর নাম হয়ে গেল। সবাই বলতে লাগল আবাহনী আধুনিক ফুটবলের ধারক ও বাহক। শেখ কামালের চাওয়ায় আবাহনীর ছেলেরাই তখন একমাত্র বিদেশি পোশাক ও সরঞ্জাম দিয়ে খেলত। কামালের লক্ষ্য ছিল এটি একটি আদর্শ ক্লাব হবে। এই ক্লাবের মধ্য দিয়েই সারা দেশের সব তরুণ সমাজকে খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট করবেন।’

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আততীয়র গুলিতে নিহত হওয়ায় ক্রীড়াঙ্গনে আবাহনীর অবদানের সবটা দেখে যেতে পারেননি শেখ কামাল। তবে তার দেখানো পথে হেঁটে আবাহনী নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে দেশের সবচেয়ে সফল ক্লাবে। মোহামেডানের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তায় ভাগ বসিয়ে কেবল আবাহনীই পেরেছিল দেশব্যপী নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠী গড়ে তুলতে। আবাহনীর আকাশি-হলুদ জার্সিতে খেলেই দেশ পেয়েছে কাজী সালাউদ্দিন, আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু, গোলাম রব্বানী হেলাল, শেখ মোহাম্মদ আসলাম, মোনেম মুন্না, রণজিৎ দাস, সত্যজিৎ দাস রুপুর মতো তারকা ফুটবলার, সৈয়দ আশরাফ লিপু, জালাল ইউনুস, আকরাম খান, মিনহাজউদ্দিন আহমেদ নান্নুর মতো তারকা ক্রিকেটার, আব্দুস সাদেক, খাজা রহমতউল্লাহ, মাহবুব হারুণের মতো হকি তারকা।

শুরু স্থানীয় তারকা নয়, বিদেশি সংগ্রহেও আবাহনী দেখিয়েছে মুন্সিয়ানার পরিচয়। আবাহনীর জার্সিতে প্রথম কোনো বিশ্বকাপ তারকাকে দেখা গেছে ঢাকার মাঠে। ১৯৮৭ সালে ইরাকের বিশ্বকাপ স্কোয়াডের দুই খেলোয়াড় করিম মোহাম্মদ ও সামির সাকিরকে নিয়ে এসে  চমক দেয় তারা। এছাড়া শ্রীলঙ্কার লায়নেস পিরিচ, পাকির আলী, প্রেমলাল দীর্ঘদিন খেলেছেন আবাহনীতে। সামির সাকির পরবর্তী সময়ে আবাহনীর কোচের দায়িত্বও পালন করেন। একটা সময় এদেশে বিদেশি ক্রিকেট বলতে বোঝাতো উপমহাদেশের ক্রিকেটারদের। আবাহনী সেই ধারাও ভেঙে উড়িয়ে এনেছিল ইংল্যান্ডের জাতীয় দলের খেলোয়াড় নেইল ফেয়ারব্রাদার ও ইংলিওয়ার্থকে ১৯৯৩-৯৪ মৌসুমে। এছাড়াও আবাহনীর হয়ে খেলে গেছেন ওয়াসিম আকরাম, বাসিত আলি, শহিদ আফ্রিদি, জহুর এলাহি, দিলিপ মেন্দিস, অশোকা ডি সিলভা, সামারা সেকারা, রমন লাম্বা, অজয় জাদেজার মতো তারকা। হকির মাঠে আবাহনী খেলিয়েছে ভারতের তারকা ধনরাজ পিল্লাই, পাকিস্তানের কামার ইব্রাহিমের মতো বিশ্বমানের তারকা।

দেশের ফুটবল পেশাদার যুগে পদার্পণের আগে আবাহনী প্রথম বিভাগ ও প্রিমিয়ার মিলিয়ে জিতেছে ১১টি লিগ শিরোপা। পেশাদার যুগে ১১টি আসরের ছ’বারই শ্রেষ্ঠত্ব গেছে আবাহনীর ঘরে। এছাড়া ফেডারেশন কাপ ১০বার, ১৯৯০ সালে ভারতের নাগজি ট্রফিতে হয়েছে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন। এছাড়া ভারতের চার্মস কাপ, বরদোলাই ট্রফিও জিতেছে তারা। এছাড়া গত বছর বাংলাদেশের প্রথম কোন দল হিসেবে খেলেছে এএফসি কাপের ইন্টার জোন সেমিফাইনাল। সবচেয়ে বেশিবার এএফসি কাপে খেলার রেকর্ডও তাদের ঝুলিতে। ক্রিকেট এবং হকিতেও তাদের শ্রেষ্ঠত্ব নজরকাড়া।

অসংখ্য রেকর্ডও নিজেদের করে নিয়েছে আবাহনী। ফুটবল লিগে তারাই প্রথম অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ড গড়ে। প্রিমিয়ার লিগের মতো পেশাদার লিগেও হ্যাটট্রিক লিগ শিরোপা জেতার কীর্তি তাদের। ক্রিকেট হকিতেও হ্যাটট্রিক লিগ শিরোপা জিতে নিজেদের অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে ক্লাবটি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ক্লাবটি যেমন অসংখ্য তারকা খেলোয়াড় জন্ম দিয়েছে, তেমনই এই ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশ পেয়েছে দক্ষ সব সংগঠক। যাদের মধ্যে অন্যতম হারুনুর রশীদ, সালমান এফ রহমান, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, সাবের হোসেন চৌধুরী, বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল, কাজী শাহেদ আহমেদ, অঞ্জন চৌধুরী, পিন্টু, বিসিবি’র সভাপতি নাজমুল হাসান, আফজালুর রহমান সিনহা। এদের আন্তরিক পৃষ্ঠপোষণায় আবাহনী পরিণত হয়েছে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে সফল ক্লাবে।