বাংলাদেশের ‘ব্যাটিং মায়েস্ত্রো’|194466|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
বাংলাদেশের ‘ব্যাটিং মায়েস্ত্রো’

বাংলাদেশের ‘ব্যাটিং মায়েস্ত্রো’

সারা বিশ্বে তখন আশরাফুল বন্দনা। নতুন প্রতিভার উত্থানে টেস্টে ক্রিকেটে খুব বাজে বাংলাদেশও মানুষের খোঁজের তালিকায় থাকে। চোখ খোঁজে আশরাফুলকে। আশরাফুল হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। সেই আকালে। ২০০৪ সালে ১৫৪ রানের একটি টেস্ট ইনিংস চট্টগ্রামে খেলেন। তখন দেশের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত স্কোর ওটি। মহা ধৈর্য আর অধ্যবসায়ের এক ইনিংস। ভারতের তখনকার অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি বলেছিলেন, তার দেখা অন্যতম সেরা ইনিংস ওটি। ভারতের বিপক্ষে এমন টেস্ট ইনিংস আশরাফুলকে বিশ্বময় আলোকিত করে আরও।

কিন্তু বিশ্ব ইতিহাসে আশরাফুলকে সবচেয়ে বেশি মনে করা হবে ২০০৫ সালের এক কীর্তিতে। তার আগে বিশ্বকাপ খেলে ফেলেছেন। মনে রাখার মতো কিছু করতে পারেননি। কয়েকটা ফিফটি আছে। কিন্তু প্রতিটা প্রবল প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রস্ফুটিত না হয়ে ঝরে পড়ার। ঠিক আশরাফুলের মতো। তিনি কোনো একদিন খেলবেন এবং সেদিন বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনো নাম থাকবে না বিশ্ব মিডিয়ায়, খ্যাপাটে সমর্থকরা তখন আড্ডার টেবিল ভাঙেন প্রবল বিশ্বাসে। এবং আশরাফুল খেলেন। সে বছরের ১৮ জুন কার্ডিফের রিকি পন্টিংয়ের মহাপরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়া তখন এক। বাকি সব দল ১০ নম্বরের মতো। তাদের সঙ্গে আর সবার এমন ব্যবধান। স্বাগতিক ইংল্যান্ডকে নিয়ে তিনজাতির ক্রিকেট আসর। গ্লেন ম্যাকগ্রা, জেসন গিলেস্পিদের মতো দুর্ধর্ষ ফাস্ট বোলারদের কী নিদারুণ ঠেঙানিটা সেদিন যে আশরাফুল দিয়েছিলেন। স্ট্রোকের ফুলঝুরিতে আলোকিত করে ফেলেছিলেন গোটা স্টেডিয়াম। প্রতিপক্ষও কখনো মুগ্ধ দর্শকের মতো। ১১টা বাউন্ডারি মারেন। ঠিক ১০০ বলে ১০০ করে আশরাফুল যখন আউট হন ততক্ষণে মুগ্ধতায় বুঁদ হয়ে সব জায়গার সব দর্শক। অস্ট্রেলিয়াকে ওই ম্যাচে হারিয়ে দিয়ে প্রবল বিস্ময় ও আলোচনার জন্ম দেয় বাংলাদেশ। আর সেই আলোচনার মধ্যমণি আশরাফুল। ওয়ানডে ইতিহাসের ক্ল্যাসিক ইনিংস থেকে কখনো বাদ দেওয়া সম্ভব হবে না সে ইনিংস। এখনো লোকে খুঁজে খুঁজে ইউটিউবে দেখে সেই ইনিংস। আশরাফুলের ব্যাটিং মানে ছিল মুগ্ধতা আর উপভোগের পেয়ালা উপচে পড়া এমন বিনোদন।

আহা, সেই ব্যাটসম্যান! সেই ব্যাটসম্যান কখনো ধারাবাহিক হতে পারেন না। কখনো না। নামের প্রতি সুবিচার করার প্রশ্নই আসে না। এমন অমিত প্রতিভাকে কি তাহলে তখনকার দিনে লালন করতে ব্যর্থ বাংলাদেশ? নাকি আশরাফুলের পারিপাশির্^কতার নেতিবাচকতা একটি ফুলকে ফুটতে দেয় না কখনো?

জবাব মিলবে না কখনো। ৬১ টেস্টে ৬ সেঞ্চুরি ৮ ফিফটিতে মোটে ২৭৩৭ রান। গড় ২৪ মাত্র। ১৭৭ ওয়ানডে খেলে মোটে ৩ সেঞ্চুরি। ২০টি ফিফটি। গড় এত ম্যাচ খেলা এক ব্যাটসম্যানের সঙ্গে বড্ড বেমানান। ২২.৩৩। টি-টোয়েন্টি হতে পারত যার খেলার ধরনের কারণে সবচেয়ে বড় জায়গা সেখানে ২৩ ম্যাচে ৫ ফিফটিতে ১৯.৫৬ গড়ে ৪৫০ রান। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার হিসেবে গড়পড়তার নিচের পরিসংখ্যান।

আবার দেশের অধিনায়ক হিসেবে ২০০৭ থেকে ২০০৯ এর বছর দেড়েকের অভিযানে কেবলই ব্যর্থতা। ১৩ টেস্টের ১২টিতে হার। একটি ড্র। বেশিরভাগ হার পীড়াদায়ক। ৩৮টি ওয়ানডে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দলকে। যার ৮টি জিতেছিল দল। বাকি ৩০টিতে হার। প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আশরাফুলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ শুরুতে চমকে দিতে পেরেছিল। কিন্তু শেষমেশ পরিসংখ্যান বলে তার অধিনায়কত্বে খেলা ১১ কুড়ি ওভারের ম্যাচে জয় ২টিতে। ৯টিতে পরাজয়।

খুব আশা নিয়ে বোর্ড তাকে দিয়েছিল অধিনায়কের দায়িত্ব। তাও জাতীয় দলের অধিকাংশ খেলোয়াড় যখন ভারতের বিদ্রোহী লিগ আইসিএলে চলে গেল হাবিবুল বাশারের নেতৃত্বে তখন। কিন্তু যত আশা নিয়ে তুলে দেওয়া অহংকার করার মতো ভার ততোধিক হতাশা নিয়ে আশরাফুলের কাছ থেকে কেড়ে নিতে হয়েছিল নেতৃত্বের আর্মব্যান্ড। এতটাই হতাশাজনক ছিল সেই অধ্যায়।

অনাগত কোনো ভবিষ্যতের মানুষ হয়তো আশরাফুলের নাম শুনবেন। তারপর নেট ঘেঁটে পরিসংখ্যানে রাখবেন চোখ। টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি এমনকি তার ফার্স্টক্লাস ক্যারিয়ারও তন্ন তন্ন করে খুঁজে বোঝার চেষ্টা করবে। সবদিকে হতাশা দেখে নেতৃত্বের অধ্যায়েও রাখবে চোখ। আরও বেশি বিস্ময়ের সঙ্গে সেই মানুষের চোখজোড়ায় থাকবে অপার বিস্ময়। কীভাবে আশরাফুল সেরা? কোথায় সেরা?

আশরাফুল নামের রহস্য এখানে। এখানেই আসলে ব্যাটসম্যান আশরাফুলের গোপন রহস্য। পরিসংখ্যান দিয়ে তাকে খুঁজতে গেলে বুঝতে গেলে ছিটেফোঁটা ছাড়া কিছু মিলবে না। তাকে বুঝতে গেলে তার সময়ের বাংলাদেশের ক্রিকেটকে জানা হবে জরুরি।

আশরাফুল সেই সময়ের বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের প্রতিনিধি যখন এই দলটার কাছে কারও কোনো চাওয়া নেই। কারণ, সবকিছুতে ব্যর্থতা সঙ্গী। টেস্টে, ওয়ানডেতে। কিন্তু এই যে আজকাল বলা হয় ‘ভয়ডরহীন’ ব্র্যান্ড ক্রিকেট খেলার কথা এই ভূমিতে সেটা প্রথম দেখিয়ে গিয়েছিলেন আশরাফুল। লিলিপুট আশরাফুল। খুদে বলে বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করলে মুহূর্তে একা হাতে সবকিছু বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখা আশরাফুল। বদলে দিয়েছেন খুব কম। কিন্তু ক্রিকেট বোদ্ধাদের পর্যন্ত নিজের ফ্যান বানিয়ে ছেড়েছিলেন। এমনই জাদুকরী ছিল তার ব্যাটিং। যতক্ষণ ক্রিজে থাকতেন মুগ্ধ মোহমদে দর্শকের চোখ থাকত কেবল তার ওপর। সবাইকে ছাপিয়ে লাইমলাইট কেড়ে নেওয়ার এমন সর্বগ্রাসী ক্ষমতা ছিল তার।

যে বাংলাদেশকে কেউ সমীহ করত না, গোনায় ধরত না তাদের প্রথম হিসেবে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন আশরাফুল। জানিয়ে দিয়েছিলেন, আগামী দিনে তার দেশ থেকে আরও প্রতিভা আসবে যারা করবে রাজত্ব। যদিও এই দেশের আক্ষেপ, আরও পারফরমার এলেও আশরাফুলের মতো ব্যাটিং প্রতিভার দেখা মেলেনি আর কখনো। বাংলাদেশকে বিশ্ব ক্রিকেট মানচিত্রে নতুন একটি জায়গা করে দেওয়া মানুষটি আশরাফুল। নিজের সময়ের সবচেয়ে বড় পোস্টার বয়।

সেই সঙ্গে কি আক্ষেপের নামও নয়? অবশ্যই। নিজেকে মেলে ধরতে পারলে কী না হতে পারতেন। পারেননি। ঠিক কবে কখন কীভাবে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের নোংরা জগতে পা রেখেছিলেন কে জানে। তাই আশরাফুলের খেলার হাইলাইটস দেখতে বসলে হয়তো প্রতিটা আউট আপনার মনে প্রশ্ন জাগাবে। কিন্তু তারপরও কি কেউ তার খেলা দেখতে দেখতে উপভোগের ভিন্ন জগতে ঢুকে পড়া থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারবেন? সম্ভবত না। সে কারণেই তিনি আশরাফুল। বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা ‘ব্যাটিং মায়েস্ত্রো’ মোহাম্মদ আশরাফুল।