দাবার রানী |194469|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
দাবার রানী
জগন্নাথ বিশ্বাস

দাবার রানী

শিক্ষকরা বলতেন দৌড়াও রানী। কিন্তু মেয়ে দৌড়াবে চাননি বাবা। পরিবারের সঙ্গে সামাজিক প্রতিবন্ধকতাও ছিল। বাড়িতে দাবা ও টেনিস খেলার চর্চা ছিল। বিয়ের পর ‘মুক্তি’ পান রানী হামিদ। হয়ে ওঠেন মেয়েদের দাবার পথিকৃৎ। লিখেছেন জগন্নাথ বিশ্বাস

ততদিনে জীবনের ত্রিশটা বসন্ত কাটিয়ে ফেলেছেন। একদিন ছোট্ট মেয়ে স্কুল থেকে এসে বলল, ‘মা আমার বান্ধবীর বাবা দাবা খেলে কত নাম করেছে তুমি কেন সেরকম কিছু করছ না?’ ছোট্ট মেয়েকে সেদিন রানী হামিদ বলেছিলেন, তোমার বান্ধবীর বাবাকে একদিন বাসায় আসতে বলো!

তারপর ডা. আকমল হোসেন একদিন বাসায় এলেন। সাদা-কালো ৬৪ খোপের কোর্ট নিয়ে বসলেন রানী হামিদ। বুঝলেন দাবা খেলা সহজ নয়। আরও অনেক পথ পেরোতে হবে। তিনি সেই পথ অনায়াসে পেরিয়েছেন। তাই এখন বাংলাদেশ দাবার রানী বলতে একজনইÑ রানী হামিদ। ক্যারিয়ারে রানী হামিদের অনেক অর্জন। টানা ছয়বার জাতীয় দাবায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল রেকর্ড গড়েছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। ব্রিটিশ দাবায় তিন-তিনটি শিরোপা জিতেছেন (১৯৮৩, ’৮৫, ’৮৯)।

সাধারণ একজন গৃহবধূ হিসাবে তার সাফল্যের গল্প শুরু হয়েছিল ১৯৮১ সালে। দেশের বাইরে ভারতের হায়দরাবাদে একটি টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়েছিলেন। তখন হয়দরাবাদে খাদিলকা সিস্টার্সদের খুব দাপট। ভয় পেয়েছিলেন। খেলতে বসে সেই ভয়টা জয়ও করেছিলেন। টানা কয়েকটা ম্যাচ জেতার পর প্রতিপক্ষ তিন বোনের গ্র্যান্ডমাস্টার কোচ এসে জানতে চেয়েছিলেন দাবার লেটেস্ট ইনফর্মেটরের কথা। প্রশ্ন শুনে বোকার মতো তাকিয়ে ছিলেন রানী হামিদ। কারণ দাবার পুঁথিগত বিদ্যার সঙ্গে তখনো তিনি পরিচিত নন।

পরে পরিচিত হয়েছেন। আর পুঁথিগত বিদ্যার সঙ্গে সহজাত প্রতিভার মিশ্রণ ঘটিয়ে বাংলাদেশ দাবার লড়াইয়ের প্রাঙ্গণটাকে বদলে দিয়েছেন চিরকালের মতো। এখন আট থেকে আশি সব মেয়েরাই রানী হামিদ হতে চায়।

তিনি নিজে কিন্তু দাবাড়ু না হয়ে স্প্রিন্টারও হতে পারতেন। পারিবারিক বাধার কারণে হতে পারেননি। কুমিল্লা কলেজের ছাত্রী থাকার সময় শিক্ষকরা রানীকে জাতীয় পর্যায়ে দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে বলেছিলেন। সুযোগও ছিল। মেয়ে দৌড়াবে এটা চাননি বাবা। চেয়েছিলেন দাবা খেলুক। বাড়িতে দাবা ও টেনিস খেলার চর্চা ছিল। বাবাও ছিলেন আগ্রহী দাবাড়ু । তাই দেখে মেয়েও আগ্রহী হয়েছিলেন। ছোট ভাইয়ের সঙ্গে দাবা খেলতেন। তবে সবসময়ে নয়। মা-বাবা তা পছন্দও করতেন না। পরিবারের সঙ্গে সামাজিক প্রতিবন্ধকতাও ছিল। বিয়ের পর এ অচলায়তন থেকে মুক্তি পান রানী হামিদ। সেই গল্প শুরুর আগে রানীর জন্ম আর বেড়ে ওঠার কাহিনী শুনুন।

১৯৪৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সিলেটে জন্ম রানী হামিদের। বাবা সৈয়দ মমতাজ আলী ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। মা মোসাম্মৎ কামরুন্নেসা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। চার ভাই ও চার বোনের কোলাহলের ভুবনে রানী ছিলেন তৃতীয়া। পারিবারিক নাম সৈয়দা জসিমুন্নেসা খাতুন। বাবা আদর করে রানী নামে ডাকতেন। বিয়ের পর স্বামীর নাম যোগ করে হলেন রানী হামিদ।

বাবার ছিল বদলি চাকরি। তাই রানীর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় চট্টগ্রাম নন্দনকানন গার্লস হাই স্কুলে। ১৯৫২ সালে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। ভাষাআন্দোলনের উত্তাল সময়ে না বুঝেই মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। রানী বুঝতে পারেননি কিসের মিছিল। পরে জানতে পারেন সেটা ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে মিছিল। ১৯৫৪ সালে বাবা বদলি হন কুমিল্লায়। রানীরও স্কুল বদল হয়। ভর্তি হন কুমিল্লা মিশনারি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে। পড়েছেন কুমিল্লার ফয়জুন্নেসা গার্লস হাই স্কুলেও। এরপর রাজশাহী। তারপর সিলেট। রানী দশম শ্রেণিতে ভর্তি হন সিলেট বালিকা বিদ্যালয়ে। ১৯৬০ সালে তিনি ওই স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করেন। পরে ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে প্রাইভেট পরীক্ষায় ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। সেখান থেকে প্রাইভেট ডিগ্রিও পাস করেছেন তিনি।

১৯৫৯ সালে নৌবাহিনীর কর্মকর্তা মোহাম্মাদ আবদুল হামিদের সঙ্গে রানীর বিয়ে হয়। তিনি তখন ১৫ বছরের কিশোরী। স্বামী পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর রেকর্ড গড়া সাঁতারু হিসাবে নাম করেছিলেন। পরে তিনি বাংলাদেশ হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সভাপতিও হন। স্ত্রীকে দাবা খেলায় উৎসাহও জুগিয়েছেন তিনি। রানী হামিদ শুধু একজন গর্বিত দাবাড়ু নন, গর্বিত জননীও। তার চার সন্তানই সুশিক্ষিত এবং খ্যাতিমান। বড় ছেলে কায়সার হামিদ তারকা ফুটবলার। মেজো ছেলে সোহেল হামিদ স্কোয়াশ ফেডারেশনের সম্পাদক। ছোট ছেলে শাহজাহান হামিদ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার। মেয়ে জেবিন হামিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা মেধাবী মুখ। তবে সন্তানরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হলেও কেউ মাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। ৭৬ বছর বয়সেও তিনি দাবার অবিসংবাদিত চ্যাম্পিয়ন।

১৯৭৬ সালে প্রথম মহসিন দাবা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেই শুরু। আর পেছন ফিরে তাকাননি। ১৯৭৭ সালে নবদিগন্ত সংসদ দাবা ফেডারেশনের প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। চ্যাম্পিয়নও হন। টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ১৯৭৯ সালে ঢাকায় উন্মুক্ত দাবা প্রতিযোগিতায় অংশ নেন তিনি। যথারীতি চ্যাম্পিয়ন হন। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার দুয়ার খুলে যায়। ১৯৮১ সালে ভারতের হায়দরাবাদে প্রথম এশীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে শিরোপা না জিতলেও নজর কাড়েন।

জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিকতায় রানীর উত্থান এরপরই। তিনি দাবা অলিম্পিয়াডের পঞ্চম নারী যিনি যোগ্যতার ভিত্তিতে অলিম্পিয়াডে জাতীয় পুরুষ দলের হয়ে খেলেছেন। ১৯৮৯ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত কাসেদ আন্তর্জাতিক মহিলা দাবায় যৌথ চ্যাম্পিয়ন হন রানী হামিদ। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি রেকর্ড ছয়বার জাতীয় মহিলা দাবা চ্যাম্পিয়ন। তাছাড়া ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি মোট ১৫ বার জাতীয় মহিলা দাবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। বাংলাদেশের জাতীয় দাবার চলতি কথা হল রানীর জন্য প্রথম পুরস্কার রেখে অন্যরা প্রতিযোগিতা করুক।

দাবা খেলে অলিম্পিয়াড, কমনওয়েলথ ও বিশ্ব গিনেস রেকর্ড বুকে নাম তুলেছেন রানী হামিদ। ১৯৮৫ সালে তিনি দাবা খেলায় কৃতিত্ব অর্জনের জন্য আন্তর্জাতিক মহিলা মাস্টার উপাধি পান। সেই বছরই লাভ করেন আন্তর্জাতিক রেটিং। বাংলাদেশের দাবায় রানী হামিদের অবদান সম্পর্কে একবার নিয়াজ মোর্শেদ বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের যে কয়জন নারী তাদের কৃতিত্ব ও কর্ম দিয়ে দেশকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করেছেনÑ রানী হামিদ তাদের অন্যতম। বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে তার নাম চির উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।’

রানী হামিদ কিন্তু এখনো ফুরিয়ে যাননি। জাতীয় দাবায় ১৮টি শিরোপা জেতা এই কিংবদন্তি এখনো প্রতিযোগিতায় নাম লেখান। শিরোপাও জেতেন। সাফল্যের ক্ষুধা কীভাবে বাঁচিয়ে রেখেছেন? এই প্রশ্নে রানী হামিদ যে উত্তর, ‘এখনো আমি দাবা খেলাকে শুরুর দিনগুলোর মতো সমান উপভোগ করি তাই।’ দাবা খেলা নিয়ে তার আছে নিজস্ব দর্শন, ‘কোনো কিছু অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে তো খেলা শুরু করিনি। যখন শুরু করি তখন সাধারণ গৃহিণী ছিলাম। ভালো লাগত বলেই খেলতাম। এখনো ভালো লাগে বলেই খেলে যাচ্ছি। এখন যা কিছু পাচ্ছি তা আমার কাছে অতিরিক্ত। তবে পুরস্কারের লোভে নয়, আমি আমার মনের আনন্দেই খেলে যাব।’

রানী হামিদ বাংলাদেশ দাবার সামাজিক প্রেক্ষাপটই বদলে দিয়েছেন। তাকে দেখে অনেক বয়স্ক নারীরাও এখন ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। ছোটরাও তাকে আদর্শ ধরে এগিয়ে আসছে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক দাবায় নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে লক্ষণীয়ভাবে। এরপরও কিন্তু বাংলাদেশ দাবার সার্বিক চিত্র ইতিবাচকভাবে বদলায়নি। সাফল্যের নিরিখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যতদূরে যাওয়ার কথা তার ধারেকাছেও যেতে পারেনি বাংলাদেশ। একসময় এ দেশের দাবাড়–রা প্রতিবেশী ভারতীয় দাবাড়–দের সঙ্গে সমানতালে লড়াই করত। সেদিন আর নেই। তাই আক্ষেপ করে রানী হামিদ বলেছেন, ‘আমরা অনেক পিছিয়ে গেছি এবং ক্রমশ আরও পেছাচ্ছি। ভারতের সঙ্গে একটা সময় সমানে সমানে লড়েছি আমরা। আর এখন তো কোনো তুলনাই হয় না ওদের সঙ্গে।’ দাবার সমস্যা শনাক্ত করেছেন তিনি, ‘আমাদের দেশে দাবার সেই শুরুর চিত্র এখনো বদলায়নি। সমানভাবে আমরা মূল্যায়ন পাচ্ছি না। এক কথায় বললে মহিলা দাবা আজও অবহেলিত। উদাহরণ হিসেবে বলব, এশিয়ান ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ হলে সেখানে শুধু ছেলেদের দলকে পাঠানো হয়। মহিলা টিম পাঠানো হয় না। এমন হলে নারীরা পিছিয়ে যাবে এটাই তো স্বাভাবিক।’ শুধু সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেই থেমে থাকেননি রানী হামিদ। বলেছেন উত্তরণের উপায়ও, ‘বাংলাদেশে দাবাড়– উঠে আসছে না এমনটা কিন্তু নয়। দুই-একজন করে উঠে আসছে ঠিকই কিন্তু তাদের ধরে রাখা বা এগিয়ে নেওয়ার কোনো প্রচেষ্টা আমাদের নেই। টাকা-পয়সা বা সুযোগ সুবিধা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সেই জিনিসটা দিতে পারছি না মেয়েদের। দুই একটা ক্লাব/প্রতিষ্ঠান হয়তো এগিয়ে আসছে। কিন্তু এতে হাতেগোনা কয়েকজনই সুবিধা পাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে উন্নত সিস্টেম গড়ে উঠছে না। তারপরও চেষ্টা করা হচ্ছে দাবাকে এগিয়ে নেওয়ার, এমনটাই আমি শুনেছি। হয়তো অচিরেই চিত্রটা বদলাবে। এখন যেহেতু একটু তোড়জোড় শুরু হয়েছে তাই আশা করাছি পাঁচ বছর পর এর একটা ফল আমরা দেখতে পাব।’ পেশাদারিত্ব ভিত্তিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার ওপরেও গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি, ‘কেউ যদি দাবাকে পেশা হিসেবে নিতে চায় আমাদের দেশে তা সম্ভব নয়। আমাদের খেলাধুলায় টাকা-পয়সা এত কম যে পেশা হিসাবে নেওয়ার কথা ভাবা যায় না। তাই উন্নতিও হচ্ছে না। কেউ খেলাধুলায় নিজেকে উজাড় করে দেবে, ভালোবেসে খেলবে, সব ঠিক আছে কিন্তু কিসের আশায়? এই যে আমি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছি, যেটা একটা বিরল সম্মান। কিন্তু সেই সম্মাননা দিয়ে ব্যবহারিক জীবনে তো আমার কোনো লাভ নেই। তাই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পাশাপাশি যদি আমরা বিভিন্ন টুর্নামেন্ট খেলার জন্য সুযোগ সুবিধাও পেতাম, বিদেশে খেলতে যাওয়ার নিশ্চয়তা পেতাম, তাহলে সেটা আমাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য বড় অনুপ্রেরণা হতো।’

বাংলাদেশ দাবার পরবর্তী রানী হামিদকে পেতে হলে এই অনুপ্রেরণা জরুরি। সংগঠকরা কি তা নিশ্চিত করতে পারবেন?