তাবিথের ওপর হামলা|194471|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
তাবিথের ওপর হামলা
রেজাউল করিম লাবলু

তাবিথের ওপর হামলা

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের নির্বাচনী প্রচারে গতকাল মঙ্গলবার দুই দফা হামলা হয়েছে। তাবিথের অভিযোগ, গাবতলীর এ হামলার উদ্দেশ্য ছিল তাকে হত্যা করা; তার মাথায় আঘাত লেগেছে। আরও আহত হয়েছেন বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানীসহ ১০-১১ জন। ৯ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থী মুজিব সারোয়ার মাসুমের নেতৃত্বে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে এ হামলা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তাবিথ। তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচনী প্রচারে কাপুরুষের মতো হামলা করা হয়েছে।’

তবে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থী মাসুম পাল্টা অভিযোগ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপির মেয়র প্রার্থীর যেখান থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু করার কথা ছিল তার এক কিলোমিটার দূর থেকে আমার প্রচার শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু তারা পরিকল্পিতভাবে আমার প্রচার শুরুর স্থানে এসেছিল আমাদের ওপর হামলা করতে। পরে এলাকাবাসীর প্রতিরোধের মুখে তারা সরে গেছে।

ওই হামলার ঘটনায় মামলার জন্য দারুস সালাম থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তাবিথের ব্যক্তিগত সহকারী আমজাদ হোসেন শাহাদাত। এদিকে হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে বলেছেন, সিটি নির্বাচনের তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে তত হিংস্র হয়ে উঠছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। তাবিথের প্রচারে এ হামলার ঘটনায় বিএনপির নেতাকর্মীরা শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘আমাদের আশঙ্কা সামনের দিনগুলোতে হামলা আরও বাড়বে। এভাবে তারা ধীরে ধীরে ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো পরিবেশ সৃষ্টি করবে। জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেবে।’ তাবিথের ওপর হামলার প্রতিক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘তারা নিজেরা সংঘর্ষে জড়িয়ে থাকতে পারে।’

হামলার ঘটনায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তাবিথ আউয়াল। এতে তিনি তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলার অভিযোগ করেছেন; পাশাপাশি গাবতলীয় থানার ওসির প্রত্যাহার চেয়েছেন। বিকেলে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদার সভাপতিত্বে কমিশন সভার পর সচিব মো. আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রচারে হামলার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ করেছেন বিএনপির প্রার্থী। কমিশন বিষয়টি শুনেছে এবং তদন্ত করে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য রিটার্নিং অফিসারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’

নির্বাচনী প্রচারের ১২তম দিন গতকাল বেলা ১১টার দিকে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের পেছনে বাজারপাড়া এলাকা থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন তাবিথ। এলাকাটি উত্তর সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে পড়েছে। হামলার পরপরই রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাবিথ অভিযোগ করে বলেন, ৯ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মুজিব সারোয়ার মাসুমের (ঠেলাগাড়ি প্রতীক) নেতৃত্বে এই হামলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যতই হামলা হোক, আমাদের দমিয়ে রাখ

 যাবে না। আমরা সুশৃঙ্খলভাবে প্রচার চালিয়ে যাব।’ তাবিথের এ বক্তব্য শেষ হতে না হতেই আবার ‘জয় বাংলা’ সেøাগান দিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায় ২৫-৩০ জন। ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্যরা একপর্যায়ে হামলাকারী ও তাবিথের কর্মী-সমর্থকদের মাঝে দাঁড়িয়ে যান। তারা হামলাকারীদের ঠেকানোর চেষ্টা করেন। এ সময় সাধারণ মানুষের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হামলার পর তাবিথ তার নেতাকর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ১১ নম্বর ওয়ার্ডের দিকে চলে যান। ঘটনাস্থলে থাকা বিএনপির প্রচার সম্পাদক এ্যানী সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের ওপর দুই দফা হামলা হয়েছে। আমাদের প্রার্থীসহ ১০-১২ জন আহত হয়েছেন।

তাবিথ গতকাল সকাল পৌনে ১১টার দিকে গাবতলী পর্বত সিনেমা হলের সামনে থেকে গণসংযোগ শুরু করেন। এরপর তিনি ৯নং ওয়ার্ডের কোর্টবাড়ী, বাজারপাড়া, হরিরামপুর, গোলারটেক, দিয়াবাড়ী, বর্ধনবাড়ী, বাঘবাড়ী, গাবতলী বাসস্ট্যান্ড এবং ১১নং ওয়ার্ডের কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড, লেকভিউ, দক্ষিণ পাইকপাড়া, বটতলা, মধ্য পাইকপাড়া, লালওয়াল, নতুন বাজার, ডি টাইপ কলোনি, কল্যাণপুর হাউজিং এস্টেট, পোড়াবস্তি ও শহীদ মিনার রোডে গণসংযোগ করেন। এ সময় এক প্রশ্নের জবাবে তাবিথ আউয়াল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে গণসংযোগ শুরু করেছিলাম। পেছন দিক থেকে কাপুরুষের মতো আমাকে টার্গেট করে আমার ওপর হামলা করা হয়েছে। আমার সঙ্গের সহকর্মী নেতাদের আঘাত করা হয়েছে। সবচেয়ে ভয়ংকর কথা হলো এ হামলা কিছু পুলিশ কর্মকর্তার সামনেই হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘তারা (পুলিশ সদস্যরা) নিজের চোখে দেখেছেন এই হামলা ৯নং ওয়ার্ডে ঠেলাগাড়ী প্রতীকের কাউন্সিলর প্রার্থী মুজিব সারোয়ার মাসুম ও তার লোকেরা করেছে। আমি আশা করছি, পুলিশ এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’ বিএনপির এ মেয়র প্রার্থী বলেন, ‘আমি আমার প্রতিপক্ষকে হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, আমার ওপর হামলা করে আমার মনোবল নষ্ট করা যাবে না। আমাদের পিছু হটাতে পারবেন না। আমাদের প্রচার কাজ এগিয়ে যাবে ইনশাল্লাহ। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তা প্রমাণ করব।’ তিনি বলেন, ভোটাররা সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কার মধ্যে আছেন। ইভিএমে ভোট নিয়ে জনগণের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা কাজ করছে।

হুটখোলা জিপে তাবিথকে নিয়ে মওদুদ : বিকেলে রাজধানীর কাফরুল, কচুক্ষেত, ইব্রাহিমপুর এলাকায় তাবিথ আউয়ালকে সঙ্গে নিয়ে হুটখোলা জিপে চড়ে গণসংযোগ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। এ সময় মওদুদ বলেন, ‘এবার আমরা ভোট চুরি করে নির্বাচন করতে দেব না। এবার দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসবে, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া মুক্তি পাবে, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে। এই সরকার এবার যদি কোনোরকম ষড়যন্ত্র করে জাতীয়তাবাদী দল এর জবাব দিতে প্রস্তুত। আমরা সেটা হতে দেব না।’

রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ, ওসিকে প্রত্যাহারের দাবি : হামলার ঘটনায় রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগে তাবিথ আউয়াল বলেছেন, ‘আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়েছে। এতে আমি প্রাণে বেঁচে গেলেও আমিসহ আমার নেতাকর্মীর আহত হই। আমি মাথায় আঘাত পেয়েছি। ঘটনার সময় পুলিশ আইনানুযায়ী সক্রিয় থাকলে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়, সেজন্য পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার জন্য দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত ও তাকে প্রত্যাহারের ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।’

‘আমার ওপর হামলা করতে এসেছিল’ : তাবিথের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ৯ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মাসুম পাল্টা অভিযোগ করেন। বলেন, ‘তাদের গণসংযোগ শুরু করার কথা ছিল গাবতলী পর্বত সিনেমা হলের সামনে থেকে। আমার প্রচার শুরু করার কথা ছিল গাবতলীর বাঘাবাড়ীর বড়বাজার এলাকা থেকে। মাঝখানে দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। কিন্তু তারা আমার গণসংযোগ এলাকায় কেন এসেছে? আসলে তারা আমার ওপর হামলা করতে এসেছিল। কিন্তু আমার সমর্থক এলাকার মানুষের প্রতিরোধের মুখে তারা সরে গেছে।’ মাসুম বলেন, ‘আসলে বিএনপি সবসময় অভিযোগ করে। তাদের বিএনপি না বলে অভিযোগ পার্টি বলা যায়।’

‘নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে শাসকগোষ্ঠী তত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে’ : তাবিথের ওপর হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু ও ভয়ভীতিমুক্ত করতে আবারও নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি জোর আহ্বান জানান। মির্জা ফখরুল বলেন, নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর লালিত সন্ত্রাসী বাহিনীর হিংস্রতা যেন ততই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রচারে সন্ত্রাসীদের এ হামলা পূর্বপরিকল্পিত এবং কাপুরুষোচিত। নির্বাচনকে একতরফাভাবে করে নৌকার প্রার্থীদের বিজয়ী করার জন্যই প্রতিদিন বিএনপির প্রার্থীদের প্রচারে হামলা চালাচ্ছে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। সাংবাদিকরাও তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না।