যার ছোঁয়ায় বদলে গেল নারী ফুটবল|194494|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
যার ছোঁয়ায় বদলে গেল নারী ফুটবল
তোফায়েল আহমেদ

যার ছোঁয়ায় বদলে গেল নারী ফুটবল

তার ছোঁয়ায় বদলে গেছে দেশের নারী ফুটবল। এসেছে একের পর এক সাফল্য। বিশেষ করে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। যার নেপথ্যের নায়ক কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন। তাকে নিয়ে লিখেছেন তোফায়েল আহমেদ

সব খেলা মিলেই কোচদের মধ্যে এ মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে বড় তারকা কে? তর্কসাপেক্ষে একাধিক কোচের নামই হয়তো আসবে। কিন্তু একটা জায়গায় অন্য সবাইকে পেছনে ফেলে দেবেন গোলাম রব্বানী ছোটন। তার হাত ধরেই যে বদলে গেল দেশের নারী ফুটবল। বলে ঠিকভাবে লাথি দিতে না পারা মেয়েরাই আন্তর্জাতিক আসরে ট্রফি জয় করতে শিখল। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে তো বাংলাদেশ এখন মাঠে নামা মানেই গোল উৎসব। দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র এশিয়াতেই বাংলাদেশ সেখানে আলাদা করে প্রতিষ্ঠা করেছে নিজেদের। দেশে তৈরি হয়েছে নারী ফুটবলের জাগরণ।

জাগরণের এই অধ্যায়ে নায়কের ভূমিকায় থাকবেন অনেকেই। যাদের উদ্যোগে সামাজিক রক্ষণশীলতার চোখ রাঙানি দূরে ঠেলে মাঠে মেয়েদের ফুটবল গড়াল, যে মেয়েরা সাহস করে প্রথম মাঠে নামল; তারা তো আজীবন করতালির দাবি রাখে। কিংবা এভাবেও বলা যায়, আজ মেয়েদের প্রতিটি সাফল্য মানে তাদের সাফল্য। আর একজন গোলাম রব্বানী ছোটন?

ফুটবলকে বলা হয় কোচের খেলা। মাঠে এগারো ফুটবলার হলো ঘুঁটি আর কোচ হচ্ছেন খেলোয়াড়। ডাগ-আউটে দাঁড়িয়ে মাথা দিয়েই যাকে কাজটা করতে হয়। ২০০৯ সালে নারী ফুটবলের দায়িত্ব নিয়ে যে কাজটা নিপুণভাবে করে যাচ্ছেন ছোটন। এই জায়গাটায় আবার তিনি শুধুই একজন কোচ নয়, একজন অভিভাবকও। তাকে যে বাবার ভূমিকায় তাকে আগলে রাখতে হয় মেয়েদের।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের নারী ফুটবলের পাইপলাইন একটিই বঙ্গমাতা আন্তঃপ্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। ২০১০ সালে সেটি শুরুর পরই বদলে যায় মেয়েদের ফুটবলের চিত্র। এই আসর থেকে প্রাথমিকভাবে নজরকারা মেয়েরাই কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে বাফুফের ক্যাম্পে ডাক পান। ছোটনের অধীনে চলে তাদের ট্রেনিং ক্যাম্প। একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা মেয়েদের শুধু ফুটবল নয়, আধুনিক শহুরে জীবনের সেঙ্গে অভ্যস্ত করেও তুলতে হয়। যে কাজেও নেতৃত্বে থাকেন ছোটন।

২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ছোটন কাজটা করে গেছেন নিভৃতে। কারণ নারী ফুটবল তখনো সেভাবে আলোড়ন ফেলতে পারেনি। বাংলাদেশের মেয়েরা আন্তর্জাতিক ফুটবলেও খেলছেন, এটাই তখন পর্যন্ত তৃপ্তি। কিন্তু ২০১৫ সাল থেকেই চিত্রটা বদলাল। ছোটনের কোচিংয়ে সে বছর নেপালে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হলো বাংলাদেশ। মেয়েদের ফুটবল ইতিহাসে যা বাংলাদেশের প্রথম ট্রফি জয়।

এরপর যেন শুধুই একটা ঘোর লাগা সময়। ২০১৬ সালে তাজিকিস্তানে হওয়া এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক ফুটবলেও চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। তার চেয়ে বড় বিস্ময়টা দর্শক উপহার পেল একই বছর সেপ্টেম্বরে ঘরের মাঠে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ নারী ফুটবলের বাছাই পর্বে। প্রতিপক্ষকে গোলের পর গোলে ভাসাল কৃষ্ণা, সানজিদা ও মৌসুমীরা। জায়গা করে নিল এফএসফি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলের চূড়ান্ত পর্বে। সে পর্ব এশিয়া সেরা আট দলের মঞ্চ। যেখানে আবার সেরা তিন দলে থাকতে পারা মানে অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ^কাপ ফুটবলে কোয়ালিফাই করা। একবার নয়, এশিয়ায় সেরা এই মঞ্চে এরই মধ্যে দুবার খেলে ফেলেছে বাংলাদেশ। বাছাই পর্বের ধাপ পেরিয়ে ২০১৭ সালের পর ২০১৯ সালেও এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ প্রতিযোগিতার মূল পর্বে খেলে লাল-সবুজের মেয়েরা। সেখানে শক্তিধর প্রতিপক্ষের সে ঙ্গ যে একেবারেই নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে পারেনি বাংলাদেশ তা নয়। ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার মতো ফুটবল শক্তির বিপক্ষে সমানে সমালে লড়াই করে হারতে হয়েছিল সানজিদাদের। দুই বছর পর সেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই ড্র নিয়ে ফিরে তহুরা-মনিকারা। যে ম্যাচে আসলে জয়টাই প্রাপ্ত ছিল বাংলাদেশের।

মাঝের সময়টায় দক্ষিণ এশিয়ার মঞ্চেও দাপট দেখিয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো আয়োজিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয় মারিয়া মান্দা, আঁখি খাতুনরা। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে হয় রানার্সআপ। ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো আয়োজিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ ফুটবলেও চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। একই বছর হংকং থেকে ফেরে আন্তর্জাতিক জকি কাপের শিরোপা জয় করে। সিনিয়র জাতীয় দলে অবশ্য এই পারফরম্যান্সের ছটা সেভাবে লাগতে শুরু করেনি। এরপরও ছোটনের কোচিংয়ে ২০১৬-১৭ সালে সিনিয়র সাফ প্রতিযোগিতায় রানার্সআপ হয় বাংলাদেশ।

শুধু শিরোপাগুলোর কথা বলে গেলে মাঠে বাংলাদেশের মেয়েদের দাপটের কথা পুরোপুরি ফুটে উঠবে না। যদি না অনূর্ধ্ব-১৮ সাফে পাকিস্তানের জালে ১৭ গোল দেওয়ার কথা উল্লেখ না করা হয়। যদি না উল্লেখ করা হয় একই বছর অনূর্ধ্ব-১৫ সাফে পাকিস্তানকে ১৪-০ গোলে হারানোর কথা। বয়সভিত্তিতে প্রায় সবগুলো প্রতিযোগিতাতেই বাংলাদেশের সাফল্যগুলো আসে আসলে ওই গোল উৎসব করেই। অথচ একটা সময় বাংলাদেশের মেয়েদেরও গুনে গুনে গোল হজম করতে হতো। ২০০৩ সালে ঘরোয়া ফুটবল চালুর পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের মেয়েদের অভিষেক ঘটে ২০০৫ সালে। দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবলের সেই আসরে জাপানের বিপক্ষে ০-২৪ গোলে হারতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। সেই দেশের মেয়েরাই এখন শুধু জয় পেলেও মন ভরে দর্শকদের!

সর্বশেষ বঙ্গমাতা আন্তর্জাতিক নারী গোল্ডকাপ ফুটবলের কথাই মনে করা যাক না। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে আসরের ফাইনাল হতে পারেনি। লাওসের সঙ্গে বাংলাদেশ যৌথ চ্যাম্পিয়ন হয়। অপরাজিত থেকেই মৌসুমী-মনিকারা ফাইনালে ওঠে এবং সেটা সংযুক্ত আরব আমিরাত, কিরগিজস্তান, মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে দাপুটে ফুটবল খেলে। কিন্তু কোনো ম্যাচেই গোল উৎসব হয়নি। কেন বাংলাদেশ সুযোগ তৈরি করেও পারছে না আরও বেশি গোল করতে, এ নিয়েই সবার মধ্যে সে কি হাহাকার। সংবাদমাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে কোচ-খেলোয়াড়রা ক্লান্ত হন, কখনো বিরক্ত।

২০১৮ সালে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলের বাছাইয়ে আরব আমিরাতকে ৭-০ ও লেবাননকে ৮-০ গোলে হারায় বাংলাদেশ। এরপরও পোস্ট ম্যাচ সংবাদ সম্মেলনে কোচ ছোটনকে এই প্রশ্ন শুনতে হয়, ‘আপনার দল ভালো ফুটবল খেলছে তো!’ গোলবন্যার পরও বাংলাদেশ ভালো ফুটবল খেলছে না। এই প্রশ্ন ওঠে কারণ, প্রতিপক্ষকে যত না গোল দিচ্ছে মেয়েরা, তার চেয়ে বেশি যে মিস করছে গোলমুখে গিয়ে। কিন্তু দিন শেষে ম্যাচ তো ঠিকই জিতছে বাংলাদেশ। সেটা সেই গোল উৎসব করে।

মেয়েদের ফুটবল মানেই এখন দর্শকদের এমন উন্মাদনা। অনেক অনেক প্রত্যাশা। কখনো কখনো এসব নিয়ে বলতে বলতে যে বিরক্ত হন না ছোটন তা নয়। আবার বাস্তবতা তো তিনি নিজেও বোঝেন। এ কারণেই বোধহয় বলেন, ‘নারী ফুটবলে এখন আসলে এটা উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। কোনো টুর্নামেন্ট খেলতে গেলে জিততে হবেই, এমন একটা চাওয়া থাকে সবার। মেয়েরাই আসলে এ অবস্থানটা তৈরি করতে পেরেছে। তাদের সাফল্যেই আজ নারী ফুটবল এতদূর।’

হ্যাঁ, মেয়েদের সাফল্যেই। কিন্তু ছোটনের পরিশ্রম, একাগ্রতাকে এখানে কিছুতেই আড়াল রাখার উপায় নেই। বরং ঈর্ষণীয় তার সাফল্য। আর এ কারণেই তিনি এখন তারকা কোচদের একজন। সিনিয়র জাতীয় দল তো বটেই, সঙ্গে মেয়েদের সবগুলো বয়সভিত্তিক দলের কোচের দায়িত্ব তাকেই সামলাতে হয়। একটা টুর্নামেন্ট শেষ করে দম ফেলার ফুসরত নেই। শুরু আরেকটি টুর্নামেন্ট। এভাবেই অক্লান্তভাবে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ছোটন যে অবদান রেখেছেন দেশের ফুটবলে, তাতে শুধু ‘তারকা কোচ’ বললে হয়তো তার মহিমা ফোটে উঠবে না সেভাবে।

নিজেকে অবশ্য সব সময়ই খুবই ‘ক্ষুদ্র মানুষ’ হিসেবে দাবি করেন ছোটন। চলনবলনেও নেই কোনো অহমিকা। বরং পরিশ্রমী মানুষের প্রতিমূর্তি তিনি। ছোটন তো রাগঢাক না রেখে নিজেকে নিয়ে এভাবে বলেন, ‘এটা হীনম্মন্যতাই বলতে পারেন। আমি সবার থেকে পিছিয়ে, সব সময় এমনটা মনে করেছি। সেটা খেলোয়াড়ি জীবন বলেন বা কোচিংয়ে আসার পর। এ জন্য আমি চেষ্টা করতাম প্রচুর। খেলোয়াড়ি জীবনে সব সময় চেষ্টা করে গেছি মাঠে এবং প্র্যাকটিসে ভালো করার জন্য। বিশ্বাস করেছি আমাকে পরিশ্রম করে টিকে থাকতে হয়েছে। কোচিংয়েও আমি একই দর্শন মেনে চলেছি প্রতিদিন। চার ঘণ্টা কাজ দিলে আমি করব দশ ঘণ্টা। নিজেকে নিজের মনিটর ভেবে কাজ করি। তাই ‘হীনম্মন্যতাই’ বলতে পারেন আমার শক্তি।’ ছোটন আবার এই জায়গায় একজন কড়া হেডমাস্টারও। তার চোখকে ফাঁকি দিয়ে অলসতার সুযোগ নেই। কঠোর অনুশীলনে তিনি তৈরি করেন মেয়েদের।

ছোটন কোচিংয়ে প্রবেশ করেছিলেন খেলোয়াড়ি জীবনকে বিদায় বলার আগেই। ১৯৯৩ সালের ঘটনা। তখন ওয়ারী ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগে খেলেন ছোটন। থাকেন মতিঝিল টিঅ্যান্ডটি কলোনিতে। পাইওনিয়ারে দীর্ঘদিন ধরেই খেলছিল টিঅ্যান্ডটি ক্লাব। এখানকার বড় ভাইয়েরা ছোটনকে ধরলেন কোচের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য। সবার চাপাচাপিতে সেই দায়িত্বটা নিয়েও নেন ছোটন। খেলোয়াড়ি জীবনের পাশাপাশি শুরু নতুন অধ্যায় এবং সেই অধ্যায়ের শুরুতেই সাফল্য। সে বছর পাইওনিয়ারে চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায় টিঅ্যান্ডটি ক্লাব।

পরের দুই বছর টিঅ্যান্ডটি ক্লাবের অফিশিয়াল হিসেবে থাকলেও কোচিংয়ে ছিলেন না ছোটন। শুধু মাঠের খেলা নিয়েই ব্যস্ত থেকেছেন। ১৯৯৬ সালে তৃতীয় বিভাগে টিঅ্যান্ডটি ক্লাবের দায়িত্ব নিলেন। এবারও ছোটনের বাজিমাত। তৃতীয় বিভাগে তার হাত ধরে চ্যাম্পিয়ন টিঅ্যান্ডটি ক্লাব। এরপর ১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় বিভাগে টিঅ্যান্ডটি ক্লাবের কোচের দায়িত্ব সামলেছেন ছোটন। পাশাপাশি দিলকুশা ক্লাব, দিপালী সংঘসহ বেশি কটি দলেরও দায়িত্ব সামলেছেন পাইওনিয়ার, তৃতীয় ও দ্বিতীয় বিভাগে। ২০০৬ সালের এপ্রিলে তিনি বাফুফেতে কোচ হিসেবে যোগ দেন।

২০০৯ সালে জুনের প্রথম সপ্তাহে মেয়েদের জাতীয় দলের কোচ হিসেবে যোগ দেওয়ার আগে পুরুষ জাতীয় ফুটবল দলের সহকারী কোচের ভূমিকাতেও ছিলেন ছোটন। কাজ করেছেন ছেলেদের বয়সভিত্তিক দল নিয়েও। তার আগে কাজ করেছেন বাফুফের ডেভেলপমেন্ট কমিটির অধীনে তৃণমূল পর্যায়ের বিভিন্ন কর্মসূচিতে।

খেলোয়াড়ি জীবনকে ছোটন বিদায় বলেছিলেন ২০০২ সালে। সব মিলে প্রায় ২০ বছর তিনি খেলেছেন ঢাকার ফুটবলে। ১৯৮৩ সালে বাসাবো তরুণ সংঘের হয়ে পাইওনিয়ার ফুটবল দিয়ে যে যাত্রার শুরু। ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ক্লাব, আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ, ওয়ারী, বিআরটিসিতে কেটেছে তার ক্লাব ক্যারিয়ার। অতিথি খেলোয়াড় হিসেবে একবার মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবেও খেলেন। জিতেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস ক্লাব শিরোপা। ১৯৯৩ সালে দেশে প্রিমিয়ার লিগ শুরুর পর ফকিরাপুলে পাঁচ বছর, আরামবাগে সাত বছর, ওয়ারীতে তিন বছর ও বিআরটিসিতে এক বছর কাটে ছোটনের।

খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচিং ক্যারিয়ার। উপভোগের আনন্দেই কাটছিল সবকিছু। কিন্তু ছোটন অথৈ জলে পড়ে গেলেন মেয়েদের কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর। একদিকে মেয়েরা ফুটবল খেলবে, এটা তখনো সেভাবে মেনে নিতে পারেনি সমাজ। মেয়েদের খেলাও তখন হাসির খোরাক হতো। বলের পিছু যে সেভাবে ছুটতেই পারত না মেয়েরা। এর মধ্যে আবার ‘মেয়েদের কোচ’ ট্যাগ বসল ছোটনের নামের আগে, যা তখন গর্বের নয়, কাছের মানুষদেরও উপহাসের বিষয় ছিল।

কিন্তু ছোটন ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো নিজের কাজ করে গেলেন। যার সুফল পেল দেশ। টানা দশ বছর কোনো খেলার জাতীয় দলের কোচিং পদে আছেন একজন, এই মুহূর্তে দেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনকে আদর্শ মানা ছোটনকে যেখানে দেশের নারী ফুটবলের ফার্গুসনও বলা চলে।

ছোটনের কোচিংয়ে নারী ফুটবল এখন এমন পর্যায়ে, অনেকে তো  বিশ্বকাপ খেলারও স্বপ্ন দেখেন। জাতীয় নারী ফুটবল দলের বর্তমান অধিনায়ক সাবিনা খাতুন তো প্রায়ই বলেন ‘বাংলাদেশের মেয়েরাই বিশ^কাপ খেলবে সবার আগে।’ এমন বিশ্বাস মারিয়া-আঁখিদেরও। ‘কাজপাগল’ ছোটনের ব্যক্তিজীবনটা কেমন? এখানেও দেখা মিলবে জাগতিক চিন্তা বিসর্জন দেওয়া এক মানুষের। খেলা খেলা করতে করতে যিনি সময়মতো বিয়েটাও করলেন না। মেয়েদের থেকে দূরে থাকবেন এটাই নাকি ছিল তার চিন্তা। ২০১৪ সালে পরিবারের চাপাচাপিতে বিয়ে করেন। ভাই-বোনরা মেয়ে ঠিক করলেন। এরপর মিথ্যা বলে ছোটনকে ডেকে নিয়ে বসালেন বিয়ের পিঁড়িতে।

কিন্তু বিয়ের রাতেই ছোটন রওনা হলেন ঢাকার উদ্দেশে। পরদিন সকালে যে প্র্যাকটিস। সবাইকে বলে গেছেন, তিনি প্র্যাকটিসে থাকবেন। সেদিন বিয়ে উপলক্ষে ছোটনকে বাফুফেতে ফুল দিয়ে বরণ করেছিলেন সহকর্মীরা। এখন অবশ্য ছোটন  বিশ্বাস করেন, বিয়ে তার জীবনে এসেছে সৌভাগ্য হয়ে।

খেলাধুলার প্রতি ছোটনের মোহটা একেবারে ছোটবেলা থেকেই। গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের গোপালপুরে। তবে বাবা ফরহাদ হোসেন তালুকদারের চাকরি সূত্রে জন্ম ও শৈশব কেটেছে তার বগুড়ায়। দশ ভাই-বোনের মধ্যে নবম ছোটন। তার পিঠাপিঠি ছোট ভাই গোলাম রায়হান বাপনও ফুটব-লপাগল এক মানুষ। গোপালপুর সুতি ভিএম পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষক তিনি। তার কোচিংয়ে জেএফএ কাপ অনূর্ধ্ব-১৪ নারী ফুটবলে চ্যাম্পিয়নও হয়েছে টাঙ্গাইল জেলা। এ ছাড়া তার হাত ধরে ওঠে এসে দেশের সর্বোচ্চ স্তরেও এখন ফুটবল মাতাচ্ছেন অনেকে। পুরুষ ফুটবল দলের সময়ের অন্যতম সেরা তারকা রবিউল হাসান, নারী ফুটবলের দলের অন্যতম সেরা মুখ কৃষ্ণা রানী সরকার ছোটনের ভাই বাপনের হাতে গড়া। গোপালপুরে প্রয়াত বাবার নামে ফুটবল অ্যাকাডেমিও চালু করেছেন তারা। যে অ্যাকাডেমি হাজারো শিশু-কিশোরদের মনে স্বপ্নের জাল বুনে চলেছে। রবিউল-কৃষ্ণা হওয়ার পথে পা বাড়াচ্ছে তারা সেই অ্যাকাডেমি থেকেই।

এমনিতে ছোটন খুব বেশি স্বপ্নবাজ মানুষ নন। সব সময় বাস্তববাদী। তাকে নিজের স্বপ্নের কথা জিজ্ঞেস করুন, উত্তর মিলবে, ‘আমি খুব বেশি স্বপ্ন দেখি না। কাজ করে যেতে চাই।  বিশ্বাস করি কাজের ফল সব সময় আসবেই।’ ছোটনের এই দর্শনের প্রমাণ মেলে যখন দল নিয়ে কোনো টুর্নামেন্টে অংশ নিতে যান তখন। তবে মেয়েদের ফুটবল একদিন অন্য উচ্চতায় যাবে, এই স্বপ্ন ঠিকই দেখেন ছোটন, ‘মেয়েরা এরই মধ্যে প্রমাণ করেছে তাদের সামর্থ্য আছে। সুযোগ-সুবিধা যখনই বাড়ানো হয়েছে, তারা ভালো করেছে। অবকাঠামো যদি ঠিক করা যায়, তবে অবশ্যই আরও ভালো কিছু সম্ভব। তৃণমূল পর্যায়েও এখন অনেক ট্যালেন্টেড খেলোয়াড় আছে। কিন্তু কাজ করতে হবে। কথার চেয়ে কাজ যদি বেশি হয়, নারী ফুটবল থেকে আমি মনে করি অনেক বেশি ভালো রেজাল্ট সম্ভব।’

মেয়েদের কাছ থেকে দূরে থাকবেন ভেবেছিলেন। অথচ ছোটনই কি না দেশের মেয়েদের ফুটবল উত্থানের নেপথ্যের নায়ক। মেয়েদের কাছ থেকে দূরে থাকার সেই কথা মনে করিয়ে দিলে অবশ্য ছোটন এখন হাসেন। আর নারী ফুটবলের এত এত সাফল্যের জন্য সব কৃতিত্ব তিনি সেই নারীদের দেন, ‘সব নরীকেই বিশেষ ধন্যবাদ দিতে হবে। আমি তাই কৃতজ্ঞতা জানাই তাদের প্রতি। মেয়েদের (ফুটবলার) কথা বলব। নারী বলেই ওরা প্রচুর পরিশ্রম করেছে। আমার কাজের ক্ষেত্রের কথা বলব। আমার মা, বোনরা ছোটবেলা থেকেই আদর দিয়ে আমাকে বড় করেছেন। বাড়িতে এখন স্ত্রীর কাছ থেকে পাই অপরিসীম সহযোগিতা। মাঠে খেলোয়াড়রা জান দিয়ে পরিশ্রম করে। আমাদের মহিলা অফিশিয়ালরা সব সময় অবদান রেখে চলেছেন। তাদের অবশ্যই কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে।’ আর পুরো দেশ কৃতজ্ঞতা জানায় একজন ছোটনকে। যার ছোঁয়ায় নারী ফুটবল পেল অন্য উচ্চতা।