কৃষি গবেষণার নতুন দিগন্তে|194650|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৩ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
কৃষি গবেষণার নতুন দিগন্তে
মো. আমিনুল ইসলাম

কৃষি গবেষণার নতুন দিগন্তে

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) দেশের বৃহৎ বহুবিধ ফসল গবেষণা প্রতিষ্ঠান। দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জন, কৃষকের আয় বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকার দানা জাতীয় শস্য, কন্দাল ফসল, ডাল, তেল ফসল, সবজি, ফল, ফুলসহ প্রায় ২১১টি ফসলের ওপর গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এ প্রতিষ্ঠান এসব ফসলের উচ্চ ফলনশীল উন্নত জাত এবং উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবন, ফসল ব্যবস্থাপনা, পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন ব্যবস্থাসহ কৃষি যন্ত্রপাতি, ফসল সংগ্রহ-উত্তর প্রযুক্তি ইত্যাদি বিষয়ের ওপর লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণা করে থাকে। বারি’র বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত বিভিন্ন ফসলের ৫৫৮টি জাত এবং ৫২৯টি উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এ প্রতিষ্ঠানের কৃষি পরিবেশ অঞ্চলভিত্তিক ৮টি আঞ্চলিক ও ৩০টি উপকেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া বারির গবেষণা কার্যক্রম ৬টি বিশেষায়িত ফসলভিত্তিক গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ইতিহাস শত বছরের পুরনো। ১৯০৮ সালে ১৬১ দশমিক ২০ হেক্টর জমির ওপর ঢাকা ফার্ম প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬২ সালে তৎকালীন সরকার কর্তৃক দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিষ্ঠার জন্য ঢাকা ফার্মের (বর্তমান শেরে বাংলা নগর) জমি অধিগ্রহণ করা হলে কৃষি গবেষণার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।  যদিও  পরবর্তী সময়ে  ১৯৬৬  সালে  ঢাকা  থেকে  ৩৫  কিলোমিটার  উত্তরে জয়দেরপুরে ২৬০ হেক্টর জমিতে ঢাকা ফার্ম স্থানান্তরিত হয়। ১৯৭১ সালে দেশ স¦াধীন হলে অন্যান্য সেক্টরের ন্যায় কৃষি সেক্টরেও উন্নতির অমিত সম্ভাবনা দেখা দেয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের কৃষি ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট আইন ২০১৫ অনুযায়ী বারি’র ম্যান্ডেট অনুযায়ী ধান, পাট, চা, তুলা ও চিনি জাতীয় ফসল ছাড়া অন্যান্য সব ফসলের গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা।

ইনস্টিটিউটের কাজ : গবেষণার বিষয়াবলির বিস্তৃত রূপরেখা প্রণয়ন ও অনুমোদন; ইনস্টিটিউটের ‘ম্যান্ডেটে’ উল্লিখিত ফসলসমূহের নতুন জাত উদ্ভাবন এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, মানসম্পন্ন উৎপাদন প্রযুক্তির মাধ্যমে সার্বিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির স্থিতিশীল ও উৎপাদনশীল কৃষি গবেষণার উদ্যোগ গ্রহণ করা;

কৃষিকাজ দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করার জন্য কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও তথ্যাবলি সরবরাহ করা; কৃষিক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার ওপর গবেষণা পরিচালনার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গবেষণা কেন্দ্র, উপ-কেন্দ্র, প্রকল্প এলাকা ও খামার স্থাপন করা; ফসলের নতুন জাত উদ্ভাবন ও তার পরিচর্যার ওপর পরীক্ষণ ও প্রদর্শনী পরিচালনা করা; ফসল গবেষণা ও ইনস্টিটিউটের কর্মকা- সম্পর্কে বার্ষিক প্রতিবেদন, কৃষি পুস্তিকা, মনোগ্রাম, সংবাদ সাময়িকী ও অন্যান্য বইপত্র প্রকাশ করা; ফসল উৎপাদনের উন্নত প্রযুক্তি ও কলাকৌশল সম্পর্কে গবেষক, সম্প্রসারণ কর্মী ও কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা; স্নাতকোত্তর গবেষণার সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করা; বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞদের দ্বারা নির্বাচিত সমস্যাবলি সম্পর্কে মতবিনিময় এবং কৃষিক্ষেত্রে সাম্প্রতিক উদ্ভাবনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করার জন্য সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও ওয়ার্কশপের আয়োজন করা; জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবেলায় গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ করা; কৃষিতে জীবপ্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধী, খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও তাপসহ বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশ সহিষ্ণু ফসলের জাত ও অন্যান্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা; জার্মপ্লাজম সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করা; কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, পুষ্টি, সাপ্লাই এবং ভ্যালুচেইন, আর্থ সামাজিক উন্নয়নের ওপর গবেষণা পরিচালনা করা; ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত বিভিন্ন ফসলের নতুন জাতের প্রজনন বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা; কৃষিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রয়োগ করা; সরকার কর্তৃক সময়ে সময়ে জারিকৃত বিভিন্ন আইন ও বিধিবিধানের আলোকে কার্যক্রম গ্রহণ করা; গবেষণা ও উন্নয়নের স¦ার্থে বারি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে।

পুরস্কার : দেশে কৃষি গবেষণায় অসামান্য অবদান রাখায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সর্বোচ্চ পদক স্বাধীনতা পদকসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে।

বারি উদ্ভাবিত ফসলের উল্লেখযোগ্য উন্নত জাত ও প্রযুক্তিসমূহ :

বারি কর্তৃক উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল আলুর জাত কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদের জন্য গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ আলু চাষে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। নিজস্ব সংকরায়ণের মাধ্যমে উদ্ভাবিত ১১টি জাত, সিআইপি জার্মপ্লাজম থেকে ৬টি জাত, বিদেশি জাত মূল্যায়নের মাধ্যমে ৪৮টি জাত এবং ২টি টিপিএস জাতসহ মোট ৯১টি আলুর জাত কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে এ পর্যন্ত বারি থেকে অবমুক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও বারি এ পর্যন্ত ১৬টি মিষ্টি আলুর জাত অবমুক্ত করেছে, এদের মধ্যে কয়েকটি উচ্চ ক্যারোটিন সমৃদ্ধ।  বারি’র কন্দাল ফসল কেন্দ্র থেকে উদ্ভাবিত উন্নত জাতসমূহের মধ্যে রয়েছে গোল আলু, বারি বাংলাদেশে এরোপনিক্স পদ্ধতিতে মানসম্পন্ন বীজ আলু (মিনি-টিউবার) উৎপাদিত হচ্ছে। ভাইরাস ও অন্যান্য রোগবালাইমুক্ত মানসম্পন্ন বীজ আলু উৎপাদন করতে আধুনিক ও জীব প্রযুক্তির বিকল্প নেই। তাই আধুনিক ও জীবপ্রযুক্তির (টিস্যু কালচার) মাধ্যমে উন্নত মানের বীজ আলু উৎপাদন করে এ দেশের বীজ আলুর আমদানি নির্ভরতা যেমন কমিয়ে আনা সম্ভব, তেমনি দেশে উদ্ভাবিত উন্নত জাতসমূহের বীজ দ্রুত কৃষকের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়াও সম্ভব। বাংলাদেশে ৯০টির অধিক বিভিন্ন ধরনের সবজির চাষ হয়ে থাকে।

হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে সবজি চাষ : হাইড্রোপনিক পদ্ধতি হলো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মাটির পরিবর্তে পানিতে গাছের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান সরবরাহ করে সবজি, ফল ও ফুল উৎপাদনের একটি কৌশল। জনবহুল বহু দেশে যেখানে স্বাভাবিক চাষের জমি কম কিংবা নেই, সেখানে ঘরের ছাদে বা আঙিনায়, পলি টানেল এবং নেট হাউজে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে সবজি ও ফল উৎপাদন করা হয়। যেহেতু আমাদের দেশ জনবহুল এবং অধিক সবজি উৎপাদনের জন্য জমি বাড়ানোর সুযোগ নেই, সেহেতু হাইড্রোপনিক পদ্ধতির মাধ্যমে টমেটো, ক্যাপসিকাম, লেটুস, শসা ইত্যাদি সহজে এবং সারা বছরব্যাপী উৎপাদন করা যায়। এই পদ্ধতিতে সবজি ও ফল উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে সাফল্যজনকভাবে টমেটো, ক্যাপসিকাম, লেটুস, শসা ও স্ট্রবেরি উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে। এই পদ্ধতিতে সারা বছরই সবজি ও ফল উৎপাদন করা সম্ভব এবং উৎপাদিত সবজি ও ফলে কোনো কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না বিধায় এসব সবজি ও ফল নিরাপদ এবং এর বাজার মূল্যও বেশি।

পোকামাকড় ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা : বালাইনাশকের ওপর একক নির্ভরশীলতা পরিত্যাগ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী, অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক, উৎপাদক ও ভোক্তার জন্য সবচেয়ে কম ক্ষতিকারক দমন ব্যবস্থাপনা উদ্ভাবন করা প্রয়োজন যা আইপিএম নামে পরিচিত। আনন্দের বিষয় হচ্ছে এই যে, বারির বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ফসলের সেক্স ফেরোমন ফাঁদভিত্তিক সমন্বিত দমন ব্যবস্থাপনা উদ্ভাবন করেছে যা কৃষক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে।  একইভাবে বারি উদ্ভাবিত আইপিএম পদ্ধতি প্রয়োগ করে অন্যান্য সবজি যেমন, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, কচু, ঢেঁড়স, শিম ইত্যাদি এবং আম, পেয়ারা, কমলা, ডালিম ইত্যাদি ফলের উৎপাদন যেমন বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে তেমনি প্রযুক্তিসমূহ স্বল্প ব্যয়সম্পন্ন হওয়ায় আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব। কোনো ধরনের কীটনাশক (বিষ) প্রয়োগ করার প্রয়োজন হয় না বলে উদ্ভাবিত আইপিএম পদ্ধতিসমূহ পরিবেশবান্ধব, স্বাস্থ্যগত সমস্যামুক্ত।

জৈব আর্বজনা থেকে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচোসার উৎপাদন :

ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচোসার উৎপাদন বর্তমানে কৃষি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় জৈব উচ্ছিষ্টাংশ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের একটি যুগোপযোগী পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপ। হজম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসিনা ফেটিডা জাতের কেঁচো গোবর ও রান্নাঘরের পচনশীল আর্বজনাকে ভার্মি কম্পোস্টে রূপান্তরিত করে। বাংলাদেশে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনকারী কম্পোস্টার কেঁচোর জাতগুলোর মধ্যে এসিনা ফেটিডা অধিক দ্রুততার সঙ্গে বেশি পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করতে সক্ষম। এই সার তৈরিতে নানারকম পচনশীল জিনিস লাগে। এসব খেয়ে হজম প্রক্রিয়ায় কেঁচো যে মলত্যাগ করে, তাই ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার। অন্যান্য জৈবসারের তুলনায় এ সার অধিক পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ কারণ হজম প্রক্রিয়ায় উপকারী অণুজীব ছাড়াও কেঁচোর শরীর নিঃসৃত রস এটাতে মিশ্রিত থাকে যা এর পুষ্টিমান বাড়িয়ে দেয়।  বর্তমানে গোবরের অপ্রতুলতায় ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদরনের বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে গোবর ও রান্নাঘরের পচনশীল আর্বজনার মিশ্রণ থেকে উৎপাদিত ভার্মি কম্পোস্ট বেশি পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ ।

চার ফসলভিত্তিক ফসল ধারা : বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটির অধিক এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করে প্রায় ১১০০ জন। প্রতি বছর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৭%। পরিসংখ্যান অনুযায়ী মোট আবাদি জমির পরিমাণ ৮৫.২ লক্ষ হেক্টর। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রতি বছর জমির পরিমাণ কমছে প্রায় ১% হারে। এক ফসলি জমির পরিমাণ ২৪.২ লক্ষ হেক্টর, দুই ফসলি জমির পরিমাণ ৩৮.৪১ লক্ষ হেক্টর, তিন ফসলি জমির পরিমাণ ১৬.৪২ লক্ষ হেক্টর এবং ফসলের নিবিড়তা ১৯১%। বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা অতীব জরুরি। আর এই বর্ধিত খাদ্য উৎপাদন করার জন্য প্রয়োজন উচ্চ ফলনশীল জাত, উন্নত ফসল ব্যবস্থাপনা এবং একক জমিতে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা। একমাত্র উন্নত ফসলধারা প্রবর্তনের মাধ্যমে ফসলের নিবিড়তা ১৯১% থেকে ৪০০% পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। ধানভিত্তিক ফসল ধারায় স্বল্পমেয়াদি অন্য ফসল সমন্বয় করে ফসলের নিবিড়তা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি : সম্প্রতি বারি উদ্ভাবিত প্রযুক্তি সমূহের তথ্য কৃষক পর্যায়ে সহজলভ্য করার জন্য “কৃষি প্রযুক্তি ভা-ার” নামে মোবাইল অ্যাপ্স তৈরি করেছে। মূলত এটি কৃষি প্রযুক্তিভিত্তিক একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন এই অ্যাপ্সটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা তাদের মোবাইল হ্যান্ডসেটে ব্রাউজ করে তথ্য নিতে পারবেন। এই অ্যাপ্সটির মাধ্যমে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি, রোগবালাই, পোকামাকড় ও সার ব্যবস্থাপনাসহ সংশ্লিষ্ট যাবতীয় তথ্য পাওয়া যাবে। অধিকতর তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি সংক্রান্ত প্রশ্ন জানাতে পারবেন এবং এসএমএস, ই-মেইল ও অ্যাপ্সে উত্তর  পাওয়া যাবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের সঙ্গে ফ্রি কলের মাধ্যমে পরামর্শ নেওয়া যাবে। 

ভাসমান কৃষি : ‘‘ভাসমান কৃষি’’ বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্লাবিত/জলমগ্ন এলাকার একটি সৃজনশীল ফসল উৎপাদন পদ্ধতি। প্লাবিত বা জলমগ্ন অবস্থার সঙ্গে অভিযোজনের জন্য স্থানীয় কৃষকরা ঐতিহ্যগতভাবে স্থানীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ‘‘ভাসমান কৃষি’’ পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন করে আসছে। বাংলাদেশ ছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য দেশ যেমন- মিয়ানমার, ভারত, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, নেদারল্যান্ডস, পেরু এবং মেক্সিকোতেও ভাসমান কৃষি পদ্ধতির প্রয়োগ দেখা যায়। বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাধারণত গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর এবং বরিশাল জেলায় বর্ষাকালে নিচু জলমগ্ন এলাকাসমূহে মূলত ভাসমান চাষ হয়ে থাকে। তবে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এ পদ্ধতির ব্যবহার সীমিত।  গোপালগঞ্জে এবং বরিশালের উজিরপুর উপজেলায় শুধুমাত্র কচুরিপানা দিয়ে তৈরি ভাসমান বেডে সাধারণত শাক-সবজি ও মসলা জাতীয় ফসলের চাষ করা হয়। অন্যদিকে বরিশালের বানারীপাড়া ও আগৈলঝড়া এবং পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদ উপজেলায়  কচুরিপানা, দুলালীলতা ও টোপাপানা দিয়ে তৈরি ভাসমান বেডে শাক-সবজি ও মসলা জাতীয় ফসলের চারা উৎপাদন করা হয়। ‘ভাসমান কৃষি’ পদ্ধতির উপকরণ যেমন- কচুরিপানা, দুলালীলতা, টোপাপানা, শ্যাওলা, নারিকেলে ছোবড়ার গুঁড়া প্রভৃতি স্থানীয় ভাসমান বাজারে বিক্রি হয়। টোপাপানার ওপর দুলালীলতা বা শ্যাওলা দিয়ে পেঁচিয়ে বল বা দোল্লা তৈরি করে তার  ভেতর সবজি বা মসলার অঙ্কুরিত বীজ বা কচি চারা বপনবা রোপণ করতে হয়। অঙ্কুরিত বীজ বা কচি চারাসহ বলটি ভাসমান বেডে স্থাপন করে সবজিবা বা মসলার চারা উৎপাদন করা হয়। ভাসমান বেডে উৎপাদিত সবজি ও মসলার চারা দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাসমূহ ছাড়াও অন্যান্য জেলায়ও বিক্রি হয়। এতে কৃষক ছাড়াও ভাসমান বা ধাপ চাষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত জনগোষ্ঠীর অর্থ উপার্জন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত প্রযুক্তিটি পরিবেশ বান্ধব এবং বাংলাদেশের পরিবর্তিত জলবায়ুগত পরিস্থিতিতে কৃষি অভিযোজনের উপযোগী।

সামুদ্রিক শৈবাল গবেষণা : বাংলাদেশের উপকূলীয় তটরেখার দৈর্ঘ্য প্রায় ৭১০ কিলোমিটার যেখানে ২৫০০০ বর্গ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা বিস্তৃত। বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট-মার্টিন্স প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া সামুদ্রিক শৈবালের প্রধান আধার। প্রাপ্ত তথ্য মতে সেখানে প্রায় ১০২ গ্রুপের ২১৫ প্রজাতির শৈবাল রয়েছে। বর্তমান সরকার সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সামুদ্রিক শৈবাল গবেষণায় গুরুত্ব আরোপ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ১০ প্রজাতির শৈবাল চাষ করা সম্ভব। শৈবাল চাষের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ ও শান্ত লোনাপানিসমৃদ্ধ সমুদ্র উপকূল। সামুদ্রিক শৈবাল থেকে এগার, কেরাজিনা এবং এলগিনেট উৎপন্ন হয় যা শিল্পকারখানায় এবং ওষুধ শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বের বহুদেশে এই সামুদ্রিক শৈবাল মানুষের খাদ্যে পুষ্টিবৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।  চীন, জাপান, কোরিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, ভারত এই সামুদ্রিক শৈবাল উৎপাদন ও বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। দেশেও এই সামুদ্রিক শৈবাল চাষাবাদ ও বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।

 পাহাড়ি অঞ্চলে ফসল উৎপাদন :  দেশের প্রায় ১২ শতাংশ পার্বত্য অঞ্চলের কৃষিকাজ সমতল ভূমির অনুরূপ নয়। এ নিরিখে উক্ত অঞ্চলে অবস্থিত বারির গবেষণা কেন্দ্রসমূহের বিজ্ঞানীরা স্থায়ীভাবে পাহাড়ে চাষাবাদ উপযোগী বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি চাষের মাধ্যমে বছরব্যাপী উৎপাদনশীল পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে। যা ওই অঞ্চলে ‘ম্যাথ’ মডেল নামে পরিচিত। মডেলটি পাহাড়ি অঞ্চলে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করছে।

বারি প্রযুক্তি হস্তান্তর : বারি প্রশিক্ষণ ও যোগাযোগ উইং এবং সরেজমিন গবেষণা বিভাগের মাধ্যমে সরকারি, বেসরকারি, এনজিও ও অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ কাজ করা হচ্ছে। প্রযুক্তি হস্তান্তরে বিভিন্ন কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে অবস্থিত খামার পদ্ধতি গবেষণা ও উন্নয়ন এলাকা এবং বহুস্থানিক গবেষণা এলাকা এবং বারি প্রযুক্তি পল্লী গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বিভিন্ন কর্মশালা, প্রশিক্ষণ, মাঠ দিবস, ইলেকট্রনিক্স ও প্রেস মিডিয়ার মাধ্যমে উদ্ভাবিত প্রযুক্তিসমূহ সম্প্রসারণ কর হয়।  বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী, গবেষক, ব্যক্তিবাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য সহযোগিতার প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে উদ্ভাবিত জাত এবং প্রযুক্তির তথ্য বিষয়ে নিয়মিত বুকলেট, লিফলেট, ম্যানুয়াল, বার্ষিক প্রতিবেদন, নিউজলেটার, উদ্ভাবিত

কৃষি প্রযুক্তি, কৃষিপ্রযুক্তি হাতবইসহ বিভিন্ন প্রকাশনা করে থাকে।