অন্যের দুঃখে দুঃখী হওয়া ইসলামের শিক্ষা|194786|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
অন্যের দুঃখে দুঃখী হওয়া ইসলামের শিক্ষা
শাহীন হাসনাত

অন্যের দুঃখে দুঃখী হওয়া ইসলামের শিক্ষা

সহমর্মিতা হচ্ছে- অন্যের দুঃখে দুঃখী হওয়া, অন্যের বিপদ-আপদ ও কষ্ট-বেদনা নিজের অনুভূতি দিয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা করা। কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাকে সহযোগিতা করা। মানবিক মূল্যবোধ অবক্ষয়ের এই সন্ধিক্ষণে ‘অন্যের দুঃখে দুঃখী হওয়া’ এটা অকল্পনীয় ব্যাপার। সর্বত্রই এখন ভোগবাদীদের পদচারণা। তাই দুর্গতদের পাশে সহমর্মিতার হাত ও হৃদয় নিয়ে এখন আর আগের মতো প্রচুর মানুষের উপস্থিতি দেখা যায় না। যাও দু’একজনকে পাওয়া যায়, তারাও অনেকেই নিজ স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। আল্লাহতায়ালা কোরআনে কারিমের সুরা আলে ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মানব জাতির কল্যাণে সৃষ্টি করা হয়েছে, তোমরা সৎকাজে উৎসাহ দেবে আর অসৎ কাজে বাধা দেবে এবং আমার প্রতি ইমান আনবে।’ কিন্তু বাস্তবজীবনে আমরা কি এই পবিত্র বাণী যথাযথভাবে পালন করছি?

ইসলাম অন্যেও প্রতি সহমর্মিতার শিক্ষা দিয়েছে। সমাজবদ্ধ জীবনে সহমর্মিতার অনেক প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে সুনানে তিরমিজিতে বর্ণিত এক হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার খিয়ানত করবে না। তার বিষয়ে মিথ্যা বলবে না। তাকে অপমানিত হতে দেবে না। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমের সম্মান, সম্পদ ও রক্ত হারাম। তাকওয়া (আল্লাহভীতি) হলো এখানে (অন্তরে) কোনো ব্যক্তির মন্দতার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে হেয় দৃষ্টিতে দেখবে।’ অন্য আরেক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘এক মুমিন আরেক মুমিনের জন্য ইমারতের মতো। একটি ইট আরেকটিকে শক্তি জুগিয়ে থাকে।’ -সুনানে তিরমিজি

সামাজিক জীবনে এ শিক্ষার চর্চা এখন খুবই জরুরি। পারস্পরিক সহানুভূতি ও সহমর্মিতা ছাড়া কোনো সমাজের মানুষ সুখী-সমৃদ্ধ হতে পারে না। ইসলামের প্রথম যুগে মুসলমানদের মাঝে যে পারস্পরিক সহানুভূতি ও সহমর্মিতা ছিল বর্তমান মুসলিম সমাজে তা অনেকাংশেই অনুপস্থিত। সাহাবায়ে কেরামের পারস্পরিক সহানুভূতি ও সহমর্মিতা সম্পর্কে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তারা তাদের নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়, নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও। যাদের অন্তর কার্পণ্য থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে তারাই সফলকাম।সুরা হাশর: ৯

দুঃখজনক হলেও সত্য, এখন আমরা দিন দিন খুবই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি। পাড়া-পড়শি, আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিতজনদের শোক-দুঃখে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা আমাদের মধ্যে লোপ পাচ্ছে। ফলে সমাজের দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত লোকেরা নিতান্তই অসহায় হয়ে পড়ছে। কোনো মুসলিম সমাজের চিত্র আদৌ এমন হওয়া উচিত নয়। এ অবস্থার অবসান হওয়া জরুরি। তবে সহমর্মিতা দেখানোর ক্ষেত্রেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। আমরা যাকে সহমর্মিতা জানাচ্ছি, তার জন্য আমার কোনো কথা বা আচরণ যেন পীড়াদায়ক না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা। কারণ, সহমর্মিতার উদ্দেশ্যই হলো, অপর পক্ষের কষ্ট লাঘব করা, বাড়ানো নয়। আগেই বলা হয়েছে, ইসলাম মানুষকে সর্বোচ্চ মানবিকতা, পরহিতৈষণা, সহমর্মিতা ও মহানুভবতার শিক্ষা দিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে আল্লাহতায়ালা তার নবীকে দয়া ও সহমর্মিতার প্রতীক হিসেবে প্রেরণ করেছেন। অনাহারীর কষ্টের ভাগিদার হতে আল্লাহতায়ালা রমজানের রোজা ফরজ করেছেন। দুঃখীর অভাব মোচনে জাকাত ফরজ ও সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব করেছেন। দান-সদকা ও অন্যের জন্য খরচে উদ্বুদ্ধ করে অনেক আয়াত নাজিল হয়েছে। একটি পরিবারকে তখন সফল পরিবার বলা যাবে, যখন সেখানে স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তান এবং ভাই- বোনদের মধ্যে সহমর্মিতা ও সহানুভূতির চর্চা থাকবে। আমরা যদি অন্যের সমস্যা ও দুঃখ-কষ্ট ভালোভাবে উপলব্ধি করে সহমর্মী হই তাহলে অন্যরাও আমার সমস্যায় এগিয়ে আসবে এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। জীবনে চলার ক্ষেত্রে মানুষকে হাজারও দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হয়। সেগুলোকে সহজভাবে কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন অন্যের দুঃখে দুঃখী হওয়া। অর্থাৎ সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেওয়া। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো- আজকাল আমরা অনেকেই তা করি না। উল্টো কেউ বিপদে পড়লে সেটা নিয়ে মজা করি, উপহাস করি। তার কর্মদোষ বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। মনে রাখতে হবে, বিপদে-আপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হলো সর্বোচ্চ মানবতা।

লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক