মালামাল পরিবহনে ‘ট্রাক লাগবে’|194851|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
মালামাল পরিবহনে ‘ট্রাক লাগবে’
আল আমীন

মালামাল পরিবহনে ‘ট্রাক লাগবে’

ব্যবসায়িক কাজে, বাসা বদল বা অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রেই মালামাল স্থানান্তর বা পরিবহনের জন্য প্রায় সময়ই আমাদের প্রয়োজন হয় ট্রাক বা পিকআপ ভ্যানের। কিন্তু প্রয়োজনের সময় অন্য যেকোনো জিনিসের মতোই, হাতের নাগালে এগুলো পাওয়াটাও ভীষণ কষ্টকর হয়ে যায়। এ ছাড়া ট্রাকস্ট্যান্ডে যাওয়া-আসার ঝামেলা, পরিচিত ট্রাক ড্রাইভারদের ফ্রি না পাওয়া ইত্যাদি নানা কারণেও ট্রাক ভাড়া করার এই বিষয়টি পীড়াদায়ক হয়ে দাঁড়ায়। আজকের লেখায় আমরা কথা বলব এ ধরনের যাবতীয় সমস্যার সহজ সমাধান দিতে পারে এমন একটি সার্ভিস সম্পর্কে। ট্রাক ভাড়া করা বা ভাড়া দেওয়ার একদমই নতুন ও যুগোপযোগী এই উদ্যোগের নাম ‘ট্রাক লাগবে’।

‘ট্রাক লাগবে’ একটি স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশন (অ্যাপ)-নির্ভর পণ্য পরিবহন সেবা। ট্রাকমালিক বা ট্রাক এজেন্সির সঙ্গে সেবাগ্রহীতার যোগসূত্র তৈরি করে দেবে ‘ট্রাক লাগবে’ অ্যাপটি। যার মাধ্যমে দেশের যেকোনো স্থান থেকে আপনি আপনার প্রয়োজনীয় মালামাল স্থানান্তরের জন্য ট্রাক ভাড়া করতে পারবেন ঘরে বসেই।

এটির উদ্যোক্তা দুই অসামান্য প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব এনায়েত রশিদ ও মীর হোসাইন ইকরাম। যাদের লক্ষ্য ছিল, ট্রাকচালকদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো। এ ছাড়া ট্রাকমালিক কিংবা চালক ও সেবাগ্রহীতার মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করা। যাতে দুই পক্ষই উপকৃত হয় এবং সময়ও বাঁচে। দেশের যেকোনো জায়গা থেকে, যেকোনো সময় পণ্য পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় ট্রাক, পিকআপ ও কাভার্ড ভ্যান মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে আসা এবং এ-সংক্রান্ত যাবতীয় ঝক্কি-ঝামেলার অবসান ঘটানোর উদ্দেশ্য নিয়েই তারা তৈরি করেন ‘ট্রাক লাগবে’ অ্যাপটি।

অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধিত থাকেন ট্রাকমালিক এবং সেবাগ্রহীতাও। দুই পক্ষই আগাম জানতে পারেন, তার শহর থেকে কোন ট্রাক কখন, কোথায় যাবে বা কার পণ্য পরিবহনসেবা দরকার। ট্রাকচালক ঠিক সময়ে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন কি না, সে বিষয়ে অ্যাপের মাধ্যমে সেবা নিলে সেবাগ্রহীতা অনেকখানি চিন্তামুক্ত থাকতে পারবেন।

‘ট্রাক লাগবে’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এনায়েত রশিদের ভাষ্য অনুযায়ী এই সার্ভিসের লক্ষ্য হলো, ‘এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যার মাধ্যমে ট্রাকচালক বা মালিকের সঙ্গে পণ্য প্রেরকের এক ধরনের যোগাযোগ তৈরি হবে। ট্রাক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের জীবনমান উন্নয়ন করাই এর মূল লক্ষ্য।’

এই অ্যাপটির কাজের ধরন বা সিস্টেম অনেকটা রাইড শেয়ারিং বা পার্সেল অ্যাপগুলোর মতোই। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্যগুলোর চেয়ে এটি একটু আলাদা। অন্যগুলোর মতো এটিতে ট্রাক ড্রাইভার বা চালককে কোনো পার্সেন্টেজ দিতে হয় না। এখানের আয় পুরোটাই ওই ট্রাকচালক বা মালিকের। এতে সাধারণত যখন কোনো প্রেরকের ট্রাকের প্রয়োজন হবে, তখন তিনি অ্যাপের মাধ্যমে তার চাহিদার কথা জানিয়ে দেবেন। এরপর সেই চাহিদার বিবরণ পৌঁছে যাবে আশপাশের ট্রাকমালিকদের কাছে। এরপর আগ্রহী ট্রাকমালিক বা চালকরা তাদের কাক্সিক্ষত ভাড়ার কথা জানাবেন। সব ঠিকঠাক হলে পণ্য প্রেরক সেই অ্যাপ দিয়েই ভাড়া করে নিতে পারবেন ট্রাক।

ধরুন, আপনার বাসা বদলের জন্য কিংবা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে জিনিসপত্র বা পণ্য এক এলাকা আরেক এলাকায় দেশের যেকোনো স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার দরকার। সে ক্ষেত্রে অ্যাপে ঢুকে আপনি কোথা থেকে কোথায় যেতে চান এবং কী পরিমাণ পণ্য বহন করতে হবে, এমনকি কতটুকু ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ট্রাক দরকার তাও উল্লেখ করে দেবেন। এরপর আপনার সেই বিবরণ পৌঁছে যাবে আশপাশের ট্রাকমালিকদের কাছে। এরপর আগ্রহী ট্রাকমালিক বা চালকরা তাদের কাক্সিক্ষত ভাড়ার কথা জানাবেন। সে ক্ষেত্রে আপনি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে যার সঙ্গে দরদামে ঠিক থাকবে তাকেই বেছে নিতে পারবেন। আর আপনি যদি অন্যান্য রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের মতো তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাক চান, তাও যেমন পাবেন তেমনি কয়েক দিন আগে থেকেও বুকিং দিয়ে রাখতে পারবেন, আপনার জন্য ট্রাক পৌঁছে যাবে সময় মতো। যারা ব্যবসায়ী, তাদের অধিক পরিমাণে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে অনেক সময় ‘ট্রাক লাগবে’ কর্র্তৃপক্ষ নিজেরাই তদারকি করে থাকেন বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। প্রয়োজন, পছন্দ এবং সামর্থ্য অনুযায়ী মালামাল পরিবহনের সুবিধা পাচ্ছেন একজন গ্রাহক। এই অ্যাপের সব ট্রাক ড্রাইভার ও তাদের গাড়িগুলো যেহেতু নিবন্ধিত, তাই নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে নিশ্চিত থাকা যায়।

বিষয়টি নিয়ে ট্রাক লাগবের মার্কেটিং ম্যানেজার আল আমিন জানান, ট্রাকমালিক ও সেবাগ্রহীতা দুই পক্ষের মধ্যে একটি সংযোগ স্থাপনের যে প্রয়াস নিয়ে এই অ্যাপের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটি যথাযথভাবেই সাধন হয়েছে। আর এ কারণেই মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করে চলেছে ট্রাক লাগবে সার্ভিসটি।

ট্রাকচালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও অন্যান্য

ট্রাক লাগবের সবচেয়ে ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ হলো, নিবন্ধিত ট্রাকচালকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। ট্রাকচালক এবং সেবাগ্রহীতা উভয়ের নিরাপত্তা এবং সুবিধার্থে অ্যাপ ব্যবহার করাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে ‘ট্রাক লাগবে’ কর্র্তৃপক্ষ। এ ছাড়া প্রতি মাসে কাজের ওপর ভিত্তি করে চারজনকে বাছাই করা হয় ‘ট্রাক লাগবে চ্যাম্পিয়ন’ হিসেবে এবং তাদের পুরস্কৃত করা হয়।

গ্রাহক ও চালক : ট্রাক লাগবের গ্রাহক হতে পারবেন যে কেউ। এ ক্ষেত্রে আপনাকে শুরুতে অ্যাপটি ডাউনলোড করে নিতে হবে। এরপর অ্যাপে ঢুকে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি দিয়ে লগইন করলেই যেকোনো সময় আপনি ঘরে বসেই এই সেবাটি পেতে পারেন। ট্রাক ভাড়া, দরদাম সবকিছুই করে নিতে পারবেন।

ট্রাকের মালিক বা চালক হলে, সে হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করে নিতে হবে। ট্রাকচালকদের এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করে কর্র্তৃপক্ষ।

ইন্টারনেট সংযোগও না থাকলেও এই সেবাটি পাওয়া যাবে। সে জন্য সরাসরি কল করতে হবে সরাসরি ‘ট্রাক লাগবে’-এর অফিশিয়াল নম্বর ০১৯৩৯১০০১০০-এ।

অ্যাপ ডাউনলোড করা যাবে গুগল প্লে স্টোর থেকে। গুগল প্লে স্টোরে ‘Truck Lagbe’ অনুসন্ধান (সার্চ) করলে ট্রাক লাগবের দুটি অ্যাপ পাওয়া যায়। একটি ‘Truck Lagbe Owner’ নামে কালো রঙের অ্যাপ যেটি ট্রাকচালক বা মালিকদের জন্য। অন্যটি ‘Truck Lagbe : Fast & Affordable Truck Hiring App’ নামে লাল রঙের অ্যাপ, যা আছে গ্রাহকদের জন্য।

উদ্যোক্তাদের গল্প : দুই পেশাজীবী বন্ধু এনায়েত রশিদ এবং মীর হোসাইন ইকরামের প্রতিষ্ঠান ‘ট্রাক লাগবে’। প্রতিষ্ঠানটির সিইও এনায়েত রশিদ। আর চিফ অপারেটিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন মীর হোসাইন ইকরাম। সম্পূর্ণ নতুন এবং ভিন্ন কিছু করার আগ্রহ থাকলেও সহজে কোনো আইডিয়া নির্ধারণ করতে পারছিলেন না তারা। এদিকে ব্যবসায়িক পণ্য পরিবহনের জন্য মাঝেমধ্যেই ট্রাক প্রয়োজন হতো এনায়েত রশিদের। সেই খাতিরে ঘটনাক্রমে কিছু জিনিস তার নজরে এলো। বিশেষ করে ভাড়ার বিষয়টি। দুই বন্ধু মিলে এ বিষয়টি নিয়ে ফের আলোচনায় বসেন। সেখানেই উঠে আসে ‘ট্রাক লাগবে’র পরিকল্পনা। এবার শুধু পরিকল্পনাতেই কাজ থেমে থাকেনি, বাস্তবেও পরিণত হয়েছে।

যাত্রা : ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রাথমিকভাবে শুরু হয় ‘ট্রাক লাগবে’র পরিকল্পনা ও নির্মাণকাজ। ২০১৭ সালের জুন মাসে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ (আইসিটি) আয়োজিত ‘স্টার্টআপ চ্যালেঞ্জ ২০১৭’ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী নির্বাচিত মোট ২০টি উদ্ভাবনী প্রকল্পের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে। সে বছরই জুলাই মাসে অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহারকারীদের জন্য এটির পরীক্ষামূলক (বেটা) সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এরপর ২০১৮ সালের আগস্টে অ্যাপটির নতুন সংস্করণ আসে গুগল প্লে স্টোরে। একই বছর সেপ্টেম্বরে ঢাকার আইসিটি টাওয়ারে আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যাপটির বাণিজ্যিক যাত্রা শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়। সেই যাত্রার এক বছর পেরোতে না পেরোতেই পণ্য পরিবহনের নির্ভরযোগ্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে খ্যাতি পেতে শুরু করে ‘ট্রাক লাগবে’। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম আয়োজিত প্রতিযোগিতায় দেশের ১৬৮টি কোম্পানির মধ্য থেকে ‘ট্রাক লাগবে’ জিতে নেয় ‘বেস্ট টেকনোলোজি ইনোভেশন’ পুরস্কার।

বর্তমান অবস্থা : মার্কেটিং ম্যানেজার আল আমিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে এই সার্ভিসটি যাত্রা শুরু করে মাত্র ৫০টি ট্রাক নিয়ে। এখন নিবন্ধিত ট্রাকের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। বর্তমানে এই অ্যাপের সাহায্যে ছোট পিকআপভ্যান থেকে শুরু করে মাঝারি বা বড় আকারের খোলা ট্রাক এবং কাভার্ড ভ্যান ভাড়া করা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, এখানে পাওয়া যাচ্ছে কনটেইনারবাহী প্রাইম মুভার। আর যদি শহরের ভেতরেই খুব দ্রুত পণ্য পরিবহনের প্রয়োজন দেখা দেয়, ‘ট্রাক লাগবে’র ‘এক্সপ্রেস’ সার্ভিসের মাধ্যমে অ্যাপ দিয়েই মুহূর্তে যে কেউ ডেকে নিতে পারবেন তার সবচেয়ে কাছে থাকা মিনি ট্রাক কিংবা পিকআপ। সেবাগ্রহীতাদের সর্বোচ্চ গুণগতমান নিশ্চিত করতে মূলত দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করছে অ্যাপটি। একটি হলো নির্ভরযোগ্যতা এবং অন্যটি স্বচ্ছতা। ২৪ ঘণ্টা পরিবহন সুবিধা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিবহনসেবা এবং অ্যাপের অভ্যন্তরীণ বিশেষ লোড ম্যাচিং প্রযুক্তির মাধ্যমে যেকোনো শিপমেন্টের জন্য সঠিক ট্রাক খুঁজে দিয়ে নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করছে ‘ট্রাক লাগবে’। অন্যদিকে স্বচ্ছতার লক্ষ্যে ‘ট্রাক লাগবে’-তে প্রাপ্ত সব ট্রাক যাচাই করা ও রেজিস্টার্ড। এ ছাড়া সব পণ্য পাঠানোরই ভেরিফিকেশনের ব্যবস্থা করেছে তারা। সেই সঙ্গে সেবাগ্রহীতারা যেন সম্ভাব্য সবচেয়ে কমমূল্যে সেবা লাভ করতে পারে, সে বিষয়ে সব সময় সজাগ নজর থাকে ‘ট্রাক লাগবে’র উদ্যোক্তাদের।

এই সার্ভিসটির মাধ্যমে শুধু সাধারণ মানুষই যে উপকৃত হচ্ছেন তা নয়, পাশাপাশি ট্রাক ব্যবসায়ীরাও খুব সহজেই খুঁজে পাচ্ছেন তাদের সেবাগ্রহীতা। তা ছাড়া পণ্য বা মালামাল পরিবহনের জন্য অনেক সময় ট্রাক নিয়ে দূর-দূরান্তে, এমনকি দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যেতে হয়। কিন্তু সেখানে নতুন কোনো সেবাগ্রহীতা না পাওয়ায়, কিংবা স্থানীয়দের সঙ্গে তেমন চেনাজানা না থাকায়, ফিরতি পথে খালি ট্রাক নিয়েই আসতে হয়। ফলে বৃথা শ্রম ও টাকার অপচয় ঘটে। কিন্তু এখন যেহেতু এই অ্যাপের মাধ্যমে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে অনলাইনেই সেবাগ্রহীতা পাওয়া যাচ্ছে, তাই ট্রাকচালক ও কর্মীদের শ্রমটাও বৃথা যাচ্ছে না। তারা যেমন বাড়তি কিছু আয়ের সুযোগ পাচ্ছে, তেমনই ক্ষতির বদলে লাভ হচ্ছে ট্রাকমালিকদেরও। সব মিলিয়ে বলাই যায়, ট্রাকমালিক, চালক, কর্মী থেকে শুরু করে সেবাগ্রহীতা, সবার জীবনকেই আরও সহজ করে দিচ্ছে ‘ট্রাক লাগবে’।