ভোট দিতে আগ্রহী হচ্ছে না জনগণ|194925|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৪ জানুয়ারি, ২০২০ ১৩:৩৮
ভোট দিতে আগ্রহী হচ্ছে না জনগণ

ভোট দিতে আগ্রহী হচ্ছে না জনগণ

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদের জন্ম ১৯৫৪ সালের ১ মার্চ, চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে। তিনি ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৭ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯১ সালে ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েলস থেকে লাভ করেন পিএইচিডি। বর্তমানে কুমিল্লা ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। এর আগে শিক্ষকতা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি বা বার্ডের ফ্যাকাল্টি মেম্বার, লোকাল গভর্নমেন্ট কমিশনের সদস্য, ইউএনডিপির স্থানীয় সরকার বিষয়ক পরামর্শকসহ নানা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ২৫টি। বাংলা ও ইংরেজি ভাষার তার অসংখ্য নিবন্ধ বিভিন্ন জার্নাল ও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকায় দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অনিন্দ্য আরিফ

দেশ রূপান্তর : সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে একাধিকবার। এ বিষয়ে আপনি কী মনে করেন?
তোফায়েল আহমেদ : এ ধরনের অভিযোগ যখন উঠবে, তখন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলো বিষয়টি তদন্ত করা। তদন্ত করে এটার সত্যতা পেলে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা করা। এর বাইরে আর কিছু নেই। কিন্তু অভিযোগ উঠবে আর এর নিষ্পত্তি হবে না কিংবা তদন্ত হবে না, এটা আশাপ্রদ নয়, কাম্যও নয়। অভিযোগ ওঠা মাত্রই নির্বাচন কমিশনকে তদন্ত করে অ্যাকশনে যেতে হবে। এটা যদি প্রথমদিকেই করা হয়, তাহলে আচরণবিধি লঙ্ঘন আর না ঘটারই সুযোগ বেশি থাকবে না। আর যদি তা না করা হয়, তাহলে এটা বাড়তে থাকবে এবং নির্বাচনের দিন এটা প্রকট হবে। এ বিষয়ে কঠোর থাকতে হবে।

দেশ রূপান্তর : ইভিএম পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি রয়েছে বিরোধী দলসহ অনেকের। এই পদ্ধতিতে কি ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু হবে বলে আশা করছেন?
তোফায়েল আহমেদ : প্রথম কথা হচ্ছে, ইভিএম একটা প্রযুক্তি। প্রযুক্তির যুগে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াটা যুক্তিসঙ্গত হবে না। কিন্তু প্রযুক্তিটাকেও সন্দেহাতীতভাবে ত্রুটিমুক্ত হতে হবে। এটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এখন অনেকগুলো ত্রুটির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর একটা ত্রুটিও যদি বজায় থাকে তাহলে নির্বাচনের প্রতি সন্দেহ থেকে যাবে। এগুলো নিরসন করা প্রয়োজন। যেমন কোনো পেপার ট্রেল রাখা হয়নি, একটা লোক ভোট দেওয়ার পরে একটা সিøপ পেতে পারে কি না তার ব্যবস্থা নেই। আর পুনর্গণনার প্রয়োজন হলে পুনর্গণনা কীভাবে করবে? সেটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আরেকটা ব্যাপার হলো হাতের আঙুলের ছাপ না মিললে সেখানে অথোরাইজড করছেন সেটা যদি জাল ভোট হয়, তাহলে কী করবেন? এই সব রক্ষাকবচ লাগবে। আর নির্বাচনের দিন কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা জারি রেখে সবার এজেন্টের উপস্থিতি নিশ্চিত করা না গেলে ব্যালট পেপারে যা ঘটত তা ইভিএমেও ঘটবে। সুতরাং এ ব্যাপারগুলো নিশ্চিত করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে ভোটপ্রদান ছাড়া অন্য কোনো কাজে অংশগ্রহণের যে বিধিমালা রয়েছে তা বেশ কিছু ক্ষেত্রে লঙ্ঘিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
তোফায়েল আহমেদ : আমি মনে করি এ বিষয়ে যে বিতর্কটা উঠেছে তা উঠাটা উচিত হয়নি। ২০১৬ সালে আচরণবিধিটা করা হয়েছে। আচরণবিধির ১৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ভোটগ্রহণ ছাড়া অন্য কোনো নির্বাচনী কার্যে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। অর্থাৎ প্রচারণাসহ অন্য যেসব নির্বাচনী কাজ রয়েছে তাতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। এটা এই সরকারের আমলেই করা। এই বিধিমালা করার পর বেশ কয়েকটি নির্বাচন হয়েছে। হঠাৎ করে এই বিষয়ে প্রশ্ন ওঠা অযৌক্তিক এবং এটা আইনের শাসনের পরিপন্থী। এটা সরকারের সুনাম ক্ষুণœ করে। এটা তো আইন। আইন তো অবশ্যই মানতে হবে। নাহলে তো আইনের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। আইনও থাকবে, আবার তা মানবেন না, এটা তো চলতে পারে না। তাহলে আইনের পরিবর্তন করেন।

দেশ রূপান্তর : স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের মতো দলীয়ভাবে করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
তোফায়েল আহমেদ : দলীয়ভাবে হওয়া তো উচিত। কিন্তু এখন যেভাবে হচ্ছে, তা দলীয়ভাবে নয়। এটা অর্ধেক দল, আর বাকি অর্ধেক অদল। দলীয় নির্বাচনকে আমি বরাবর সমর্থন করেছি। দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হোক, এটা আমি সবসময়ই চেয়েছি। কিন্তু তা স্থানীয় সরকারের কাঠামো পরিবর্তন করে। স্থানীয় সরকারকে সংসদীয় কাঠামোতে এনে, তারপরে দলভিত্তিক নির্বাচন করা হোক। শুধু কাউন্সিলর নির্বাচন হবে, মেয়র নির্বাচন হবে না। ইউনিয়ন পরিষদেরও শুধু মেম্বার নির্বাচন হবে, উপজেলা পরিষদেরও শুধু সদস্য নির্বাচন হবে। জেলা পরিষদের সদস্যদের ক্ষেত্রেও একইভাবে নির্বাচন হবে। তখন কিন্তু দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হবে। পার্টি থেকে অর্থাৎ কাউন্সিলরের মধ্য থেকে একজন মেয়র নির্বাচিত হবেন। সদস্যরাই বানাবেন, কাউন্সিলরারই বানাবেন। ওটা হলে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন ঠিক আছে। ওটা না হলে যেটা ঘটে, তাহলো শুধুমাত্র মেয়রকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়। অর্থাৎ মেয়র নির্বাচনটা একদলীয় হয়ে যায়। আর যদি প্রতীক দিয়ে সংসদীয় পন্থায় করেন, তাহলে ব্যবস্থাটা সংসদীয় হয়, কাউন্সিলরদের প্রতিনিধিত্ব থাকে। এর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠরা সরকার গঠন করে, আর সংখ্যালঘুরা বিরোধী হয়ে থাকে। এখন কিন্তু তার অবকাশ নেই। তাহলে ব্যাপারটা অত্যন্ত স্বৈরচারী হয়ে যায়। সরাসরি দলীয় প্রতীকে মেয়র নির্বাচন করলে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার যে সুবিধা তা পাওয়া যায় না। এটা একদলীয় হয়ে যায়।

দেশ রূপান্তর : নির্বাচন কমিশনের ভেতরে দ্বন্দ্বের বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
তোফায়েল আহমেদ : এটাকে দ্বন্দ্ব বলব নাকি সুস্থ প্রতিযোগিতা বলব। দ্বন্দ্ব থাকাটা তো ভালো। সবাই মিলে অন্যায় করলাম সেটা ঠিক নয়, সবাই মিলে ন্যায় করলাম সেটাই ঠিক। এখন যদি ন্যায় না হয়, তাহলে কেউ যদি প্রতিবাদ করে সেটাকে আমি অভিনন্দন জানাই। সুতরাং এটা তাদের মধ্যেই মীমাংসা হোক, বাইরে প্রকাশ না করাই ভালো ছিল। বোধহয়, নিজেদের মধ্যে মীমাংসা হচ্ছে না। সে কারণে এটা বাইরে আসছে। এটা একটা দিক। আরেকটা দিক হলো, এটা হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের জন্মকালীন ভুল। জন্মকালীন ভুল হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন করার সময় দলীয় মনোনয়ন চেয়েছেন কেন? মাহবুব তালুকদারকে বিএনপি দিয়েছেন, এখন উনি বিএনপির হয়ে কথা বলছেন। নির্বাচন কমিশন সিলেকশন কখনই দলের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। এটা নিরপেক্ষতা, সততা আর রেকর্ড দেখে সিলেকশন দেওয়া উচিত। দলের মনোনয়ন নিয়ে সিএসই সিলেকশন করা হয়েছে। তাহলে এটা কার ভুল? আমি মনে করি যে এটা ঠিক হয়নি। দলের মনোনয়ন নেওয়ার কোনো দরকার ছিল না। দলের পছন্দ নেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। ভিন্ন ভিন্ন লোকের সঙ্গে যদি আলাপ করা হতো, ভিন্ন ভিন্ন লোকের যদি সিভি নেওয়া হতো এবং ওখান থেকে সর্বোৎকৃষ্ট মানুষগুলোকে যদি সিলেক্ট করা হতো, তাহলে সেটাই সবচেয়ে ভালো পন্থা ছিল। আমি তো মনে করি না, যাদের নেওয়া হয়েছে, তারাই বাংলাদেশের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট মানুষ। যারা এসব প্রতিষ্ঠানে যেতে পারেন, তাদের তো নেওয়া হয়নি। এই ব্যক্তিদের তো জাতি আগে চিনত না। তাহলে এটা কীসের ভিত্তিতে নেওয়া হলো। তারা তো প্রমাণিত দক্ষতা আগে প্রদর্শন করতে পারেননি। তারা তো পেশাদারিত্ব আর সুনাম প্রমাণ করে এখানে আসতে পারেননি। এখন মাহবুব তালুকদার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। মাহবুব তালুকদার তো বিএনপির মনোনীত। ধরেন, আপনার চারজন মনোনীত একসঙ্গে কাজ করছে, আর বিরোধীদের একজন মনোনীত তাদের সঙ্গে কাজ করছে না। কিন্তু এটা নিয়ে স্বাস্থ্যকর বিতর্ক হতে পারে। আপনারা চারজন মিলে একটা জিনিসকে একভাবে দেখছেন, আর উনি আরেকভাবে দেখছেন। সেটাও হতে পারে। সুতরাং এটা জনগণ বিচার করবে। আর তার কথাতে তো কোনো কাজ হচ্ছে বলে আমার মনে হয় না। চারজন যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তাই তো বাস্তবায়িত হচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে। এই অবস্থায় সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়?
তোফায়েল আহমেদ : এর কোনো সংক্ষিপ্ত উত্তর নেই। কেননা নির্বাচনী পরিবেশ একদিনে সৃষ্টি হয়নি, আবার একদিনে নষ্ট হয়নি। আমাদের দেশে ১৯৯০ এর আগে কোনো ভালো নির্বাচন হয়নি। ১৯৯০ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সরকারের আমলেও হয়েছে। ২০১৪ থেকে এই অবস্থার আবার অবনতি শুরু হয়েছে। এটা এখন কোথায় গিয়ে শেষ হয় সেটা দেখতে হবে। এটা কেমন করে হবে এটা কেউ বলতে পারে না। এখন চট্টগ্রামে ভালো আবহাওয়া থাকা সত্ত্বেও মাত্র ২৩ শতাংশ ভোট পড়েছে। এটা কেন হয়েছে। তাহলে মানুষের আগ্রহ নেই ভোটে। কেন আগ্রহ নেই, এটা খুঁজে বের করতে হবে। মানুষ ভোটে আগ্রহী হচ্ছে না। এখান থেকে উত্তরণের কোনো উপায় আমার জানা নেই। মানুষ কেন আসছে না, তা তাদের জিজ্ঞাসা করেন। দেশের সব মানুষ তো আর বোকা নয়। নিশ্চয়ই এর একটা কারণ রয়েছে। আর তাতে করে আবার সরকারের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। কেননা নির্বাচনে কেউ আসুক না আসুক, জয় তো হয়ে গেছে। এটা অনেকটা ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত’ অর্থাৎ ‘ভোটগ্রহণ হোক আর না হোক, নির্বাচনে তো জয়ী হওয়া গিয়েছে’। এটা আবার একটা সুবিধেও হয়ে গেছে। নির্বাচিত হতে খুব বেশি ভোটের প্রয়োজন হচ্ছে না।