মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা জোগাড়ে আনসারুল্লাহ|195054|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৫ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা জোগাড়ে আনসারুল্লাহ
এস এম নূরুজ্জামান

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা  জোগাড়ে আনসারুল্লাহ

বাংলাদেশে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে এখন অনলাইনে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় আনসার আল ইসলাম। জঙ্গি সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড অনুসরণকারী পুলিশের একাধিক সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এ কথা জানিয়ে বলেছেন, তারা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা সংগ্রহ করছে। সংগঠনটি অনলাইনে ‘প্রপাগান্ডা চালিয়ে’ সদস্য সংগ্রহেও তৎপর রয়েছে এবং এ কাজে সফলতাও পাচ্ছে।

ওই কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে সব জঙ্গি সংগঠন। এ অবস্থায় সাময়িকভাবে হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে এসে মূলত সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুতে গোপনে সক্রিয় হয়েছে আনসার আল ইসলাম। এর অংশ হিসেবে অনলাইনে নিজস্ব চ্যানেলে সদস্য বাড়ানোসহ নানা তৎপরতা চালাচ্ছে তারা।

জঙ্গি সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড অনুসরণকারী একটি সংস্থার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে সংগঠনটির অন্তত সাত নেতাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ও বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যে জানতে পেরেছি, বর্তমানে দেশে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় আনসার আল ইসলামের সাইবার মোটিভেটররা। যাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা বা আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার (একিউআইএস) আদর্শিক মিল রয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) প্রধান মনিরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আল-কায়েদা ও আনসার আল ইসলামের সরাসরি যোগাযোগ না থাকলেও আদর্শিক মিল রয়েছে। সংগঠনটি আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) নামেও পরিচিত। এ সংগঠনের নামে অনলাইনের বিভিন্ন চ্যানেলে ব্যাপক প্রপাগান্ডার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সিটিটিসির অপর এক কর্মকর্তা বলেন, অনলাইনে সংগঠনটি অনুসারী বাড়ানোর পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিপুল অর্থ সংগ্রহ শুরু করেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী ছাড়াও বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগঠনটি এভাবে অর্থ সংগ্রহ করছে। অর্থ সংগ্রহকারী এই গ্রুপটিকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

সিটিটিসির আরেক কর্মকর্তা জানান, সংগঠনটির সাংগঠনিক কাঠামো বেশ শক্তিশালী। প্রধান চারটি শাখার মাধ্যমে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। শাখাগুলো হচ্ছে দাওয়া, মিডিয়া ও আইটি, আসকারি (হামলা বা হত্যা বাস্তবায়নকারী শাখা) এবং লজিস্টিক। এদের মধ্যে দাওয়া ও লজিস্টিক

শাখার কর্মকাণ্ড সবচেয়ে বেশি। দাওয়া শাখার মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহের পাশাপাশি লজিস্টিক শাখার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের কাজ করছে তারা। এছাড়া দাওয়া শাখার মাধ্যমে প্রত্যেক মামুরকে (প্রাথমিক সদস্য) প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা, প্রযুক্তিবিষয়ক জ্ঞান ও ইমান-আকিদার ওপরে বয়ান দেওয়া হয়। আসকারি শাখার রয়েছে তিনটি অণু বিভাগ। এগুলো হচ্ছে ইনটেল, অপস এবং ল্যাব।

সিটিটিসি কর্মকর্তা আরও জানান, ইনটেল বিভাগের জঙ্গিরা সাধারণত গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে যেকোনো টার্গেট করা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে। তাদের তথ্য নিয়ে অপস বিভাগের জঙ্গিরা অপারেশন বাস্তবায়ন করে। যদিও অপারেশনের আগে ফতোয়া বোর্ডের অনুমোদন নিতে হয়। এই শাখার ল্যাব অণু বিভাগের কাজ মূলত বিভিন্ন বোমা ও আগ্নেয়াস্ত্র তৈরির উপকরণ নিয়ে গবেষণা। এক কর্মকর্তা বলেন, এ সংগঠনের জঙ্গিরাই বাংলাদেশে প্রথম মরিচবাতি দিয়ে ডেটোনেটর তৈরি করেছিল। এছাড়া ক্লোজ কমব্যাটে ব্যবহারের জন্য বিশেষ ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি তৈরিতে পারদর্শী তারা। এ ধরনের একাধিক ডেটোনেটর ও আগ্নেয়াস্ত্র সিটিটিসি আগেই তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করেছিল। ওই কর্মকর্তা জানান, লজিস্টিক শাখার কাজ মূলত দুটিÑ অর্থ সংগ্রহ ও যেকোনো হামলার কাজে ব্যবহৃত ইক্যুইপমেন্ট জোগাড়। তবে তারা এখন যেকোনো ধরনের হামলা বা টার্গেট কিলিং থেকে সরে এসেছে। আপাতত তারা প্রচার, অর্থ ও কর্মী সংগ্রহে বেশি মনোযোগী। এ তিন বিষয়ে শক্তিশালী হওয়ার পর তারা হামলার দিকে এগোবে। সিটিটিসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, আনসার আল ইসলাম বা একিউআইএসের প্রাথমিক সদস্যকে ‘মামুর’ বলা হয়। কয়েকজন ‘মামুর’ মিলে তৈরি করা গ্রুপকে ডাকা হয় ‘তৈয়ফা’ নামে। এরূপ একটি তৈয়ফা বা একাধিক তৈয়ফা মিলে গঠন করে একটি সেল, যেটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে জঙ্গিদের ‘সিøপার সেল’ হিসেবে পরিচিত। এরূপ একটি সিøপারের দায়িত্বশীল জঙ্গি নেতাকে সাংগঠনিকভাবে ‘মাশুল’ পদবি দেওয়া হয়। কয়েকজন ‘মাশুল’-এর দায়িত্বশীল নেতাকে মাজমাহ মাশুল বলা হয়। আবার কয়েকজন মাজমাহ মাশুলের দায়িত্বশীল নেতাকে ডাকা হয় ‘হাদি’ নামে। সংগঠনের কর্মকাণ্ডে এ ‘হাদিরা’ই শূরা সদস্য হিসেবে কাজ করে। সর্বশেষ যেকোনো অপারেশন, হত্যাকাণ্ড বা হামলার সিদ্ধান্ত দেয় সংগঠনটির সর্বোচ্চ স্তর ফতোয়া বোর্ড, যার সদস্য ১১-১৩ জন হাদি।

পুলিশ সদর দপ্তরের জঙ্গিবিষয়ক এক কর্মকর্তা জানান, আনসার আল ইসলামের ফতোয়া বোর্ডের শীর্ষ নেতার মধ্যে জসিমউদ্দিন রাহমানী ছিলেন। তিনি কারাগারে থাকায় তার পক্ষে ফতোয়া বোর্ডের সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি ছাড়াও একাধিক ব্যক্তি ফতোয়া বোর্ডে রয়েছেন বলে জানতে পেরেছি। তবে কৌশলগত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে তাদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের অনেক জঙ্গি নেতা আফগানিস্তানে গিয়ে আল-কায়েদার পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করলেও দেশের অভ্যন্তরে ভিন্ন ভিন্ন ব্যানারে জঙ্গি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে সাজা কার্যকর হওয়ায় এখন তাদের কিছু অনুসারী সক্রিয় রয়েছেন। ওই কর্মকর্তার মতে, বর্তমানে পলাতক চাকরিচ্যুত মেজর জিয়ার মাধ্যমে আনসার আল ইসলাম সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। এছাড়া সংগঠনটির কোন শাখায় কারা কীভাবে দায়িত্ব পালন করছেন সে বিষয়েও বেশকিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্টার টেররিজম (সিটি) বিভাগের উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আনসার আল ইসলামের কর্মকাণ্ড মূলত প্রচার-প্রচারণাতেই সীমাবদ্ধ। এখন কোনো হামলা করার সাংগঠনিক ক্ষমতা তাদের নেই। তিনি বলেন, আমরা বেশ কয়েকজন জঙ্গি নেতাকে খুঁজছি, যাদের গ্রেপ্তার করতে পারলেই এ সংগঠনের সবকিছুই জানা যাবে।

যেভাবে আনসার আল ইসলামের জন্ম : সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ২০১০ সালে আনসারুল্লাহ ফাউন্ডেশন নামে পাকিস্তানভিত্তিক একটি ওয়েবপেজ চালু করেন বাব-উল-ইসলাম নামে এক পাকিস্তানি। যেখানে উর্দু, পশতু, হিন্দি, ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় ব্লগ লেখা হতো। ২০১২ সালে আনসারুল্লাহ ফাউন্ডেশন থেকে পৃথক হন বাংলা ভাষাভাষী ব্লগার গ্রুপটি; যাদের বলা হয় আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা এবিটি। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের জঙ্গি কর্মকাণ্ড অনুসরণকারী কর্মকর্তাদের কাছে এবিটি আর আনসার আল ইসলাম অভিন্ন সংগঠন হিসেবেই পরিচিত। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলাকালে এই সংগঠনের মাধ্যমে বেশকিছু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে আল-কায়েদা নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা (একিউআইএস) প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এরপর আনসার আল ইসলাম তাদের টুইটার পেজে নিজেদের একিউআইএসের বাংলাদেশ শাখা দাবি করে। আনসার আল ইসলাম ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত ১৩টি হামলার দায় স্বীকার করে। এসব ঘটনায় নিহত হন ১১ জন, যাদের অধিকাংশ ছিল ব্লগার। নিহতদের মধ্যে এছাড়া ছিলেন প্রকাশক, শিক্ষক ও সমকামীদের অধিকারকর্মী।