করোনাভাইরাস মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা জরুরি|195182|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
করোনাভাইরাস মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা জরুরি

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা জরুরি

করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা এখনো পর্যন্ত মূলত চীন ও প্রতিবেশী কয়েকটি দেশকে আক্রান্ত করলেও বিশ্বব্যাপী এর ছড়িয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস দ্রুততম সময়ে সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা না করা গেলে তা বিশ্বস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ভাইরাসটি সংক্রামিত হওয়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশও রয়েছে। কেননা চীনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী তো আছেই, উপরন্তু বাণিজ্যিক ও ভ্রমণসংক্রান্ত কারণে দেশটিতে এখন প্রচুর বাংলাদেশির যাতায়াত রয়েছে। প্রত্যাশিতভাবে, বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও এ সংক্রামক ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে উদ্যোগ নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, বিষধর চাইনিজ ক্রেইট বা চাইনিজ কোবরা এ ভাইরাসের মূল উৎস হতে পারে। এই ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল উহানের সিফুড বাজারের সঙ্গে যুক্ত বলে অনুমান করা হচ্ছে। ভাইরাসটি কোনো প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়েছিল। ভাইরাসটির লক্ষণ সর্দিজ্বর, মাথাব্যথা, গলাব্যথা, কাশি ও শরীরে অস্বস্তি অনুভব করার মতো কিছু উপসর্গ। যেহেতু এখন পর্যন্ত ২০১৯-এনসিওভি ভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা বা ভ্যাকসিন নেই, তাই সতর্ক থাকা এবং সাবধানতা অবলম্বনের কোনো বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে চীনে এ পর্যন্ত ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা আটশ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ১৭৭ জনের অবস্থা গুরুতর ও সন্দেহভাজন আরও ১ হাজার ৭২ জনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। মৃত্যু এবং আক্রান্তদের বেশিরভাগই উহান শহরের। সংক্রমণ ঠেকাতে চীন কর্র্তৃপক্ষ গত শুক্রবার দেশের ১৩টি শহরে জরুরি অবস্থা জারি করেছে। এই জরুরি অবস্থার আওতায় বাসিন্দারা শহরের বাইরে বের হতে পারবে না। ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কায় চীনের মহাপ্রাচীরের একাংশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চীনা নববর্ষের ছুটির মধ্যে দেশটির কোটি কোটি মানুষ একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যাতায়াত করলে সংক্রমণ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে উহান ও হুয়াংগাং শহরে গণপরিবহন চলাচল। উহানের সঙ্গে বিমান ও রেল যোগাযোগ বন্ধ আছে। চলাচল নিষিদ্ধের আওতায় রয়েছে বেশিরভাগ সড়ক। শুধু করোনোভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য এক হাজার শয্যার একটি হাসপাতাল নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে চীন সরকার।

করোনাভাইরাস চীনের পাশাপাশি জাপান, থাইল্যান্ড, হংকং, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত ছড়িয়েছে। যুক্তরাজ্যেও ১৪ জনকে আক্রান্ত সন্দেহে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। যদিও বৃহস্পতিবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এখনই বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা জারির মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (সিডিসি) সূত্রে জানা যায়, চীন থেকে সিয়াটলে আসা ৩০ বছর বয়সী এক পুরুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। তারা বিমানবন্দরগুলোতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করছে। উহান প্রদেশের সব ফ্লাইট বাতিল করেছে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশেই সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত করোনাভাইরাস প্রতিরোধে চীন থেকে আসা সরাসরি ফ্লাইটগুলোর যাত্রীদের থার্মাল স্ক্রিনিংয়ের বন্দোবস্ত করেছে। অভিবাসন বা ইমিগ্রেশন চত্বরে পৌঁছানোর আগেই থার্মাল স্ক্রিনিংয়ের মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হচ্ছে। কারও মধ্যে রোগের উপসর্গ দেখা গেলে সেই যাত্রীকে আইসোলেশন হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। ভারত থেকে যারা চীনে যাবেন, তাঁদের জন্য বিশেষ সফর নির্দেশিকাও জারি করেছে সে দেশের সরকার। হাত ধোয়া, শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হলে, সে সংক্রান্ত আচরণবিধি মেনে চলা ও সর্বোপরি কাউকে দেখে অসুস্থ বলে মনে হলে তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়েছে নির্দেশিকায়। রান্না না করা মাংস খেতে ও খামারে যেতে নিষেধ করা হয়েছে ভারতীয়দের।

আশঙ্কার কথা হচ্ছে, উহান শহরে বাংলাদেশের বহু শিক্ষার্থী থাকেন। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এ সংখ্যা পাঁচ শতাধিকের বেশি। এখন নববর্ষ শুরু হওয়ায় তারা খাদ্য সংকটে রয়েছে। ছুটি শুরু হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে এই সময় দেশে ফিরবে অনেক শিক্ষার্থী। যদি তাদের কেউ ওই ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে দেশে আসেন এবং তার থেকে যদি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হতে পারে। ভারত ঘুরেও বাংলাদেশে নতুন করোনাভাইরাস আসতে পারে। বাংলাদেশ থেকে নানা কাজে একটা অনেকে শেনঝানে ও সাংহাইয়ে যান। এই দুটো এলাকাতেও করোনাভাইরাসের প্রকোপ পরিলক্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশে নানা সরকারি–বেসরকারি প্রকল্পে কর্মরত প্রায় ১৫ হাজার চীনা কর্মীর একটা বড় অংশ চীনা নববর্ষের ছুটিতে দেশে ফিরবেন। ছুটি কাটিয়ে ফিরে আসবেন বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রে। সবাইকে নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ইমিগ্রেশন কর্র্তৃপক্ষকে।

একবার এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে তা মহামারী আকার ধারণ করতে পারে। এরই মধ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষ সতর্কব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চীন থেকে আসা সরাসরি ফ্লাইটগুলোর যাত্রীদের পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। তবে এই তৎপরতাকে আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। চীনে অবস্থানরত শিক্ষার্থীসহ সবার বিষয়ে দূতাবাসের ভূমিকাকে অধিক কার্যকর করার তৎপরতা গ্রহণ করতে হবে। যদি কেউ আক্রান্ত হয়েই যায়, তাহলে তাদের জন্য আইসোলেশন হাসপাতালের ব্যবস্থা থাকাও জরুরি। সর্বোপরি, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে আগাম সতর্কতার বিকল্প নেই। এ বিষয়ে এখনই জরুরি সরকারি উদ্যোগ দরকার।