প্রকৃতির কোলে অনাড়ম্বর মুজিব|195215|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
বঙ্গবন্ধু সমাধিসৌধ
প্রকৃতির কোলে অনাড়ম্বর মুজিব
ইকবাল হাবিব

প্রকৃতির কোলে অনাড়ম্বর মুজিব

ধানমণ্ডি-৩২-এ অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর বাড়িটি একসময় রাজনীতির সূতিকাগার ছিল। ১৯৭৫ সালে সেই বাড়িতেই তাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ১৯৯৪ সালে বাড়িটিকে জাদুঘরে পরিণত করার লক্ষ্যে একটি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতায় ‘ভিত্তি স্থপতিবৃন্দ লিমিটেড’ প্রথম স্থান অধিকার করে এবং জাদুঘর নির্মাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়। প্রকল্পটির যখন কাজ চলছিল, তখন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আমাদের টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যান। তিনি তার বাবার সমাধিসৌধ নির্মাণ করতে চান। কোনো রাষ্ট্রীয় প্রকল্প হিসেবে নয়, বঙ্গবন্ধুকন্যার উদ্যোগে, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের ইচ্ছায় এই সমাধিসৌধ নির্মাণের চিন্তা করা হয়। সেই থেকে এটি নির্মাণের ক্ষেত্রে আমরা ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকেই খুঁজে বেড়িয়েছি। কোন পরিবেশে তিনি বেড়ে ওঠেন তা আমরা দেখেছি। আবহমান বাংলার এমন এক গ্রামীণ পটভূমিতে বেড়ে উঠে তার বিশ্বনেতায় পরিণত হওয়ার যে যাত্রা, সেটিকেই আমরা আমাদের প্রকল্পের মূল মন্ত্র হিসেবে নিয়েছি। আর এ কারণেই আমরা পুরো প্রকল্পকে দুভাগে ভাগ করি। এক. স্পিরিচুয়াল কোর্টইয়ার্ড । দুই. পাবলিক কোর্টইয়ার্ড।

বঙ্গবন্ধুর সমাধির পাশ দিয়ে যে সড়কটি ছিল, সেটি আমরা বন্ধ করে দিই। অবশ্য বিকল্প হিসেবে টুঙ্গিপাড়া উপজেলায় আগত সব মানুষের জন্য একটি ডাইভারশন সড়ক নির্মাণ করে দিই। প্রথমে আমরা একটি পাবলিক কোর্টইয়ার্ড নির্মাণ করি যেখানে জনসমাগম হবে, স্থাপত্যের ভাষায় যাকে ‘পাবলিক গ্যাদারিং স্পেস’ বলা হয়। সেখানে প্রক্ষালনকেন্দ্র, ক্যান্টিন, সুভিনিয়র বিক্রয়কেন্দ্র, লাইব্রেরি ও মসজিদ মিলিয়ে একটি লোকসমাগমস্থল বানানোর পরিকল্পনা করি।

বিলের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া আইলের মতো পথকে গোপালগঞ্জের স্থানীয় ভাষায় ‘হালট’ বলে। এখানেও সে রকম একটি হালট ছিল। সেই হালট দিয়ে হয়তো বঙ্গবন্ধুও একসময় হেঁটেছেন। তার মৃত্যুর পর মানুষ সেটি দিয়েই সমাধি পর্যন্ত যেত। সেটিকে আমরা পাবলিক প্লাজা পর্যন্ত যাওয়ার জন্য এমন এক পথ বানানোর পরিকল্পনা করি, যে পথ দিয়ে হাঁটলে মানুষ জানবে এই সোঁদামাটি থেকে বেরিয়ে এসে বঙ্গবন্ধু কীভাবে বিশ্বসভায় মহান নেতায় পরিণত হন। এ ধরনের একটি অভিজ্ঞতার যাত্রাপথ আমরা তৈরি করি।

এই বীথিকা ধরেই ‘হালট’ থেকে হঠাৎ করে দর্শনার্র্থীরা একটি স্পিরিচুয়াল কোর্টইয়ার্ডে প্রবেশ করবেন। এই কোর্টইয়ার্ডের ঠিক মাঝখানে বঙ্গবন্ধু ও তার বাবার কবর বিদ্যমান। জায়গাটিকে আমরা একটা বৃত্তাকার পারফোরেটেড বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে দিই, যাতে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে। সেখানে কোনো কৃত্রিম আলো বা বাতাসের দরকার নেই। এর ভেতরে দাঁড়িয়ে যখন আপনি মোনাজাত করবেন, মৃতের স্মরণ করবেন, কবিতা পাঠ করবেন, দোয়া করবেন বা পবিত্র গ্রন্থ থেকে কিছু উচ্চারণ করবেন, তখন আপনি বাইরের দুনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাবেন।

আমরা পথটির নাম দিয়েছি ‘বীথিকা’। বীথিকাটি দুটো ‘তালাব’ বা পুকুরের পাশ দিয়ে যায়। বড় তালাব ও ছোট তালাব। সেখানকার ঘাস ও গাছ আমরা সংরক্ষণ করি। একটি দেয়াল তুলে পাশের বাড়িগুলোর সঙ্গে একটি আড়াল তৈরি করি। এই বীথিকা ধরেই ‘হালট’ থেকে হঠাৎ করে দর্শনার্থীরা একটি স্পিরিচুয়াল কোর্টইয়ার্ডে প্রবেশ করবেন। এই কোর্টইয়ার্ডের ঠিক মাঝখানে বঙ্গবন্ধু ও তার বাবার কবর বিদ্যমান। জায়গাটিকে আমরা একটা বৃত্তাকার পারফোরেটেড বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে দিই, যাতে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে। সেখানে কোনো কৃত্রিম আলো বা বাতাসের দরকার নেই। এর ভেতরে দাঁড়িয়ে যখন আপনি মোনাজাত করবেন, মৃতের স্মরণ করবেন, কবিতাপাঠ করবেন, দোয়া করবেন বা পবিত্র গ্রন্থ থেকে কিছু উচ্চারণ করবেন, তখন আপনি বাইরের দুনিয়া থেকে আলাদা হয়ে যাবেন। এ রকম একটি জায়গা তৈরি করে, তার চারপাশে দর্শনার্থীরা যাতে ঘুরে ঘুরে দেখতে পারেন, তেমন একটা বৃত্তাকার পথ রচনা করা হয়েছে। বিশেষ বিশেষ দিনে কবরের পাশে বেষ্টনীর এই কাঠের স্ট্রিমগুলো সরে যায় এবং ফুল রাখার জন্য বেদিটা সামনে চলে আসে। মাঝেমধ্যে যখন আনুষ্ঠানিক আয়োজন থাকে, তখন আপনি বাইরে দাঁড়িয়েই ফুল দিতে পারবেন। কাঠের স্ট্রিমগুলো সরে গেলেই কবরটা দেখা যায়। বাকি সারা বছর বন্ধ থাকে। এর চারপাশে আরেকটি সার্কুলার স্পেস বা ইন্টারনাল কোর্টইয়ার্ড বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আর সমাধির মধ্যে রয়েছে। এ বাড়িতেই বঙ্গ বন্ধু থাকতেন, যা পরে ছোট একটি মিউজিয়াম হয়। তখন ফার্নিচার যা ছিল তা সংরক্ষণ করে ওপরে বঙ্গ বন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা থাকতেন। সে বাড়িটিকে আমরা অক্ষুণ্ণ রেখেছি। ভেতরের এই উঠোনে বসে মানুষ যাতে কোরআন পাঠ করতে পারেন বা আলোচনা করতে পারেন সে রকম একটা ব্যবস্থাও সেখানে আছে। ঢাকা থেকে যে কফিনে বঙ্গবন্ধুকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাও সংরক্ষিত আছে। পাবলিক ও স্পিরিচুয়াল দুই কোর্টইয়ার্ডের মধ্য থেকে এটি একেবারে মাটি থেকে উত্থিত একটি স্থাপত্য হিসেবে তৈরি করা হয়। প্রকৃতিনির্ভরতাই এ স্থাপত্যের সবচেয়ে বড় ঐশ্বর্য হিসেবে বিবেচিত। সে সময় অনেক সম্মানিত ব্যক্তি আমাদের সাজেশন দিয়েছিলেন। আমি তাদের নাম উল্লেখ করছি না। তারা বলেছিলেন, এই স্থাপত্য ইরানের শাহ কিংবা তুরস্কের কামাল আতাতুর্কের মাজারের মতো হবে না কেন? বঙ্গবন্ধুকন্যা একটি ছোট্ট স্কেচ এঁকে দিয়েছিলেন। সেটি এখনো টুঙ্গিপাড়ায় টাঙানো আছে। সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু সেভাবে তৈরি হওয়া নেতা নন। তিনি মাটি থেকে, সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে বেড়ে ওঠা নেতা। তার মাজার হবে সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠার অনুপ্রেরণায় ভরপুর। সেখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশে গাছ, তালাব... ঝিঁঝি পোকার ডাক ইত্যাদি যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে সেসব এই স্থাপত্য নির্মাণের সময় বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এ কারণেই হয়তো কেউ সেখানে গেলে বঙ্গবন্ধু কোথা থেকে কীভাবে এসেছেন, কোথা থেকে কোথায় গিয়ে পৌঁছেছেন সবাই যেন তা বুঝতে পারেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যার পর সামরিক ঘাতকরা হয়তো ভেবেছিল, মানুষের কাছ থেকে তাকে দূরে সরিয়ে ফেলি। কিন্তু অবচেতন মনে ঘাতকরা তাকে সেখানেই নিয়ে গেলেন! যে মাটিতে এ মহামানবের জন্ম, তিনি সেখানেই শায়িত আছেন। এর চেয়ে ভালো যে আর হয় না সেটা এই স্থাপত্য করতে গিয়ে আমরা ভীষণভাবে উপলব্ধি করেছি।

আরেকটি ছোট তথ্য না দিলেই নয়। সমাধি নির্মাণের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর পরিবার অন্যদের কাছ থেকে কোনো জমি অধিগ্রহণ করেননি। সেখানে গেলে মনে হয়, সমাধি আরেকটু বড় করা যেত! কিন্তু আমরা তা পারিনি। জমি যা রয়েছে, সবই দান করেছেন বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যরাই। এসব স্মৃতি আমাকে কাঁদায়। আমরা জাতির পিতার সমাধিসৌধ করতে গিয়েও কারও দান নিতে পারলাম না।

লেখক : স্থপতি ও ভিত্তি স্থপতিবৃন্দ লিমিটেডের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা