বাণিজ্যিক স্থাপত্যের অনন্য মাইলফলক|195217|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
বসুন্ধরা সিটি
বাণিজ্যিক স্থাপত্যের অনন্য মাইলফলক
সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার

বাণিজ্যিক স্থাপত্যের অনন্য মাইলফলক

ছবিঃ রুবেল রশীদ

মেগাসিটি ঢাকাতে নাগরিকের চাপ বাড়ছেই, সেই তুলনায় ঘরে-বাইরে সময় কাটানোর নিরাপদ জায়গা কমছে। বসুন্ধরা সিটি ব্যস্ত এই নগরে এই অভাব বেশ খানিকটা পূরণ করতে পেরেছে। বসুন্ধরা সিটির স্থাপত্য ভাবনায় কখনোই কেবল একটা শপিং কমপ্লেক্স ছিল না, স্থপতিদের প্রয়াস ছিল এমন একটা কমপ্লেক্স তৈরি করা যেখানে শহরের মানুষ ঘুরতেও যেতে পারে, একইসঙ্গে কেনাকাটা বা শপিংয়ের কাজটাও সেরে নেওয়া যায়। দুই দশক আগে করা এই স্থাপত্য যে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ছিল তা এখন বোঝা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেক স্থাপনা তৈরি হলেও বসুন্ধরা সিটির আবেদন এখনো কমেনি।

দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপ কর্র্তৃক আধুনিক স্থাপত্যে নির্মিত এই বহুতল ভবনটির নকশা করেছে স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ‘ভিস্তারা আর্কিটেক্টস’। ‘সিটি ইন অ্যা সিটি’ বা শহরের ভেতর আরেক শহরের মতো স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি স্থাপনা তৈরির ভাবনা থেকে এই কাজ শুরু করেন তারা। একটি শহরে সাধারণত একটি সিটি সেন্টার বা কেন্দ্রবিন্দু থাকে, যেখানে সব প্রান্ত এসে একত্রে মিলিত হয়। পুরো শহর ঘুরে পথগুলো এসে মিলিত হয় ওই কেন্দ্রে। বসুন্ধরা সিটির ভেতরটা তেমনই। তাছাড়া এক ছাদের নিচে নানা সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাবে একসঙ্গে এমনটা ভেবেই পরিকল্পনা করা হয়েছে এই ভবনটির।  আধুনিক স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের কারণে বাইরে থেকে দেখতেও ভবনটি নান্দনিক, এর প্লাজা ও ভেতরে যে পরিমাণ জায়গা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে শুধু দর্শনার্থীদের সুবিধা বিবেচনায়, তা এদেশে একেবারেই দেখা যায় না।

পান্থপথের মূল সড়ক থেকে বসুন্ধরা সিটি ভবনকে আলাদা করেছে জলের ফোয়ারা এবং গাছের সারি।  এরপর ড্রাইভওয়ে এবং ড্রাইভওয়ের শেষ মাথায় পার্কিংয়ে যাওয়ার পথ। ফুটপাত ধরে বা গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে বেশ কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে প্রবেশ করতে হয় শপিং মলে। দক্ষিণ প্রান্তে প্রবেশের দিকের পুরো দেয়ালটাই কাচের, যা দর্শনার্থীকে ভেতরে প্রবেশে আকৃষ্ট করছে। আর ব্যস্ততম সড়কের ট্রাফিক সামলাতেই এখানে সুপ্রশস্ত ড্রাইভওয়ে ও পর্যাপ্ত পার্কিং স্পেস রাখা হয়েছে, পার্কিং লটে ১২০০ গাড়ি রাখা যায়। একটা শপিং কমপ্লেক্সে যানবাহনের সার্কুলেশনের আধুনিকতম ব্যবস্থা এখানে নিশ্চিত করা হয়েছে।  

প্রতিদিন প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ নানা প্রয়োজনে বা বিনোদনের খোরাক নিতেই বসুন্ধরা সিটিতে আসেন। ঈদ বা বিভিন্ন উৎসবে দর্শনার্থীর সংখ্যা দু লাখ ছাড়িয়ে যায়। যা এই শহরের জনসংখ্যার এক শতাংশ বলা যায়! একটি স্থাপনা কীভাবে নাগরিক জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে বসুন্ধরা সিটি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

ভেতরে যাওয়ার পর প্রথমেই চোখে পড়বে মাঝখানের বড় খোলা জায়গা, স্থাপত্যের ভাষায় যা সেন্ট্রাল কোর্টইয়ার্ড। এটাই বসুন্ধরা সিটির প্রাণ, এর চারপাশ দিয়ে করিডর ধরে পরিকল্পিতভাবে সাজানো নানা পণ্যের দোকানগুলো। সেন্ট্রাল কোর্টইয়ার্ডের ফাঁকা জায়গায় দিনের বেলায় দিনের আলো এসে পড়ে, কারণ ছাদে ব্যবহার করা হয়েছে কাচ। কাচের তৈরি ডোমটি যেন দৃষ্টিনন্দন হয়, সেজন্য একে সাদামাটা না রেখে স্থপতিরা বর্ণিল চিত্রকর্মও ব্যবহার করেছেন। ভবনের ভেতরের জায়গাগুলোকে যেন বড় এবং খোলামেলা বলে মনে হয়, সেজন্য কোর্টইয়ার্ড বরাবর প্রতিটি তলার রেলিংয়েও স্বচ্ছ গ্লাস ব্যবহার করা হয়েছে। এস্কেলেটর ও ক্যাপসুল লিফটের মাধ্যমে এক তলা থেকে অন্য তলায় যাওয়া যায়। প্রতিটি জোনেই রয়েছে সংযোগ, এই  বিষয়গুলো দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে, যা ভবনের ভেতরে লোকসমাগম ও সারাক্ষণ উৎসবমুখর পরিবেশের দারুণ এক আবহ তৈরি করেছে।

বসুন্ধরা সিটি ভবনটি মূলত ১৯ তলাবিশিষ্ট। এর নিচের ৮টি তলা বিপণি বিতানের জন্য ব্যবহার করা হয় এবং অবশিষ্ট তলাগুলো বসুন্ধরা গ্রুপের দপ্তর হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যার সম্পূর্ণ আলাদা প্রবেশপথ রয়েছে; আবার ভেতর থেকেও যাওয়া যায় পাবলিক ফাংশান রয়েছে টাওয়ার ভবনের এমন ফ্লোরগুলোতে। বিপণি বিতানের পাশাপাশি সিনেপ্লেক্স, ফুডকোর্ট, বাচ্চাদের খেলাধুলা ও বড়দের শরীরচর্চার জায়গাÑ দেশে এমন বহুমাত্রিক ভবনের ধারণা বসুন্ধরা সিটিই প্রথম দেখিয়েছে। ভবনের বিপণি বিতান অংশে প্রায় আড়াই হাজার দোকানের জায়গা রয়েছে। এছাড়া একটি তলায় খাবারের জন্য ফুডকোর্ট,  সিনেপ্লেক্স এবং বেইজমেন্টে হেলথ ক্লাব বা শরীরচর্চা কেন্দ্রের জায়গা রয়েছে। রয়েছে সুইমিং পুলও।  ছাদে বাগান রয়েছে। সিনেপ্লেক্সের তিনটি হলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নানা চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। এই যে এক জায়গাতেও সুবিন্যস্তভাবে এত সুন্দর করে সবগুলো বিষয় সাজানো, তা স্থপতিদের মুন্সিয়ানারই প্রমাণ।

বসুন্ধরা সিটিতে বেশ কয়েকটা মাল্টিপারপাস জায়গা রয়েছে, এছাড়া বাচ্চাদের জন্য রয়েছে একটি থিম পার্ক। আলাদা আলাদা পণ্যের কেনাকাটায় সুবিধার জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে দোকানগুলোকে জোনিং করে সাজানো হয়েছে। যেমন প্রযুক্তিপণ্যের সব দোকান এক সারিতে বা এক প্রান্তে। আবার জামাকাপড় বা অন্য পণ্যের দোকান আলাদা প্রান্তে। বিভিন্ন ব্লক ঘুরে এলেও তা এসে মিলিত হচ্ছে মাঝের খোলা জায়গায়।  সেখানে আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্যের বিশেষ অফারের ছোট ছোট স্টল সাজিয়ে মেলাও বসে নিয়মিত।

ভবনের পেছনের দিকের এলাকার লোকেরাও যেন সহজে প্রবেশ করে শপিং মলের ভেতর আসতে পারেন, সেজন্য রাখা হয়েছে আলাদা প্রবেশপথ। রয়েছে দোতলা আন্ডারগ্রাউন্ড। মলে প্রবেশের জন্য দক্ষিণ পাশে তিনটি প্রবেশপথ আছে। পূর্ব ও পশ্চিমেও প্রবেশপথ রয়েছে। এছাড়া আন্ডারগ্রাউন্ডে সরাসরি প্রবেশ করা যায়, যেখান থেকে লিফটের মাধ্যমে মলের যেকোনো ফ্লোরে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।  নির্মাণকালীন এটি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম এবং বিশ্বের ১২তম মল ছিল। ভবনটি ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল। এছাড়া দেশের বেসরকারি খাতে অন্যতম বড় কর্মসংস্থানের স্থান বসুন্ধরা সিটি, এখানে একসঙ্গে সহস্রাধিক কর্মী কাজ করেন। বৃহত্তম এই শপিং মলটি যেমন একদিকে মানুষের কেনাকাটা তথা জীবনযাত্রাকে সহজ করেছে, তেমনি স্থাপত্যেও অনন্য এক নিদর্শন স্থাপন করেছে।প্রতিদিন প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ নানা প্রয়োজনে বা বিনোদনের খোরাক নিতেই বসুন্ধরা সিটিতে আসেন। ঈদ বা বিভিন্ন উৎসবে দর্শনার্থীর সংখ্যা দু লাখ ছাড়িয়ে যায়। যা এই শহরের জনসংখ্যার এক শতাংশ বলা যায়! একটি স্থাপনা কীভাবে নাগরিক জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে বসুন্ধরা সিটি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ

লেখক : ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যের শিক্ষার্থী

মুস্তাফা খালিদ পলাশ
স্থপতি মুস্তাফা খালিদ পলাশের জন্ম ১৯৬৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীতে। মূলত একজন সফল স্থপতি হিসেবে পরিচিত হলেও একাধারে তিনি চিত্রকর, লেখক, সঙ্গীতশিল্পী এবং সেতারবাদক।  বাবা কে এম জি মুস্তাফা এবং মা আফরোজ মুস্তাফা দুজনেই চিত্রকর ও সংস্কৃতিকর্মী ছিলেন, ফলে ছোটবেলা থেকেই বড় হয়েছেন শিল্পসংস্কৃতির আবহে।১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ভিস্তারা আর্কিটেক্টস।  তার অভিনব কাজ ও একবিংশ শতাব্দীর ভাবনাধারা তাকে অনন্য বৈশিষ্ট্যের স্থপতি হিসেবে খ্যাতি এনে দিয়েছে।  কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশে ও বিদেশে পেয়েছেন নানা সম্মাননা, হয়েছে একাধিক প্রদর্শনী।
মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ
স্থপতি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ্র পৈতৃক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হলেও তিনি বড় হয়েছেন ঢাকায়। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে। ১৯৯৮ সালে শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ভিস্তারা আর্কিটেক্টস প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময়ই নকশা করেন দেশের স্থাপত্য শিল্পের অন্যতম মাইলফলক বসুন্ধরা সিটির। ২০০৮ সালে ফয়েজ উল্লাহ নিজে ‘ভলিউম জিরো’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।  একদল তরুণ ও মেধাবী স্থপতিকে নিয়ে তিনি কাজ করছেন। শিল্প ও বিজ্ঞানের মিশেলে নান্দনিক স্থাপত্য, আর তাতে প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি পরিবেশের প্রতি সচেতনতা ও সংবেদনশীলতাকেই নিজের স্থাপত্যচর্চার আদর্শ বলে মনে করেন এই স্থপতি।
শাহজিয়া ইসলাম অন্তন
১৯৬৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ওয়ারীর র‌্যাংকিন স্ট্রিটে জন্ম শাহজিয়া ইসলাম অন্তনের। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল ঢাকা থেকে মাধ্যমিক, হলিক্রস কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেন তিনি। অন্তন ১৯৮৮ সালে যোগ দেন প্রস্থাপনা লিমিটেডে। পরবর্তী সময়ে যোগ দেন ভিস্তারা আর্কিটেক্টস-এ।  সংগীত ও শিল্পকলার প্রসারে নানা উদ্যোগে যুক্ত স্থপতি অন্তন বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থাপনা নিয়ে আর্কাইভ তৈরির কাজ করছেন।