নদীর দেশে নতুন নিরীক্ষা|195219|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার
নদীর দেশে নতুন নিরীক্ষা
মাসরূর মামুন

নদীর দেশে নতুন নিরীক্ষা

গেল বছর দেশজুড়ে যখন বন্যার প্রকোপ বেড়ে উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত, তখন কোনো এক বিকেলে একদল তুলনামূলক নির্ঝঞ্ঝাট সাহেবি মানুষদের আড্ডার বিষয়বস্তুতে বারবার ফিরে আসছিল গাইবান্ধার একটি স্থাপত্যকর্মের কথা। সেই আড্ডায় আমিও ছিলাম এবং একই রকম নৈর্ব্যক্তিক মন নিয়ে বানভাসি মানুষের দুঃখে কাতর হওয়ার ভান করে সদ্য আন্তর্জাতিক আগা খান পুরস্কারপ্রাপ্ত সেই স্থাপত্য কাজের ভুলত্রুটি ধরতে চাওয়ার যে অবচেতনের ঈর্ষা বোধ তাতে আমিও শামিল ছিলাম। এই ঈর্ষার উৎস কোথায় সেটি ব্যক্তিগত নাকি জাতিগত ইত্যাদি খুঁজতে ঘুরে আসা যায় নানান তথ্য থেকে তত্ত্বে, ফ্রয়েড থেকে লাঁকা হয়ে দেশি-ভিনদেশি উত্তরসূরিদের দুয়ারে। কিন্তু একথা না বলে উপায় নেই, যেখান থেকে এই আলোচনার শুরু সেখানেই হতে পারে এর সমাপ্তি গাইবান্ধা শহর ছাপিয়ে কাঞ্চিপাড়ার ইট-কাঠ-মাটির একটি স্থাপত্য চেষ্টায়।

যেই কাজটি নিয়ে কথার সূত্রপাত তার পোশাকি নাম ‘ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার’, স্থপতির নাম কাশেফ মাহবুব চৌধুরী। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে নিজস্ব কর্মকাণ্ডের জন্য তৈরি এই ‘বন্ধু কেন্দ্র’-এর মূল কাজ আশপাশের চরাঞ্চলের মানুষদের নানারকম প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান, যার সঙ্গে কিছু আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা ও রাতে থাকার সুবিধাও আছে। এনজিও কর্মকাণ্ডের দেশব্যাপী বিস্তারে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় এ ধরনের ট্রেনিং সেন্টারের খুব কমতি নেই, এবং মাঝে মাঝে তাদের মধ্যে স্থাপত্য চিন্তার বাহারও ভালোই চোখে পড়ে। কাজেই এদের ভিড়ে গাইবান্ধার কাজটি নিয়ে এত আলোচনা কেন সেটি বুঝতে হলে এই স্থাপনার নানা কাজকর্মের স্থাপত্যিক সমাধান ছাপিয়ে তাকাতে হবে গাইবান্ধার ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, বাংলার ভিটেবাড়ি বানানোর আবহমান ধারণার বিপরীতে আরেকটি কার্যকরী সমাধান দেওয়ার জন্য স্থপতির সৎ ও সরল ইচ্ছা, এবং সবকিছু ছাপিয়ে মনের গহিনে কোথায় যেন একলা হয়ে অল্প একটু ‘সন্ন্যাসী’ হওয়ার আকাক্সক্ষা তৈরির ক্ষমতার দিকে।

যেই এলাকায় হরবছরই বন্যা হয়, নিচু জমি চলে যায় পানির তলে, সেখানে বাড়ি বানানোর পরীক্ষিত চল হলো মাটি ভরাট করে ভিটে উঁচু করা। এটি বাঁশ টিন মাটির কাঁচাঘরের ক্ষেত্রে যেমন নিয়ম, তেমনি প্রচলিত পাকা দালানের ক্ষেত্রেও। ফ্রেন্ডশিপ সেন্টারের জমির গল্পও একই রকম নিচু জমি, বন্যাপ্রবণ, ভূমিকম্পের ভয়টাও আছে। কিন্তু মাটি ভরাটে বাগড়া দিল অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা। যা বাজেট ধরা আছে পুরো কাজের জন্য, হিসাব করলে দেখা যায় প্রায় পুরোটাই চলে যায় ইটের দালান তোলার ভিটে বানানোর মাটি ভরাটেই। স্থপতির জন্য সীমাবদ্ধতাই অনুঘটক। পুরো মাটি ভরাটের বদলে বাঁধ বানানোর যে আরেকটি পরীক্ষিত পদ্ধতি আছে নদীশাসনের, সেটিই তিনি কাজে লাগালেন এখানে। পুরনো পদ্ধতি, ভিন্ন আঙ্গিক এবং একেবারেই নতুন চেষ্টা। চারপাশটা বাঁধের মতো উঁচু হয়ে রাস্তা ছাপিয়ে ওপরে, আর দালানগুলো নিচু জমিতেই। খরচও গেল কমে, আর স্থপতি কাশেফ প্রশ্নের জন্ম দিলেন বাকি স্থপতিদের মনে নদীমাতৃক দেশে স্থাপত্যের আরেকটি স্থানিক উত্তর কি পাওয়া গেল? আমাদের সেই ঈর্ষাকাতর আড্ডায় তুমুল ঝড় উঠল এবং ঝগড়া নিরসনে আমরা গোপনে একজনকে পাঠালাম সরেজমিনে বন্যাক্রান্ত গাইবান্ধার হালচাল দেখে আসতে। পানি ঢোকেনি বন্ধু কেন্দ্রে, অন্তত সেবার।

পুরো মাটি ভরাটের বদলে বাঁধ বানানোর যে আরেকটি পরীক্ষিত পদ্ধতি আছে নদীশাসনের, সেটিই তিনি কাজে লাগালেন এখানে। পুরনো পদ্ধতি, ভিন্ন আঙ্গিক এবং একেবারেই নতুন চেষ্টা। চারপাশটা বাঁধের মতো উঁচু হয়ে রাস্তা ছাপিয়ে ওপরে, আর দালানগুলো নিচু জমিতেই। খরচও গেল কমে, আর স্থপতি কাশেফ প্রশ্নের জন্ম দিলেন বাকি স্থপতিদের মনে নদীমাতৃক দেশে স্থাপত্যের আরেকটি স্থানিক উত্তর কি পাওয়া গেল?

তবু কথা তো থেমে থাকে না গতানুগতিকতার বাইরের এই সমাধান সূত্রপাত ঘটিয়েছে সার্বক্ষণিক পরিচর্যার, প্রয়োজন পড়েছে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার জন্য যান্ত্রিক সমাধানের। বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুতের প্রতি এই নির্ভরশীলতা কারও কারও কাছে অযাচিত মনে হয়েছে। কিন্তু তাই বলে এই উদ্যোগের মাহাত্ম্য মোটেও কমে যায় না, বরং এর ফলে আরও প্রবলভাবে ফুটে ওঠে পুরো কেন্দ্রের ভেতরের অলি-গলি-উঠানের এক ধরনের মায়াময় অন্তরমুখিতা। স্থপতির মনের কোণে স্পেসের এই ধ্যানমগ্নতার বীজ আগে থেকেই ছিল, আর রাস্তা থেকে ক্রমশ নিচে নেমে নিজস্ব জগতে প্রবেশের কাব্যিকতা যোগ করেছে প্রয়োজনীয় আমেজ। কেউ যখন এই কেন্দ্রে প্রথম প্রবেশ করে, দৃষ্টিসীমায় দালান নয়, ধরা পড়ে দালানগুলোর ছাদ যার ওপরে আবার ঘাসের আচ্ছাদন। সেই সবুজ ছাদের ফাঁকে ফাঁকে নেমে যাওয়া লাল ইটের বাঁধানো উঠানগুলো চোখে পড়ে।

ফ্রেন্ডশিপ সেন্টারে ঢোকার মুখে কোথায় যেন মনে হয়, এ এক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপত্যের আধুনিক রূপ। উত্তরবঙ্গের মহাস্থানগড়ের প্রভাব খোঁজাটা খুব অবান্তর নয়, স্থপতি নিজেই বিভিন্ন সময় সেই কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন। পাশাপাশি শ্রদ্ধাবোধ নজরে পড়ে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যের চর্চার প্রতিও। লুই আই কানকে খোঁজা যায়, পাওয়া যায় মাজহারুল ইসলাম, বশিরুল হক ও অন্যদের হাত ধরে আসা লাল ইটের ভিজ্যুয়াল উপস্থিতিও। তবে সেই সমস্ত উদাহরণ থেকে এই স্থাপত্যকর্মটি একটি জায়গায় একেবারেই আলাদা আর তা হচ্ছে ‘আবেশ’। আধুনিক স্থাপত্যের কথিত আদর্শিক নির্লিপ্ততা ও বিমূর্ত জ্যামিতিক প্রয়াস এখানে প্রথম সারিতে নেই, বরং চোখে পড়ে স্পেসগুলোর এক ধরনের ‘সাবজেক্টিভ পোটেন্সি’ অর্থাৎ নিজের মতো করে মজে যাওয়ার আমন্ত্রণ। সিঁড়ি বেয়ে নেমে যেতে যেতে যেন আরেকটি জগতে চলে যাওয়া, যেখানে অনুভূমিক দিগন্তের পরিবর্তে খাড়া আকাশমুখিতার আহ্বান সর্বত্র। চারদিকের বাঁধের ফলে চিরাচরিত গ্রামবাংলার ভূমিমুখী দৃষ্টি সরেছে বটে, তবে যোগ হয়েছে একধরনের জগৎ সংসার ছেড়ে আপাত কোলাহলমুক্ত নিজস্ব আধ্যাত্মিকতায় মগ্ন হওয়ার আহ্বান। দৃষ্টিসীমায় আকাশের প্রবল উপস্থিতি সে ভাব আর বাড়িয়েছে। তিনটি বিষয় এখানে উল্লেখের দাবি রাখে প্রথমত একটি বড় খোলা উঠানের পরিবর্তে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত ছোট-বড় নানান আকৃতির উঠানের মালা। আকাশখোলা, অর্ধখোলা ও ছাদে ঢাকা, স্তরে স্তরে সাজানো এই সমস্ত স্পেসের মধ্য দিয়ে চলাচল হয়ে ওঠে আকর্ষণীয়, অনুসন্ধিৎসা মাথাচাড়া দেয়। দ্বিতীয়ত হাতে বানানো স্থানীয় ইটের দেয়াল ও একইভাবে ইট বিছানো মাটির মিলেমিশে এক হয়ে যাওয়া। বোধহয় এই কৌশলটি পুরো কেন্দ্রটিকে এক করে তোলে, ইচ্ছে জাগায় ধরে দেখার। তৃতীয়ত জ্যামিতিক হিসাবের মাঝে একটু-আধটা নড়েচড়ে যাওয়া, হাল্কা কাত হয়ে সিঁড়ির উঠে যাওয়া, ছোট ছোট পুকুর আর গাছ, দুই ধরনের কাজের জায়গা আলাদা করা ভল্টেড সংযোগ ইত্যাদি নানান ছোটগল্পের সমাহার। সব কিছু মিলিয়ে ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার মোটেও নির্বিকার নয়, ব্যক্তিগতভাবে সম্পর্ক তৈরি করতে আগ্রহী।

আমাদের সেই আড্ডায় কেউ একজন জুহানি পালাজমা ও পিটার জুমথরের সূত্র ধরে ‘হ্যাপ্টিক ফেনোমেনা’ নিয়ে কথা বলছিলেন, অর্থাৎ যাকে বুঝতে হলে ছুঁয়ে দেখতে হয়, ব্যক্তিগতভাবে আস্বাদন করতে হয়, বুদ্ধি দিয়ে বোঝার আগে মনে হয় একটু উপভোগ করে নিই। কাশেফ মাহবুব চৌধুরীর ফ্রেন্ডশিপ সেন্টারও অনেকটা সেরকমই। আড্ডা শেষে যখন ঘরে ফিরছিলাম, তখন ভাবছিলামÑ ঈর্ষাকাতর সমালোচনার মারমুখিতা কত দ্রুতই পালটে গেল।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক