পরিবেশ ও শ্রমিকবান্ধব কারখানা|195220|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
কারুপণ্য লিমিটেড
পরিবেশ ও শ্রমিকবান্ধব কারখানা
গৌরব কুন্ডু

পরিবেশ ও শ্রমিকবান্ধব কারখানা

বিশ্বায়নের এ যুগে অন্য অনেক কিছুর পাশাপাশি স্থাপনা তৈরির ক্ষেত্রেও পশ্চিমা বিশ্বের অন্ধ অনুকরণ হচ্ছে। বাহ্যিক সৌন্দর্য আর অর্থনৈতিক লাভের চিন্তা করে এমন সব স্থাপনা তৈরি হচ্ছে যা আমাদের জলবায়ু-পরিবেশ-সংস্কৃতির সঙ্গে বেমানান তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিকরও। কিন্তু আশার কথা এই প্রবণতার বাইরে গিয়ে কিছু স্থপতি দেশের জন্য উপযুক্ত ও পরিবেশবান্ধব নকশা প্রণয়ন করে যাচ্ছেন। এসব স্থপতি তাদের দলে যারা স্থাপনার সৌন্দর্য, নির্মাণ ব্যয়, স্থাপনার স্থায়িত্বের পাশাপাশি পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব নিয়েও সমানভাবে ভাবেন। কাজ করেন পরিসর আর পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। তেমনই এক স্থাপনার উদাহরণ রংপুরে অবস্থিত কারুপণ্য লিমিটেডের কারখানা।

কারখানা চত্বরে প্রবেশ করে জলাধার আর বৃক্ষরাজিবেষ্টিত চওড়া সিঁড়ি পেরিয়ে সবুজে ছাওয়া প্রধান স্থাপনায় প্রবেশ করার সময় প্রথম দেখায় একে হয়তো আমাদের চিরচেনা কারখানার ধারণার সঙ্গে মেলানো যাবে না। কংক্রিট, স্টিল, বাহারি গ্লাসের খোলসের পরিবর্তে সবুজের আবরণে ঘেরা এ স্থাপনা। শুধু মূল স্থাপনাই নয়, পুরো কারখানা চত্বরের আবহটাই গ্রামের চিরচেনা আবহে পরিকল্পনা করা। জলাধারগুলো যেন গ্রামের পুকুরের প্রতিরূপ। এ কারখানার পরিকল্পনায় স্থপতি মাথায় রেখেছেন পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, স্থানীয় আবহাওয়া, ব্যবহারকারীদের স্বাচ্ছন্দ্য এবং দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কথা।

অনন্য এ সবুজঘেরা স্থাপনার কারিগর স্থপতি বায়েজিদ মাহবুব খন্দকার। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৩ সালে বি.আর্ক পাস করেন। স্বাধীনভাবে কাজ করার তাগিদে চাকরি ছেড়ে ২০০০ সালে শুরু করেন নিজের প্রতিষ্ঠান ‘নকশাবিদ আর্কিটেক্টস’। এই প্রতিষ্ঠান থেকে গত ২০ বছরে এই স্থপতি নকশা করেছেন তোশাখানা জাদুঘর, এবিসি হেরিটেজ, এসএম টাওয়ার, মাগুরা গ্রুপের হেডকোয়ার্টার, দরগাতলা জামে মসজিদ, কামাল রেসিডেন্স, মিরপুর কিডনি ফাউন্ডেশনসহ বেশকিছু উল্লেখযোগ্য স্থাপনা। এর মধ্যে রংপুর শহরের রবার্টসনগঞ্জে স্থাপিত কারুপণ্য লিমিটেডের এই কারখানা ভবন অন্যতম।

কারুপণ্য লিমিটেডের এই কারখানা মূলত রংপুরের ঐতিহ্যবাহী শতরঞ্জি তৈরি করে থাকে। ১৯৯১ সালে মাত্রা ১৫ জন কর্মী নিয়ে এর পথচলা শুরু। পুরনো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি এ কারখানা তৈরি করেছে প্রায় পাঁচ হাজার লোকের কর্মসংস্থান। কাঁচামাল, বুনন ও নকশার নানা পর্যায় পেরিয়ে রংপুরের শতরঞ্জির প্রায় ১৫ প্রকার পণ্য আজ রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়া মহাদেশের ৫৫টি দেশে, সেই সঙ্গে প্রতি বছর দেশে আসছে কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। এই শতরঞ্জি তৈরির কাঁচামালেও আছে অভিনত্ব। এ কারখানায় ব্যবহার করা হয় প্রাকৃতিক ও নবায়নকৃত কাঁচামাল। প্রতি বছর কটন মিলের তিন হাজার টন তুলার বর্জ্য থেকে তৈরি হয় সুতা। তাছাড়া গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির ১ হাজার ২০০ টন বর্জ্য ঝুট কাপড় এবং সাড়ে ৪ হাজার টন পাটের আঁশ ব্যবহার করা হচ্ছে এই কারখানায়। প্রতি বছর এই বিপুণ পরিমাণ গার্মেন্টস বর্জ্য নবায়ন করে পণ্য প্রস্তুত করার ফলে একদিকে যেমন বর্জ্যরে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা পাচ্ছে দূষণের হাত থেকে।

ভবনের দক্ষিণ দিকে খোলা রাখার আর খোলা দিকে পুকুর রাখার প্রাচীন জ্ঞানকে স্থপতি তার এই আধুনিক স্থাপনায় দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। শুধু সম্মুখভাগই নয়, কারখানার ভেতর দিয়ে যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে সেজন্য ত্রিমাত্রিক স্থাপত্য-নকশায় বিশেষ কিছু কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। নিচতলায় সিঁড়ি-লবিতে নির্মাণ করা হয়েছে পুকুরের মতো বৃহদাকার চারটি জলাধার। ১৫ হাজার বর্গফুটের এ জলাধারগুলো মোট পাঁচ লাখ লিটার পানি ধারণ করতে পারে

প্রায় আট লাখ বর্গফুটের জমিতে তিন লাখ বর্গফুটের সাততলাবিশিষ্ট এই ভবন নির্মাণে স্থপতি প্রথমেই চেয়েছেন এতে বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করতে। এই লক্ষ্যে তিনি স্থাপনাটিকে বসিয়েছেন উত্তর-দক্ষিণে আড়াআড়ি ভাবে; যাতে ভবনে প্রাকৃতিক বায়ু প্রবাহের ও প্রাকৃতিক আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। অবস্থানগত কারণে এই স্থিতিবোধ ভবনটিকে করে তোলে ওই নিসর্গের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই সঙ্গে গ্রীষ্মের প্রখর রোদকে আটকানোর জন্য দক্ষিণমুখের প্রতি তলায় প্রায় সাড়ে চার ফুটের টানা বারান্দা ব্যবহার করা হয়েছে। যা আমাদের আবহমান বাংলার স্থাপত্য রীতির ‘দক্ষিণ খোলা বারান্দা’র আধুনিক প্রতিরূপ। এই দক্ষিণা বারান্দা ব্যবহার করে স্থাপনাটির দক্ষিণভাগ ঢেকে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা দিয়ে। ফলে কর্মস্থলে একটি আরামপ্রদ পরিবেশ তৈরি হয়। এই সবুজে ছাওয়া সম্মুখভাগ স্থাপনার সৌন্দর্যে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। বছরের বেশিরভাগ সময় গরম হলেও রংপুরের শীতটাও নেহাত কম নয়। শীতের বাতাস আসে উত্তর থেকে। তাই শীতকালে শ্রমিকদের অতিরিক্ত ঠাণ্ডা থেকে রেহাই দিতেও ভাবতে হয়েছে আলাদাভাবে। দক্ষিণ আর উত্তর ভাগের নকশায় এর প্রভাব লক্ষণীয়। শীতকালে উত্তরের শৈত্যপ্রবাহ রুখতে কয়েকটা মাস বন্ধ রাখা হয় উত্তরের জানলাগুলি।

ভবনের দক্ষিণ দিকে খোলা রাখার আর খোলা দিকে পুকুর রাখার প্রাচীন জ্ঞানকে স্থপতি তার এই আধুনিক স্থাপনায় দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। শুধু সম্মুখভাগই নয়, কারখানার ভেতর দিয়ে যাতে বাতাস চলাচল করতে পারে সেজন্য ত্রিমাত্রিক স্থাপত্য-নকশায় বিশেষ কিছু কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। নিচতলায় সিঁড়ি-লবিতে নির্মাণ করা হয়েছে পুকুরের মতো বৃহদাকার চারটি জলাধার। ১৫ হাজার বর্গফুটের এ জলাধারগুলো মোট পাঁচ লাখ লিটার পানি ধারণ করতে পারে। চত্বরের সবুজ গাছপালা আর এই পানির ওপর দিয়ে উড়ে আসা বাতাস ৩৭ ফুট ব্যসের চারটি সিলিন্ড্রিকাল এট্রিয়ামের মধ্য দিয়ে কারখানার ভেতরে ঢোকে। তারপর বিভিন্ন তলায় উঠে যায়। তাই এসি বা ফ্যান ছাড়া প্রাকৃতিকভাবেই কারখানার বাইরের চেয়ে ভেতরের তাপমাত্রা কমে যায় ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এভাবে শীতল বাতাস কারখানায় ঢুকে অনবরত চলতে থাকা কর্মযজ্ঞের ফলে সৃষ্টি হওয়া তাপ শুষে নিয়ে নিজে গরম হয়ে প্রাকৃতিক নিয়মে এই গরম হালকা বাতাস ওপরের চিমনি দিয়ে কারখানার বাইরে বেরিয়ে যায়। আর খালি জায়গা পূরণ করতে আবার দক্ষিণ থেকে শীতল বাতাস কারখানার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। এভাবে অভ্যন্তরে শীতল বায়ুর অনবরত প্রবাহ চলতে থাকে। এছাড়া প্রতি ফ্লোরের মেঝে থেকে ছাদের উচ্চতা গতানুগতিকভাবে ১০ ফুট না রেখে ১২ ফুট রাখা হয়েছে। এতে করে অভ্যন্তরের আয়তন বেড়ে অতিরিক্ত আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়। কারখানার প্রতিটি যন্ত্রের নিচে মেঝেতে ফুটো রাখা হয়েছে যাতে ঠা-া বাতাস সহজেই যন্ত্রগুলোকে ঠা-া করে জানালা ও ঘুলঘুলি দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে।

সিঁড়ির ধারের জলাশয়গুলো সৌন্দর্যবর্ধন ও ভবনকে শীতল রাখার কাজের বাইরেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে লাগে। সেটা ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো এবং পানি পরিশোধনের সঙ্গে যুক্ত। রংপুর এলাকার পানি অতিরিক্ত আয়রনযুক্ত। জলাশয়গুলোর সঙ্গে স্থাপিত ফোয়ারাগুলো তীব্র গতিতে ও বেশ কয়েক ধাপে এই পানি নিচে ফেলতে সাহায্য করে, যার ফলে আয়রন বন্ড ভেঙে যায়। এই পানি আসে ডাইং সেকশন থেকে। মূলত যেখানে পানি ব্যবহার হওয়ার পর, ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত পানি প্রথমে ইটিপিতে যায়, তারপর দ্বিতীয়বার রিফাইনিং হয়ে আবার ফোয়ারা দিয়ে জলাশয়গুলোতে চলে আসে, যা আবার অক্সিডাইজেশন করে আবার ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে এই সঞ্চিত পানি গাছের জন্য, অগ্নি দুর্যোগের সময় অগ্নিনির্বাপণেও ব্যবহার করা যাবে। এভাবে কারখানাটিতে গ্রাউন্ড ওয়াটার ব্যবহার হয় মাত্র ২০ শতাংশ, যা আগে প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত তুলতে হতো। এই জলাশয়গুলোর আবার বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্যও ব্যবহার করা হয়। এভাবে স্থপতি এই স্থাপনায় বিভিন্ন উপাদানের মূল কাজ ও সৌন্দর্যবর্ধনের এক চমৎকার দ্যোতনা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।

কারুপণ্যের এই কারখানা নির্মাণের বেশিরভাগ উপকরণই স্থানীয়ভাবে সংগ্রহকৃত। এতে নির্মাণ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও দেখা হয়েছে। কারখানার অন্দরসজ্জায়ও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে লোকজ ঐতিহ্য-

সংস্কৃতিকে। অন্দরের সজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে কাঠ, বাঁশ, বেত, চাটাই ইত্যাদি। শুধু স্থাপনার নির্মাণশৈলীই নয়, এই কারখানাকে সামাজিকভাবে টেকসই করার কথা ভেবে এতে যোগ করা হয়েছে ক্যান্টিন, ডে কেয়ার সেন্টার, মেডিকেল সেন্টার, গ্রোসারি সপ, প্রেয়ার রুম, বিশ্রাম ও খাওয়ার জায়গা। যাতে শ্রমিকরা স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারে। মিটিংয়ের মতো কাঠখোট্টা ব্যাপারগুলো সারতে বানানো হয়েছে গ্রামের উঠানের আদতে সাজানো পরিসর। এছাড়া সহজে চলাচল ও ভারী যন্ত্র সহজে স্থানান্তরের জন্য ব্যবহার হয়েছে র‌্যাম্প। স্থাপনার প্রায় ৪০ হাজার স্কয়ার ফুটের ছাদকেও স্থপতি নৈপুণ্যের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। ছাদের জায়গাটুকু গাছ, জলাশয়, জলজ গাছ, বসার জায়গা, ছাউনি দিয়ে দারুণভাবে বিন্যস্ত করা। বিভিন্ন ফুলেল গাছে ভরা এই নন্দিনী পার্কটি শ্রমিকদের একটু অবসর যাপনের-স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা। লাঞ্চ টাইমে এ জায়গাটাই হয়ে ওঠে কারখানার সবচেয়ে প্রাণবন্ত জায়গা। স্থপতি ও তার দলের সঙ্গে এই স্থাপনাকে নান্দনিক রূপ দিতে আরও একজনের অবদান অনস্বীকার্য, তিনি শিল্পী সাইদুল হক জুইস। আবহমান গ্রামবাংলার চিরায়ত রূপ, নারীর অবদান ও নৈপুণ্য ফুটিয়ে তুলতে কারখানার ফোকরে ফোকরে টেপা পুতুল, মাটির দেয়াল লেপার মতো করে দেয়ালের টেক্সচার আর স্থাপনার সামনের ভাস্কর্য ‘বনলতা’ এই স্থাপনাকে সাজিয়েছে অনন্য রূপে।

আধুনিক এই স্থাপনা পরিবেশবান্ধব ও সামাজিকভাবে টেকসই। এই স্থাপনা যেমন একদিকে রংপুর অঞ্চলের প্রাচীন কারুপণ্যের ঐহিত্যেকে ধারণ করে বিশ্বের সামনে নতুন করে তুলে ধরছে, তেমনি তা শ্রমবান্ধব ও মানবিক কর্মস্থানের একটি চমৎকার উদাহরণ।

লেখক : স্থপতি ও প্রভাষক, স্থাপত্য বিভাগ, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা