শেকড়ে ফেরার অনুপ্রেরণা|195223|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
রামকৃষ্ণ মিশন মন্দির
শেকড়ে ফেরার অনুপ্রেরণা
ড. নীরু শামসুন্নাহার

শেকড়ে ফেরার অনুপ্রেরণা

প্রাচীন বাংলার পোড়ামাটির ভবন নির্মাণশৈলী বাঙালির এক অদ্বিতীয় মনীষা। বাংলাদেশের মন্দির-স্থাপত্য সম্পর্কে লিখতে গিয়ে পোড়ামাটির ফলকসজ্জিত প্রাচীন ধর্মীয় সৌধের স্থাপত্যশৈলী নিয়ে সামান্য আলোকপাত করছি। অধুনা কিছুসংখ্যক ঐতিহ্যানুরাগী স্থপতি ও  নগরবাসীর মধ্যে প্রাচীন এই বাস্তুবিদ্যার প্রতি অনুরাগ লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রাচীন বাঙালি স্থাপত্যের মৌলিক উদ্ভাবন হলো পোড়ামাটির ভবন নির্মাণ পদ্ধতি ও এর অবয়বে উৎকীর্ণ মৃৎফলকের ব্যবহার। পোড়ামাটির ভবন নির্মাণ শিল্প হলো প্রাচীন বাংলার স্থপতিদের সৃষ্টিশীল মন ও মেধার অনন্য সমন্বয়, অনবদ্য সৃষ্টি।

ইতিহাসবিদ ও শিল্পকলাবিদদের অভিমত অনুসারে বলা যেতে পারে, মধ্যযুগে স্বাধীন সুলতানি আমলে (১৩৩৮-১৫৩৮) সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় আঞ্চলিক রীতিতে মসজিদের পাশাপাশি মন্দির নির্মাণ শুরু হয়। মসজিদ স্থাপত্যে বাংলার ঐতিহ্যবাহী খড়ে ছাওয়া চালা ঘরের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্যবাহী পোড়ামাটির ফলক দিয়ে ভবন-গাত্র সজ্জিত করার সুপ্রাচীন রীতিকে গ্রহণ করার ফলে বাঙালি স্থপতি ও মৃৎশিল্পীরা পুনরায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে মানবতাবাদী  শ্রীচৈতন্য বৈষ্ণব ধর্ম প্রবর্তন করার ফলে পনেরো শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ষোড়শ শতক পর্যন্ত বাংলার স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে নবজাগরণ লক্ষ করা যায়। উনিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত ছিল। এমনকি পোড়ামাটির ফলকসজ্জিত মন্দির উনিশ শতকের শেষেও নির্মিত হয়েছে, যদিও এগুলো সংখ্যায় খুব অল্প এবং মন্দিরগাত্রে ব্যবহৃত ফলকগুলোও উৎকৃষ্ট মানের নয়।

বাংলাদেশের বাগেরহাটের কোদলা মঠ, ফরিদপুরের মথুরাপুর দেউল, বরিশালের মাহিলারার সরকারের মঠ, মুন্সীগঞ্জের সোনারং মঠ রেখ-দেউল নির্মাণের পূর্ববঙ্গীয় উদাহরণ হিসেবে ধরে নিতে পারি। যদিও ‘রেখ-দেউল’ স্থাপত্যরীতিটি  ওড়িশা-দেশীয়। পোড়ামাটির স্থায়িত্ব ও ভার বহন ক্ষমতা যেহেতু গ্রানাইট প্রভৃতি পাথরের তুলনায় কম, সেজন্য উপকরণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রায়তন মন্দির বা দেউল নির্মাণ করতে শুরু করে বাঙালি স্থপতিগোষ্ঠী। এভাবেই নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্থপতিরা নিজস্ব মন্দির-স্থাপত্যশৈলীর উদ্ভাবন করেন। প্রাচীন বাংলার স্থপতিগোষ্ঠী একাধারে ‘কাষ্ঠ, পাষাণ, মৃত্তিকা ও চিত্র’ এই চারটি মাধ্যমেই কাজ করত। নবপর্যায়ের মন্দির চর্চায় আঞ্চলিক সত্তার বিকাশে প্রধানতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন সুলতানি আমলের শাসকরা। পঞ্চদশ শতকের দ্বিতীয় ভাগ বা ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলার আঞ্চলিক মুসলিম স্থাপত্যের বিকাশ ঘটে। মসজিদ স্থাপত্য চর্চার মধ্য দিয়ে নতুন ধারার স্থাপত্য ও শিল্পধারা গড়ে ওঠে এবং একইসঙ্গে নবপর্যায়ের মন্দির চর্চার সূত্রপাত ঘটে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী কাদামাটি, বাঁশ ও খড়ে ছাওয়া ঘরের অনুকরণে চালারীতি এবং শিখররীতির উদ্ভব ঘটে। এই নতুন দুই আঞ্চলিক বাংলা রীতির সঙ্গে ইন্দো-মুসলিম স্থাপত্য কৌশল যেমন অভ্যন্তরীণ গম্বুজ, ভল্ট, খিলান এবং স্তম্ভযুক্ত প্রবেশপথ, পত্রাকৃতি খিলান প্রভৃতি যুক্ত হলো, যা তখনকার মসজিদ নির্মাণেও বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে (ফার্গুসন, সরস্বতী, দানী)। বাঁকানো কার্নিস এবং উদ্ভাসিত ছাঁচের মধ্যে পোড়ামটির ‘লো-রিলিফ’। এ সমস্ত রীতি বাঁকানো কার্নিসে ব্যবহৃত হলেও, কোথাও কোথাও তা রেখ-দেউলের ক্ষেত্রেও গ্রহণ করা হলো (ব্রিক টেম্পলস অফ বেঙ্গল, ডেভিড মেককাচন)। সুলতানিপর্বে নির্মিত মসজিদগুলো ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থানের বৃহদায়তন মসজিদের মতো নয়। বস্তুত বাংলায় ইসলাম ধর্মের বিপুল গতিবেগ ও রাষ্ট্রশক্তির ক্ষমতার কোনো পরিচয় স্বল্পবিস্তৃত, অনতিউচ্চ মসজিদগুলোতে দেখতে পাওয়া যায় না। শান্ত ও নম্রতার মধ্য দিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে আরাধনা করার জন্য বাঙালি নও-মুসলিমদের জন্য অনতিউচ্চ মসজিদগুলো নির্মিত হয়েছিল। ঠিক একইভাবে স্বল্পয়াতন মন্দির স্থাপত্যেও সনাতন ধর্মাবলম্বীর প্রাণের দেবতাকে পাওয়ার আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। অসাম্প্রদায়িক সুলতানদের সহায়তায় উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় অবধি পোড়ামাটির ভাস্কর্য সমৃদ্ধ অসংখ্য মন্দির নির্মিত হয়। এ সময় পোড়ামাটির ফলক সমৃদ্ধ মসজিদও নির্মিত হয়। মসজিদের ভাস্কর্যসজ্জা মূলত জ্যামিতিক ও ফুলকারী নক্শায় সীমিত ছিল। এ ধরনের নকশাসমৃদ্ধ বেশ কিছু মসজিদ বাংলাদেশে রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের (তৎকালীন গৌড়ের) ছোট সোনা মসজিদ (১৪৯৩-১৫১৯), সুলতানি এবং মুঘল স্থাপত্যরীতির মিশ্র রূপবিশিষ্ট টাঙ্গাইলের আতিয়া জামে মসজিদের (১৬০৯) কথা উল্লেখ করা যায়। পক্ষান্তরে মন্দিরগাত্রে সন্নিহিত ফলকগুলোতে নতোন্নত মূর্তির সাহায্যে মৃৎশিল্পীরা নানা ধরনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিষয়াদি তুলে ধরেছেন। মন্দিরের গায়ে শোভিত অজস্র মৃৎফলকগুলোতে প্রাচীন বাংলার জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক স্রোতধারা ধর্মীয় আবহকে আশ্রয় করে ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্যে প্রতিফলিত হয়েছে। বাংলাদেশের কান্তজীর মন্দির (১৭০৪-১৭২২), রাজশাহীর পুঠিয়ার গোবিন্দ মন্দির (১৯ শতক) এর অন্যতম উদাহরণ।

প্রাচীন বাংলার স্থাপত্যের সংক্ষিপ্ত  আলোচনার আলোকে বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া নিজস্ব শিল্পরূপে ফেরার একটা ইঙ্গিত পাঠক রামকৃষ্ণ মঠে খুঁজে পাবেন। বহু শতকের শিল্পধারায় ঋদ্ধ বাংলাদেশের সংস্কৃতির শেকড় একুশ শতকের বাঙালির শিল্পবোধকে নতুন করে প্রাণরসে জারিত ও পরিপুষ্ট করছে এ স্বপ্ন দেখলে ক্ষতি কী?

বলা প্রয়োজন, ‘চালা’ ও ‘বাংলা’ পদ্ধতির উপাসনালয়  আলাদা কোনো রীতির স্থাপত্য নয়। ‘এক বাংলা’ বা ‘দোচালা’ রীতিকে পরবর্তীতে আরও মজবুত ও উন্নততর শৈলীতে পরিণত করার উদ্দেশ্যে ‘জোড়-বাংলা’ পদ্ধতিতে মন্দির  নির্মাণ করা হয়েছে। ‘এক বাংলা’ মন্দিরগুলো দেখতে একেবারে গ্রামবাংলার  দোচালা কুঁড়েঘরের মতো। একবাংলা রীতিটি যশোর এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বেশি প্রচলিত ছিল। এই রীতির মন্দিরস্থাপত্য ওড়িশায় ‘গৌড়ীয়’ বা ‘বাংলা রীতি’ নামে পরিচিত। দোচালা বা একবাংলা মন্দিরগুলো খুব মজবুত হতো না বলে দুটি এক বাংলাকে একত্র করে ‘জোড় বাংলা’ মন্দিরের নির্মাণ করে স্থায়িত্ব বিধানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আনুমানিক ১৮ শতকের পাবনার ‘জোড় বাংলা’ মন্দিরটি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মন্দিরের সামনের দিকে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার খিলান (ধৎপয) বিশিষ্ট প্রবেশপথ রয়েছে। খাঁজকাটা দরজার উপরিভাগের কার্নিশ বেশ বাঁকানো। পোড়ামাটির ফলক দিয়ে মন্দিরটির সম্মুখভাগ সজ্জিত করা হয়েছিল। জোড় বাংলা মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী অনুসারে প্রথম দোচালার নিচে গর্ভগৃহের অবস্থান। দুটি দোচালার ছাদই ভল্টের ওপর স্থাপিত। ‘চারচালা’ মন্দির চারচালা খড়ো ঘরের অনুকরণে নির্মিত। এটিতেও চারটি চালের নিচের প্রান্ত বরাবর দৃশ্যমান। রাজশাহীর পুঠিয়ার চারআনি জমিদার বাড়ির চারচালা মন্দির এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। ‘চারচালা’র পরিবর্ধিত রূপ ‘আটচালা’ মন্দির।

স্থাপত্যের চার কোণের অনাবৃত অংশগুলোকে ভরাট করার পরিকল্পনা থেকে ‘রত্ন’ বা ‘শিখর’ রীতির উদ্ভব। চালা আকারে গঠিত মসজিদের ওপর গম্বুজ বসিয়ে যে রূপের সৃষ্টি হয়েছিল, ‘রত্ন’ মন্দিরের রূপকল্পনাও করা হয়েছে ঐ একই ধরন অনুসরণে। ‘রত্ন’ বা  ‘শিখর’ রীতির মন্দিরের একটি নিয়ম এই যে, কোণের শিখরগুলোর আয়তন কেন্দ্রীয় চূড়াগুলো থেকে অল্প ছোট হবে। রত্ন মন্দিরে এক বা একাধিক চূড়ার ব্যবহার লক্ষ করা যায়। একটি চূড়াযুক্ত মন্দিরকে বলা হয় ‘এক রত্ন’ মন্দির, ‘পঞ্চরত্ন’ হচ্ছে পাঁচটি চূড়া বিশিষ্ট মন্দির। রাজশাহীর গোবিন্দ মন্দির একটি উত্তম ‘পঞ্চরত্ন’ মন্দির। নয়টি চূড়া বিশিষ্ট দেবালয় হচ্ছে ‘নবরত্ন’। বাংলাদেশের জাতীয় স্থাপত্য-কীর্তি দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী ‘কান্তজীর মন্দির’ (১৭০৪-১৭৫২) ‘নবরত্ন’ মন্দিরের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। পরবর্তী পর্যায়ে ভূমিকম্পে রত্নগুলো ভেঙে যায়।

উনিশ শতকের দিকে ঐতিহ্যবাহী চালা বা রত্ন মন্দির নির্মাণ একেবারে কমে যায়। এ সময় ব্রিটিশ রাজত্বকালে ইউরোপীয় স্থাপত্যের অনুকরণে সমতল ছাদের দালানরীতির মন্দির নির্মাণ জনপ্রিয়তা পায়। ঐতিহ্যবাহী পত্রাকৃতি প্রবেশ খিলানযুক্ত স্তম্ভের ওপর সমতল ছাদযুক্ত মন্দির দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া প্রথম দিকে এ জাতীয় মন্দিরের সামনের দেয়ালে পোড়ামাটির ফলকও ব্যবহার করা হয়েছে। ক্রমে ক্রমে মন্দির স্থাপত্যে পরিবর্তন দেখা দেয় এবং পোড়ামাটির ফলকের বদলে অপেক্ষাকৃত সস্তা বলে  মন্দিরের গাত্রালংকার হিসেবে ‘পঙ্খের কাজ’ (stucco work) হতে শুরু করল।

‘অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা’, ‘রাজনৈতিক-নিরাপত্তা’, এবং ‘জনচেতনা’ একত্রে যুক্ত হলে মানুষের মনে শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার বোধ জাগ্রত হয়। এ প্রসঙ্গে ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশন প্রাঙ্গণে নবনির্মিত (২০০৫ সালে উদ্বোধনকৃত) ষড়ভুজাকৃতি মঠটির (মন্দির) উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রথমেই যেটি উল্লেখ করার মতো, তা হলো এটির সমতল ছাদের সামনের অংশে ঐতিহ্যবাহী চালা-মন্দিরের অনুরূপ বেশ বড় আকৃতির চূড়া। এটির পেছনে বেশ বড় আকারের ওড়িশা-শৈলীর শিখর রয়েছে। এর চারপাশে রয়েছে আরও কয়েকটি মিনিয়েচার চূড়া। এটির ষড়ভুজের ছয়টি অংশে প্রধান ছয়টি ধর্মীয় প্রতীক উপস্থাপন করা হয়েছে। পুরো মঠের কার্নিশের নিচ দিয়ে প্রাচীন মন্দির-সজ্জার অন্যতম উপকরণ হাতির মোটিফযুক্ত পোড়ামাটির ফলকের সারি দিয়ে সজ্জিত করে এই আধুনিক মন্দির-স্থাপত্যকে ঐতিহ্যবাহী রূপ প্রদানের একটা চেষ্টা করা হয়েছে। মূল মঠের অদূরে অতিথিশালার সমতল ছাদেও আরও একটি চালা-মন্দিরের চূড়া তৈরি করা হয়েছে। মঠের চারপাশের দেয়াল করিন্থিয়ান স্তম্ভের সহায়তায় স্বচ্ছ কাচ দিয়ে আবৃত। এতে করে দর্শনার্থীরা গর্ভগৃহে স্থাপিত শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের পবিত্র প্রতিমা, মা সারদা দেবী এবং স্বামী বিবেকানন্দের পবিত্র চিত্র সহজেই বাইরে থেকে অবলোকন করতে পারেন।     

প্রাচীন বাংলার স্থাপত্যের সংক্ষিপ্ত  আলোচনার আলোকে বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া নিজস্ব শিল্পরূপে ফেরার একটা ইঙ্গিত পাঠক রামকৃষ্ণ মঠে খুঁজে পাবেন। বহু শতকের শিল্পধারায় ঋদ্ধ বাংলাদেশের সংস্কৃতির শেকড় একুশ শতকের বাঙালির শিল্পবোধকে নতুন করে প্রাণরসে জারিত ও পরিপুষ্ট করছে এ স্বপ্ন দেখলে ক্ষতি কী?

লেখক : শিল্পকলা-গবেষক, প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর