মাইকে অতিষ্ঠ পরীক্ষার্থীরা|195227|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
মাইকে অতিষ্ঠ পরীক্ষার্থীরা
বিশেষ প্রতিনিধি ও নিজস্ব প্রতিবেদক

মাইকে অতিষ্ঠ পরীক্ষার্থীরা

আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু। এখনো দেশে একজন শিক্ষার্থীর জন্য এই পরীক্ষা এবং এর ফলাফল জীবনে লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবেই বিবেচিত। পরীক্ষার এক মাস আগ থেকেই শিক্ষার্থীরা রিভিশন দেয়। নিজেদের দুর্বল বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগী হয়। অভিভাবকদেরও থাকে প্রস্তুতি। সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবারগুলো এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের পড়ার জন্য নীরব নিরবচ্ছিন্ন পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেন ঘরে। এমনও দেখা যায়, যে পরিবারে এরকম পরীক্ষার্থী রয়েছে সে পরিবারে টানা দু-তিন মাস মেহমানও পর্যন্ত আসে না।

কিন্তু ১ ফেব্রুয়ারি সিটির নির্বাচনকে ঘিরে শব্দদূষণের মহানগরীতে রূপ নিয়েছে ঢাকা। হাসপাতালের সামনেও চলছে উচ্চশব্দে মাইকিং এবং অলিগলিতেও একই অবস্থা। প্রার্থীরা নির্বাচনী নিয়ম মানছেন না। তদারককারীরাও চুপ। এ পর্যায়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী, সাধারণ শিক্ষার্থী, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, রোগী এবং ভুক্তভোগী নাগরিকরা অসহায়বোধ করছেন এবং সংশ্লিষ্টদের প্রতি বিষয়টি দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।

এমনিতেই এবার পরীক্ষা শুরুর আগেই ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনে হোঁচট খেয়েছে পরীক্ষার্থীরা। সেটি সামলে উঠলেও সিটি ভোটের প্রচারে সকাল ৮টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীজুড়ে মাইকিং এবং প্যারোডি গানের আতঙ্কে পড়াশোনায় কোনো মনোযোগই দিতে পারছে না তারা।

গত কয়েক দিন সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পরীক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসএসসি পরীক্ষার্থীরা এখন মাইক আতঙ্কে রয়েছে। তাদের কথা চিন্তা করে সীমিত পর্যায়ে এবং নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রতি।

গতকাল সকাল ৮টায় পশ্চিম মালিবাগ এলাকায় মেয়র প্রার্থী এবং কাউন্সিলর প্রার্থীর পৃথক মাইকে কয়েকশ গজের মধ্যেই প্রচার শুরু হয়। চলে প্যারোডি গান। রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের এসএসসি পরীক্ষার্থী হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলে, মাইকিং এখন আমাদের কাছে আতঙ্ক। কখন পড়ব। চারদিকে শব্দ, ভোর থেকে রাত ২টা পর্যন্ত উচ্চশব্দে অলিগলিতে মাইকিংয়ে ওমুক ভাইয়ের সালাম নিন, ওমুক মার্কায় ভোট দিন। আর গান তো আছেই। যাদের শিক্ষার্থীদের জন্য এতটুকু সংবেদনশীলতা নেই তারা কীভাবে জনগণের সেবা করবেন। হোসাইন আরও বলে, নির্বাচন কমিশনের প্রতি আমাদের অনুরোধ আপনারা আমাদের বিষয়টি খেয়াল করুন। যে সময়টায় আমাদের একটা নীরব পরিবেশ দরকার সেই সময়ই আমরা শব্দদূষণের হামলার শিকার হচ্ছি।

গতকাল মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল, সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে মাইক বসিয়ে উচ্চশব্দে নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন প্রার্থীদের সমর্থকরা।

কথা হয় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা এবং দুজন এসএসসি পরীক্ষার্থীর অভিভাবকের সঙ্গে। ব্যাংক কর্মকর্তা সৈয়দ খোরশেদ আলম দেশ রূপান্তরকে শব্দদূষণের অভিযোগ দিয়ে বলেন, ‘আমি সকাল ৮টার দিকে অফিসের উদ্দেশে বের হয়ে যাই। তখনো দেখি আমার বাসার সামনে মাইক বাজছে, অফিস শেষ করে বাসায় ফিরি সাড়ে ৭টার দিকে, তখনো বাজতে দেখি প্রার্থীদের মাইক। এভাবে রাত প্রায় ২টা পর্যন্ত বাজে। আমার দুই যমজ বাচ্চা এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী। তারা কোনোভাবেই পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না। আমরা খুবই অসহায় অবস্থায় রয়েছি।’ অন্যদিকে দুজন পরীক্ষার্থীও অভিযোগ করে বলে, ‘কদিন বাদেই আমাদের পরীক্ষা। কিন্তু কোনোভাবেই পড়াশোনায় মনোযোগ বসাতে পারছি না। একটু পরপর বাসার পাশ দিয়ে মাইক বাজিয়ে চলে যাচ্ছে। এতে পড়াশোনায় খুবই বিঘ্ন ঘটছে।’

গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, বাসাবো এলাকায় প্রার্থীদের হেঁটে দলগত প্রচার তেমন চোখে না পড়লেও মাইকের প্রচার চলে দিনভর। নানা গানের প্যারোডি করে প্রার্থীরা নিজেদের প্রতীকের প্রচার চালাচ্ছেন। অনবরত মাইকের শব্দে বিরক্ত এলাকার লোকজন। রিকশা, অটোরিকশা এবং ট্রাক ভাড়া করে প্রার্থীরা দিনভর ভোটের গীত বাজাচ্ছেন। বিশেষ করে বাসাবো টেম্পোস্ট্যান্ড মোড়ে যানজটের মধ্যে বসে থেকে একসঙ্গে কয়েকটি মাইকের অনবরত শব্দ ওই পথে যাতায়াতকারীদের অসহনীয় করে তোলে। টেম্পোস্ট্যান্ড মোড়ে রাস্তার সঙ্গেই রয়েছে শহীদ জিয়া বাসাবো উচ্চ বিদ্যালয় এবং বাসাবো খেলার মাঠের সঙ্গে রয়েছে বাসাবো বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। মাইকের অনবরত শব্দে দুই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। এছাড়া রাস্তার দুপাশে বেশকিছু ছোট-বড় হাসপাতাল রয়েছে। মাইকের শব্দ এসব হাসপাতালের রোগীদেরও সমস্যার সৃষ্টি করছে।

পরিবেশ ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন যেহেতু নির্বাচন চলছে, নির্বাচনে প্রার্থীদের কিছু অধিকার দেওয়া হয়েছে। এখন বিশেষ বিবেচনায় ওই অধিকারগুলো অন্যান্য অধিকারের সঙ্গে দেখতে হবে। নির্বাচনে মিছিল, মাইকিংয়ের প্রয়োজন রয়েছে, এটা ঠিক। কিন্তু শব্দদূষণ হচ্ছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। এখন যেটি হচ্ছে, আমার মনে হয় মাইকিংয়ের বিষয়ে প্রার্থীদের যেভাবে অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেভাবে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অনুমতি দেয়নি। যে কারণে শব্দদূষণও বেশি হচ্ছে। অনুমতি দেওয়ার আগে এগুলো সীমিত আকারে অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল।’

তিনি বলেন, ‘ঢাকা এখন একটি ঘনবসতিপূর্ণ শহর। অলিগলিতে শত শত বাড়িঘর। সেখানে লাখ লাখ মানুষ থাকে। স্বভাবতই এ ধরনের উচ্চশব্দের কারণে খুব বড় আকারের শব্দদূষণে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবারই অনুধাবন করা উচিত। প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করে রাজনৈতিক অধিকার বজায় রাখার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। কীভাবে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আনা যায় সেটি আইনের মাধ্যমে করা যেতে পারে।’ অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘নির্বাচনে প্রার্থীরা কর্মীদের যেভাবে নির্দেশনা দেন কর্মীরা সেভাবেই প্রচার চালান। এখন যেহেতু এসএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি চলছে, তাই সব প্রার্থীর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রচার চালানো উচিত। তাহলে হয়তো শব্দদূষণ কিছুটা কমে আসবে।’

সরেজমিন রাজধানীর মেরুল বাড্ডা, উত্তর বাড্ডা, রামপুরা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সড়কের পাশের ফুটপাতে অস্থায়ী নির্বাচনী ক্যাম্পগুলোতে সাউন্ড বক্সে বাজতে দেখা যায় বাংলা-হিন্দি গানের আদলে তৈরি করা নির্বাচনী প্রচারের গান। শুধু তাই নয়, এসব এলাকায় পিকআপ ভ্যানের পাশাপাশি মাইকে উচ্চস্বরে বাজতে দেখা যায় নির্বাচনী প্রচারের গান। তবে এ  ক্ষেত্রে মেয়র প্রার্থীদের চেয়ে বেশি প্রচারের তৎপরতা দেখা যায় কাউন্সিলর প্রার্থীদের। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে প্রচার। চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। পুরান ঢাকার মালিটোলা, রায়সাহেব বাজার, রবিদাস লেন, লালবাগ, সূত্রাপুর এলাকায়ও শোনা যায় নির্বাচনী প্রচারের গান।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন যদি কিছু না করে তাহলে কারও কিছু করার নেই। স্বার্থান্বেষী মহল এই কাজগুলো করছে; তারা কোনো কিছু তোয়াক্কা করছে না। যার ফলে বাচ্চাদের পড়ালেখায় বিঘ্ন ঘটছে।’

নির্বাচন কমিশনার (ইসি) রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনে বলা আছে, দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মাইক বাজিয়ে প্রচার করতে পারে; কেউ যদি আইন ভঙ্গ করে তাহলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছে।’ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কার্যক্রম দৃশ্যমান কি না জানতে চাইলে ইসি রফিকুল বলেন, ‘দুই কোটি মানুষের মধ্যে ৪৮ জন কীভাবে দৃশ্যমান হবে, এ প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, তারা জরিমানা করছে; সতর্ক করছে।’ এসব বিষয়ে রিটার্নিং অফিসার ব্যবস্থা নেবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রার্থীদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ রেখে এ কমিশনার বলেন, এমনিতেই আমরা শব্দদূষণের মধ্যে আছি, এর মধ্যেই পরীক্ষার্থীরা প্রস্তুতি নিচ্ছে এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে যেন প্রচার চালায়। সবশেষে তিনি বলেন, আমরা আর শব্দদূষণে আক্রান্ত হতে চাই না; পরীক্ষার্থীদের যে অসুবিধা হোক সেটাও কাম্য নয়।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন করতে গেলে প্রচার-প্রচারণা প্রার্থীদের করতেই হবে। কিন্তু এগুলোর বিভিন্ন রকম পন্থা আছে। নির্বাচনী আচরণবিধিতে বলা আছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রচারণা করতে হবে, স্কুল-কলেজ হাসপাতালের আশপাশে উচ্চশব্দে মাইক বাজানো যাবে না। কিন্তু কজন মানছে সেটা। সমস্যা হলো, দায়িত্ব যাদের তারা এগুলো তদারকি করছে না। মাইক না বাজিয়েও তো নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যায়। কিন্তু যারা নিয়ম তৈরি করেন তারা তো খেয়াল রাখছেন না। ফলে ক্ষতি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের, সাধারণ মানুষের।’