শহরের বর্জ্যে বিষাক্ত গ্রাম|195252|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
শহরের বর্জ্যে বিষাক্ত গ্রাম
আহসান হাবীব অপু, রাজশাহী

শহরের বর্জ্যে বিষাক্ত গ্রাম

রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার নর্দমার বর্জ্যমিশ্রিত বিষাক্ত পানি ফেলা হচ্ছে শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বারনই নদীতে। নগরীতে পানির গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের পর প্রতিদিন যে পরিমাণ অবশিষ্ট নোংরা পানি থেকে যায় তার বেশির ভাগই ফেলা হয় এই নদীতে। বড় বড় নর্দমার মাধ্যমে পবা উপজেলার নওহাটা এলাকায় বারনই নদীতে বর্জ্যমিশ্রিত এই পানি কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়াই সরাসরি ফেলা হচ্ছে। আর বর্জ্যমিশ্রিত বিষাক্ত পানির প্রভাবে শুধু বারনই নদীই নয়, এর সঙ্গে সংযুক্ত আশপাশের ডোবা-নালার পানিও এখন বিষাক্ত। সেখানে এখন আর মাছ চাষ করা যায় না। সব মিলিয়ে পুরো এলাকার প্রতিবেশব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলেছে নর্দমার অপরিশোধিত বিষাক্ত পানি। পবা ও পুঠিয়া এলাকার ভুক্তভোগী মানুষ সিটি করপোরেশনের কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা না পেলেও নগরবাসীর নোংরা পানির খারাপ প্রভাবটুকু মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজশাহী নগরীতে প্রতিদিনের ব্যবহৃত গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক পানি নিষ্কাশনের জন্য রয়েছে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৮০ কিলোমিটার নর্দমা। এসব নর্দমায় বাসা-বাড়িতে ব্যবহৃত পানি ছাড়াও কল-কারখানার বর্জ্যরে পাশাপাশি হাসপাতাল-ক্লিনিকের মেডিকেল বর্জ্যও পড়ছে। নগরীর অধিকাংশ বাড়ির মলমূত্রও গিয়ে পড়ছে নর্দমায়। আর এই সবকিছুই নর্দমার মাধ্যমে চলে যাচ্ছে নগরসংলগ্ন বারনই নদীতে। ২৪ ঘণ্টা বিরামহীনভাবে নর্দমার পানি গিয়ে পড়ে এই নদীতে। সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই চলছে এ ব্যবস্থা। নগরীর পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে নর্দমাগুলো অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। তবে নগরীর বেশির ভাগ বাড়ির টয়লেটের মলমূত্র নিষ্কাশনের সংযোগ নর্দমার সঙ্গে সংযুক্ত। অন্যদিকে কারখানাগুলোতেও বর্জ্য শোধনের কোনো ব্যবস্থা নেই। এই দুই কারণে নর্দমাগুলোতে প্রতিনিয়ত পড়ছে কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য ও বাসা-বাড়ির মলমূত্র।

এদিকে বারনই নদীপাড়ের মানুষ বহু বছর ধরেই পরিশোধন না করে বর্জ্যমিশ্রিত বিষাক্ত পানি  নদীতে ফেলা বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। সরেজমিনে দূষণকবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বারনই নদীর পানি দিনে দিনে আরও বিষাক্ত হচ্ছে। কালো রং ধারণ করেছে পানি। বারনই নদীপাড়ের বাসিন্দাদের ভাষ্য, নর্দমার পানির কারণে আশপাশের খাল-বিলের পানিও এখন বিষাক্ত।

নদীপাড়েই শাহীনের ছোট্ট চায়ের দোকান। তিনি বলেন, ‘এখানে তো আর নদী নেই। এটি এখন ময়লার নদী। শহরের সমস্ত ময়লা আমাদের পরিবেশ নষ্ট করে দিচ্ছে। এ ছাড়া এখানে নদীতে মাছও আর হয় না। সব মাছ মারা যায়। বর্ষা মৌসুমে প্রচুর মাছ এখানে মরে পড়ে থাকে। কেউ খায় না, নিতেও যায় না। কারণ পানিতে হাত দিলেই হাত চুলকাবে।’ এদিকে বারনই নদীর দুয়ারি এলাকায় নর্দমার বর্জ্য পড়লেও এর দূষণের প্রতিক্রিয়া দেখা যায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরেও। পুঠিয়া উপজেলায়ও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। পুঠিয়ার শিলমাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন মুকুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজশাহী সিটি করপোরেশন তাদের তরল বর্জ্য সরাসরি বারনই নদীতে ফেলছে। এতে দূষিত হচ্ছে নদী। সিটি করপোরেশন এলাকা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের বাসিন্দা হয়েও আমাদের এর শিকার হতে হচ্ছে। সাধনপুর এলাকায় বারনই নদীতে এখনো মাছ মারা যাচ্ছে।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির রাজশাহীর সমন্বয়কারী তন্ময় সান্যাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো নদীতে তরল বর্জ্য ফেলার অধিকার সিটি করপোরেশনের নেই। এমনিক এটি জাতীয় নীতিতেও নেই। সিটি করপোরেশন কোনোক্রমেই এটি করতে পারে না। প্রায় দুই দশক ধরে আমরা সিটি করপোরেশনকে বিষয়টি বলে আসছি। কিন্তু কার্যকর কোনো উদ্যোগ আজও নেওয়া হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিষাক্ত বর্জ্য পরিশোধন না করে নদীতে ফেলা বন্ধের দাবির পক্ষেই জনপ্রতিনিধিরা বলেন, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেন না। তারা কোনো উদ্যোগই নেননি। এত দিনেও তাদের তরল বর্জ্য পরিশোধনে সক্ষমতা অর্জন না করতে পারাটা লজ্জাজনক।’

এদিকে শহরের বর্জ্যে গ্রামের দূষণ ঠেকাতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের কাছেও আপাতত কোনো সুখবর নেই বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক। তবে তিনি নর্দমার পানি নদীর জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ানোর বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘আপাতত এ বিষয়ে কোনো প্রকল্প নেই। তবে আগামীতে এ বিষয়ে প্রকল্প হাতে নেওয়া হতে পারে।’