স্বেচ্ছাখেলাপিরা নিষিদ্ধ হচ্ছেন রাজনীতিতে|195446|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৭ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
স্বেচ্ছাখেলাপিরা নিষিদ্ধ হচ্ছেন রাজনীতিতে
আবুল কাশেম

স্বেচ্ছাখেলাপিরা নিষিদ্ধ হচ্ছেন রাজনীতিতে

রাজনীতিতে নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছেন ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ব্যক্তিরা। থাকতে পারবেন না কোনো পেশাজীবী, ব্যবসায়িক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনেও। শুধু তা-ই নয়, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে সরকার। নতুন করে কোনো বাড়ি-গাড়ি ও কোম্পানি নিবন্ধন করতে পারবে না, ইস্যু করা হবে না কোনো ট্রেড লাইসেন্স। রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের যোগ্যতাও হারাবেন তারা। সামাজিকভাবে কোনো ধরনের সম্মাননা নিতে পারবেন না ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা।

এসব বিধান রেখে ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২০’ করছে সরকার। আইনের খসড়াটি ইতিমধ্যে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সংসদে উত্থাপনের জন্য খসড়া বিল আকারে পাঠানো হয়েছে। এতে কোনো ধরনের ঋণখেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, তাও স্পষ্ট করা হয়েছে। খসড়া বিলের ওপর এখন মতামত নিচ্ছে এফআইডি। এতে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ‘স্বেচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের এ সংজ্ঞা ব্যাংক কোম্পানি আইনেও অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের। বিদ্যমান আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন, ১৯৯৩ রহিত করে নতুন এ আইন বলবৎ করবে সরকার। চীন ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ  নিয়ে সফল হয়েছে।

স্বেচ্ছাকৃত বা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শুধু রাজনীতিতে পদ পাওয়াই নিষিদ্ধ হচ্ছে না, তারা কোনো সামাজিক, ব্যবসায়িক, সাংস্কৃতিক কমিটির পদেও থাকতে পারবেন না। এ প্রসঙ্গে খসড়া বিলের ৩০(৬) ধারায় বলা হয়েছে, ‘স্বেচ্ছাকৃত ঋণগ্রহীতা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে কোনো সম্মাননা পাওয়ার বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইবে না এবং কোনো প্রকার পেশাজীবী, ব্যবসায়িক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক সংগঠন পরিচালনার লক্ষ্যে গঠিত কোনো কমিটির, যে নামেই অভিহিত করা হউক না কেন, কোনো পদে অধিষ্ঠিত হইতে বা আসীন থাকিতে পারিবে না।’

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই তালিকা সরকারের কাছে পাঠিয়ে তাদের বিদেশ ভ্রমণ, বাড়ি-গাড়ি নিবন্ধনসহ নতুন কোম্পানি করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ থাকবে। সরকার বিদ্যমান অন্যান্য আইন অনুযায়ী সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।

এ প্রসঙ্গে খসড়া বিলের ৩০ (৫) ধারায় বলা হয়েছে, ‘স্বেচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ গ্রহীতাদের তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের নিকট প্রেরণপূর্বক তাহাদের বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ি ও বাড়ি রেজিস্ট্রেশন, ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু, যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর এর কোম্পানি নিবন্ধনের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হইলে সরকার তদসংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।’

ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার কথা বলা হয়েছে এতে। এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘স্বেচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে তালিকাভুক্তির এক মাসের মধ্যে তার বকেয়া ঋণ আদায়ের জন্য ফাইন্যান্স কোম্পানি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করবে।

খসড়া বিলে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের দেউলিয়া ঘোষণার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো খেলাপি বা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের শনাক্ত করে সিআইবিতে রিপোর্ট করবে। খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে দেউলিয়া ঘোষণা করার লক্ষ্যে ফাইন্যান্স কোম্পানি দেউলিয়া আদালতে আবেদন করবে। দেউলিয়া আদালতে আবেদন করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ফাইন্যান্স কোম্পানিকে নির্দেশ দিতে পারবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালসহ সরকারের নীতিনির্ধারকরা একাধিকবার ‘ইচ্ছাকৃত’ ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ঋণের সুদহার কমানোর বিষয়ে আলোচনায় বারবার ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করছেন সাবেক ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। তবে কোন শ্রেণির ঋণখেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, তা নির্ধারণ করার সুনির্দিষ্ট কোনো উপায় নেই। এবার সেই উপায় বের করতে যাচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি)।

খসড়া বিলে স্বেচ্ছাকৃত বা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির সংজ্ঞা নির্ধারণ করে বলা হয়েছে, ‘ফাইন্যান্স কোম্পানি আইনের খসড়া বিলে বলা হয়েছে কারা স্বেচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা হিসেবে চিহ্নিত হইবেন যদি : যদি- তিনি তাহার নিজের বা স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রদত্ত ঋণ বা উহার অংশ বা উহার উপর অর্জিত সুদ বা উহার মুনাফা তাহার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্র্তৃক জারিকৃত নির্দেশনা অনুযায়ী পরিশোধ না করেন; বা তিনি জাল-জালিয়াতি, প্রতারণা ও মিথ্যা তথ্য প্রদানের মাধ্যমে অস্তিত্ববিহীন প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির নামে ঋণ গ্রহণ করেন; বা তিনি, যেই উদ্দেশ্যে ঋণ প্রদান করা হইয়াছিল সেই উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে উক্ত ঋণ বা ঋণের অংশ ব্যবহার বা স্থানান্তর করেন; বা তিনি ঋণের বিপরীতে প্রদত্ত জামানত ঋণ প্রদানকারী ফাইন্যান্স কোম্পানির অজ্ঞাতসারে হস্তান্তর বা স্থানান্তর করেন।’

বাংলাদেশ ব্যাংক ও এফআইডির কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যমান ব্যাংক কোম্পানি আইন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির কোনো সংজ্ঞা নেই। তাই ব্যবসা করতে গিয়ে লোকসানের কারণে খেলাপি হওয়া ও খেলাপি হওয়ার উদ্দেশ্যে ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদা করার সুযোগ নেই। তবে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গভর্নর থাকাকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পলিসি রিসার্চ ইউনিটের দায়িত্বে ছিলেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান-বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরি। তখন তিনি কয়েকটি খেলাপি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন যাচাই করে দেখতে পান যে, কোম্পানিগুলো মুনাফা করেছে, পরিচালকরা কোম্পানি থেকে মুনাফা নিয়েছেন, শুধু ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছেন না। তখন ওই কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তরফে যোগাযোগ করলে পরিচালকরা জানান যে, ঋণ সংক্রান্ত মামলা থাকার কারণে কোম্পানি মুনাফা করলেও তারা ঋণ পরিশোধ করছেন না। তখন এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হিসেবে উল্লেখ করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তারা। তখন থেকেই ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি শব্দের ব্যবহার হতে শুরু করে। তবে কাদের ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো আইন, বিধিমালা, নীতিমালা বা কোনো সার্কুলার হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুস্তফা কে মুজেরি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২০-এর খসড়া বিলে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের যে সংজ্ঞা ও শাস্তি নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে, তা খুবই যৌক্তিক। কারণ, দেশে বড় ঋণখেলাপিদের বেশিরভাগই ঋণ পরিশোধ না করার পরিকল্পনা করেই বৈধ ও অবৈধভাবে ঋণ নিচ্ছে এবং নেওয়ার পর পরিকল্পনা অনুযায়ী মোটেই কোনো অর্থ পরিশোধ করছেন না। তাদের জন্যই আর্থিক খাতে বিপর্যয় ও দুর্যোগ নেমে আসছে।

তিনি বলেন, শুধু আইনে সংজ্ঞা নির্ধারণ করে শাস্তির বিধান রাখলেই হবে না। সংজ্ঞা অনুযায়ী ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। না হলে ঋণ নিয়ে ইচ্ছা করে খেলাপি হওয়ার যে সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছে, তা দমন করা যাবে না।

খসড়া বিলে ঋণের সুদ মওকুফ ও মুনাফা মওকুফ করার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কোনো ফাইন্যান্স কোম্পানি তার কোনো বর্তমান বা সাবেক পরিচালক বা অন্য কোনো ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানির বর্তমান ও সাবেক পরিচালকের ঋণের সুদ মওকুফ করতে পারবে না। এমন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদ মওকুফ করা যাবে না, যাতে ফাইন্যান্স কোম্পানির কোনো পরিচালক, জামিনদার, পরিচালকের অংশীদার, ম্যানেজিং এজেন্ট হিসাবে স্বার্থসংশ্লিষ্টতা রয়েছে। স্বেচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির ঋণের সুদও মওকুফ করা যাবে না।

খসড়া বিলে বেআইনি অর্থায়ন ব্যবসারত ব্যক্তির কাছে থাকা নগদ অর্থ ও অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, শেয়ার, সম্পত্তির স্বত্ব-দলিল বা অন্য কোনো দলিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজের নিয়ন্ত্রণে নেবে বলে উল্লেখ রয়েছে।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, মালয়েশিয়ায় ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ গ্রাহকরা বিদেশে যাওয়ার অনুমতি পান না। তবে খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কঠোর পদক্ষেপ নেয় চীন। দেশটিতে খেলাপিদের ওপর উড়োজাহাজ ও উচ্চ গতির ট্রেনের টিকিট কেনায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। করপোরেট সংস্থার নির্বাহী কিংবা প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করতে পারেন না খেলাপিরা। এমনকি খেলাপিরা ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র ব্যবহার করে কোনো হোটেল সুবিধা নিতে পারেন না, কিনতে পারেন না ভবন বা ফ্ল্যাট। চীনের কিছু প্রদেশে খেলাপিদের সামাজিকভাবে ও সর্বজনীনভাবে লজ্জা দেওয়া হয়। যেমন গত আগস্টে দক্ষিণ-পশ্চিম সিচুয়ান প্রদেশের একটি আদালত ২০ খেলাপি গ্রাহকের ফোনে রেকর্ডকৃত বার্তা ছেড়ে দেয়, যাতে কেউ ফোন দিলে ‘আপনি যাকে ফোন দিয়েছেন, দেনা পরিশোধ করতে না পারায় আদালত তাকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে’ এমন মেসেজ বেজে উঠে।