সোনারগাঁও লোককারুশিল্প মেলা: ঐতিহ্যের অনুরণন|198056|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ১৫:৫২
সোনারগাঁও লোককারুশিল্প মেলা: ঐতিহ্যের অনুরণন
আরফাতুন নাবিলা

সোনারগাঁও লোককারুশিল্প মেলা: ঐতিহ্যের অনুরণন

মেলার মাঠে বাঁশ কাঠের বানানো স্টলে বসে মাটি দিয়ে ছোট ছোট হাঁড়ি, কাপ, প্লেট, গ্লাস বানাচ্ছেন বিপদহরী পাল। নিখুঁত হাতে চাকা ঘুরিয়ে সন্তর্পণে বানানো শেষে উঠিয়ে রাখছেন মাটিতে বিছানো চটের ওপর। পাশেই তাকে সাহায্য করছেন স্ত্রী।

দুজনের সামনে কাঠের একটি ছোট টেবিলের ওপর সাজানো রয়েছে রঙ-বেরঙের এর মাটির নানা জিনিস। মাঠে বেড়াতে আসা মানুষজন হেঁটে হেঁটে জিনিস দেখছিলেন, কেউ হয়তো কিনে নিচ্ছিলেন, কেউবা শুধু দেখে ভালো লাগা নিচ্ছিলেন।

কাজের মাঝে কিছুটা বিরতি নিতেই জিজ্ঞেস করলাম, কীভাবে করেন এত নিখুঁত হাতের কাজ? কোনো হাঁড়িতে একটু ছোট বড় বা অসমান জায়গা নেই। হেসে বললেন, “বছরের পর বছর সাধনা করলে তবেই না এমন নিখুঁত হাতের কাজ তৈরি হয়।”

বলছিলাম সোনারগাঁও লোককারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসবে আসা মৃৎশিল্পী বিপদহরী পালের কথা। তার মতো আরও কয়েকজন মৃৎশিল্পী আছেন মেলায়। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে ১৫ জানুয়ারি শুরু হয়েছে এই মেলা, চলবে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

এবারের মেলায় ১৭০টি স্টলে অংশ নিয়েছেন দেশের নানা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা ৬০ জন কারুশিল্পী। অংশ নিয়েছে কিশোরগঞ্জের টেরাকোটা শিল্প, চট্টগ্রামের নকশি পাখা, মুন্সিগঞ্জের শীতল পাটি, মানিকগঞ্জের তামা-পিতলের কারুশিল্প, রাজশাহীর মাটির হাঁড়ি, ঝিনাইদহের শোলা, সিলেটের মণিপুরি, ঢাকার বাঁশের তৈরি চিত্রশিল্প ও ক্যানভাস, সোনারগাঁয়ের জামদানি- পাট ও কাঠের কারুশিল্প, নকশি কাঁথা, হাতপাখা, কাগজের নানা হস্তশিল্প, বেতের ঝুড়ি ইত্যাদি।

মেলায় প্রতিদিন গ্রামীণ নানা ধরনের খেলা যেমন; লাঠি খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো ইত্যাদির আয়োজন করা হয়। আরও হয় লোকজ জীবন প্রদর্শনী, লোকজ গল্প বলা, পিঠা প্রদর্শনী ইত্যাদি। কারুমঞ্চে প্রতিদিন আয়োজন থাকছে বাউলগান, পালাগান, কবিগান, জারি-সারি, ভাওয়াইয়া ও ভাটিয়ালি গানের।

‘রাধাচূড়া’ দোকানে টেবিল-চেয়ারে বসে আনমনে পাখার নকশা করে যাচ্ছিলেন শবিতা সূত্রধর। পারিবারিক এই ব্যবসায় বিয়ের পরও তিনি যুক্ত আছেন বাবা-মায়ের সঙ্গে। বাবা বানান কাঠের হাতি-ঘোড়াসহ নানা জিনিস। আর মা-বোনেরা মিলে বানান নানা রঙের পাখা। হাত পাখাগুলোর নামও দারুণ। পদ্মপাতা, শঙ্খমালা, আয়নাকোটা, নিশানকাটা বা সিঙাড়া। নামের সঙ্গে যেন নকশার মিল থাকে সেদিকে থাকে পূর্ণ নজর। ডিজিটালের এই যুগে বাঙালিয়ানার সকল নিজস্বতাই যেন হারাতে বসেছে। তবু শবিতার মতো অনেক নারীই ভালোবাসার টানেই ধরে রেখেছেন নকশি পাখার কাজ।

শঙ্খমালায় নানা ধরনের কাঠের জিনিস, চুড়ি, মালা, দুলসহ ঘর সাজানোর বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করছেন গোলজার ভূঁইয়া। স্ত্রীসহ সন্তানরাও তার সঙ্গে রয়েছেন মেলায় সারাদিন। ১৫ বছর ধরে এই ব্যবসা করলেও মেলায় দোকান দেন ৬ বছর ধরে। অন্যান্য বছরের চেয়ে এ বছর কেনাকাটার পরিমাণ কিছুটা কম বলে জানালেন তিনি।

জামদানি শাড়ির কথা বললে যে জায়গার নাম চোখের সামনে আসে সেটি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও। বাংলাদেশের এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তারা অবিরত। তবু চাহিদা আর জোগানে কিছুটা সামঞ্জস্য রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আগে যেমন তাঁতিরা পটিতে সব শাড়ি বানাতেন এখন সেগুলো বানানো হচ্ছে জাপানি তাঁতে। কেনাবেচা এ বছর মোটামুটি হলেও সারা বছরের তুলনায় খুব বেশি না বলে জানান সানি জামদানি উইভিং ফ্যাক্টরির মো. মাফিজুল। ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে সকলকেই এই তাঁতিদের পাশে দাঁড়ানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।

বাঁশের গায়ে আঁকানো রয়েছে নানা ধরনের চিত্র। শাড়ি পরিহিতা কোনো রমণী হয়তো কারো অপেক্ষায় গাছের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে, প্যাঁচা উৎসুক চোখে তাকিয়ে রয়েছে সামনে, গ্রামীণ ঘর, পাখি, হাতিসহ নানা কিছু বাঁশের গায়ে নিজ হাতে আঁকিয়েছেন রতন। এবার তিনি স্টলে নতুন সংযোজন করেছেন ল্যাম্পশেড। সেটির গায়েও আছে নানা নকশা।

ঐতিহ্য হারাতে বসেছে বাংলার এক সময়ের জনপ্রিয় টেপা পুতুল। বর্তমানে কিশোরগঞ্জে কয়েকজন মৃৎশিল্পী এই কাজের ধারা ধরে রাখলেও খুব বেশি লাভ করতে পারছেন না। বর্তমানে প্লাস্টিক বাজার দখল করে নেওয়ায় তাদের থেকে মুখ ফিরিয়েছেন ক্রেতারা। কিছুটা আক্ষেপের সুরেই এমন কথা জানান ৪৫ বছর ধরে টেপা পুতুল তৈরির কারিগর সুনীল চন্দ্র পাল। ক্ষুদ্র কিছু কাজ করলেও বিপুল কাজ করেন শুধু বছরের এই সোনারগাঁ মেলাতেই। এ ছাড়া চারুকলায়ও তার তৈরি পুতুল নিয়ে আসা হয় বিক্রির জন্য।

কারুশিল্পীদের মধ্যে আরও ছিলেন সরা ও পটচিত্রশিল্পী নমিতা চক্রবর্তী। শাখা-ঝিনুক নিয়ে ছিলেন বাবু অমল চন্দ্র দত্ত, বাঁশ ও বেতের জিনিস নিয়ে ছিলেন শাহ আলম, তামার বিভিন্ন শো-পিস, গহনা নিয়ে ছিলেন মানিক সরকার।

লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের লোকজ মঞ্চে এ বছরের মেলা উদ্বোধন করেছেন সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। সোনারগাঁও শহরের ইতিহাস এবং মেলায় আসা দর্শকদের লোকজ এই আয়োজন নিয়ে জানাতে ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ নিয়মিত এই কাজটি করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।