বসন্তে-ভালোবাসায় সোনায় সোহাগা|198910|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
বসন্তে-ভালোবাসায় সোনায় সোহাগা
কামরুল আহসান

বসন্তে-ভালোবাসায় সোনায় সোহাগা

একেই হয়তো বলে সোনায় সোহাগা! একে তো পহেলা ফাল্গুন, তার ওপর ভালোবাসা দিবস। শীতঘুম কাটিয়ে বসন্তে জাগে প্রকৃতি। মানুষ প্রকৃতিরই অংশ। তাই তার মনে জাগে প্রেম। বসন্ত আর প্রেমের এই যোগসূত্র নিয়ে লিখেছেন কামরুল আহসান

একের ভেতর দুই

তামান্নার মনটা অবশ্য একটু খারাপ। একই দিনে দুটো সুন্দর দিন পড়ে গেল! কত শখ করে রেখেছিল পহেলা ফাল্গুনে পরবে একটা হলুদ শাড়ি, ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবসে পরবে একটা লাল টুকটুকে শাড়ি। সেটা আর হলো না। মাত্র এক সপ্তাহ আগে সে পত্রিকা পড়ে জানতে পারল বাংলা বর্ষপঞ্জিতে কিছু পরিবর্তন এসেছে। ১৯৭১ সালের কয়েকটি ঐতিহাসিক দিনের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হয়েছে নতুন বাংলা বর্ষপঞ্জি। ফলে একটু এদিক-ওদিক হয়েছে বাংলা মাসের তারিখ। নতুন এই বর্ষপঞ্জিতে জাতীয় দিবসের বাংলা তারিখ এখন থেকে একই থাকবে প্রতি বছর। গত অক্টোবর মাসেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন আকারে আকারে প্রকাশ করেছে। এটা সে জানতই না!

শায়লা অবশ্য খুব খুশি। গত বছর পহেলা ফাল্গুনের দিনটা তার পার করতে হয়েছে অফিসে। এবার পরিবারের সঙ্গে দিনটা পার করতে পারবে। সবচেয়ে ভালো ব্যাপার এদিন আবার শুক্রবার! ছুটির দিন সবাই মিলে কোথাও ঘুরতে যাওয়া যাবে।

রায়হানের মেজাজ খারাপ। একই দিনে দুটো বিশেষ দিন, ঘর থেকে বেরোনোর উপায় আছে? ভিড়ে চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে যাবে না! কিন্তু, না বেরিয়েও তো উপায় নেই। সেদিন একটু বইমেলার দিকে না গেলে হয় নাকি! ঝাঁক ঝাঁক হলুদ পরীরা নেমে আসবে। এমন উৎসব না দেখলে চোখ জুড়াবে কী করে! তার বসন্ত এমনিতেই ফুরিয়ে আসছে। বসন্ত যায়, বসন্ত আসে, তার জীবনে এখনো কেউ এলো না। এইসব দিনে প্রাণটা তাই খুব বেশি হু হু করে। ফেইসবুকে তাই সে একটা স্ট্যাটাস দিয়ে দিল, তুমি নাই তুমি নাই বাঁশরি...কত ফাগুন যায় বলো কী করি...

আহা আজি এ বসন্তে...

আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে, এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়... সখীর হৃদয় কুসুম কোমল, কার অনাদরে আজি ঝরে যায়... রবিঠাকুরের এই গান শুনলে প্রাণ হায় হায় করে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বিরল। প্রাণের দোসর যার আছে তারও কেমন হাহাকার জাগে! আসলে এই হাহাকার সুন্দরের প্রতি অবিরল আকাক্সক্ষার। মানুষ মাত্রই সুন্দরের পূজারী। আর এই সুন্দর কখনোই পূর্ণতা পায় না। পায় না বলেই সে প্রতি মুহূর্তে আরও সুন্দর হতে চায়। এ এক অবিরাম প্রক্রিয়া। বসন্ত প্রকৃতির সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে আবির্ভূত হয়। তাও এই সৌন্দর্য কেমন যেন বেদনা জাগায়। বেদনা জাগার কারণ সৌন্দর্য খুব ক্ষণস্থায়ী। প্রস্ফুটিত ফুল দেখে মুগ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মনে পড়ে এই ফুল অল্প সময়ের মধ্যেই ঝরে যাবে। এ যেন জীবনেরই প্রতীকী রূপ। ক্ষণস্থায়ী বলেই তা প্রবল আরাধ্যের। ওই আরাধনার নামই তো ভালোবাসা।

বসন্তের সঙ্গে ভালোবাসা শব্দটি কেমন যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। কাউকে একটু ফুরফুরে দেখলেই আমরা বলি, ‘কী হৃদয়ে বসন্ত এসে গেছে!’ যৌবনকালকে বসন্তের সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়- ‘বসন্ত আজ জাগ্রত দ্বারে’। প্রকৃতির ছাপ মানুষের মনের ওপর প্রবলভাবেই পড়ে। বর্ষায় একরকম, শীতে আরেক রকম, বসন্তে আরেক রকম। বসন্তের মাতাল সমীরণ মানুষের মনকে যেমন করে দোলা দেয় আর কোনো ঋতুই সম্ভবত এতটা কাতর করে না। ঋতুরাজ বসন্ত তাই যৌবনের প্রতিচ্ছবি। আর যৌবনই ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ সময়।

ভালোবাসা আসলে কী

ভালোবাসা যে আসলে কী জিনিস তার সঠিক সংজ্ঞা দেওয়া একটু কঠিন। মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড ভালোবাসাকে কেবল যৌনতা দিয়েই চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি এমনও বলেছিলেন, যার সঙ্গে মানুষের যৌন সম্পর্ক যত গভীর তাকেই মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। যৌন সম্পর্কের মাধ্যমেই পরিবার গঠিত হয়। যদিও যৌনতাই পরিবার গঠনের একমাত্র উপাদান নয়। কিন্তু, এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না যে আমরা পরিবারের যে-সব সদস্যকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, বাবা-মা, ভাই-বোন, সন্তানাদি তাদের সবার সঙ্গেই আমাদের বন্ধনের সুতোটি কোনো না কোনোভাবে যৌনতার সূত্রেই তৈরি হয়। তবুও শুধু যৌনতা দিয়েই ভালোবাসাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাহলে আমরা একটা পশু-পাখি কিংবা গাছের পাতাকে কেন ভালোবাসি! দূর আকাশের একটি নক্ষত্রের জন্য কেন আমাদের মন হাহাকার করে ওঠে?

আরেক মনোবিদ এরিক ফ্রম বলেছিলেন, ‘দ্য সোল হ্যাজ নো সেক্স।’ অর্থাৎ আত্মার কোনো লিঙ্গ নেই। এরিক ফর্ম তার ‘আর্ট অব লাভিং’ গ্রন্থে ভালোবাসার সংজ্ঞায়ন করতে গিয়ে বলেছেন, আমরা সবাই আমাদের মায়ের বিচ্ছিন্ন সত্তা। সেই বিচ্ছিন্নতা পূরণ করার জন্যই আমরা ভালোবাসি। ভালোবাসা হচ্ছে বিশ্বমায়ের বিরাট একটা জগৎ। যেখানে আমরা শিশুর মতো ঘুমিয়ে থাকি। মানুষের অস্তিত্বের যদি কোনো অর্থ থাকে সেটা হচ্ছে এই ভালোবাসার মধ্যেই। ‘ভালোবাসা’ শুধু একটা শব্দ মাত্র না, ভালোবাসা হচ্ছে কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব-কর্তব্য। কোনো মা যদি তার সন্তানকে দুধ না খাওয়ায়, কোলে নিয়ে ঘুম না পাড়ায়, আদর-যতœ না করে তাকে কি আমরা কোনোদিন মায়ের ভালোবাসা বলব? কেউ যদি বলে, ‘আমি ফুল ভালোবাসি’, কিন্তু, ফুলগাছের প্রতি সে কোনো যতœ নিল না, তবে তাকে আমরা ভালোবাসা বলতে পারি না। ঈশ্বর জোনাহ্কে বলছেন, যেখানে ভালোবাসা আছে সেখানে কিছু পরিশ্রমও আছে, যেখানে পরিশ্রম নেই সেখানে কোনো ভালোবাসা নেই।

ভালোবাসা বিষয়টি কী, এই নিয়ে প্রচুর আধ্যাত্মিক, মনস্তাত্ত্বিক, বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সখি, ‘ভালোবাসা কারে কয়/সে কি কেবলই যাতনাময়?’ আসলেই কি এর কোনো উত্তর আছে? পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রহস্য বের করা সম্ভব, কিন্তু, প্রেম-ভালোবাসা যে কী জিনিস তার রহস্য বের করা অসম্ভব! আসলেই কি তাই। ব্যাপারটা কিছুটা রহস্যময় হলেও মানুষ তার নাড়ি-নক্ষত্র খুঁজে বের করার জন্য পিছিয়ে নেই। আদিমকাল থেকেই মানুষ তার জীবনের একটা অর্থ খুঁজে বেড়িয়েছে। মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করেছে, আমি কে? কোত্থেকে এলাম? এই পৃথিবীতে আমার কী কাজ? এই সমস্ত প্রকৃতি, বিশ্বচরাচরের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক? এর সমস্ত উত্তর মানুষ খুঁজে পেয়েছে একমাত্র ভালোবাসার মধ্যে। ভালোবাসাই মানুষের একমাত্র আশ্রয়। অসীমের দিকে চোখ মেলে মানুষ খুঁজে পেয়েছে ঈশ্বরকে। ঈশ্বর হচ্ছেন সেই ধারণা যার নামে সমস্ত মানুষ অনন্ত অসীমের সঙ্গে এক হয়। ঈশ্বর হচ্ছেন ভালোবাসার অপর নাম। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, প্রাচীন ধর্ম-দর্শনের হাত ধরেই মানুষের মনে ভালোবাসার বোধ জাগ্রত হয়েছে। এটা শুধু শারীরিক কোনো ব্যাপার না। এর সঙ্গে যুক্ত আছে আত্মিক বিকাশ, বৌদ্ধিক মনন। পরবর্তীকালে বিবর্তনবাদী দার্শনিকরা এসেও আবিষ্কার করেছেন কেন মানুষের মনে ভালোবাসা জেগে ওঠার প্রয়োজন হলো? এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা রয়েছে। মানুষ একটা কেমিক্যাল পদার্থ বটেই। তবে শুধু হরমোনগত কারণেই যে মানুষ ভালোবাসে তা না। ভালোবাসা সত্যিই বাস্তব বোধবুদ্ধি বহির্ভূত এক অনন্ত রহস্যময় অনুভূতির নাম। মানুষ যাকে ভালোবাসে তাকে তো আবার ঘৃণাও করে। মানুষ তো নিজেকেও ঘৃণা করে। অন্যকে ঘৃণা করে বলেই নিজেকে ঘৃণা করে, আবার নিজেকে ঘৃণা করে বলেই অন্যকে ঘৃণা করে। সাবজেক্ট ও অবজেক্টের এ এক অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব।

প্লেটো তার ‘সিম্পোজিয়াম’-এ বলেছিলেন, মানুষ সুন্দরকে ভালোবাসে। মানুষ যেহেতু অন্য কোনো সুন্দরকে ভালোবাসে, তার মানে হচ্ছে সে নিজে সুন্দর নয়, কিংবা তার মধ্যে সুন্দরের কিছু অপূর্ণতা আছে বলেই সে অন্য কোনো সুন্দর কামনা করে নিজেকে পরিপূর্ণ করতে চায়।

ভালোবাসা, প্রেম নয়!

মোটামুটি বয়ঃসন্ধিকাল যার অতিক্রম হয়েছে সেও এখন জানে ভালোবাসা ও প্রেমের পার্থক্য। আমরা সবাইকেই ভালোবাসতে পারি। কিন্তু, প্রেম তো হয় একজনের সঙ্গে। সেই বিশেষ মানুষটির সঙ্গে আমরা ঘরবাঁধার স্বপ্ন দেখি, সারা জীবন একসঙ্গে থাকতে চাই। খুব আধ্যাত্মিক আলাপে না গেলে এ কথা সবাই মানবেন যে, প্রেম হয় বিশেষ এক মানুষের সঙ্গে, সেখানে লিঙ্গগত পার্থক্য থাকে এবং সেটা বিশেষ একটা অনুভূতি। সেই অনুভূতিও ব্যাখ্যার অতীত। তখন স্রেফ মরে যেতে ইচ্ছা করে। সবকিছু নতুন মনে হয়, রঙিন মনে হয়। আবার মনের মানুষটার একটু অবহেলায় এক মুহূর্তেই সব বিষাদে ছেয়ে যায়। প্রেমের টানে ঘর ছাড়ার গল্প অসংখ্য। রাজা তার সিংহাসন ছেড়ে দিতে পারেন প্রেমের টানে। প্রেমের জন্য কলঙ্কের ভাগীদার হতে পারে পাগলপ্রায় প্রেমিক-প্রেমিকা। সমাজসংসার তুচ্ছ করে প্রেম এক আলাদা রাজত্ব ঘোষণা করে। তলস্তয়ের সৃষ্টি করা চরিত্র আন্না কারেনিনার সবই ছিল। সুন্দর সংসার, সমাজে সম্মান। তাও তার মনে হচ্ছিল সে যেন ভেতরে ভেতরে মরে যাচ্ছে। স্বামীর সঙ্গে তার সম্পর্কটা ছিল নেহাতই সাদামাটা ঘরকন্নার। প্রেমহীন জীবন তো মৃত্যুরই শামিল। তাই সে বাঁচতে চেয়েছিল। ঘর ছেড়ে পালিয়েছিল  ভ্রনস্কির হাত ধরে। তবুও সে বাঁচতে পারল না অবশ্য। ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে জীবন দিতে হলো। তলস্তয় বলেছিলেন, আন্নাকে বিচার করো না, পারো তো তাকে করুণা করো। সত্যিই প্রেমিক-প্রেমিকা এত অসহায় হয়ে যায় যে তাদের আর সামাজিক মানদণ্ডে বিচার করা যায় না।

লাইলী-মজনু ও রোমিও-জুলিয়েট

লাইলী-মজনু ও রোমিও-জুলিয়েট পৃথিবীর বিখ্যাত দুটি প্রেমকাহিনী। একটি আরব্য লোকগাথা, আরেকটি শেকসপিয়ার রচিত বিয়োগান্ত নাটক। এ-দুটি প্রেমকাহিনী সারা বিশ্বে এত জনপ্রিয় যে এর তুল্য প্রেমের গল্প সম্ভবত তৃতীয়টি নেই। এখন প্রেমে উন্মত্ত প্রেমিক-প্রেমিকাকে সম্বোধন করা হয় লাইলী-মজনু অথবা রোমিও-জুলিয়েট বলে। প্রেমের জন্য এমন আত্মত্যাগের উদাহরণও খুব বেশি নেই। রোমিও-জুলিয়েট গল্পে যেমন শ্রেণিবিভাজনকে উপস্থাপন করে, তেমনি লাইলী-মজনুর গল্পটি ফুটিয়ে তুলে অধ্যাত্ম প্রেমের দৃষ্টান্ত। লাইলী-মজনুর প্রেমকাহিনী তো মুসলমান সমাজে সুফি দর্শনের মর্যাদা পেয়েছে। লাইলী-মজনুর গল্পটিতে এমন কিছু মিথ প্রচলিত আছে যে ঘটনাটিকে অনেকে সত্য বলেই ধরে নেন। অনেকে গল্পটির অনেক রকম রূপান্তর করেছেন। লাইলী-মজনুর গল্পে একটা ঘটনা আছে এরকম- মজনু লাইলী লাইলী বলে কাঁদছে। তার কান্না থামানোর জন্য তার বাবা একটু মাটি এনে তার চোখে নিচে লাগিয়ে দিয়ে বললেন, এ হচ্ছে লাইলীর বাড়ির মাটি। এ মাটির ওপর দিয়ে লাইলী হেঁটেছে। তখন মজনু আর চোখের জলও ফেলতে পারছে না। যদি চোখের জলে লাইলীর পায়ের স্পর্শ লাগা মাটি ধুয়ে যায়! আরেকটি গল্প আছে এরকম, এক লোক নামাজ পড়ছেন। মজুন লাইলী লাইলী করতে করতে তার সামনে দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে। নামাজরত ব্যক্তিটি তখন নামাজ বাদ দিয়ে মজনুকে ধরে বললেন, এই পাগল, তুই দেখছিস না আমি নামাজ পড়ছি? সামনে দিয়ে দৌড়ে গেলি কেন? মজনু বলল, তুমি যদি খোদার প্রেমে পাগল থাকতে তাহলে কে সামনে দিয়ে দৌড়ে গেল দেখতে না। লাইলীর প্রেমে পড়ে আমার হুঁশ নেই। খোদার প্রেমে তো তুমি বেহুঁশ হতে পারলে না! আরেকটি গল্প আছে এরকম- মজনুর কান্না শুনে লাইলী এসেছে মজনুর সামনে। লাইলীও কাঁদতে কাঁদতে বলছে, চোখ খোলো, মজনু, দেখো আমি এসেছি। মজনু চোখ বন্ধ রেখেই বলল, চোখ খুলে তোমাকে আমার দেখতে হবে কেন? আমি তো চোখ বন্ধ রেখেই তোমাকে দেখতে পাই। আরেকটি গল্পে আছে এরকম- মজনু চোখ খুলে বলল, তুমি কে! আমার লাইলী কেন এমন সাধারণ নারী হবে! আবার আরেকটি গল্পে আছে, লাইলী-মজনুর কথা শুনে নাকি এক রাজা লাইলীকে খবর দিয়ে নিয়ে গেছেন। কী সুন্দর নারী সে, যার জন্য একজন পাগল হয়ে গেছে দেখার জন্য। লাইলীকে দেখে রাজা বিরক্ত হয়ে মজনুকে বললেন, আমার দাসীও তো তারচেয়ে সুন্দর। কী দেখে তুমি পাগল হলে! মজুন বলল, আপনি তো প্রেমিকের চোখ দিয়ে দেখেননি!

এই গল্পগুলোতে অনেক কিছুই আবিষ্কার করার আছে। অধ্যাত্ববাদ, প্রেমিকের মনস্তত্ত্ব, সেই সময়ের সংস্কৃতি। আবার এ কথাও সত্য, বাস্তব বুদ্ধি এগুলো বুঝা সম্ভব নয়। যতই আমরা পাগল হই, বাস্তববুদ্ধি ঠিকই রাখি। আবার এ কথাও সত্য, প্রেম হিসাব-নিকাশ-বিচারবুদ্ধি-বহির্ভূত ব্যাপার। যেখানে হিসাব-নিকাশ, বিচারবুদ্ধি থাকে সেখানে আর প্রেম থাকে না। প্রেম হচ্ছে তাই আগে ঝাঁপ দিলাম, তার পর যা হওয়ার হোক। চিন্তাভাবনা করে ঝাঁপ দেওয়ার নাম প্রেম না, ব্যবসা।

প্রেম-ভালোবাসার সাংস্কৃতিক বিবর্তন

প্রেম হয়তো চিরকালই ছিল। কিন্তু, সেটা সবকালে একরকম ছিল না। যুগে যুগে প্রেমের অনেক সাংস্কৃতিক বিবর্তন হয়েছে। এক সময় আমাদের এখানে প্রেম বলতে বোঝানো হতো পরকীয়া। এর কারণ মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত খুব অল্প বয়সে, আর স্বামীরা হতেন বেশি বয়সী। মেয়েটি যৌবনবতী হতে হতেই স্বামীরা বুড়ো হয়ে যেতেন। অনেক স্বামী হয়তো মারাই যেতেন। তখন বিধবা বিবাহেরও তেমন প্রচলন ছিল না। বিশেষ করে হিন্দু সমাজে। সেটা তো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় এসে করে গেলেন। ফলে সেই বিধবা নারীরা পরকীয়ায় বাধ্য হতেন। সমাজে এর নাম ছিল ব্যভিচার। এখনো তাই প্রেমের প্রতি অনেকের বিরূপ ধারণা। আধুনিক মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজে প্রেম প্রবেশ করেছে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই। তারপর তো নাটক-সিনেমা এলো, গল্প-উপন্যাস এলো। ফেইসবুক এলো। এখন তো প্রেম ঘরে ঘরে। বয়ঃসন্ধিকাল পার হওয়ার আগেই ছেলেমেয়েরা পাগল হয়ে ওঠে প্রেম করার জন্য। প্রেমহীন জীবন যেন ব্যর্থ। এইসব বিশেষ দিবসগুলোও প্রভাব ফেলে। গ্রাম-শহর ভেদে তার পার্থক্যও আছে নিঃসন্দেহে। আছে মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রভাব। বাজার চায় যে-কোনো দিবস ধরে পণ্য বিক্রি করতে। এই বাজারি ব্যবস্থায় ভালোবাসাও পণ্য। একজন নারী নিজেকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য নিজের শরীরের দিকে মনোযোগ দেয়। হাল-জামানার ফ্যাশন নিয়ে মাতামাতি করতে থাকে। আর একজন পুরুষ সেই নারীটিকে জয় করার জন্য, নিজেকে সেই নারীটির যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য মনোযোগ দেয় অর্থ রোজগারের দিকে। তারপর তারা যখন এক হয়, পরস্পরকে ভালোবাসে, সেটা একটা বাজারি ভালোবাসা হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে প্রকৃত ভালেবাসা বলে কিছু থাকে না। কারণ, তারা কেউ কাউকে ভালোবাসে না, তারা শুধু ভালোবাসা কিনতে চায়। কিন্তু, ভালোবাসা তো পণ্য নয়। ভালোবাসা একটা শিল্প। তাই অন্যান্য শিল্পের মতোই ভালোবাসা শিখতে হয়। নিরন্তর চর্চার মধ্য দিয়েই তা অর্জন করতে হয়।