সৌদি আরব থেকে নারী শ্রমিকদের ফেরার আকুতি|198982|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
সৌদি আরব থেকে নারী শ্রমিকদের ফেরার আকুতি
সরোয়ার আলম, সৌদি আরব থেকে ফিরে

সৌদি আরব থেকে নারী শ্রমিকদের ফেরার আকুতি

রোজিনা বেগম (ছদ্মনাম)। বয়স ৩৮ বছর। বাড়ি রংপুর। বছর তিনেক আগে পাড়ি জমান সৌদি আরব। যাওয়ার আগে আশা ছিল ভাগ্য খুললে হাল ধরবেন তার সংসারের। কিন্তু তার স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছে দালাল চক্র। চাকরির পরিবর্তে তাকে পাঠানো হয়েছে পতিতালয়ে। রিয়াদের একটি বাসার ভেতরেই এই ব্যবস্থা। বাঁচার জন্য দেশে ফিরতে আকুতি জানিয়েছেন রোজিনা। ভাগ্য ফেরাতে কুমিল্লার পারুল বেগম বছর দুয়েক আগে জেদ্দায় যান। তারও একই দশা হয়েছে। নির্যাতন ছাড়া তার ভাগ্যে আর কিছুই জুটছে না। তিনিও বাঁচতে দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন। রোজিনা ও পারুলের মতো সৌদিপ্রবাসী লাখো বাংলাদেশি নারীর দশা প্রায় একই। 

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্যানুযায়ী, সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসের নিয়ন্ত্রণে থাকা সেফ হোমগুলোতে গড়ে আড়াইশ নারীশ্রমিক আশ্রয় নিয়েছেন। গত চার বছরে অন্তত ছয় হাজার নারী সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে এসেছেন। ওইসব নারীর একটি বড় অংশ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার। ২০১১ সালে ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশ সৌদি আরবে নারীশ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দেয়।

তার অন্যতম কারণ ছিল নারীশ্রমিকদের ওপর নির্যাতন। এ অবস্থায় গত এক বছরে হাজারের বেশি নারী সৌদি থেকে ফিরেছেন এবং লাশ ফিরেছে ১১৯ জনের।

এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০০৮ সাল থেকে সৌদি শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বন্ধ ছিল। সরকার নানা দেনদরবার করে কয়েক বছর পরই সৌদি আরবে শ্রমবাজার চালু করে। আর এরই অংশ হিসেবে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সৌদি আরবে নারীশ্রমিক পাঠাতে রাজি হয়। কিন্তু নারীশ্রমিকদের পাঠিয়ে কোনো লাভ হচ্ছে না। সৌদি আরবের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে মিনি পতিতালয় গড়ে তুলেছে ওই দেশের নিয়োগদাতা বিভিন্ন কোম্পানি। নারীশ্রমিকদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন করা হচ্ছে বলে আমরা তথ্য পাচ্ছি। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সম্প্রতি যারা দেশে ফিরে এসেছেন তাদের মধ্যে যৌন নির্যাতনের কারণে অনেকে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছেন। এছাড়া শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন অনেকেই। গত চার বছরে ২ লাখেরও বেশি নারীশ্রমিক পাঠানো হয় সৌদি আরবে।

সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রিয়াদ ও জেদ্দায় দুটি ‘সেফ হোম’ আছে। যেসব নারীকর্মী বিপদে পড়েন, তাদের সেখানে আশ্রয় দেওয়া হয়। আবার অনেকে পরিবারের কথা চিন্তা করে নির্যাতন সহ্য করে চাকরি করছেন। অনেকে দেশে ফিরতে আকুতি জানান। যারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন তাদের সহায়তায় এগিয়ে যাচ্ছি।

সৌদি আরবের মক্কা, মদিনা ও জেদ্দায় বেশ কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রবাসে গিয়ে কষ্টের আয়ে যেসব নারীশ্রমিক বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন, তারা শিকার হচ্ছেন অমানবিক নির্যাতনের। আবার কেউ কেউ নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরছেন লাশ হয়ে। সৌদিতে মালিকের অত্যাচারে অনেকে পালিয়ে দেশে ফিরে আসছেন। শ্রমিকদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের বিষয়ে মুখ খুললেও লজ্জায় মুখ বন্ধ রাখেন অনেকেই। আবার কেউ কেউ পরিবারের কথা চিন্তা করে নির্যাতন সয়ে থাকছেন। নিয়োগকর্তার মাধ্যমে যৌন নির্যাতন ও গর্ভধারণের জন্য আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে সৌদি আরবে। কাজ করতে গিয়ে নারীরা গড়ে ১৮ ঘণ্টার পরিশ্রম শেষে তিন বেলা খেতে পান শুধু শুকনো রুটি। তারা আরও জানান, দেশে ফেরত আসা নারী কর্মীদের ৬১ শতাংশ নানা ধরনের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। ১৪ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ৫২ শতাংশ নারীকে দীর্ঘ সময় জোরপূর্বক কাজে বাধ্য করা হয়। আর নির্যাতনের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন ৬৩ শতাংশ নারী। ৮৬ শতাংশ শ্রমিককে ঠিকমতো বেতন দেওয়া হয় না।

জেদ্দায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী দেশ রূপান্তরকে জানান, তার বাড়ি কুষ্টিয়ায়। অনেক স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে এসেছিলাম। নির্যাতন সইতে না পেরে পালিয়ে এক বাংলাদেশির সহায়তায় তার বাসায় আশ্রয় নিই। ওই বাংলাদেশির স্ত্রী একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সেখানে খণ্ডকালীন চাকরি করছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে দালালদের মাধ্যমে এই দেশে আসি। এখানে আসতে ৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। একটি শপিং মলে চাকরি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দালাল চক্র একটি বাসায় নিয়ে আসে। ওই বাসাটি সৌদি নাগরিকের। তারা প্রথমে অসামাজিক কাজ করার প্রস্তাব দেয়। প্রতিবাদ করলে মারধর শুরু করে। তিনি আরও বলেন, ওদের কথা হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে তাকে কেনা হয়েছে। তাদের খুশিমতো কাজ করতে হবে। ওরা যখন যেটা ইচ্ছা তাই করতে বাধ্য করত। বাধা দিলেই চাবুক দিয়ে মারধর করত। ওই বাসাতে আরও কয়েকজন নারী আছে। তারা আমার সর্বনাশ করেছে। আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছে ওরা। আর এইজন্য সম্পূর্ণ দায়ী দালালরা। ১০ দিন থাকার পর এক গার্ডের সহায়তায় পালিয়ে আসি। খুলনার খালিশপুরের এক তরুণী কয়েক মাস আগে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সৌদি আরবে নির্যাতনে তার ছোট বোন মারা গেছেন। লাশ আনতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে।

সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, সৌদি আরবের রিয়াদ, দাম্মাম, মক্কা, মদিনাসহ আরও কয়েকটি স্থানে ১৫ থেকে ১৬ লাখ শ্রমিক কাজ করছেন। তার মধ্যে নারীশ্রমিকরা খারাপ অবস্থায় আছেন। আসলে বাংলাদেশের দূতাবাসের লোকজন শ্রমিকদের খোঁজ নিচ্ছেন না। কোম্পানির লোকজন বেশিরভাগ শ্রমিকের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। আর বাংলাদেশের দালালরা বেশি সক্রিয়। তাদের সঙ্গে সৌদি আরবের বিভিন্ন কোম্পানির লোকজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকার সুবাদে এসব বেশি হচ্ছে।