শিক্ষক-কর্মচারী সবই আছে বিদ্যালয়ে, নেই শুধু শিক্ষার্থী|199593|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ১৩:০৯
শিক্ষক-কর্মচারী সবই আছে বিদ্যালয়ে, নেই শুধু শিক্ষার্থী
ঝালকাঠি প্রতিনিধি

শিক্ষক-কর্মচারী সবই আছে বিদ্যালয়ে, নেই শুধু শিক্ষার্থী

শিক্ষক-কর্মচারী, শ্রেণিকক্ষ সবই আছে। শুধু শিক্ষার্থী না থাকায় এখানে কোনো পাঠদান হয় না। গত ৩৪ বছর ধরে এভাবেই চলছে ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়।

বিদ্যালয়টি কাগজ-কলমে ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠার তথ্য থাকলেও একদিনও সেখানে হয়নি কোনো পাঠদান। 

অভিযোগ রয়েছে, উপরিস্থ কর্মকর্তারা পরিদর্শনে গেলে বাইরে থেকে ভাড়া করে ছাত্রছাত্রী এনে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি দেখান শিক্ষকরা। শুধু তাই নয়, প্রতি বছর জেএসসি পরীক্ষার জন্য জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের এনে এ বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করিয়ে এমপিও ঠিক রেখেছেন শিক্ষকরা।

জানা গেছে, ১৯৮৬ সালে নিজ বাড়ির আঙিনায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন আবু বকর নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি। এরপর ১৯৯৫ সালে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হয়।

স্থানীয়রা বিদ্যালয়টিকে ‘আবুর স্কুল’ নামেই চেনেন। আবু হচ্ছেন এ বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক। তার মেয়ে মুনমুন বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি, স্ত্রী নার্গিস বেগম অফিস সহকারী ও শ্যালিকা জাহানারা বেগম দপ্তরি।

প্রতিষ্ঠার তিন যুগ পেরিয়ে গেলেও একটি দিনের জন্যও এই বিদ্যালয়ে পাঠদান করানো হয়নি।

ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত তিনটি শ্রেণিতে একজন শিক্ষার্থীও নেই। শুকনো মৌসুমে মাঝে মাঝে কিংবা শুধুমাত্র কর্মকর্তারা পরিদর্শনে আসলে বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেখা যায়।

এ ছাড়া প্রায় সারা বছরই বিদ্যালয়টি তালাবদ্ধ থাকে। অথচ এ বিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন বাবদ প্রতি মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা উত্তোলন করে উপরিস্থ কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে তা ভাগ-বাঁটোয়ারা করা হয়।

সরেজমিনে সোমবার বেলা ১১টায় বিদ্যালয়টির অফিসে গিয়ে দেখা যায়, ছয়জন শিক্ষক ও দুইজন কর্মচারীর মধ্যে প্রধান শিক্ষক ও একজন সহকারী শিক্ষক উপস্থিত আছেন। বাকি শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই আসবেন বলে জানান প্রধান শিক্ষক আখতারুজ্জামান বাচ্চু।

পাশেই টিনের তৈরি বিদ্যালয়ের বড় একটি ঘরের শ্রেণিকক্ষগুলোতে ধুলাময় চেয়ার-টেবিল ও কিছু বেঞ্চ থাকলেও তা বহুদিন ব্যবহার করা হয়নি দেখেই বোঝা যায়। বিদ্যালয়ের সামনে খালি জায়গাতে স্থানীয় মহিলারা ধান শুকাতে ব্যস্ত রয়েছেন।

স্থানীয় বাবলু হাওলাদার নামে এক যুবক এ বিদ্যালয় সম্পর্কে বলেন, আমার জন্মের পর থেকেই বিদ্যালয়টি এভাবেই দেখছি। এখানে কোনো দিন পাঠদান হতে দেখিনি।

এ অনিয়মের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় মানুষ প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু প্রতিবাদ করা প্রত্যেকেই আবু বকর ও তার ছেলেদের হামলায় এবং মামলার শিকার হয়েছেন। তাই এখন কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে চান না।

বিদ্যালয়ে পেছনেই আবুর ঘর। সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে ছুটে আসেন আবু বকরের স্ত্রী অত্র বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী নার্গিস বেগম।

তিনি বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে স্থানীয় কোনো শিক্ষার্থী নেই। স্কুল সংলগ্ন খালে কয়েক বছর আগে ফারজানা নামে ৫ম শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থীর লাশ পাওয়া গিয়েছিল। এ ঘটনায় আমার স্বামী আবু বকর ও আমার ছেলেদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দেওয়া হয়। এরপর থেকেই এলাকার সবাই আমাদের এড়িয়ে চলেন। তাই স্থানীয় অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের আমাদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করান না।

জেলার অন্য একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জেলায় নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের কয়েকশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর অধিকাংশ ভালোভাবেই চলে। তবে পুরো জেলায় প্রায় অর্ধ শতাধিক বিদ্যালয় রয়েছে, যা সাইনবোর্ড সর্বস্ব। বিদ্যালয়ে পাঠদান না হলেও প্রতি মাসে বেতন-ভাতা তুলে পরিচালনা পর্ষদ, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস ও শিক্ষক কর্মচারীরা তা  ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেন।

তিনি অভিযোগ করেন, এসব বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় প্রশাসন সাময়িক কিছু ব্যবস্থা নিলেও টাকার বিনিময়ে আবার পরে তা ঠিকঠাক হয়ে যায়।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আখতারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, স্থানীয় কোন ছাত্রছাত্রী এ বিদ্যালয়ে পড়ে না। আমি ঝালকাঠি থেকে কিছু ছাত্রছাত্রী এনে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতার দূরত্বের কারণেই এখানে শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না।

রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সোহাগ হাওলাদার বলেন, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ থাকায় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমি ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসক বরাবর চিঠি লিখেছি। তা ছাড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাও এমপিও বাতিলের জন্য জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেছে।