ভাষা-ভাত ভূখণ্ড-ভোট|199682|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
ভাষা-ভাত ভূখণ্ড-ভোট
রাজেকুজ্জামান রতন

ভাষা-ভাত ভূখণ্ড-ভোট

মুসলমানদের জন্য আলাদা আবাসভূমির পাকিস্তান আন্দোলনে নিম্নবিত্ত দরিদ্র মুসলমান দলে দলে যুক্ত হয়েছিলেন এই ভেবে যে, পাকিস্তানে কোনো শোষণ থাকবে না। কারণ মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই। ভাই কি ভাইকে শোষণ করতে পারে? আর উচ্চবিত্ত ধনী, উচ্চশিক্ষিত মুসলমান যুক্ত হয়েছিলেন এই আশায় যে, রাষ্ট্রটা হাতে পেলে ক্ষমতার দুধ-মধু সবই পাবেন। দুই শ্রেণির দুই আশা; কিন্তু লক্ষ্য ছিল একটা পাকিস্তান সৃষ্টি। পাকিস্তান সৃষ্টির পর প্রথম যে প্রশ্ন এলো তা হলো মুসলমান কেন, ধর্মের ভিত্তিতে কি দেশ হতে পারে? যদি তাই হতো তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশের অধিবাসীই তো মুসলমান, তাহলে তারা সবাই মিলে একটা দেশ হতে পারে না কেন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারা গেলেও আশ্বস্ত করা হয়েছিল এই বলে যে, এক দিন হিন্দু আর হিন্দু হিসেবে নয়, মুসলমান আর মুসলমান হিসেবে নয়, তারা সবাই বিবেচিত হবেন পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে। একেবারে দ্বি-জাতিতত্ত্বের বিপরীতমুখী যাত্রা! তাহলে এত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু কীসের জন্য? এই টানাপড়েনে পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নে তাই দীর্ঘ সময় লেগে গেল। ১৯৪৭ সালে হলো পাকিস্তান আর ১৯৫৬ সালে প্রণীত হলো সংবিধান। কিন্তু সংবিধান না থাকুক, রাষ্ট্র পরিচালনার ব্রিটিশ প্রবর্তিত বিধান তো ছিলই, তা দিয়েই চলছিল সব।

রাষ্ট্রের ধর্ম নিয়ে সমাধানে আসতে না আসতেই প্রশ্ন এলো রাষ্ট্রের ভাষা কী হবে? এক ধর্ম এক দেশ এক ভাষা এই ধরনের চিন্তা থেকেই মুসলমান, পাকিস্তান এবং উর্দু সমার্থক করার আয়োজন চলছিল সর্বত্র। বিপরীতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনে ঢাকা তখন উত্তাল। এই সময় ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ ঢাকায় এলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অনুষ্ঠিত গণসংবর্ধনায় তিনি বললেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, অন্য কোনো ভাষা নয়। ভাষা আন্দোলনকে তিনি মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেন। তার বক্তব্যের প্রতিবাদ হয় সমাবেশের মধ্যেই। এর পর ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তনে ‘স্টুডেন্টস রোল ইন নেশন বিল্ডিং’ শীর্ষক বক্তৃতায় তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিকে বাতিল করে দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে একটি এবং সেটি অবশ্যই উর্দু। কারণ উর্দুই পাকিস্তানের মুসলিম পরিচয় তুলে ধরে। ছাত্ররা সমস্বরে ‘না, না’ বলে জিন্নাহর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানায়। ক্ষুব্ধ ছাত্র জনতার ভাষার দাবিকে তাচ্ছিল্য করে ২৮ মার্চ ঢাকা ত্যাগ করেন জিন্নাহ। জিন্নাহ তো গেলেন কিন্তু প্রশ্ন রেখে গেলেন একরাশ। উর্দু কি পাকিস্তানের কোনো প্রদেশের ভাষা? সিন্ধু, বেলুচিস্তান, পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, প্রত্যেকেরই তো আলাদা ভাষা। ভাষা দিয়ে কি ধর্মের পরিচয় তুলে ধরা যায়? আরবি ভাষায় কি মুসলমান ছাড়া কেউ কথা বলে না? মানুষ যত দ্রুত ধর্মান্তরিত হতে পারে, ভাষান্তরিত হওয়া কি তত সহজ? আরবের মুসলমান, ইন্দোনেশিয়ার মুসলমান ধর্মে এক হলেও ভাষা এবং সংস্কৃতিতে কি এক? আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কথাও যদি বিবেচনা করা হয় তাহলে যে ভাষায় ৫৪ শতাংশ মানুষ কথা বলে তাদের দাবি কি অগ্রগণ্য বলে বিবেচিত হবে না? ভাষা আন্দোলনের মূল সুর ছিল অসাম্প্রদায়িক, রাষ্ট্র তার নাগরিককে ধর্মের ভিত্তিতে বিবেচনা করবে না। বিবেচনা করবে যে সে তার নাগরিক। যুক্তি হবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি। একুশের স্মরণে নির্মিত হয়েছিল শহীদ মিনার। সব ধর্মের মানুষ যেন শ্রদ্ধা জানাতে পারে সে উদ্দেশ্যেই নির্মিত হয়েছিল শহীদ মিনার। সংগ্রামের প্রতিজ্ঞা বা সংগ্রামীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনার এখনো মানুষের মিলনক্ষেত্র।

একুশ শিখিয়েছিল আত্মসমর্পণ নয় আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিতে। ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’ এটা আমাদের কাছে এখনো একটি প্রেরণাদায়ক কথা। প্রবল শক্তির কাছে বা যুক্তিহীনতার কাছে আত্মসমর্পণ করে প্রাণে বেঁচে থাকা যায় কিন্তু সম্মানের সঙ্গে বাঁচা যায় না। অন্ধত্ব বা অন্ধকার যত প্রবলই হোক না কেন, যুক্তির অস্ত্রে তাকে পরাভূত করা সম্ভব যদি ব্যাপক মানুষের মধ্যে সেই যুক্তির আলো পৌঁছে দেওয়া যায়। যুক্তির আলো পথ দেখিয়েছে আমাদের স্বাধীনতার। স্বাধীনতার সঙ্গে মুক্তির যে স্বপ্ন দেখেছিল মানুষ, তা অর্জন করতে হলেও যুক্তিই হবে অন্যতম হাতিয়ার। ভাষার দাবিতে লড়াই পথ দেখিয়েছে নাগরিক অধিকার অর্জন করতে হলে ভোটের অধিকার দরকার। বৈষম্য দূর করার প্রথম পদক্ষেপ হলো সবার ভাতের অধিকার। সে কারণেই স্লোগান উঠেছিল ‘কেউ খাবে আর কেউ খাবে না, তা হবে না, তা হবে না।’ আর এসব দাবিকে একসঙ্গে যুক্ত করেছিল এই ভূখণ্ডকে স্বাধীন করতে হবে। তাই দেখা যায় ‘ভাষা-ভাত-ভূখণ্ড-ভোট’ এই চারটি শব্দ যা ‘ভ’ দিয়েই শুরু তা আমাদের জীবন ও রাজনীতিকে কতটা প্রভাবিত করেছে এবং এখনো করছে।

ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে আমরা স্বাধীনতায় এলাম কিন্তু বন্দি হয়ে গেলাম পুঁজির কাছে। সে কারণে সব স্বাধীনতাই এখন পুঁজিপতিদের। মুখের ভাষাকে লিখতে, পড়তে হলে যে শিক্ষা লাগে তা তো আমরা জানি। শিক্ষা ক্রমাগত ব্যয়বহুল পণ্যে পরিণত হচ্ছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং একটি গণতান্ত্রিক, বিজ্ঞানভিত্তিক সেক্যুলার একই পদ্ধতির শিক্ষানীতির দাবিতে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের জীবন দিতে হয়েছিল, তা প্রায় ভুলেই যাচ্ছে ছাত্ররা। স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস কি শুধু স্মৃতিচারণের বিষয় হয়ে থাকবে? ভালোবাসা দিবসের উন্মাদনার জোয়ারে হারিয়ে যাচ্ছে আন্দোলনের চেতনা।  কিন্তু সমাজ, প্রকৃতি-পরিবেশ, জনগণ এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে ব্যক্তিগত ভালোবাসা সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পারে না। মায়ের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে জীবন দিলেও সে ভাষায় কথা বলতে গেলে যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ লাগে, তা এখন কী অবস্থায় আছে এটা ব্যাখ্যা করে বোঝানোর প্রয়োজন হবে না। মাথা নত না করার সাহস দিয়েছে একুশ, আর মাথা নত করে রাখার পরিবেশ তৈরি করেছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র দেখায় ভয়। ফলে দেশ, অর্থনীতি নিয়ে কথা বলতে গেলে বন্ধু স্বজনরাও পরামর্শ দেয় এবং বলে, বাদ দাও তো এসব, কী দরকার রাজনীতির বিষয়ে মাথা ঘামিয়ে!

মানুষ রাজনীতির বাইরে থাকতে পারে না এটা প্রতিটি ঘটনায় বারবার স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একসময় গ্রিকরা বলত, যে রাজনীতি করে না সে বর্বর। আকৃতিতে মানুষ হলেও সে মানবিকবোধ বা বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেড়ে উঠেনি। এখনকার রাজনীতি দেখলে গ্রিকরা সম্ভবত তাদের সে কথা ফিরিয়ে নিতেন। কিন্তু অরাজনৈতিক মানুষ যে নিজের বাইরে কিছু ভাবে না, তাকে কি খুব বড় কিছু ভাবা যাবে? তাই রাজনীতির বাইরে নয়, রাজনীতিতেই সমাজের সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। প্রয়োজন হবে অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ার সংগ্রাম শক্তিশালী করা। শিকল পড়ব না ছিঁড়ব, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মাথা নত না করার শিক্ষা একটি প্রেরণা হিসেবে বহুদিন আমাদের পথ দেখাবে।

লেখক : রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

[email protected]