নারীবিদ্বেষী কৌতুক : লঘুরসের গুরুভার|199683|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
নারীবিদ্বেষী কৌতুক : লঘুরসের গুরুভার
আফরোজা সোমা

নারীবিদ্বেষী কৌতুক : লঘুরসের গুরুভার

রঙ্গ-তামাশা, ঠাট্টা-মস্করা যেন নুনের মতন।  রসের কথায় আড্ডার স্বাদ বাড়ে। কৌতুক যদি মোক্ষম হয় তো হাসির হুল্লোড় ছোটে।  হাসতে-হাসতে পেটে খিল ধরে যায়। কিন্তু হাসি শুধু হাসায় না। কাঁদায়ও। এই কান্না হাসতে-হাসতে চোখে পানি চলে আসার মতন অমলিন নয়। এই কান্না তুষের অনল। এই কান্না, মনের মধ্যে অপমানের ব্যথা গোপন রেখে ঠোঁটে ঝোলা হাসির পোস্টার।

কৌতুকের কথা এলেই ‘সর্দারজি’র কথা আসে! ‘মাথামোটা’, ‘বেকুব’, ‘বোকার হদ্দ’, সর্দারজি! এককালে, ‘কালো’রাও ছিল সাদাদের হাসির খোরাক। কিন্তু সেসব অনেক বদলেছে। কারণ কৌতুকেরও আছে অকৌতুককর দিক। লঘুকথার গুরু-প্রভাব নিয়ে অ্যাকাডেমিক ও নন-অ্যাকাডেমিক প্ল্যাটফর্মে দুনিয়াব্যাপী ‘সিরিয়াস’ বা গুরুগম্ভীর আলাপ চলছে। পণ্ডিত ও বিশ্লেষকরা বলছেন, কৌতুক বা হাস্যরসের ভেতর দিয়ে শ্রেণি-বিদ্বেষ, বর্ণ-বিদ্বেষ, জাতি-বিদ্বেষ ও লিঙ্গ-বিদ্বেষের বিষ সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। রঙ্গ-তামাশার ভেতর দিয়ে কখনো-কখনো বিশেষ শ্রেণি, বর্ণ, গোত্র বা লিঙ্গের মানুষকে হেয় ও খেলো করে দেখানোটাকে অতি-স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরা হয়। ফলে, কৌতুকের ভেতর দিয়ে বৈষম্য ও বিদ্বেষ এক-প্রকারের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায় বলেই মনে করা হয়। ঠিক যেমনটি হয়েছিল সর্দারজির ক্ষেত্রে। তাই, সর্দারজিকে নিয়ে কৌতুক বন্ধে রীতিমতন কোর্ট-কাচারি হয়েছে। কৌতুক গড়িয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অবধি।

কৌতুক বা চুটকির অকৌতুককর ও গুরুতর দিক নিয়ে মানুষ দিনে-দিনে সচেতন হয়েছে। অসংবেদনশীল বক্তব্য আছে এমন রসের কথাকে পরিশীলিত মানুষ পরিহার করাকেই ন্যায্য ও শোভন মানেন। তাই, কাণ্ডজ্ঞানওয়ালা মানুষ এখন স্থূল রসিকতা এড়িয়ে চলেন। যে ব্যক্তি অন্যকে নিয়ে অসংবেদনশীলভাবে কৌতুক করেন লোকে এখন তাকেই গাড়ল ঠাওরাতে পারে। তাই, নিজের মূর্খতার অন্দরমহল উদোম হয়ে যাওয়ার ভয়ে অনেকে বর্ণ-বিদ্বেষী কৌতুক থেকে বিরত থাকেন। বর্ণ-বিদ্বেষী কৌতুক নিয়ে মানুষ সচেতন হলেও লিঙ্গ-বিদ্বেষী কৌতুক বা রঙ্গ-তামাশাকে এখনো ‘নির্দোষ’ হিসেবেই দেখে বঙ্গীয় সমাজ। আজও এদেশে কাপুরুষতার উপমা হিসেবে ‘হাতে চুড়ি পরা’ ব্যবহার করা হয়। আজও বঙ্গীয় সমাজে ‘মেয়েমানুষ’ কৌতুকের সেই সর্দারজি যেন। ‘মেয়েমানুষ’ মানেই সে ‘কমবুদ্ধি’, ‘বেকুব’, ‘বেক্কল’, ‘অশিক্ষিত’ ‘টিউবলাইট’, ‘ছলনাময়ী’, ‘ছিনাল’, ‘খান্ডার’, ‘মুখরা’ ‘প্রলোভনকারী’, ‘প্রবঞ্চনাকারী’, ‘লোভী’, ‘কূটবুদ্ধি’, ‘মন্ত্রণাদাত্রী’, ‘পেটে কথা থাকে না’, ‘পেট-পাতলা’, ‘মুখ-পাতলা’, ‘অবিশ্বাসী’, ‘বিশ্বাসঘাতিনী’ এইরকম আরও নানান নেতিবাচক চরিত্র। 

নারী-বিদ্বেষী ভাবনা কৌতুকের মধ্য দিয়ে ছড়ায় এবং সেটি নারীর বিরুদ্ধে সমাজে জারি থাকা বিদ্বেষ ও বৈষম্যকেই আরও জোরদার করে। কিন্তু এই বিষয়ে এদেশে সচেতনতা নেই। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পাস দেওয়া ব্যক্তিরা বর্ণ-বৈষম্য বোঝেন। কৃষ্ণাঙ্গ কাউকে নিয়ে ঠাট্টা-মস্করা-উপহাস-পরিহাস করাকে বর্ণ-বৈষম্য হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেন। কিন্তু লিঙ্গ-বিদ্বেষী কৌতুকগুলোকে তারা শুধু চিনতে পারেন না। ‘কৌতুকের ভেতর দিয়ে বৈষম্যমূলক বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে’ এই কথা কোনো আসরে যদি কেউ বলেন তবে তার গায়েই ‘বেরসিক’, ‘কম-বখ্ত’, ‘আক্কলকম’ ছাপ্পর বসিয়ে দেওয়া হয়।  এগুলোর চেয়েও ভয়ানক হচ্ছে, কোনো নারী যদি লিঙ্গ-বৈষম্যমূলক এসব কৌতুকের অকৌতুককর দিকটা তুলে ধরেন, তার আর রক্ষে নেই! তাকে দেওয়া হবে ‘নারীবাদী’ আখ্যা। গল্পের ভূত যেমন আলো এড়িয়ে চলে, তেমনি ‘নারীবাদী’কে এড়িয়ে চলে পুরুষতান্ত্রিক মন। নারীবাদী ছাপ্পড় দিয়ে সেই মানুষটিকে ‘আলাদা’ করে দেওয়া হয়।  আর এসবও করা হয়, হাস্যরসের ভেতর দিয়েই। হাসতে-হাসতেই কোনো আড্ডায় আসর-জমানো মধ্যমণি হয়তো বলেই বসবেন, ‘আপনি তো ভাই নারীবাদী! আপনার সামনে তো এই কৌতুক বলা ঠিক না। তবু, বলেই ফেলি। কৌতুকই তো! কিছু মনে করবেন না’। ‘কৌতুকই তো! কিছু মনে করবেন না’।  এই ভাবনার মধ্যেই আছে গলদ। বিশ্লেষকরা অন্তত তাই মনে করেন। আন্তর্জাতিক সংস্থা কাউন্সিল অফ ইউরোপ নারীর বিরুদ্ধে থাকা লিঙ্গ-বিদ্বেষ বন্ধের উদ্যোগ হিসেবে ‘সেক্সিজম : সি ইট। নেম ইট। স্টপ ইট’ বলে একটি অনলাইন ম্যাটেরিয়াল প্রকাশ করেছিল।  সেখানে বলা হয়েছে, সমাজে ‘সেক্সিজম’ অর্থাৎ পুরুষকে ‘শ্রেষ্ঠ’ এবং নারীকে পুরুষের সাপেক্ষে ‘হীন’ হিসেবে উপস্থাপন করার বিভিন্ন উপায় রয়েছে। কথা, ছবি, ইশারা বা অঙ্গভঙ্গি এবং বিভিন্ন রকমের কর্মের মাধ্যমে সমাজে নারীকে হেয় ও হীন হিসেবে দেখানো হয়। কাউন্সিল অফ ইউরোপ ‘সেক্সিজম’কে ক্ষতিকর হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, জোক বা কৌতুকের ভেতর দিয়েও সেক্সিজম প্রকাশ পায়।

‘ডাউন গার্ল : দি লজিক অফ মিসোজিনি’ গ্রন্থের লেখক কেট মানে ‘সেক্সিজম’, ‘মিসোজিনি’ ও ‘পেট্রিয়ার্কি’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এই তিনটি ইংরেজি টার্ম বা শব্দের তিন রকম অর্থ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নারীকে যখন পুরুষের সাপেক্ষে বিচার করে তার চেয়ে হীন অবস্থানে দেখা হয়, সহজ কথায় সেটিই সেক্সিজম। আর ‘মিসোজিনি’ বা নারী-বিদ্বেষ হচ্ছে সেক্সিজমের চেয়েও ভয়াবহ। কেট মানে মিসোজিনিকে পিতৃতন্ত্রের ‘ল’ এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ’ বা আইন-প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ মিসোজিনিস্টরা যে শুধু পুরুষকে কেন্দ্রে রেখে এই বিশ্বসংসারকে দেখেন তা নয়। মিসোজিনিস্টরা পুরুষতান্ত্রিক রীতিনীতিকে জারি রাখার পক্ষে কাজ করে। পুরুষতান্ত্রিক দর্শনে ও চিন্তা-ভাবনায় নারীকে যে ‘ফ্রেমে’ বা কাঠামোতে বা ভূমিকায় রাখতে চাওয়া হয়, কোনো নারী যদি সেই কাঠামোকে প্রশ্ন করে বা সেই কাঠামো ভেঙে ফেলার পক্ষে যুক্তি দেয় তাহলে সেই নারীকে শাস্তি দিতে উদ্যত হয় নারী-বিদ্বেষী বা মিসোজিনিস্ট সমাজ। এখানেই বলা দরকার, শুধু পুরুষ নয়, অনেক সময় জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে অনেক নারীও মিসোজিনিস্ট হয়ে উঠতে পারেন। 

কৌতুক বা রঙ্গরসকে ‘হার্মলেস’ বা নির্বিষ বা নির্দোষ ভাবা হয়। কিন্তু এটি তা নয়। গবেষকরা বলছেন, অন্যকে হেয় ও খাটো করে যেসব রঙ্গ-তামাশা করা হয় মানুষের মনোজগতে এর প্রভাব গুরুতর। ২০১৬ সালে দি কনভার্সেশান ডটকমে ‘সাইকোলজি বিহাইন্ড দি আনফানি কনসিকোয়েন্সেস অফ জোক্স দ্যাট  ডেনিগ্রেট’ শিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধে মানুষের মনোজগতে কৌতুকের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে বা গোষ্ঠীর মানুষকে যখন ক্রমাগতভাবে হেয় ও নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে রঙ্গ-তামাশা-কৌতুক চলে তখন সেটিকে ‘ডিসপ্যারেজমেন্ট হিউমার’ বলা হয়। এ ধরনের হিউমার বা রঙ্গ-রসকে বিশ্লেষকরা বৈষম্যের ধারক-বাহক মনে করেন। নারীকে হেয় ও নেতি হিসেবে উপস্থাপন করা কৌতুকগুলোর ভেতর দিয়ে সমাজে চিরায়ত বৈষম্যমূলক প্রথাকেই সমর্থন করা হয়। যেমন, এই কৌতুকটি দেখুন : এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে প্রশ্ন করছেন, ‘দোস্ত, নাসা এখনো চান্দে কোনো মেয়ে মাইনষেরে পাঠাইল না কেন’! অন্য বন্ধুটি তখন ‘চান্দে এখনো রান্না-বান্না-ঘরগোছানোর কাজ-কাম নেই’ বলে উত্তর করলেন এবং দুজনেই হাসতে লাগলেন। কৌতুকটিকে মিসোজিনিতে ভরা বা নারী-বিদ্বেষী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘সাইকোলজি বিহাইন্ড দি আনফানি কনসিকোয়েন্সেস অফ জোক্স দ্যাট ডেনিগ্রেট’ নিবন্ধে। 

এই কৌতুকের মতোই রঙ্গরস বা সিরিয়াস কথা আপনারাও শুনেছেন নিশ্চয়ই। কোনো পুরুষ যখন বলে, ‘আমি কেন রাঁধব, আমি কি মহিলা নাকি’ সেটি স্পষ্টতই একটি মিসোজিনি বা নারী-বিদ্বেষী আচরণ।  কারণ এই বক্তব্যের ভেতর দিয়ে দাবি করা হচ্ছে, রান্না কেবলি নারীর কাজ। অর্থাৎ এখানে কাজকে লিঙ্গ-ভিত্তিক করে তোলা হয়েছে। অর্থাৎ ‘অন দি বেসিস অফ সেক্স’ বা লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনো মানুষের জন্য কোনো কাজ তা নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে। মাইক্রোএগ্রেশন বলে একটি শব্দ আছে।  ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে কোনো বিশেষ বর্ণ বা গোষ্ঠীর মানুষকে যখন নিত্যই হেয় করা হয় বা নেতিবাচকভাবে বর্ণনা করা হয় তখন সেটিকে মাইক্রোএগ্রেশন বলে। এখন প্রকাশ্যে হেট্রেড বা ঘৃণামূলক বক্তব্য দিতে মানুষ সতর্ক। কিন্তু, অনেকক্ষেত্রেই ঘৃণা এখন হাসি-ঠাট্টা-মস্করার মোড়কে প্রকাশ পায়। কৌতুক বলে সাতখুন মাফের দিন শেষ। কারণ কৌতুক এখন কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। সর্দারজিই তার প্রমাণ।  তাই, রঙ্গ-রসের ভাষা নিয়ে সতর্ক হোন। সতর্কতার কথা শুনে আপনি যদি প্রশ্ন করেন, ‘জীবন থেকে কি তাহলে রঙ্গ-রস উঠে যাবে নাকি’? বুঝবেন, আপনার ঘাড়ে চেপেছে পুরুষতন্ত্রের ভূত। সর্দারজিকে হেয় না করেও যদি কৌতুক করা যায় তাহলে নারী-বিদ্বেষী কৌতুক ছাড়াও জীবনে রসালাপ থাকবে। কিন্তু নারী-বিদ্বেষী কথাবার্তা ছাড়া আপনার যদি আর কোনো রসালাপ বা চুটকি জানা না থাকে তাহলে সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনা বা ‘বাঙালীর হাসির গল্প’ পড়ুন। আর ওসবে রুচি না এলে, এই নিন, সুকুমার রায়ের দুই লাইন কবিতা পড়ুন : “রামগরুড়ের ছানা হাসতে তাদের মানা, হাসির কথা শুনলে বলে, ‘হাসব্ না-না, না-না’।”

লেখক

কবি ও সহকারী অধ্যাপক, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ

[email protected]