নদী বাঁচানোর দৃষ্টান্ত হোক মেঘনা|199855|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
নদী বাঁচানোর দৃষ্টান্ত হোক মেঘনা

নদী বাঁচানোর দৃষ্টান্ত হোক মেঘনা

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী মেঘনা। হিমালয়ের পাদদেশে তিনটি আন্তঃসংযুক্ত নদী গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার মিলিত অববাহিকা বা ‘জিবিএম বেসিনে’ গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ ভূখণ্ড। আসাম ও ত্রিপুরার পার্বত্যভূমিতে উৎপন্ন বেশ কয়েকটি নদীর প্রবাহ বাংলাদেশে এসে মেঘনায় মিশেছে। একদিক থেকে পার্বত্য এলাকার পানি আরেকদিক থেকে হাওরের পানি এসে মেঘনায় মেশায় প্রাকৃতিকভাবেই মেঘনার পানি অনেক বেশি বিশুদ্ধ ও সুমিষ্ট। আমাদের নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম দূষিত মিঠাপানির উৎস হিসেবে মেঘনার খ্যাতি দীর্ঘদিনের। কিন্তু শিল্পায়ন ও অবৈধ দখল দূষণের করাল গ্রাসে এখন হুমকির মুখে পড়েছে মেঘনাও। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীবাসীর খাবার পানির উৎস হিসেবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য মেঘনা নদীকে সংকটাপন্ন ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। পরিবেশ অধিদপ্তর এ সংক্রান্ত ঘোষণার প্রস্তাব পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হলে নদীতীরে পরিবেশ দূষণকারী কলকারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন সহজ হবে তেমনি নতুন কলকারখানা স্থাপন বন্ধ করা এবং প্রয়োজনে বিদ্যমান শিল্পকারখানা ও প্রকল্প স্থানান্তর করাও সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।          

গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘মেঘনা সংকটাপন্ন’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে বিশুদ্ধ পানির উৎস হিসেবে মেঘনা নদী বাঁচাতে সরকারের এ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ঢাকার চারপাশের নদীর পানি আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। রাজধানীর কাছাকাছি মিঠাপানির নদী হিসেবে মেঘনা এখনো ভালো আছে। তাই সংকটাপন্ন ঘোষণা করে মেঘনা নদীরক্ষার জন্য অগ্রিম ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুরো নদীকে সংকটাপন্ন ঘোষণা না করে চার জেলার ছয়টি স্থানকে সংকটাপন্ন ঘোষণা করা হচ্ছে। মোট ১১৯ বর্গকিলোমিটার সংকটাপন্ন এলাকার মধ্যে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং কুমিল্লা জেলার অংশবিশেষ। এসব সংবেদনশীল স্থানকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া-‘ইসিএ’ হিসেবে ঘোষণার প্রজ্ঞাপন খসড়া করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই সংকটাপন্ন এলাকার পরিবেশ ব্যবস্থাপনার নির্দেশিকার একটি গাইডলাইনও করা হয়েছে।  ভূমি জরিপের সিএস ও আরএস ম্যাপের ভিত্তিতে ‘ইসিএ’ এলাকার নির্ধারণ করা চৌহদ্দি কনক্রিটের পিলার দিয়ে চিহ্নিত করা হবে।  সংকটাপন্ন মেঘনা বাঁচাতে এমন উদ্যোগ প্রশংসনীয় সন্দেহ নেই।   

আসলে মেঘনা নদীকে সংকটাপন্ন ঘোষণার পরিকল্পনায় মূল প্রণোদনা হিসেবে কাজ করেছে রাজধানী ঢাকার নাগরিকদের জন্য আগামীতে পানীয় জলের সরবরাহ নিশ্চিত করা। একসময় রাজধানীর পানির প্রয়োজন মেটাতে গভীর নলকূপের মাধ্যমে মাটির নিচ থেকে পানি তোলা হতো। কিন্তু পানির স্তর এখন এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, পাম্পের সাহায্যে পানি তোলা যায় না।  এরপরই সরকার ভূগর্ভস্থ পানির বদলে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ঢাকার নিকটবর্তী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার পানি অনেক আগেই দূষিত হয়ে গেছে। বহু উদ্যোগ নেওয়া হলেও সরকার এসব নদীকে রক্ষা করতে পারেনি। এদিকে, মেঘনার ভাটির দিকে ইতিমধ্যেই বিপুল সংখ্যক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। কারখানা থেকে নির্গত তরল-কঠিন-বায়বীয় বর্জ্য মেঘনা নদীর পানি, মাটি ও বাতাসকে দূষিত করছে। এসব এলাকায় বাড়িঘর তৈরি করার জন্য অবাধে নদী তীরবর্তী জলাভূমি ভরাট করা হচ্ছে। স্থাপন করা হচ্ছে ইটভাটা। উজানে প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর পানির লবণাক্ততাও বেড়ে গেছে। এতে সংকটে পড়েছে মেঘনার জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ। 

খেয়াল রাখা দরকার মেঘনা নদী নিয়ে এই প্রস্তাব আসার আগেই গত বছর তুরাগ নদকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ও ‘আইনগত সত্তা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ। সেই সুবাদে দেশের সব নদ-নদী-জলাশয়ই এখন আইনের দৃষ্টিতে একটি একীভূত সত্তা। ‘পাবলিক ট্রাস্ট’ হিসেবে এসব কিছুর দেখভালের দায়িত্ব এখন রাষ্ট্রের। মেঘনা বাংলাদেশের একমাত্র জোয়ার-ভাটার নদী যেখানে কার্প জাতীয় মাছ অর্থাৎ রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউশ এসব মাছ ডিম ছাড়ে এবং নদী থেকে ডিম সংগ্রহ করা হয়। মেঘনা বিপন্ন তালিকাভুক্ত ‘কাটা কাছিম’ নামে পরিচিত দুই ধরনের ভারতীয় কচ্ছপ, দক্ষিণ এশীয় শুশুক এবং দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। কিন্তু দূষণের কারণে শুশুক বা স্থানীয় ডলফিনের সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে। এ অবস্থায় মেঘনায় ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করা এবং জল ও পরিবেশ দূষণ বন্ধে এ প্রকল্পের সুপারিশগুলোর কঠোর বাস্তবায়ন আশার সঞ্চার করতে পারে। এ অবস্থায় মেঘনার এ উদ্যোগ থেকে শিক্ষা নেওয়াটা জরুরি। নদ-নদী-জলাশয়ের দেশ বাংলাদেশে এখনই ভবিষ্যতের সুপেয় পানি নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে সেটা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। কারণ প্রাকৃতিক পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা করা না গেলে যে বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে মহাসংকট ঘনিয়ে আসবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।