খাবার নিয়ে বিপাকে ১৮০ রোগী|199950|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
খাবার নিয়ে বিপাকে ১৮০ রোগী
নয়ন চক্রবর্ত্তী, চট্টগ্রাম

খাবার নিয়ে বিপাকে ১৮০ রোগী

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে কার্ডিয়াক বিভাগে অপারেশনের রোগী মো. শরীফ (৬৩)। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী দুপুর ১২টায় ভরাপেটে ওষুধ খেতে হবে তাকে। কিন্তু হাসপাতালে গ্যাস সংযোগ না থাকায় রান্না দেরি, খাবার পেলেন দুপুর ২টায়। সময়মতো খাবার-ওষুধ না পেয়ে চিন্তিত শরীফ। হাসপাতালটিতে ১৮০ জন রোগী হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করা খবার খান।

গত সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)। কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী খায়েজ আহমদ মজুমদার বলেন, প্রায় ৫ বছরের বিল বকেয়া। বারবার চিঠি দিয়েছি কিন্তু ৪ লাখ টাকা বকেয়া বিল পরিশোধ করা হয়নি। ফলে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার নাথ বলছেন, হাসপাতালে বরাদ্দ আসে তো বছরে একবার। আমরা এ সপ্তাহের মধ্যে এই বিল পরিশোধ করব কথা দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা শোনেনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে ২৫০ শয্যার এ হাসপাতালে ১৮০ রোগীর দুপুরের-রাতে রান্না করা খাবার সরবরাহ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। গ্যাসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর খাবার নিয়ে বিপাকে পড়েছে এসব রোগী।

সরেজমিন গতকাল দুপুর দেড়টায় হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ওয়ার্ডে রোগীদের খাবার সরবরাহ করছে হাসপাতালে খাদ্য বিভাগের কর্মীরা। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্তরা জানায়, মঙ্গলবার রাত ৩টায় উঠে রান্না শুরু করেছি লাকড়ি দিয়ে। গ্যাস সংযোগ না থাকায় লাকড়ির কৃত্রিম

চুলা বসিয়ে রান্না করে রোগীদের খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া সকালে নাশতার জন্য পাউরুটি-কলার সঙ্গে ডিম দেওয়া রুটিন। ডিম সিদ্ধ করতে গরম পানি প্রয়োজন, তাই রাত ৩টায় জ্বলানই কাঠ দিয়ে কৃত্রিম চুলায় মাধ্যমে সকালের নাশতার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

হাসপাতালের নার্সিং কর্মকর্তা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত খাদ্য বিভাগের ডায়েট ইনচার্জ চায়না রানী শীল দেশ রূপান্তরকে বলেন, কুক ও খাদ্য বিভাগের নিয়োজিতরা রাত ৩টায় উঠে রান্নার ব্যবস্থা করেছে। বর্তমানে ১৮০ জনের খাবার তৈরি করতে হচ্ছে লাকড়ির চুলা বানিয়ে। দুই বেলায় ৩৬০ জনের ভাত, মাছ, মাংস, ডাল ও ডিম রান্না করতে হচ্ছে। গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন বলে তো রোগীদের খাবার না দিয়ে থাকতে পারব না। সেবা পেতেই হাসপাতাল অথচ গ্যাস বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলো।

হাসপাতালের কুক সালেহ উদ্দিন মুরাদ ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, কী পরিমাণ কষ্ট হচ্ছে তা না দেখলে বোঝা যাবে না। এই যে এত বড় রান্নার ডেকচি-কড়াই এসব মুভ করতে খুব পরিশ্রম। লাকড়ি চুলা বানিয়ে এত মানুষকে খাওয়ানো খুব কষ্ট। এটা তো হাসপাতাল, রোগীদের জন্য সবকিছু নিয়ম মেনে করতে হয়।

হাসপাতালের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় প্রতিটি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। গাইনি বিভাগের চিকিৎসাধীন এক রোগীর স্বজন অমৃত চৌধুরী বলেন, কোটি টাকা পাচার হয়েছে কানাডায়। পাহাড়ে অবৈধ বসতিতে গ্যাসের সংযোগ আছে যা কোনোদিন এক টাকাও পায়নি কেজিডিসিএল। অথচ জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে গ্যাসলাইন কেটে দিল। দেশে সব দুর্নীতিবাজ, গ্যাসের কোম্পানিগুলো সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য বিতর্কিত এসব কাজ করছে, অন্যদিকে আমরা কষ্ট পাচ্ছি রোগী নিয়ে।

৭ বছর বয়সী শিশুপুত্রকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মা রোকেয়া বেগম বলেন, ছেলের ভাইরাস জ¦র। সময়মতো খাবার ও ওষুধ দিতে ডাক্তার বলে গেছেন। কিন্তু গ্যাসলাইন বিচ্ছিন্ন, তাই খাবার দেরিতে পাচ্ছি। হাসপাতালের ওরা তো আমাদের জন্য কষ্ট করছে, কিন্তু যারা গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করছে তারা তো অমানুষ।

প্রবীণ চিকিৎসক মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, লুটপাট করে যে কোটি টাকা পাচার হয়েছে সেদিকে নজর নেই, সরকারি জায়গায় অবৈধ বসতি করে গ্যাস সংযোগ দিয়ে কোটি টাকা রাজস্ব যে সরকার হারাচ্ছে, সেখানে তাদের মাথাব্যথা নেই। শুধু হাসপাতালের বকেয়ার অজুহাতে সংযোগ বিচ্ছিন্ন। এমন আচরণ কাম্য নয়। যারা এ কাজ করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার নাথ বলেন, হাসপাতালে বরাদ্দ আসে তো বছরে একবার। প্রায় ৪ লাখ টাকার মতো বকেয়া হয়েছে। আমরা তাদের (কেজিডিসিএল) অনুরোধ করেছিলাম কিস্তিতে বিল নেওয়ার। গত বৃহস্পতিবার তারা ২ লাখ ৭৩ হাজার টাকার একটি অংশবিশেষ বিল আমাদের দেয়। এ সপ্তাহের মধ্যে এ বিল পরিশোধ করব কথা দিয়েছিলাম। অর্থও বরাদ্দ পেয়েছি। কিন্তু হিসাব বিভাগ থেকে তা ছাড় করার জন্য সময় লাগছিল। সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণে কিছু সময় লাগে। তাই চলতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার পরিশোধ করার কথা ছিল। এ অবস্থায় কেজিডিসিএল কোনো কথা না শুনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী খায়েজ আহমদ মজুমদার বলেন, প্রায় ৫ বছরের বিল বকেয়া। বারবার চিঠি দিয়েছি কিন্তু বিল পরিশোধ করেনি। টাকা দিলেই পুনঃসংযোগ হবে। রোগীদের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে বিল বকেয়া অজুহাতে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করাটা উচিত কি না জানতে চাইলে বলেন, আমাদের কিছু করার নেই। আমরাও তো ওপরের মহলের চাপে আছি। আমরাও তো চাকরি করি। হাসপাতাল সেনসেটিভ এটা আমি অবশ্যই জানি, কিন্তু আমাদের তো সেভ থাকতে হবে।