চেতনার প্রভাতফেরি|200443|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
চেতনার প্রভাতফেরি
এ কে এম শাহনাওয়াজ

চেতনার প্রভাতফেরি

এক. ভাষাপ্রেমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশপ্রেম। সাধারণ সরল উক্তিতে বলা হয় বাহান্নতে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল বলেই সেই চৈতন্য বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে সাহসী করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ যা পারেনি বাঙালি কেমন করে তা পারল? রক্ত দিলো ভাষার জন্য! রক্তমূল্যে মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষার উদ্দীপনা সে পেল কোথা থেকে? অর্থাৎ অমন মর্যাদার বাহান্ন তৈরি হলো কেমন করে? ইতিহাসে ফিরে তাকালে এর উত্তর পাওয়া কঠিন নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় মায়ের ভাষার জন্য মৃত্যুঞ্জয়ী হতে পারে শুধু বাঙালিই। আট শতকের সেই বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য যাদের মাতৃভাষার পরিচয় অজ্ঞাত কিন্তু তারা বুঝেছিলেন এদেশের প্রাকৃতজনের কাছে বৌদ্ধধর্মের বাণী পৌঁছে দিতে হলে তাদের ভাষাতেই বলতে হবে। কিন্তু সে ভাষার লিখিত রূপ তো তৈরি হয়নি। তাই তারা অনেক মমতায় জন্ম দিলেন বাংলা সাহিত্যের ভ্রুণশিশু চর্যাপদের। একই মনোভঙ্গি ছিল উনিশ শতকে খ্রিস্টান মিশনারিদের। উইলিয়াম কেরি বুঝেছিলেন এদেশে অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত মানুষের সামনে ইংরেজিতে যিশুর বাণী প্রচারের মানে হয় না। তাদের মুখের ভাষায় ধর্ম প্রচার করতে হবে। এর বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাংলা গদ্যের যাত্রা শুরু করিয়ে দিলেন এই মিশনারি।

মধ্যযুগ ছিল পা-ুলিপি লেখার যুগ। শত সহস্র মানুষের মধ্যে পৌঁছে দিতে পা-ুলিপির ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল কেরিকে। ইউরোপ থেকে ছাপাখানা এনে প্রতিষ্ঠা করলেন সিরামপুর মিশনে। প্রকাশ পেলো ‘সমাচার দর্পণ’। এভাবে গদ্য সাহিত্যচর্চার ভুবন তৈরি হলো। পাল যুগে আট থেকে দশ শতকে চর্যাপদচর্চা এবং উনিশ শতকে বাংলা গদ্য সাহিত্যের বিকাশের মাঝখানে সাময়িক ছন্দপতন ঘটেছিল এগারো-বারো শতকে সেন রাজাদের শাসনকালে। সেনযুগে রাষ্ট্রযন্ত্রের বৈরী দৃষ্টিতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চা শুরুতে থমকে গিয়েছিল। সেনরা এককালে দাক্ষিণাত্যের কর্নাটক থেকে পাল রাজাদের সৈন্যবাহিনীতে চাকরি করতে আসে। পালদের দুর্বলতার সুযোগে বাংলার রাজদন্ড দখল করে নেয় সেনরা। পররাজ্য গ্রাস করার হীনম্মন্যতা থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদী সেনরা নিজেদের বিযুক্ত করতে পারেনি। নিজেদের শাসন নিষ্কণ্টক করতে প্রথম বৌদ্ধ পীড়ন করতে থাকে। অত্যাচারিত অনেক বৌদ্ধ পন্ডিত দেশান্তরী হন। সাধারণ বৌদ্ধদের অনেকেই হিন্দু ধর্মে নিজেদের আত্তীকরণ করে ফেলেন। অন্যরা অন্ত্যজ শ্রেণিতে নিপতিত হন। ব্রাহ্মণ সেন শাসকরা মানসিক ঔদার্যে সাধারণ হিন্দু ও অন্ত্যজ শ্রেণিকে কাছে টেনে নিতে পারেনি। বরঞ্চ একটি মনস্তাত্ত্বিক ভীতি তাদের তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। অবৈধ শাসনের বিরুদ্ধে গণরোষের আশঙ্কা তাদের ছিল। তাই সাধারণ বাঙালিকে সংস্কৃতি বোধহীন করে রাখতে চেয়েছে। সেন শাসকরা ঠিকই বুঝেছিল ভাষাচর্চার মধ্য থেকে প্রাণ পাবে সাহিত্য। সে যুগের ধর্ম-সাহিত্যচর্চা ও অধ্যয়ন সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলবে। ধর্মের দোহাই দিয়ে শোষণ করার সুযোগ হারাবে তারা। সেনদের বৈরী আচরণে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিকাশে ক্ষতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু চৌদ্দ শতকে বহির্ভারতীয় অবাঙালি শাসক সুলতানরা সে সংকট ঘুচিয়ে দিলেন। তারা বাংলা সাহিত্যের বিকাশকে শুধু সমর্থনই দিলেন না, পৃষ্ঠপোষকতায় ভরিয়ে দিলেন। মঙ্গলকাব্য এবং পরবর্র্তী সময়ে বৈষ্ণব সাহিত্য এবং চৈতন্যচরিত কাব্যের মধ্যদিয়ে হিন্দু কবিরা বাংলা ভাষাকে বিশেষ মর্যাদার জায়গায় পৌঁছে দিলেন। পিছিয়ে থাকলেন না মুসলমান কবিরাও। তারাও রোমান্টিক কাব্য, বীরগাথা ও জীবনী সাহিত্য রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে বিশেষ অবস্থানে এনে দাঁড় করালেন। মোগল যুগে এসে যুক্ত হলো মর্সিয়া সাহিত্য আর বাউল সংগীত।

এভাবে দীর্ঘকালজুড়ে যে ভাষা শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে দিগন্তবিস্তারী হয়েছে তার উত্তরাধিকারীরা তো সে ভাষা নিয়ে অহংকার করবেই। কোথাকার কোন ভুঁইফোড় এসে মাটিতে শক্ত প্রথিত ভাষামূলে আঘাত করলে এই গর্বিত জাতি তা মানবে কেন! পাকিস্তানি শাসকদের সঙ্গে এদিক থেকে সেন শাসকদের মানসিক অবস্থানে ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে। এদের মনেও ছিল সেনদের মতো একধরনের ঔপনিবেশিকতা। ধর্ম ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্ম হলেও শাসকদের মনে ছিল শোষণ মানসিকতা। তাই সংস্কৃতি বোধে উজ্জ্বল বাঙালির প্রতি ভীতি তাদের ছিল। সেনদের মতো এরাও যথার্থ বুঝেছিল বাংলা ভাষাচর্চা বিচ্ছিন্ন করতে পারলে দেশপ্রেমের শক্তি হারাবে বাঙালি। সংস্কৃতিবোধহীন বাঙালিকে তখন নতজানু করা কঠিন কিছু হবে না। তাই সাতচল্লিশে পাকিস্তানের জন্মলগ্নেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বিতর্ক তৈরি করে ফেলে। ইতিহাসবোধহীন স্থূল বিবেচনার পাকিস্তানি শাসকরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার দীর্ঘ ঐতিহ্যের শক্তিকে বিবেচনায় আনল না। তারা কেড়ে নিতে চাইল মুখের ভাষাকে। এ অবস্থায় ঐতিহ্যস্নাত বাঙালি স্বাভাবিকভাবেই রক্তমূল্যে ভাষার মর্যাদা রক্ষায় এগিয়ে আসে। তাই পূর্ব বাংলার বাঙালি ১৯৪৮ এবং ১৯৫২-তে ঐতিহ্য তৈরি করতে পেরেছিল। ভাষা যে দেশাত্মবোধে জাতিকে উদ্বুদ্ধ করে তার জ্বলন্ত প্রমাণ হলো ভাষা আন্দোলন। ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবোধ তৈরিতে ভাষা আন্দোলন ছিল একটি প্রেরণাদায়ী শক্তি। একুশে তাই আমাদের ঐতিহ্য আমাদের সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুই. অপূর্ণ ইতিহাসচর্চার কারণে নতুন প্রজন্মের সামনে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের চর্যাপদচর্চা বা স্বাধীন সুলতানি যুগের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার উজ্জ্বল দিনের কথা অস্পষ্ট। একুশেই তাদের প্রেরণার প্রথম উৎস। তাই একুশের আবেগ বিচ্ছিন্ন হলে প্রজন্ম প্রাণিত হওয়ার এই শেষ সূত্র হারিয়ে ফেলবে।

মানতেই হবে একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জীবনে তার সংস্কৃতি ভাবনায় ভিন্ন আবেগ যুক্ত করেছে। নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করতে তাই মৌলিক আবেগ থেকে একুশে তর্পণের বিকল্প নেই। কিন্তু নাগরিক জীবনে একুশের আবেগকে খন্ডিত করে ফেলা হয়েছে। প্রায় তিন দশক আগে সামরিক শাসক নিজের নিরাপত্তার দিক বিচারে একুশের প্রথম প্রহর নাম দিয়ে রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের রেওয়াজ চালু করে। একে বিনা প্রশ্নে মেনে নেয় নগরবাসী সংস্কৃতিকর্মীসহ সর্বশ্রেণির মানুষ। আর সেইসঙ্গে একুশের চেতনায় জড়িয়ে থাকা প্রভাতফেরি নতুন প্রজন্মের কাছে অচেনা হয়ে যায়। অথচ বাহান্নর পর থেকে একুশের প্রত্যুষে প্রভাতফেরির মধ্যদিয়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন একুশের মহিমাকে আলাদা ঔজ্জ্বল্য দিয়েছে। কাকডাকা ভোরে সাজ সাজ রব। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পাড়া-মহল্লার ক্লাব কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ ফুল হাতে নগ্নপায়ে এগিয়ে যেত শহীদ মিনারের দিকে। কণ্ঠে থাকত “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো...” গানের সুর মূর্ছনা। এক অপার্থিব পরিবেশের সৃষ্টি করত। এভাবে একুশ যে কোনো জাতীয় দিবস থেকে আলাদা মাত্রা হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেছিল।

বাঙালি সংস্কৃতি রাত ১২টা ১ মিনিটকে দিনের প্রথম প্রহর বিবেচনা করে না। আবহমান বাংলার দিনের শুরু প্রত্যুষে আর দিনের অবসান সন্ধ্যায়। পাশ্চাত্যের চব্বিশ ঘণ্টা গণনায় দিনের প্রথম প্রহর রাত ১২টা ১ মিনিট। পাশ্চাত্যের অনুসরণেই যেন মাঝরাতে চলে গেল একুশে তর্পণ এবং প্রায় বিনা প্রতিবাদেই। কিন্তু স্বাধীনতা দিবস আর বিজয় দিবসে তো প্রত্যুষে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। প্রভাতফেরি একুশের সকালে শহীদ মিনারে বাঙালির শ্রদ্ধা নিবেদনের মিছিলের প্রতীকী শব্দ। শ্রদ্ধাবনত বাঙালির শহীদ মিনারে যাত্রার প্রভাতি এই মিছিল তো প্রভাতফেরিতেই জড়িয়ে আছে। আমাদের নাগরিক জীবনের বাইরে গ্রাম-গঞ্জে এখনো বাঙালি একুশের শ্রদ্ধা নিবেদন করে প্রভাতফেরির মধ্য দিয়ে। একুশের গানের মূর্ছনায় প্রভাতফেরির যাত্রার এই অভিনবত্ব নতুন প্রজন্মকে কৌতূহলী ও আবেগাপ্লুত করে তুলবে। নতুন করে ভাববে আমাদের ভাষাপ্রেম আর দেশপ্রেমের কথা। এভাবেই প্রাণিত হবে তারা। এখন একুশে শুধু বাংলাদেশের গন্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছে বিশ্ববাসী। এই ভাষা দিবসে একবার বিশ্ববাসী ফিরে তাকাবে ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার এদেশটির দিকে। অনুকরণ করবে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলির রেওয়াজকে। প্রভাতফেরি শব্দটির জন্মই হয়েছে যেন একুশে প্রভাতের মিছিলকে বোঝাতে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে উৎসভূমির অনুকরণে বিশ্ববাসীও প্রভাতফেরিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। অথচ আমরাই হঠকারী সিদ্ধান্তে প্রভাতফেরিকে বিসর্জন দিয়ে মধ্যরাতে একুশের চেতনা খুঁজে ফিরছি। সংস্কৃতি ভাবনার সুস্থ ধারা বলবে আমরা প্রভাতফেরিকে হারাতে চাই না। হারাতে চাই না একুশের আবেগকে। রাত ১২টা ১-এর বৈরী সংস্কৃতি থেকে মুক্ত করে আবার প্রভাতফেরির একুশে উদযাপনে ফিরে যেতে চাই। কারণ একুশকে তার স্বমহিমায় পুনঃস্থাপন না করে প্রজন্মকে ভাষাপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা যাবে না। আর কে না জানে দেশপ্রেমের জন্ম তার ভাষা প্রেমের মধ্য থেকেই।

লেখক

অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]