প্রতি বছর বইমেলায় ভর্তুকি দিতে হচ্ছে|200484|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
প্রতি বছর বইমেলায় ভর্তুকি দিতে হচ্ছে
ছাইফুল ইসলাম মাছুম

প্রতি বছর বইমেলায় ভর্তুকি দিতে হচ্ছে

একুশে বইমেলা নিয়ে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, নামকরা কবি, লেখক হাবীবুল্লাহ সিরাজীর মুখোমুখি হয়েছেন ছাইফুল ইসলাম মাছুম

বইমেলায় অসংখ্য দর্শক, পাঠক, লেখক প্রকাশক আসেন। আয়ের পথ হিসেবে বাণিজ্যমেলার মতো বা ১০ টাকার টিকিট ব্যবস্থা চালু করবেন?

বেশ কয়েক বছর আগে একবার আমাদের বইমেলার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে টিকিটের ব্যবস্থা হয়েছিল। একাডেমি তার ও আশপাশের জায়গায় বইমেলার আয়োজন করে, কিন্তু বাঙালির ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ও সেই থেকে বয়ে আসা চেতনাকে ধারণ করে পুরো মেলার আয়োজন ও কার্যক্রম হয়। ফলে মেলাকে আমরা সর্বস্তরের দর্শক, পাঠক সবার জন্য উন্মুক্ত রাখতে চাই। তাই ভবিষ্যতে টিকিট ব্যবস্থা চালু করার কোনো পরিকল্পনা একাডেমিরও নেই। যতই কষ্ট হোক, নিজেদের উদ্যোগে সবাই মেলার ব্যবস্থাপনা বিনা টিকিটে করব। সেভাবে সবার জন্য একুশের সারা মাস বইমেলা পরিচালনা করব।

মেলার প্রতিষ্ঠাতা চিত্তরঞ্জন সাহা একজন প্রকাশক। প্রশ্ন ওঠে দায়িত্বে প্রকাশকরা না থেকে একাডেমি কেন?

কোনো উদ্যোগ, নব ধারণা, অনন্য কাজ অন্যভাবে শুরু হয়। সেটি নানাভাবে হতে পারে। আমরা সবাই প্রতি বছর শ্রী চিত্তরঞ্জন সাহার কথা স্বশ্রদ্ধে স্মরণ করি। তিনি মেলার প্রথম স্টলটি পান, তার নাম লেখা থাকে বড় করে। তিনি ১৯৭২ সালে ৩১ খানা বা মতান্তরে ৩২ খানা বই নিয়ে একাডেমির মূল অংশ বর্ধমান হাউজের সামনে মাদুর পেতে বিক্রি শুরু করেছিলেন। এই কাজটি তো ঠিক মেলা হিসেবে ধরা যায় না। তার এককভাবে বই বিক্রির উদ্যোগ। তারও আগে, স্বাধীনতার আগে বর্ধমান হাউজের নিচতলায় একটি কক্ষের জানালা দিয়ে আমরা বই কিনে নিয়েছি। স্পষ্ট মনে আছে। বই বিক্রি বা একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে বইমেলার ধারণাটি প্রথম এসেছে আশির দশকের মধ্যে। একাডেমির তখন মহাপরিচালক বিখ্যাত লেখক মনজুরে মাওলা। তার উদ্যোগে ও সময়ে আনুষ্ঠানিক একুশের বইমেলা শুরু করা হলো। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মহাপরিচালক হিসেবে আরেকটি উদ্যোগ নিলেন বিখ্যাত লেখক সরদার জয়েন উদ্দিন। ঢাকার পাশে নারায়ণগঞ্জে গ্রন্থকেন্দ্রের মাধ্যমে বইমেলা করলেন। আকর্ষণও সৃষ্টি করেছিলেন- একটি গরুর গলায় প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে ছিলেন। লেখা- ‘আমি বই পড়ি না।’ মানুষ বই পড়ে, গরু পড়ে না। ফলে সে গরু থাকে। মানুষ হতে হলে বই পড়তে হবে, বলেছেন জয়েনউদ্দিন। তাদের সবার মাধ্যমে আজকের বিরাট বইমেলায় বাংলা একাডেমির সহযোগী হিসেবে কাজ করে জ্ঞান ও সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশক সমিতি, পরিবেশ, বই ব্যবসায়ী সমিতি। নিজস্ব জনবলে মেলার ব্যবস্থাপনা করে দেয় একাডেমি। সঙ্গে থাকে- সরকারের পুলিশ, আনসার ও দমকল বাহিনী। সরকারের গণপূর্ত বিভাগ আমাদের মাঠ দেয়, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় বিদ্যুৎ দেয়। বিনিময়ে বাংলা একাডেমি তাদের সবার পাওনা টাকা পরিশোধ করে।

বাংলা একাডেমির আয়ের বড় ক্ষেত্র এই বইমেলা?

কোনোভাবেই একাডেমির আয়ের ক্ষেত্র বা উৎস বইমেলা নয়। সেটি হয়নি। এখনো প্রতি বছর বইমেলায় ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। একাডেমি একটি স্পন্সর নিয়ে বইমেলা করছে। এবার সহযোগিতায় ‘বিকাশ’। আমাদের স্পন্সর কুলিয়ে উঠতে পারছে না। ভর্তুকি দিতে হচ্ছে আমাদের। এভাবেই চলছে।

টাকার ঘাটতি কেমন?

প্রতি বছর অনেক টাকার ঘাটতি থাকে। অঙ্কটি বলব না, বলতে পারব না। তাই সরকারের কাছে বইমেলা খাতে আমরা টাকা বরাদ্দ চেয়েছি। আশা করছি, আগামী বছর থেকে বইমেলার জন্য সরকার আমাদের সহযোগিতা করবেন। সে টাকায় ঘাটতি পূরণ করতে পারব।

একুশে বইমেলার মাধ্যমে বাংলা একাডেমি কীভাবে লেখক, প্রকাশক পাঠকদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে চলেছে?

আমাদের একাডেমির পৃষ্ঠপোষকতার ধরন হলো আমরা উপায়গুলো তাদের বলে দিই। এখানে যে বইমেলা করা যায়, লেখকের তাতে দায়িত্ব, ভালো বই লিখে আনা, প্রকাশকদের কাজ ভালো বই প্রকাশ। তাতে বই ও মেলার মান উন্নত হবে। আমরা এবার মেলার পরিসর আরও বাড়িয়েছি। তার মানে এই না, বাংলা একাডেমি ভালো বই বের হবে এমন গ্যারান্টি দিতে পারে। তবে বইমেলার বইয়ের মান নির্ণয়ে একাডেমি উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি করেছে। তারা চেষ্টা করছেন, মেলায় যেসব বই প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ভালো বইগুলো নির্ধারণ করে দিতে।

অসুস্থ, অসহায় লেখক, প্রকাশক, পাঠক-সংশ্লিষ্টদের পাশে কীভাবে দাঁড়ান?

কে অসহায় লেখক বা কেন অসহায় প্রকাশক-নির্ণয় খুব কঠিন। তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা নানাভাবে আসে।

বইমেলার অর্জন বিকাশে একুশে বইমেলার সেরা পুরস্কার দেন?

বাংলা একাডেমি সেরা প্রকাশক পুরস্কার দেয়। সেরা সুন্দর স্টল পুরস্কার দেয়। শিশুদের জন্য আমরা ছবি আঁকা, আবৃত্তি প্রতিযোগিতা করি। তাদের মেধার বিকাশে পুরস্কার দিই।

সেরা রিপোর্টিংও হতে পারে। কারণ সাংবাদিকরা অসংখ্য লেখা লেখেন বইমেলায়। তাদের কীভাবে সম্মানিত করেন? মেলার আগে, পরে তো আপনারা কোনো বিজ্ঞাপন কোনো গণমাধ্যমে দেন না?

একুশে বইমেলা নিয়ে আমাদের আলাদা বিজ্ঞাপন দিতে হয় না। গণ্যমাধ্যমে এত বেশি কাভার হয় যে তাতে বইমেলার প্রচার কোনো অংশে কম হয় না। বইমেলার জন্য এ অংশগ্রহণ কম নয়। তবে মিডিয়া থেকে যারা সেরা রিপোর্ট করেন, সেরা চিত্র ধারণ করেন; তাদের সম্মানিত করতে মিডিয়াগুলো যদি আমাদের সহযোগিতা, সহায়তা করে, তাহলে পরিকল্পনাটি ভবিষ্যতে আমরা নিতে পারব।

অন্য বইমেলার মতো একুশে বইমেলাকে আরো পাঠকবান্ধব করতে একাডেমির উদ্যোগগুলো?

পৃথিবীতে অনেক বইমেলা আছে। এক-দুটিতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। দেখেছি, জার্মানির বিখ্যাত ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় কোনো বই বিক্রি হয় না! সেখানে কপিরাইট বিক্রি হয়। বইমেলাটি উপলক্ষে লোকের যাতায়াত, সবকিছু করতে যেভাবে প্রচার, প্রচারণা করে! সরকারি ব্যবস্থাপনা ও বইমেলা কমিটি সেগুলো সব করে। তেমন উদ্যোগ আমরাও ভবিষ্যতে নিতে পারব। সবাই মেলা শেষে সহজে যাতায়াত করতে পারবেন।

জেলায়, জেলায় বইমেলা কারা করেন?

সরকারিভাবে এই বইমেলাগুলো করার দায়িত্ব জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের। তারা প্রতি বছর এমন বইমেলা আয়োজন করছেন।

ইতিহাস, গবেষণা, ছড়া, কবিতা ইত্যাদির বই বিক্রি কম। কেন? এজন্য আপনাদের ধারাবাহিক, কার্যকর উদ্যোগ আছে?

যেকোনো বই কেন কম বিক্রি হয়? বইটির মান এবং সেটির জন্য পাঠক চাহিদার ওপর তা নির্ভর করে। ফলে বিক্রির বিষয়ে আমার আলাদা মত নেই। তবে বিক্রি বাড়াতে ভালো বই লেখা উচিত, পাঠকদের চাহিদামতোও লেখা উচিত।

প্রকাশনা সংস্থাগুলো নিয়ে লেখকদের অভিযোগের শেষ নেই। তারা বই বিক্রি লেখার কোনো সম্মানী দেন না। ভালোভাবে ছাপান না। মারা গেলে পরিবার বইয়ের রয়্যালটি পায় না। বছরব্যাপী বই বিক্রির হিসাব কারও কাছেই দেন না। এসব সমস্যা সমাধানে বাংলা একাডেমি সুধীজনদের নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে, নেবে?

এসবই এখন সবচেয়ে বড় কথা। কপিরাইট আইনে লেখক ও প্রকাশকের চুক্তি হলে সমস্যাগুলো পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের মুদ্রণ আইনে প্রকাশক লেখককে টাকা দিতে বাধ্য? লেখকের করণীয়?

আমাদের কপি রাইট আইন অনুযায়ী প্রকাশক লেখককে সম্পূর্ণ টাকা দিতে বাধ্য। লেখকের করণীয়- আইন না মানলে প্রকাশকের বিরুদ্ধে কপিরাইট আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।

এই প্রকাশনা শিল্প এখনো আমদানিনির্ভর- কাগজ, কালি, প্রেস সর্বক্ষেত্রে। শিল্পটিকে এগিয়ে নিতে আপনাদের কী কী উদ্যোগ আছে? এই দেশে প্রকাশনা শিল্প কেন দাঁড়াতে পারছে না?

এ বিষয়ে সরকারের সঠিক মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবেন। একে শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রকাশকদের অন্তর থেকে এগিয়ে আসতে হবে।

আপনি ভালো, নামকরা লেখক। এবার কতগুলো বই বেরিয়েছে? বই বিক্রি বাবদ টাকা পেয়েছেন?

এই বইমেলায় আমার নতুন বই একটি। কিছু আগের বইয়ের সংস্করণ এসেছে। কবিতাসমগ্র, গদ্যসমগ্র, শিশুতোষ লেখাসমগ্র বেরিয়েছে। কিছু পত্রিকার লেখার সংকলন নতুন বই হিসেবে প্রথমা করেছে- ‘জমিনে ফারাক নেই’। প্রকাশিত বইগুলো থেকে আমার প্রত্যাশা অনুযায়ী টাকা পেয়েছি।

একুশের বইমেলায় সব বইয়ের ওপর শতকরা ২৫ ভাগ ছাড় দেওয়া হয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ছাড় নেই কেন?

শিক্ষার্থীদের জন্য বই চিহ্নিত করা এবং শিক্ষার্থীও চিহ্নিত করা দরকার। শিক্ষার্থী চিহ্নিত করা না গেলে, বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করার সুযোগ নেই।

অনেক পুরনো বইয়ের বিক্রেতা বই বিক্রি করে খান।

অনেক দেশের বইমেলায় পুরনো, দুর্লভ কালেক্টরের বই বিক্রির জায়গা থাকে। আমাদের দেশে এমন উদ্যোগ নেবেন?

পুরনো বই বিক্রির জন্য আলাদা স্টল বরাদ্দের আপাতত পরিকল্পনা আমাদের নেই।

মাসজুড়ে বইমেলার বড় কালটি পেরিয়েছে। মেলা কতটা সফল?

একুশে বইমেলার প্রায় তিন সপ্তাহ পেরিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে আমরা মনে করি ৮০ থেকে ৯০ ভাগ সফল হয়েছি। যেভাবে আশা করেছিলাম অবকাঠামো সেভাবে করতে পেরেছি। তবে আগেই বলেছি, বইয়ের মান ও সংখ্যা আমরা এখনো পর্যবেক্ষণ করছি।

(১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০, বাংলা একাডেমি, ঢাকা)