‘আত্মহত্যা করেন’ পুলিশকন্যা রুম্পা|200505|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
‘আত্মহত্যা করেন’ পুলিশকন্যা রুম্পা
ইমন রহমান

‘আত্মহত্যা করেন’ পুলিশকন্যা রুম্পা

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রুবাইয়াত শারমিন রুম্পা (২১) আত্মহত্যাই করেন আর তার পেছনে তিনটি কারণ রয়েছে বলে মনে করছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) কর্মকর্তারা বলছেন, রুম্পার আত্মহত্যায় প্ররোচনায় ফেঁসে যাচ্ছেন তার সাবেক প্রেমিক সৈকত। এজন্য তার সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।   

ডিবি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, গত বছরের ৪ ডিসেম্বর রাতে সিদ্ধেশ্বরীর যে ১২তলা আয়েশা কমপ্লেক্সের পাশের গলি থেকে রুম্পার মরদেহ উদ্ধার করা হয় সেই ভবনের ছাদে কোনো রেলিং নেই। ঝুঁকিপূর্ণভাবে সবাই ছাদে ওঠে। ওই ছাদে এর আগেও বান্ধবী সুলতানার সঙ্গে উঠেছিলেন রুম্পা। ছাদের যেখান থেকে তিনি নিচে পড়েন সেখানকার ‘ফুট প্রিন্ট’ পরীক্ষা করে রুম্পা ছাড়া অন্য কারও পায়ের ছাপ পাওয়া যায়নি। সৈকতের ডিএনএ নমুনা রাখা হয়েছে। রুম্পার ডিএনএ প্রতিবেদন পেলে তা মিলিয়ে দেখা হবে। ভিসেরা প্রতিবেদনে পাওয়ার পরই আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র)  দাখিল করবে ডিবি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির দক্ষিণ বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শামসুল আরেফিন গত বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মরদেহ উদ্ধারের পর আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও পারিপার্শ্বিক আলামত পর্যালোচনা করে রুম্পা আত্মহত্যা করেছে বলে আমরা মনে করছি। রুম্পার আত্মহত্যার পেছনে তার সাবেক প্রেমিক সৈকতের কিছুটা দায় রয়েছে। মরদেহের ভিসেরা প্রতিবেদন ছাড়া বাকি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন আমাদের হাতে এসেছে। ডিএনএ টেস্ট ও ভিসেরা প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডের আলামত না পেলে এবং আত্মহত্যার পেছনে কারও ইন্ধন পাওয়া গেলে আত্মহত্যায় প্ররোচনার ধারায় আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারীর সর্বোচ্চ ১০ বছরের জেল হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘এই দুই প্রতিবেদন আসতে আরও মাসখানেক সময় লাগবে বলে জেনেছি। প্রতিবেদন আসার পরই চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।’

গত ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় রুম্পার বাসা থেকে বের হওয়া এবং মরদেহ উদ্ধারের মাঝের চার ঘণ্টা তিনি কোথায় ছিলেন জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা আরেফিন বলেন, ‘আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হলেও তা অস্পষ্ট। এজন্য এ বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। তদন্ত চলছে।’

রুম্পার মরদেহ উদ্ধারের পর হত্যাকাণ্ড ধরেই তদন্তে নামে পুলিশ। তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন কি না সে বিষয়ও খতিয়ে দেখেন তদন্তকারীরা। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ধর্ষণের আলামত মেলেনি। ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত রুম্পা কোথায় ছিলেন তার কোনো তথ্য পায়নি পুলিশ।

স্বজন ও সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘটনার ছয় মাস আগে সৈকতের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে রুম্পার। কিন্তু তিন মাসের মাথায় সম্পর্ক ছিন্ন করেন সৈকত। ফলে সদা হাস্যোজ্জ্বল রুম্পা অনেকটা নিশ্চুপ হয়ে যান। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়াও করতেন না। লাশ উদ্ধারের দিন বিকেলেও আয়েশা কমপ্লেক্সের সপ্তম তলায় বান্ধবী সুলতানার বাসায় গিয়েছিলেন রুম্পা। সৈকতের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছেদ হওয়া নিয়ে তখনো কান্নাকাটি করেন তিনি। পরে সেখানে থেকে টিউশনির উদ্দেশে বের হন। টিউশনি শেষে সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটের দিকে বাসার নিচে যান। রাত সাড়ে ১০টায় আয়েশা কমপ্লেক্সের পাশের গলি থেকে রুম্পার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সে সময় ডিএমপির রমনা জোনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, রুম্পার মরদেহ উদ্ধারের সময় তার শরীর ঠান্ডা ছিল। এ ছাড়া বহুতল ভবন থেকে কেউ নিচে পড়লে যতটা রক্তপাত হওয়ার কথা সেই তুলনায় অনেক কম রক্তপাত হয়েছে।’

তদন্ত সংশ্লিষ্ট ডিবি কর্মকর্তারা বলছেন, রুম্পার আত্মহত্যার পেছনে তিনটি কারণ তদন্তে উঠে এসেছে। সৈকত তার বাবা ও চাচা হার্ট অ্যাটাকে মারা যাওয়ার কথা বলে রুম্পার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এতে রুম্পা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক ছিল। রুম্পা বেশি আবেগি ছিলেন এবং সৈকতের অবহেলা মানতে পারতেন না।

ডিবির ইন্সপেক্টর আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলেন, ‘মরদেহ উদ্ধারের পর হত্যা মামলা হলেও এটি আত্মহত্যা বলে অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই আত্মহত্যার পেছনে তিনটা কারণ রয়েছে। আর এগুলোর সঙ্গে তার সাবেক প্রেমিক সৈকত জড়িত রয়েছে। সে ক্ষেত্রে মামলাটি পরিবর্তন হয়ে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা হবে।’

গত বছরের ৪ ডিসেম্বর রাতে সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোডের ৬৪/৪ নম্বর বাসার গলিতে রুম্পার লাশ উদ্ধারের পর সে রাতেই অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে রমনা থানায় হত্যা মামলা করে পুলিশ। ৮ ডিসেম্বর তার সাবেক প্রেমিক সৈকতকে আটক করা হয়। থানা-পুলিশ প্রথমে মামলাটি তদন্ত করলেও পরে দায়িত্ব পায় ডিবি।