যুব মহিলা নেত্রীর কেলেঙ্কারি গা করছে না আওয়ামী লীগ|200884|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
যুব মহিলা নেত্রীর কেলেঙ্কারি গা করছে না আওয়ামী লীগ
পাভেল হায়দার চৌধুরী

যুব মহিলা নেত্রীর কেলেঙ্কারি গা করছে না আওয়ামী লীগ

যুবলীগের ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির পর এবার ফাঁস হলো যুব মহিলা লীগ নেত্রীর কেলেঙ্কারির ঘটনা। গতকাল শনিবার ঢাকা বিমানবন্দর থেকে র‌্যাব এক দম্পতিসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে। বিলাসী জীবনযাপনকারী ওই দম্পতি দুই সহযোগীকে নিয়ে বিদেশে পালানোর চেষ্টায় ছিলেন এমন অভিযোগ এনে র‌্যাব গ্রেপ্তার করে তাদের। এর মধ্যে এক নারী রয়েছেন তিনি হলেন নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শামিমা নূর পাপিয়া। গ্রেপ্তার অন্য তিনজন হলেন পাপিয়ার স্বামী ও তার অবৈধ আয়ের হিসাবরক্ষক মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমন, পাপিয়ার ব্যক্তিগত সহকারী শেখ তায়্যিবা ও সাব্বির খন্দকার। তাদের কাছে পাওয়া গেছে সাতটি পাসপোর্ট, বাংলাদেশি ২ লাখ ১২ হাজার ২৭০ টাকা, ২৫ হাজার ৬০০ জাল টাকা, ৩১০ ভারতীয় রুপি, ৪২০ শ্রীলঙ্কান মুদ্রা, ১১ হাজার ৯১ মার্কিন ডলার ও সাতটি মোবাইল ফোন। পাপিয়ার এই গ্রেপ্তারের ঘটনা সারা দেশে নেতিবাচক আলোচনার জন্ম দিলেও এ নিয়ে তেমন গা করছে না ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। তারা বলছে, আওয়ামী লীগ তো আর কারও পারিবারিক ও ব্যক্তিগত খোঁজখবর রাখে না। পদ-পদবি ব্যবহার করে কেউ কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়ালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তো রয়েছেই।

যুব মহিলা লীগের নেতারাও আলোচিত এ ঘটনা নিয়ে নির্ভার। অবশ্য যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আক্তার ও সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল সংগঠন থেকে তাকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করেন। যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা এই প্রসঙ্গে বলেন, যত দিন পর্যন্ত যোগ্যতার মানদন্ডে সংগঠনগুলোতে নেতা নির্বাচন করতে ব্যর্থ হবে, তত দিন নেতা নিয়ে এ ধরনের সমালোচনা হবেই। সংগঠনের কেন্দ্রীয় এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তদবিরে নেতা বানানোর সুযোগ বন্ধ করে দিতে হবে, তাহলেই কোনো নেতা অনৈতিক কাজে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ পাবে না। তিনি বলেন, আমরা যারা সংগঠন করি, শ্রম দিই, মেধার চর্চা করি একমাত্র তদবিরের কাছে আমরা ব্যর্থ হয়ে যাই। সুযোগ পেয়ে যায় অযোগ্যরা। ফলে এ ধরনের সমালোচনা থামবে না। ওই যে কয়েকটি অভিযান ও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার, ঘটনার পরেও দল থেকে বহিষ্কার করলেই সমাধান হবে না। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো অপরাধীর স্থান নেই আমাদের সংগঠনে। তিনি বলেন, আপনারা দেখেছেন পাপিয়ার নামে অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আমরা তাকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করেছি। এ ধরনের নেতার পদ দেন কেনজানতে চাই তিনি বলেন, পদ পাওয়ার আগে আমরা তো জানতাম না সে অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আপনারা নেতাদের সম্পর্কে খোঁজ রাখেন না কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এত বড় একটা সংগঠন কার খোঁজ কে রাখে? ভবিষ্যতে দলের অভ্যন্তরে থাকা অপরাধীদের চিহ্নিত করার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেভাবে কোনো পদক্ষেপ নেই। তবে কেউ কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন খবর পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেব আমরা। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। গতকাল রবিবার যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি নাজমা আকতার ও সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বহিষ্কারের তথ্য জানানো হয়।

অপরাধের দায়ে গ্রেপ্তার হওয়া পাপিয়ার খবরটি সারা দেশে আলোচনা-সমালোচনা অব্যাহত থাকলেও গা করছে না আওয়ামী লীগ। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, অপরাধীর ক্ষমা নেই এই দলে। সে যেই হোক না কেন। তিনি বলেন, ইতিপূর্বে আপনারা দেখেছেন কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে আওয়ামী লীগ সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। নেতা হওয়ার আগে এসব অপরাধীর ব্যাপারে কেন খোঁজখবর রাখেন না জানতে চাইলে দিনি বলেন, এভাবে খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। বিভিন্ন সময়ে আপনারা দাবি করেন নেতা বানানোর আগে তদন্ত করেন প্রত্যেকের তাহলে এরা কীভাবে জায়গা পায় দলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নেতা বানানোর আগে পারিবারিক ঐতিহ্য কী, রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড কী এসব খবর নেওয়া হয়। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ একটা বড় সংগঠন, কিছু ভুল নেতা তো হয়ই। তবে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত দশ বছরে এ দলে এত আগাছা জন্ম নিয়েছে যে লোম বাছতে গেলে কম্বলই থাকবে না। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে উপায় কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, নেতা বানানোর আগে তদবির বন্ধ করতে হবে। তদবিরে আর্থিক লেনদেনে যারা নেতা হয় তারাই আসলে অবৈধ উপায়ে টাকা আয়ের পথ খোঁজে। রাজনীতি এখন ধন দৌলতের হাতিয়ার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নেতা দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, শুদ্ধি অভিযান ভ-ুল না হলে অপরাধীরা ভয় পেত। নানা কারণে আসলে ওই অভিযান বন্ধ হয়ে গেছে এবং জৌলুশ হারিয়ে ফেলেছে।

শনিবার গোপনে দেশ ত্যাগের সময় পাপিয়াকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তার বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের ব্যবসা, অর্থ পাচারসহ অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে পাপিয়াকে গ্রেপ্তারের খবর জানিয়ে বলা হয়, গত তিন মাসে তিনি শুধু ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলেই বিল দিয়েছেন ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ওই হোটেলের প্রেসিডেন্ট স্যুট সব সময় তার নামে বরাদ্দ থাকত। হোটেলটির বারে তিনি প্রতিদিন বিল দিতেন প্রায় আড়াই লাখ টাকা। অথচ বৈধভাবে তার বার্ষিক আয় মাত্র ১৯ লাখ টাকা। র‌্যাব জানায়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পাপিয়ার বিষয়ে অনুসন্ধান করছিল একটি দল। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে তড়িঘড়ি করে দেশত্যাগের সময় শনিবার সকালে বিমানবন্দর থেকে তিন সহযোগীসহ তাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১। পরে তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ওই পাঁচ তারকা হোটেল থেকে চার নারীকে আটক করা হয়। মোটা অঙ্কের টাকায় তাদের দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসামাজিক কাজ করিয়ে আসছিলেন পাপিয়া ও তার স্বামী।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর আরেক সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারও ব্যক্তিগত অপরাধের দায় আওয়ামী লীগ নেবে না। অপরাধীকে লালন-পালনও আওয়ামী লীগ করে না। অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রয়েছে তারা ব্যবস্থা নেবে। তিনি বলেন, পাপিয়া ইস্যুতে আমরা বিব্রত কেন হব।