রজব মাসের তাৎপর্য|201410|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০
রজব মাসের তাৎপর্য
মাওলানা মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন

রজব মাসের তাৎপর্য

এখন চলছে হিজরি বর্ষের রজব মাস। আল্লাহতায়ালা যে চারটি মাসকে ‘আশহুরে হুরুম’ বা সম্মানিত ঘোষণা করেছেন রজব তার অন্যতম। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টির দিন থেকে আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস নিশ্চয়ই বারোটি। সুতরাং তোমরা এই মাসগুলোতে নিজেদের প্রতি অত্যাচার  কোরো না।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৩৪)

হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘বারো মাসে বছর। তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। তিনটি ধারাবাহিক : জিলকদ, যিলহজ, মহররম আর চতুর্থটি হলো রজব; যা জুমাদাল উখরা  ও শাবান মাসের মধ্যবর্তী।’ (বুখারি : ২/৬৭২)

ইসলামের দৃষ্টিতে রজবের বিশেষ তাৎপর্য ও গুরুত্ব রয়েছে। মুসলিম মনীষীরা  বলেছেন, এসব মাসে ইবাদতের প্রতি যতœবান হলে বাকি মাসগুলোতে ইবাদতের তাওফিক হয়। আর গুনাহ থেকে বিরত থাকতে পারলে অন্যান্য মাসেও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়। (আহকামুল কোরআন, লিল জাসসাস : ৩/১১১; মাআরিফুল কোরআন : ৪/৩৭২)

রজব মাসে দোয়া কবুল

আল্লাহতায়ালা বিশেষ কিছু রাত-দিনে বান্দাদের দোয়া ব্যাপকভাবে কবুল করেন। এসব রাত-দিনের মধ্যে পাঁচটি রাত অন্যতম। আবদুল্লাহ ওমর (রা.) বলেন, এমন পাঁচটি রাত আছে যেগুলোতে আল্লাহতায়ালা বান্দার দোয়া ফিরিয়ে দেন না। জুমার রাত, রজবের প্রথম রাত, শাবানের ১৫ তারিখের রাত ও দুই ঈদের রাত।’ (সুনানে বায়হাকি, হাদিস : ৬০৮৭; মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ৭৯২৭)

কায়েস ইবনে উবাদা (রা.) বলেন, ‘রজবের দশম তারিখে মহান আল্লাহ বান্দার দোয়া কবুল করেন।’ (তাফসিরে কুরতুবি : ৯/৩৩২)

এ মাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা

একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এ মাসে। এতে উম্মাহর জন্য অনেক শিক্ষা রয়েছে। এ মাসের ২৭তম রাতে রাব্বুল আলামিন তার প্রিয় হাবিব রাসুলে কারিম (সা.)-কে দাওয়াত করে এই জগৎ থেকে ঊর্ধ্বজগতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তার প্রতি বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন।

নুহ (আ.)-এর জাতিকে আল্লাহ মহাপ্লাবনের মাধ্যমে ধ্বংস করেছেন। আর নুহ (আ.)-কে তার নির্মিত বিশাল জাহাজের মাধ্যমে রক্ষা করেছেন। তাফসিরে তাবারি ও বগভিতে আছে, নুহ (আ.) রজবের ১০ তারিখে কিস্তিতে আরোহণ করেছিলেন। দীর্ঘ ছয় মাস পর্যন্ত ওই কিস্তি তুফানের মধ্যেই চলছিল। পরিশেষে ১০ মুহররম আশুরার দিন ইরাকের জুদি পর্বতে জাহাজটি অবতরণ করে। (মাআরেফুল কোরআন, পৃষ্ঠা : ৬৩২)

বিশেষ কোনো আমল নেই

শরিয়তের পক্ষ থেকে এ মাসের জন্য নির্ধারিত বিশেষ কোনো নামাজ, রোজা ও বিশেষ কোনো আমলের হুকুম দেওয়া হয়নি। তাই মনগড়া আমল করে এ মাসের ফজিলত ও বরকত লাভ করা যাবে না। রজব মাসের বরকত ও ফজিলত হাসিল করার জন্য অন্য মাসে পালনীয় ফরজ ইবাদতগুলো যথাযথ পালন করতে হবে। বেশি বেশি নফল ইবাদত করতে হবে।

মহিমান্বিত মাসগুলোতে, বিশেষ করে রজব মাসে সতর্ক থাকতে হবে; যেন নিজের ওপর কোনো ধরনের জুলুম না হয়। জুলুম অর্থ গুনাহ, পাপাচার ও অন্যায়-অপরাধ করা। সবচেয়ে বড় জুলুম হচ্ছে শিরক করা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই শিরক অনেক বড় জুলুম ও অন্যায়।’ (সুরা লোকমান, আয়াত : ১৩)

রজব মাসের রোজা

নফল রোজা রাখা অনেক ফজিলতপূর্ণ আমল। তবে এ মাসে রোজা রাখার আলাদা কোনো ফজিলত নেই। প্রখ্যাত হাদিসবেত্তা হাকেম ইবনে হাজার (রহ.) লিখেছেন, ‘বিশেষভাবে রজব মাসে রোজার ফজিলত সম্পর্কে বিশুদ্ধ ও আমলযোগ্য কোনো হাদিস নেই।’ (তাবইনুল আজর বিমা ওরাদা ফি ফজলি রজব, পৃষ্ঠা : ১১)

শরিয়ত কর্তৃক রোজা রাখার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ দিনগুলো ছাড়া যেকোনো দিনই নফল রোজা রাখা যায়। তবে রজবে বিশেষ ফজিলতপূর্ণ মনে করে রোজা রাখা সুন্নত নয়। এ মাসে রোজা রাখাকে সুন্নত ও মুস্তাহাব মনে করাও ঠিক নয়।

রজবের ২৭ তারিখে রোজা রাখা

সমাজে প্রচলিত আছে, ২৭ রজবে রোজা রাখা অনেক ফজিলত। অনেকের বিশ্বাস, এ দিনের রোজার ফজিলত এক হাজার রোজার সমান। অথচ এ ব্যাপারে সহিহ ও গ্রহণযোগ্য কোনো বর্ণনা নেই। আল্লামা ইবনুল জাওজি, হাফেজ জাহাবি, তাহের পাটনি, আবদুল হাই লৌখনবি (রহ.) প্রমুখ প্রখ্যাত হাদিসবিশারদ এ রোজার ফজিলতকে ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলেছেন। (কিতাবুল মাওদুয়াত, ইবনুল জাওজি : ২/২০৮; তালখিসুল মাওদুয়াত, পৃষ্ঠা : ২০৯; তাজকিরাতুল মাওজুয়াত, পৃষ্ঠা : ১১৬; আল আসারুল মারুফা, পৃষ্ঠা : ৫৮)

রজব মাসের দোয়া

আনাস বিন মালেক (রা.) বলেন, রজব মাস এলে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজাবা ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রামাদান।’ অর্থ : হে আল্লাহ! রজব ও শাবান মাসে আমাদের বরকত দান করুন, আর রমজান পর্যন্ত আমাদের জীবিত রাখুন। (মুজামুল আওসাত, হাদিস : ৩৯৩৯; বায়হাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস : ৩৫৩৪)

রজবে কুসংস্কার নয়

ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগে রজব মাসে মুশরিকদের বিভিন্ন প্রথা প্রচলিত ছিল। তারা দেবতা-প্রতিমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু জবাই করত। এটাকে ‘আতিরা’ বলা হতো। রাসুল (সা.) এই শিরকি প্রথা দূর করেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, “ইসলামে ‘ফারা’ (উট বা বকরির প্রথম বাচ্চা প্রতিমার উদ্দেশ্যে) জবাই করার কোনো বিধান নেই এবং ‘আতিরা’ও নেই।” অর্থাৎ রজব মাসে প্রতিমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু জবাই করার প্রথা নেই।’ (বুখারি, হাদিস : ২/৮২২)