নীরবে বেঁচে আছে|204366|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ মার্চ, ২০২০ ০০:০০
নীরবে বেঁচে আছে
মোহাম্মদ আল আমিন তুষার

নীরবে বেঁচে আছে

লেখা ও ছবি :মোহাম্মদ আল আমিন তুষার

তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। এক রোজার ঈদের সালামিতে ৫০ টাকার চকচকে নোট পেলাম। অনেক টাকা পেয়ে খরচ করব কী–অসাধারণ সুন্দর এক মসজিদের ছবি দেখে হতবাক। এত দারুণ! ‘মা, মসজিদটি কোথায়?’ ‘আমাদের রাজশাহীর বাঘা উপজেলায়।’ সেখানে নানাবাড়ি। অবশ্যই যাব, মনে মনে বলেছি। ছবির প্রতি তুমুল ভালোবাসার এই এক কারণ হলো। সেই থেকে আলো, ছায়ার; সুন্দরকে ধরে রাখার ইচ্ছের জন্ম ভেতরে। এমন অপূর্ব সৃষ্টি দেখব দেখব করে দেখা হলো না। বড় হয়েছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। নানুকে আনতে গেলাম রাজশাহী। একদিনে ঘুরে এলাম শৈশবের ভালোবাসার মসজিদ। রাজশাহীর পুরনো বাস টার্মিনাল থেকে চড়ে বসলাম বাঘার বাসে। জনপ্রতি ৬০ টাকা। সকাল ১০টায় বাসে; সদর থেকে ৩৭ কিলোমিটার যেতে হয়। দক্ষিণ-পূর্বের এলাকা– বাঘা একটি উপজেলা। তবে বিশ্ববিখ্যাত তার অনন্য সুলতানি আমলের এই মসজিদের জন্য। তখন বাংলা শাসন করতেন নবাবরা। তাদের ওখানে যেতে বাসে লাগল মোটে দেড় ঘণ্টা। ১০ মিনিটের ভ্যানের যাত্রাপথ শেষে বললেন, ‘নামুন ভাই, এসে গেছেন।’ নেমে দেখি, অনেক বছরের এক তেঁতুল গাছ।

তার নিচে ফটক। সুলতানি আমলে তৈরি বলে দেয়। বাঘা শাহী মসজিদের এই প্রবেশঘর। সামনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নীল সাইনবোর্ড টাঙানো। নানা তথ্য পড়ে জানলাম, অনুমান মতে, ১৫২৩ সাল থেকে ১৫২৪ মোটে এক বছর সময়ে বিখ্যাত, অনিন্দ্যসুন্দর মসজিদটি বানানো। ‌‘হোসেন শাহ’ বংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ। তার ছেলে সুলতান নাসির উদ্দিন নসরত শাহের আমলে, তার নির্দেশে তার পীরের পুণ্য স্মৃতিতে তৈরি। বাঘা মসজিদের উত্তর কোণে বিখ্যাত ইসলাম প্রচারক, সুফি সাধক হযরত শাহ দৌল্লা (রহ.) ও তার পাঁচ অনুসারীর মাজার। আজও ভালোবেসে যত্ন করে, গেলাফ; ঝাড়বাতি জ্বালান সবাই। বাঘা মসজিদ তৈরি হয়েছে আরবি বছর ৯৩০ হিজরি সালে। এখন মোট ২৫৬ বিঘা জমি আছে মসজিদ এলাকার। উত্তরে মুখ করা মসজিদে প্রবেশ করলে স্নিগ্ধ, শান্ত ও অনাবিল প্রশান্তিতে ভরে মন। মসজিদের আঙিনা বা ফ্লোর সমতলের আট থেকে ১০ ফিট ওপরে। খুব রহস্য! দেয়ালে, দেয়ালে চুন ও সুড়কির গাঁধুনি; মাঝে মাটির নকশাদার ইট। ভেতরে ও বাইরের দেয়ালে, সুন্দর বিশাল মোটা স্তম্ভ। মেহরাবগুলোতে এখনো কারুকাজ বেঁচে আছে–গবেষণার অমূল্য বিষয়। কারুকাজ করে মাটি পুড়িয়ে সেগুলো দিয়ে ইট বানিয়ে বসানো হয়েছে মসজিদের শরীর। কাছে গিয়ে ভালো করে খেয়াল করে দেখি, আমগাছ, শাপলা, লতাপাতা; ফরার্সি নানা বর্ণমালা ও স্থাপত্যে খোদাই মসজিদ। ভেতরে ও বাইরে অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক। এখনো কী অসাধারণ রং। কত যত্নে শিল্পীরা কাজ করেছেন! মোট ১০টি গম্বুজ। চারটি মিনার–ওপরের অংশগুলো আবার গম্বুজের মতো।

এগুলো বাইরের। ভেতরে আছে ছয়টি গম্বুজ। এ ১০টিতেই বেঁচে আছে মসজিদের কাঠামো। চারটি মেহরাবের নিচে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ানো হতো। যুদ্ধের সময় সেপাইরা থাকতেন। একটি অন্যগুলোর চেয়ে ছোট। মোয়াজ্জিন কারি মোহাম্মদ শওকতুল ইসলাম বললেন, ছোট মেহরাবে নারী মোয়াজ্জিন নামাজ পড়াতেন। মসজিদের উত্তর-পশ্চিম কোণে একটু উঁচুতে এই বিশেষ নামাজ ঘর নারীদের জন্য ছিল। তবে সংস্কার করতে গিয়ে আর রাখা হয়নি। বাঘা শাহী মসজিদের ওপর আঘাত কম আসেনি। অনেক বছর ধরে নামি এই পবিত্র স্থানের খাদেম মোহাম্মদ মামুন আলী বললেন, ১৮৯৭ সালের ভয়ংকর ভূমিকম্পে উপজেলা ও আশপাশের এমন নামকরা, ইতিহাসের অনেক আঁতুড়ঘর ভেঙে গিয়েছে। বিরাট শক্তিশালী এ মসজিদের অসম্ভব শক্তিধর ১০টি গম্বুজ ভেঙে পড়েছে। পুরো মসজিদের ভেতর দীর্ঘকাল ভেঙে পড়ে ছিল। কেউ যেতেন না। ওপরে টিন দিয়ে ছাপড়া ঘরের মতো বানিয়ে নামাজ আদায় শুরু করলেন মুসল্লিরা। সেগুলোও ভেঙে পড়ল। এরপর তৈরি করা হয়েছে ঠিকভাবে গম্বুজগুলো। মসজিদের জীবন বেঁচেছে। কাজটি চলেছে ১৯৭৬ সালের আগস্ট থেকে ১৯৭৭ সালের জুলাই। এখন মসজিদের মূল প্রবেশপথ পাঁচটি, সবই পুব দেয়ালে। মসজিদে বিদ্যুৎ আছে। আলো আসার পর উত্তর ও দক্ষিণের দেয়ালের দুটি করে চারটি প্রবেশপথ বন্ধ করে দিতে হয়েছে। মসজিদের চারদিক সুলতানি আমলের নগররাষ্ট্রের জনপদের নিয়মে প্রাচীরের। নানা আপদ-বিপদে মানুষ মসজিদে আশ্রয় নিতেন। দুপাশে দুটি প্রবেশ ফটক। অনিন্দ্য কারুকার্যের দক্ষিণেরটি ভালো আছে। তবে উত্তরের ফটক নাজুক। আগে তাদের একরকম দেখেছেন প্রবীণরা। বাঁচানো সম্ভব? বাঘা মসজিদ টেরাকোটার অপূর্ব নিদর্শন। কিছু নোনা ধরে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল জায়গায় জায়গায়; ২০০৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে সিরাজগঞ্জের বিখ্যাত ‌‘টেরাকোটা মাস্টার আর্টিস্ট’ মদন পাল তেমন করে বানিয়ে দিলেন। রাজশাহীর আম, গোলাপ, ফুলগুলোর নকশা কাটা দেখলাম। সবসময়, সবাই আসতে পারেন বাঘা মসজিদে। প্রাচীন স্থাপত্যকর্ম তাদের মন ভালোবাসায় ভরিয়ে দেয়। অজু করতে পারেন পাশের দর্শনীয় ৫২ বিঘা বিশাল দিঘিতে। সুলতানই মানুষের পানি ও জীবনের প্রয়োজন মেটাতে বানিয়ে দিয়েছিলেন।  চারপাশে সারি সারি নারকেল গাছ ছায়া দেয়, জল শীতল করে।

চারটি বাঁধানো পাড়ে মানুষ পানি খান, অজু করেন। প্রতি শীতে লাখ মাইল পেরিয়ে জীবন বাঁচাতে অসংখ্য অতিথি পাখির দল আসে। ভরে দিঘি। এলাকা মুখর করে।  মসজিদের পাশে দরগাহ শরিফ। খাদেম হাসান আলী জানালেন, দরগার প্রাণ মসজিদের প্রতিষ্ঠাতার ছেলে হযরত শাহ আবদুল হামিদ (রহ.)’র মাজার শরিফ। এ প্রাঙ্গণকে কেন্দ্র করে প্রতি রোজার ঈদে দুই মাসের দীর্ঘ আসবাব মেলা হয়। সারা বছর জমাট মেলার রেশে ছোটখাটো খেলনা, হাতের কাজ, নানা কিছু বিক্রি হয়। কিনে নেন বছরওয়ারি বেড়ানো ও মনের বাসনা পূর্ণ করতে আসা মানুষরা। তাদের থাকার জন্য বাঘা উপজেলা ডাকবাংলো হয়েছে। কটি আবাসিক হোটেল আছে। খরচ কম। সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু একটি ছোট পাঠাগার গড়ে দিয়েছেন। মসজিদের পাশে জহর খাকি পীরের সাহেবের মাজার। মূল মাজারের উত্তরে তার কবর। প্রায় শ’ পাঁচ বয়সের বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষী এই ‘বাঘা’ মসজিদ।