করোনাভাইরাস: জীবন ও মৃত্যুর লড়াই|206223|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৩ মার্চ, ২০২০ ১৭:৩৬
করোনাভাইরাস: জীবন ও মৃত্যুর লড়াই
সৈয়দা রাহনুমা শরমিন দিশা

করোনাভাইরাস: জীবন ও মৃত্যুর লড়াই

জীবনের সমাপ্তি মৃত্যুতে, জীব মাত্রই মৃত্যুকে অনুসরণ করছে- এই ‘সত্যর’ ব্যত্যয় আমি জেনেছি বেশি দিন হয়নি। প্রাণ সৃষ্টির গোড়ায় মৃত্যু ছিল না। জীবনের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু সংযোজিত হয়েছে। মৃত্যু হয়তো প্রাণের বিকাশের ধাপ, উন্নতির চিহ্ন। এখনো কোনো কোনো নিচু স্তরের জীবের মৃত্যু হয় না।

ছোটবেলায় আমরা সবাই পড়ি- জীব এবং জড়’র পার্থক্য। একটু বড় হওয়ার পর পরিচয় হয় ভাইরাসের সঙ্গে- জীব এবং জড় জগতের সেতুবন্ধন।

ভাইরাস জীব নয়, কিন্তু জীবনোপযোগী অণুসমূহ- প্রোটিন, নিউক্লিয়িক অ্যাসিড, লিপিড এবং কার্বোহাইড্রেট এর জটিল সমাবেশ। এরা কেবলই সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারে, তাও নিজে নিজে নয়, কোনো জীবকোষে ভর করে। এদের সংখ্যাবৃদ্ধিকে প্রজনন বলে না, বলে Replication. ভাইরাস জীবকোষের মুখোমুখি হলে বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়, এর ফলে নতুন ভাইরাস উৎপন্ন হয়। এই ধাপগুলি আসলে পূর্বনির্ধারিত এবং ভাইরাস মূলত নিষ্ক্রিয় পদার্থ।

কিন্তু কতকাল?

ভাইরাসের নিউক্লিয়িক অ্যাসিড (ডিএনএ/আরএনএ) প্রোটিন দিয়ে আবৃত থাকে। এ পর্যন্ত নিষ্প্রাণ রসায়ন। কিন্তু যখনই সে জীবকোষে (পোষক) প্রবেশ করে, একে মোটেই আর নিষ্ক্রিয় বলা চলে না। জীবকোষের ভেতর সে তার প্রোটিন আবরণ ভেঙে নিউক্লিয়িক অ্যাসিডকে উন্মুক্ত করে এবং তারই সংকেতে পুনরুৎপাদিত হতে থাকে, যা আবার নতুন কোষে স্থান নেয়, ব্যাহত করে প্রাণকোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম।

এ কারণেই ভাইরাসকে রসায়ন এবং জীবনের সীমারেখা মনে করা হয়।

ভাইরাসের সঙ্গে আমাদের নিত্য ওঠাবসা। মৌসুমি জ্বরজারি থেকে শুরু করে দুনিয়া কাঁপানো এইচআইভি সবই তার লীলাখেলা।

এখন অবশ্য দুনিয়া কাঁপছে অন্য জ্বরে। এই মহামহিম সার্স-করোনা-ভাইরাস-২, সে মানব শরীরে কখন কীভাবে ঢুকে পড়ল, সেসব পরে জানা যাবে। যা জলজ্যান্ত জানা যাচ্ছে, তা হলো, এটি প্রাণঘাতী এবং ছোঁয়াচে।

করোনার নাকি ৩০টি প্রোটিন, মানবকোষে ২০,০০০ অন্যান্য ভাইরাসের মতোই এটি কোষের তুলনায় বেশ ছোট। এই অল্প কলকবজা দিয়েই করোনাবিবি সুচতুরভাবে পুরো মানবশরীর কবজা করে ফেলে।

স্বাভাবিকভাবে মানবকোষে বহিঃশত্রুর প্রবেশের পথ চাবি আঁটা থাকে। কিন্তু করোনা তার নিজস্ব প্রোটিন দিয়েই এই তালা খুলে ফেলতে পেরেছে। তারপর সে কোষের প্রোটিনগুলির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, যেন বা কোষটি হাইজ্যাক করে। একসময় তা করোনাফ্যাক্টরিতে রূপান্তরিত হয়, নিজেই সে করোনা উৎপাদন শুরু করে। কোষ নিজে মরতে শুরু করে।

ফুসফুসের কোষগুলি বিশেষভাবে নাজুক অবস্থায় পড়ে, কারণ এই কোষ লক হিসেবে যে প্রোটিন ব্যবহার করে তা সার্স-করোনাভাইরাস-২ এর চাবিতে খুলে যায়। বিপুল পরিমাণ ফুসফুস কোষ মরে যেতে শুরু করলে তখন শ্বাসকষ্টসহ কভিড-১৯ এর অন্যান্য উপসর্গ দেখা দেয়।

দুই ধরনের লড়াই এর কথা ভাবা হয়। প্রথমত, ভাইরাস প্রোটিনকে সরাসরি আক্রমণ করে, যেন সে কোষের ভেতর ঢুকতে না পারে, অথবা ঢুকলেও প্রতিলিপি তৈরি করতে না পারে।

এ রকম ড্রাগ আগে থেকে আছে, যা কভিড-১৯ এর চিকিৎসায় কার্যকরী প্রমাণিত হয়েছে।

এই চিকিৎসার একটা বড় অসুবিধা হলো, ভাইরাস সব সময় মিউটেশন অর্থাৎ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। ফলে এখন যে ওষুধটি কাজ করছে, পরবর্তী কালে তা করবে না। ওষুধ এবং ফ্লু এর এই দৌড় প্রতিযোগিতা আসলে আগে থেকেই আছে।

অপরদিকে, কোনো ড্রাগ ভাইরাল প্রোটিন ও কোষ প্রোটিনের মিথস্ক্রিয়া রোধ করে কোষ প্রোটিনকে সুরক্ষা দিতে পারে। এই পদ্ধতিতে ভাইরাস ধ্বংস না করেই পোষকদেহের কলকবজা রক্ষা পেতে পারে, কারণ মানবকোষ অত দ্রুত পরিবর্তিত হয় না।

এ বিষয়ে কাজ চলছে। আমরা খুব দ্রুতই কভিড-১৯ এর ওষুধ পেয়ে যাব। বিজ্ঞানীরা সপ্তাহের ৭দিন ২৪ ঘণ্টা কাজ করছেন।

ও হ্যাঁ, এই সুবাদে প্রাণের শুরু বিষয়েও কিছু সুরাহা হবে বলে আশা করা যায়। 

(তথ্যসূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট)

লেখক: প্রভাষক, রসায়ন বিভাগ, শহীদ বেগম শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব সরকারি কলেজ, ঢাকা