শুধু ফুটবলার হলেও কম যেতেন না কম্পটন|220068|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৩ মে, ২০২০ ০০:০০
শুধু ফুটবলার হলেও কম যেতেন না কম্পটন
জগন্নাথ বিশ্বাস

শুধু ফুটবলার হলেও কম যেতেন না কম্পটন

লর্ডসের মাঠে স্কোর কার্ড বিক্রি করে মিডলসেক্স নার্সারিতে খেলা শিখেছিলেন ডেনিস কম্পটন। আজ ২৩ মে তার জন্মদিন। গল্পে গল্পে শুভেচ্ছা জানানো যাক।

ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৪৬ সালের ১৭ আগস্ট। সাধারণ একটা রান আউট। স্কোর বোর্ড দেখে অন্তত তাই মনে হবে। ওভালে সেদিন ১২৮ রানে ব্যাট করছিলেন বিজয় মার্চেন্ট। ৩১৫ মিনিটের ইনিংসটা তিনি সাজিয়েছিলেন ড্রাইভ, পুল আর লেটকাটে। উইজডেনের ভাষায়, ‘ইন মাস্টারলি ফ্যাশন।’ শেষে একটা বল মিডঅফে ঠেলে সিঙ্গেলের জন্য দৌড় দিয়েছিলেন মার্চেন্ট। অন্য প্রান্তে দাঁড়ানো ভিনু মানকাড ‘নো’ বলে বারন করেন। তাই দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন। হলে কী হবে। কম্পটন বিদ্যুৎগতিতে এসে বল না তুলে পা দিয়ে সজোরে কিক করলেন। উইকেট ছিটকে গেল। রান আউট মার্চেন্ট। কলকাতার এক খবরের কাগজ হেডলাইন করেছিল ‘মার্চেন্ট কিকড আউট বাই কম্পটন।’

ক্রিকেটার কম্পটন ফুটবলও খেলতেন। ছিলেন আর্সেনাল ক্লাবের ফরোয়ার্ড। ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে ১৪টি ম্যাচও খেলেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষভাগে তিনি যোগ দেন ব্রিটিশ আর্মিতে। ইন্দোরের কাছে মাউতে পোস্টিং হয়েছিল। সেই সময় হোলকরের পক্ষে রঞ্জি ট্রফিতেও খেলেছেন কম্পটন।

যেকোনো ম্যাচেই পুরোদস্তুর পেশাদারের মতো সিরিয়াস থাকতেন কম্পটন। সেসব নিয়ে অনেক গল্পও আছে।  ছেচল্লিশে হোলকরের অধিনায়ক ছিলেন সি কে নাইডু। আধুনিক বিরেন্দ্র শেভাগের আদি ভারতীয় সংস্করণ মুশতাক আলিও খেলতেন নাইডুর দলে। মুম্বাইয়ের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ৮৬৪ রানে পিছিয়ে পড়েছিল হোলকর। ফলাফল না হওয়া পর্যন্ত ম্যাচ চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। হোলকরের দুই ওপেনার মুশতাক এবং কম্পটনকে অধিনায়ক নাইডু বলেন, ‘প্রয়োজন হলে সারা দিন উইকেট কামড়ে পড়ে থাকো।’ মুশতক সেই ম্যাচে সেঞ্চুরি করে আউট হওয়ার পর ক্ষুব্ধ নাইডু বলেছিলেন, ‘কম্পটনকে দেখো। ইংল্যান্ডের ক্রিকেটার। হোলকর টিমের প্রতি তার কোনো লয়ালটি নেই। কিন্তু সিজনড, প্রফেশনাল, অধিনায়কের নির্দেশ তার কাছে অমোঘ বিধান। সে টিকে আছে। আর তোমাদের মতো দায়িত্বজ্ঞানহীন ছোকরারা বাজে স্ট্রোক নিতে গিয়ে আউট হও, লজ্জা করে না?’ কম্পটন সেই ম্যাচে ২৪৯ রানে অপরাজিত ছিলেন। গ্যালারি থেকে এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী তাকে লোভ দেখিয়েছিল। সেঞ্চুরির পর কম্পটনকে নাকি লোকটা বলে ‘খেলে যাও, প্রতি রানের জন্য এক পাউন্ড করে দেব।’ আত্মজীবনীতে সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক লিখেছেন, ‘খেলার পর আমি লোকটার খোঁজে গ্যালারিতে গিয়ে দেখি একটা চিঠি পড়ে আছে। তাতে লেখা ডিয়ার কম্পটন, জরুরি দরকারে শহরের বাইরে যাচ্ছি।’ সেদিন ১৪৯ পাউন্ড না পেয়ে আফসোস হয়েছিল কম্পটনের। আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘অনেকগুলো টাকা তো। এখনকার কয়েক হাজার পাউন্ডের সমান। না পেয়ে খারাপ লেগেছিল।’

ডেনিস কম্পটনরা যখন খেলতেন তখন ক্রিকেটে অ্যামেচারের রাজত্ব। ইটোন হ্যারো পাবলিক স্কুল থেকে অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজ হয়ে ইংল্যান্ড দলে ঢুকতেন তারা। ভালোবেসে ক্রিকেট খেলতেন। অর্থকড়ির চিন্তা ছিল না। অধিকাংশের বাপ-দাদাই লর্ড ছিলেন, কিংবা বড় ব্যবসা ছিল। লর্ড হক, সিবি ফ্রাই, স্ট্যানলি জ্যাকসন, ডগলাস জার্ডিন, পার্সি ফেন্ডার, লর্ড টেনিসন, কলিন কাউড্রে এই দলে পড়েন। স্কোর কার্ডে এদের নামের পাশে মিস্টার লেখা থাকত। আলাদা ড্রেসিং রুমে বসতেন। জ্যাক হবস, কম্পটন কিংবা হ্যারল্ড লারউডের মতো যারা ক্রিকেট খেলে পেট চালাতেন, তাদের জন্য ছিল আলাদা ড্রেসিং রুম। চূড়ান্ত শ্রেণিসচেতন সেই ইংরেজ সমাজে স্রেফ ক্রিকেট খেলে অর্থ এবং সম্মান আদায় সহজ ছিল না। সেই দুঃসাধ্য কাজটাই করেছিলেন কম্পটন। অ্যামেচার যুগেও ইংল্যান্ড ক্রিকেটের ‘আইকন’ হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

১৯১৮ সালের ২৩ মে মিডলসেক্সে জন্ম নেওয়া কম্পটন ইংল্যান্ডের হয়ে ৭৮ টেস্টে ৫০.০৬ গড়ে ৫৮০৭ রান করেছেন। সেঞ্চুরি ১৭টি। হাফসেঞ্চুরি ২৮টি। এর সঙ্গে ভয়ংকর ফিল্ডিং আর কার্যকর অফস্পিন যোগ করুন, দেখবেন আর্সেনাল স্ট্রাইকারকে বিরল প্রতিভা মনে হবে। ৫১৫টি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১২৩টি সেঞ্চুরি আছে কম্পটনের। ৫১.৮৫ গড়ে রান করেছেন ৩৮৯৪২। উইকেট নিয়েছেন ৬২২টি। 

চিরকাল ক্রিকেটে নিবেদিতপ্রাণ কম্পটনের ফুটবলপ্রেমও ভোলার নয়। এক সময় কলকাতার ঐতিহ্যবাহী মোহনবাগানে খেলতে চেয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালে আইএফএ শিল্ডে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ দেখে তিনি নাকি হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘ফরোয়ার্ড লাইনের কাছে ছেলেরা লাল পিঁপড়ের মতো ছুটে বেরাচ্ছে কেন! গোলে শট নিতে বলো। আমি ছয় বছর প্রথম শ্রেণির ও আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলেছি। গোলে শট নিতে আমায় পেনাল্টি বক্সে ঢুকতে হয়নি।’

এখনকার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোদের মতো পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে দূরপাল্লার শটে গোল করার বিরল ক্ষমতা ছিল কম্পটনের। চাইলে তিনি গ্রেট ফুটবলারও হতে পারতেন।