ইসলামিক পন্ডিত জিয়াউর রহমান আজমি|236501|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৫ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০
ইসলামিক পন্ডিত জিয়াউর রহমান আজমি
মুহাম্মাদ হেদায়েতুল্লাহ

ইসলামিক পন্ডিত জিয়াউর রহমান আজমি

সৌদি আরবের মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ জিয়াউর রহমান আজমি বিশ্বখ্যাত হাদিস গবেষক। গত ৩০ জুলাই (৯ জিলহজ) আরাফার দিনে মদিনায় মৃত্যুবরণ করেন এই মনীষী। হাদিস বিষয়ে তার অবদান অসামান্য। তার লেখা গ্রন্থাবলি ইসলামি রচনা সম্ভারে অনবদ্য কর্ম হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে বলে অনেকে মনে করেন।

প্রফেসর ড. জিয়াউর রহমান আজমি ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিশ্ববিখ্যাত পণ্ডিত। ১৯৪৩ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের আজমগড়ের বালরিয়াগঞ্জ গ্রামে এক বিত্তবান ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার নাম ছিল বাঙ্কালাল। তার বাবা ছিলেন আজমগড়ের বিত্তবান ব্যবসায়ী। আজমগড় থেকে কলকাতা পর্যন্ত তাদের পৈতৃক ব্যবসা বিস্তৃত ছিল।

প্রবল ধর্মীয় অনুশাসনে বেড়ে ওঠায় শৈশব থেকেই ধর্মবিষয়ে খুবই আগ্রহী ছিলেন বাঙ্কালাল। নিজ উদ্যোগে শুরু করেন ধর্মবিষয়ক পাঠ ও গবেষণা। শায়খ আবুল আলা রচিত ‘দীনে হাকিকত’-এর হিন্দি অনুবাদ পড়ে খুবই প্রভাবিত হন তিনি। পরে হিন্দি ভাষায় খাজা হাসান নিজামির কোরআনের অনুবাদ পাঠ করে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন।

পরিবার তার মুসলিম হওয়া মেনে নিতে পারেনি। নানা উপায়ে তাকে হিন্দু ধর্মে ফিরে আসার আহ্বান জানায়। তাকে ফিরিয়ে নিতে তার বাবাসহ অন্যরা সর্বাত্মক চেষ্টায় চালান; কিন্তু সবাই ব্যর্থ হন। এ সময় তাকে নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়।

নিজ বাড়ি ত্যাগ করে বাদায়ুনের একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। অতঃপর উমরাবাদের প্রসিদ্ধ দারুস সালাম মাদ্রাসায় একাধারে পাঁচ বছর অধ্যয়ন করেন। এখান থেকে আলামিয়্যত ও ফজিলত ডিগ্রি অর্জন করেন।

পড়াশোনার সময় তিনি নিজ বাড়িতে যান। এ সময় অনেকে তাকে দেখতে আসে। ইসলামের প্রতি তার আস্থা দেখে অনেকে বেশ অবাক হয়। বাড়িতে থাকাকালে ঈদুল ফিতরের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শায়খ জিয়াউর রহমান ঈদের নামাজে ইমামতি করেন। ঈদের জামাতে তার কথা শুনতে অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বীও ঈদগাহে সমবেত হয়। একজন নওমুসলিম কীভাবে ঈদের নামাজের ইমাম হলেন, তা নিয়েও পড়শিদের বিস্ময়ের সীমা ছিল না। অল্প বয়সে অভূতপূর্ব অগ্রগতি দেখে তার প্রতি নমনীয় হন তার বাবা।

আজমগড়ের শিবলী কলেজ ও উমরাবাদের দারুস সালাম মাদ্রাসায় পাঠ সম্পন্ন করে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি চলে যান সৌদি আরব। ১৯৬৬ সালে সৌদি আরবের মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। এ ছাড়া একজন নওমুসলিম হিসেবেও তিনি ছিলেন প্রথম শিক্ষার্থী।

স্নাতকেও প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। পড়াশোনা ও গবেষণায় সবার মধ্যে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

১৯৭০ সালে মক্কার কিং আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমান উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়) স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তার মাস্টার্সের থিসিসের বিষয় ছিল :  Abu Huraira in the Light of His Narrations|। এতে তিনি আবু হুরায়রা (রা.) সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের উত্থাপিত নানা প্রশ্নের উত্তর লেখেন। এ সময় তিনি মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর মিসরের বিশ্ববিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তার পিএইচডি ডিগ্রির বিষয় ছিল :In Defense of Abu Huraira বা আবু হুরায়রা (রা)-এর সমর্থনে।

এ মনীষীর কর্মজীবন খুবই বর্ণাঢ্য। মক্কায় অবস্থিত রাবেতা আলম আল-ইসলামির (মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ) বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। অবশেষে ১৯৭৯ সালে (১৩৯৯ হিজরি) মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদিস বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে অধ্যাপনা-জীবন শুরু করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট থিসিসের নিরীক্ষণ এবং খসড়া তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাজও তিনি সম্পাদন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা করার সময় রাষ্ট্রীয় অনুমোদনে সৌদি আরবের নাগরিকত্ব লাভ করেন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তিনি প্রাচীন পদ্ধতিতে বিভিন্ন শায়খের সান্নিধ্যে থেকে হাদিস ও শরিয়ার গভীর জ্ঞানার্জন করেন। উল্লেখযোগ্য শায়খদের মধ্যে ছিলেন সৌদি আরবের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শায়খ আবদুল্লাহ বিন হামিদ (রহ.), সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি ও মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শায়খ আবদুল আজিজ বিন বাজ (রহ.), দক্ষিণ ভারতের শায়খুল হাদিস মাওলানা আবদুল ওয়াজিদ উমরি রহমানি, মাওলানা আবুল বায়ান হাম্মাদ উমরি প্রমুখ।

তিনি মসজিদে নববিতে নিয়মিত সহিহ বোখারি ও সহিহ মুসলিমের পাঠদান করতেন। হিন্দি ও আরবি ভাষায় বহু গ্রন্থ রচনা ও সংকলন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি একাগ্রতার সঙ্গে অধ্যয়ন ও গবেষণা কর্মে যুক্ত থাকেন।

হাদিস বিষয়ে তিনি রচনা করেন অনবদ্য গ্রন্থ। হাদিস বিষয়ে রচিত তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হলো : ‘জামিউল কামিল ফিল হাদিসিস সহিহ শামিল।’ ২০ ভলিউমের এ বিশাল গ্রন্থে তিনি ১৬ হাজার হাদিস সংকলন করেন। বিশ্বব্যাপী সমাদৃত গ্রন্থ Quran Encyclopedia বা কোরআন বিশ্বকোষ রচনায়ও তার অসাম্য অবদান আছে। এ ছাড়া তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ আছে।

গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই, ৯ জিলহজ) আরাফার দিনে মদিনায় মৃত্যুবরণ করেন বিশ্ববিখ্যাত এই মহান মনীষী। মসজিদে নববিতে জানাজা শেষে তাকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়।