পাটের সুদিন ফিরবে কীভাবে|236714|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৬ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০
পাটের সুদিন ফিরবে কীভাবে

পাটের সুদিন ফিরবে কীভাবে

সাম্প্রতিক অতীতেও পাট ও পাটশিল্প নিয়ে গর্বের শেষ ছিল না বাংলাদেশের।  বহুকাল বিশ্বের বুকে এ ভূখণ্ডের মর্যাদার অন্যতম প্রতীক ছিল সোনালি আঁশ নামে পরিচিত এ কৃষিপণ্য। আদমজী জুটমিলের মতো বিশ্বের এক নম্বর প্রতিষ্ঠানও ছিল আমাদের দেশে। পাটের অতীত গৌরব ম্লান হলেও সম্প্রতি বলা হচ্ছিল, পাট বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হবে। কিন্তু আলোর নিচে অন্ধকারের মতোই পাট নিয়ে যাতনারও যেন শেষ নেই। পাটচাষিরা তাদের শ্রমে-ঘামে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না এই অভিযোগ বহুদিনের। ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের ঘোষণায় আরও বিপাকে পড়েছেন পাটচাষিরা। করোনা বিপর্যয়ের মতো দুঃসময়ে উৎপাদিত পাট বিক্রি নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, চলতি মৌসুমে ৮২ লাখ বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। ৭ দশমিক ২৬ হেক্টর জমিতে এবার পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছর দেশে ৬৮ লাখ বেল পাট উৎপাদিত হয়েছিল। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ শতাংশ পাট কাটা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি সপ্তাহের মধ্যে বাজারে পাট উঠতে শুরু করবে। কৃষি তথ্যসেবা সূত্রে জানা গেছে, দেশে পাটচাষি প্রায় ৪০ লাখ।  প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চার কোটি মানুষের জীবিকা পাটকে কেন্দ্র করে। প্রতি বছর মৌসুমে পাট বিক্রি করে গড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আয় করেন

কৃষকরা।  বিজেএমসির তথ্য অনুসারে, সরকারি পাটকলগুলো প্রতি বছর গড়ে ১৩ লাখ বেল পাট কিনে থাকে। গত বছর গড়ে প্রায় দুই হাজার টাকা মণপ্রতি দর পেয়েছেন কৃষক।  কিন্তু এবার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পাট বিক্রি নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। উৎপাদিত পাটের ৫০-৫৫ লাখ বেল বেসরকারি খাতের পাটকলগুলোতে ব্যবহৃত হলেও সরকারি পাটকলের মতো বড় গুদাম না থাকায় মৌসুমে প্রয়োজনীয় পাট কেনা সম্ভব হয় না তাদের পক্ষে। তারা মূলত স্থানীয় বাজার থেকে ফড়িয়া এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সারা বছরের পাট সংগ্রহ করে থাকে। 

এখন সরকার কাঁচা পাট রপ্তানির উদ্যোগ নিতে পারে। কিন্তু গত কয়েক বছরে কাঁচাপাট রপ্তানির হার নিম্নমুখী। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্র জানায়, ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ২০ লাখ বেল কাঁচাপাট রপ্তানি হতো। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮-৯ লাখ বেলে। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছর রপ্তানি হয় ৮ লাখ বেল।  সদ্যসমাপ্ত ২০১৯-২০ অর্থবছরে আরও কমে তা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১৪ হাজার বেলে। কিন্তু কাঁচা পাটের রপ্তানি কমলেও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আশাব্যঞ্জকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জানা যায়, বিদায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮৮ কোটি ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানির মধ্যে পাটসুতার অবদান ৫৬ কোটি ডলার। আগের বছরের তুলনায় রপ্তানি বেড়েছে ১০ দশমিক ১২ শতাংশ। তাছাড়া ১২ কোটি ডলারের কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। আর পাটের ব্যাগ রপ্তানির আয় ১০ কোটি ডলারের। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে পাটের ব্যাগের রপ্তানি আয় বেড়েছে সাড়ে ২৮ শতাংশ। পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির বড় কারণ বিশ্বব্যাপী পাটের চাহিদা বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাপী পলিথিন ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে বিভিন্ন দেশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পলিব্যাগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।  তাতে কেবল ইইউর দেশগুলোতে বার্ষিক প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি পাটের ব্যাগের চাহিদা সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। গৃহস্থালির পণ্য থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত বাগানের জন্যও পাটপণ্য জনপ্রিয় হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামনের দিনগুলোতে বহুমুখী পাটপণ্যের চাহিদা আরও বাড়বে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো গেলে পাটের সুদিন ফেরানো সম্ভব। পাশাপাশি, কাঁচা পাট রপ্তানির ব্যাপারেও অগ্রাধিকার দেওয়ার বিকল্প নেই। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যেহেতু বাংলাদেশের পাট ও পাটপণ্যের ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, তাই বাংলাদেশকে এ অঞ্চলে নতুন বাজার খুঁজতে হবে। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের বাজারকে সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সে দেশের সরকার ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত হওয়ায় এখন বাংলাদেশ থেকে পাট আমদানির কৌশল নির্ধারণ করেছে। 

উদ্যোক্তারা বলছেন, পণ্যবৈচিত্র্য না থাকায় পাটপণ্যের রপ্তানি আশানুরূপ বাড়ছে না।  এজন্য বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ দরকার। পাট মন্ত্রণালয় পাটের কাগজ তৈরি করার পাইলট প্রকল্প নিতে পারে। সরকারি দপ্তরে পাটের কাগজ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। এছাড়া তৈরি পোশাকের মতো করসুবিধা পাট খাতে দেওয়া যেতে পারে। সেই সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য ভ্যাট অব্যাহতির মতো বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। আর পাটচাষিদের স্বার্থকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে বন্ধ পাটকলগুলো চালুর পরিকল্পনা জরুরি। 

যে দেশের বিজ্ঞানীরা পাটের জীবনরহস্য আবিষ্কার করতে পারেন, যে দেশকে বহির্বিশ্ব সোনালি আঁশের দেশ হিসেবে চেনে, সেই দেশে ফের পাটের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনা কঠিন নয়। বাইরের দুনিয়ায় যখন পরিবেশসম্মত পণ্য হিসেবে পাটের ব্যবহার বেড়েছে, তখন বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকবে কেন? পাটের পুনরুজ্জীবন ঘটাতে চাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন। পাটের উৎপাদক, পাটকল মালিক, শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থ সমুন্নত রেখে পাট খাতকে এগিয়ে নিতে হবে।