দুর্গতদের সহযোগিতা নৈতিক দায়িত্ব|236726|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৬ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০
দুর্গতদের সহযোগিতা নৈতিক দায়িত্ব
এহসান বিন মুজাহির

দুর্গতদের সহযোগিতা নৈতিক দায়িত্ব

মহামারীর মধ্যেই বন্যায় বিপর্যস্ত দেশের বিভিন্ন জনপদ। বন্যা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিভিন্ন জেলায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এসব এলাকার ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বানভাসি মানুষ অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয় ও চিকিৎসার অভাবে অর্ধাহারে-অনাহারে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে দিনযাপন করছে। দুর্গত অঞ্চলে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের অভাবে তারা সুচিকিৎসা পাচ্ছে না। পরিস্থিতির অবনতির কারণে অসহায় মানুষ যখন পানিবন্দি অবস্থায় জীবন যাপন করছে, তখন বন্যার্ত মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসা সমাজের বিত্তবানদের মানবিক দায়িত্ব।

বানভাসি মানুষের কষ্ট লাঘবে টাকা-পয়সা, খাদ্য, বস্ত্র, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় দ্রব্য নিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্যাদুর্গতদের সাহায্যে এগিয়ে আসার এখনই সময়। জাতিসংঘের অফিস ফর দ্য কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্সের (ওসিএইচ) তথ্যমতে, জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে বন্যা শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত ১৬২টি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। ২৪ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘরবাড়ি ছেড়ে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছে অন্তত ৫৬ হাজার মানুষ।

মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত বুলেটিনের তথ্যমতে, ১৪৫ জন মানুষ মারা গেছে। প্লাবিত হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখেরও বেশি বাড়িঘর। এবারের বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি রূপ লাভ করতে পারে- এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছে সরকারি সংস্থা বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)।

বন্যাকবলিত অঞ্চলের অসহায় বানভাসি মানুষ কতটা দুঃখ-কষ্টের মধ্যে পড়েছেন তা সহজেই অনুমেয়। অসহায়-বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ানোও অনেক সওয়াবের কাজ। এটা অন্যতম একটি ইবাদতও বটে। পবিত্র কোরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি তথা তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে দরিদ্র, এতিম ও বন্দিদের খাদ্য দান করে’। (সুরা দাহর, আয়াত : ৮)

আল্লাহ আরও ইরশাদ করেন, ‘তাদের (বিত্তশালী) ধনসম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে। (সুরা জারিয়াত, আয়াত : ১৯)

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ দূর করবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ দূর করে দেবেন। (বোখারি, হাদিস : ২৪৪২)।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা যতক্ষণ তার ভাইকে সাহায্য করে, আল্লাহ ততক্ষণ বান্দাকে সাহায্য করে থাকেন’। (মুসলিম, হাদিস : ২৩১৪)

মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুনিয়াতে মানুষকে খাদ্য দান করেছে, কেয়ামতের দিন তাকে খাদ্য দান করা হবে। যে আল্লাহকে খুশি করার জন্য মানুষকে পানি পান করিয়েছে, তাকে কেয়ামতের দিন পানি পান করানো হবে’। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৩৪৬)

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন, যে তার বান্দাদের প্রতি দয়া করে’। (বোখারি, হাদিস : ১৭৩২)। রাসুল (সা.) এরশাদ করেন অসুস্থ লোকের সেবা করো, ক্ষুধার্তকে অন্ন দাও এবং বন্দিকে মুক্ত করো। (বোখারি, হাদিস : ৫৬৪৯)

রাসুল (সা.) আরও বলেন যে ব্যক্তি দুনিয়ায় অপরের একটি প্রয়োজন মিটিয়ে দেবে, পরকালে আল্লাহ তার ১০০ প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন এবং বান্দার দুঃখ-দুর্দশায় কেউ সহযোগিতার হাত বাড়ালে আল্লাহ তার প্রতি করুণার দৃষ্টি দেন’। (মুসলিম : ২৫৬৬)

নোমান (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘সব মুমিন একই ব্যক্তিসত্তার মতো। যখন তার চোখে যন্ত্রণা হয়, তখন তার গোটা শরীরই তা অনুভব করে। যদি তার মাথাব্যথা হয়, তাতে তার গোটা শরীরই বিচলিত হয়ে পড়ে’। (মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৬)।

আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কেয়ামতের দিন নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা বলবেন, ‘হে আদম সন্তান, আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমার সেবা করোনি, বান্দা বলবে হে আমার প্রতিপালক আপনি তো বিশ্বপালনকর্তা কীভাবে আমি আপনার সেবা করব? তিনি বলবেন তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, অথচ তাকে তুমি দেখতে যাওনি। তুমি কি জান না, যদি তুমি তার সেবা করতে তবে তুমি তার কাছেই আমাকে পেতে। হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে আহার চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি আমাকে আহার করাওনি। বান্দা বলবে হে আমার রব, তুমি হলে বিশ্ব পালনকর্তা, তোমাকে আমি কীভাবে আহার করাবো? তিনি বলবেন, তুমি কি জান না যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাদ্য চেয়েছিল কিন্তু তাকে তুমি খাদ্য দাওনি। তুমি কি জান না যে, তুমি যদি তাকে আহার করাতে আজ তা প্রাপ্ত হতে। হে আদম সন্তান তোমার কাছে আমি পানীয় চেয়েছিলাম, অথচ তুমি আমাকে পানীয় দাওনি। বান্দা বলবে, হে আমার প্রভু তুমি তো রাব্বুল আলামিন তোমাকে আমি কীভাবে পান করাব? তিনি বলবেন তোমার কাছে আমার অমুক বান্দা পানি চেয়েছিল কিন্তু তাকে তুমি পান করাওনি। তাকে যদি পান করাতে তবে নিশ্চয় আজ তা প্রাপ্ত হতে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৭২১)

রাসুল (সা.) আরও ইরশাদ করেন, মুমিনরা পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে এক দেহের মতো। দেহের কোনো অঙ্গ আঘাতপ্রাপ্ত হলে পুরো দেহ সে ব্যথা অনুভব করে’। (বোখারি, হাদিস : ৬০১১)

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুহূর্তে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো দলমত-নির্বিশেষে সব শ্রেণি পেশার মানুষের নৈতিক দায়িত্ব।