চিকিৎসাবিদ্যা অর্জন ফরজে কেফায়া|238318|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৩ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০
চিকিৎসাবিদ্যা অর্জন ফরজে কেফায়া
মুফতি মাহমুদ হাসান

চিকিৎসাবিদ্যা অর্জন ফরজে কেফায়া

মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ব্যাপারে ইসলাম জোর তাগিদ দিয়েছে। অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণের জন্য রাসুল (সা.) উৎসাহিত করেছেন। তিনি নিজেও অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতেন। মহানবী (সা.) হাদিসে ইরশাদ করেন, ‘হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো, কেননা আল্লাহতায়ালা এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার প্রতিষেধক তিনি সৃষ্টি করেননি; শুধু বার্ধক্য ব্যতীত।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৩৮৫৫)

ডাক্তারের অভিজ্ঞতা

অভিজ্ঞ ব্যক্তির দিকনির্দেশনায় চিকিৎসা নেওয়া ইসলামের নির্দেশ। হাদিস শরিফে এসেছে, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) হৃদরোগে আক্রান্ত হলে রাসুল (সা.) তাকে তখনকার প্রসিদ্ধ ডাক্তার হারেস ইবনে কালদাহর কাছে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৮৭৫) অপর একটি বর্ণনায়ও এসেছে যে জনৈক রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে রাসুল (সা.) গোত্রের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩১৫৬)

চিকিৎসাবিদ্যায় ব্যুৎপত্তি

ইসলাম রোগীকে অভিজ্ঞ ডাক্তারের মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে। তদ্রƒপ ডাক্তারকে পরিপূর্ণ জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনেরও নির্দেশ দিয়েছে। না জেনে চিকিৎসা করা বৈধ নয়। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি চিকিৎসা-জ্ঞান ছাড়া কারও চিকিৎসা করে, আর এতে অজ্ঞতার কারণে রোগীর কোনো ক্ষতি করে ফেলে, তাহলে সে দায়ী হবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৫৮৭)

তবে এ ক্ষেত্রে ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট অর্জন জরুরি নয়, বরং শর্ত হলো, যেকোনো উপায়ে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জিত হওয়া। প্রচলিত সার্টিফিকেটধারী হওয়া শর্ত নয়। হ্যাঁ, সরকারি আইনে সার্টিফিকেটের বাধ্যবাধকতা থাকলে সরকারি আইন মেনে চলা আবশ্যক। (আলফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহু : ৫/৪৪৯; আহসানুল ফাতাওয়া : ৮/৯৫)

অভিজ্ঞ ডাক্তার ছাড়া চিকিৎসা স্বাভাবিকতই অসম্ভব। তাই প্রত্যেক এলাকায় প্রয়োজন মতো কিছু লোকের সাধারণ চিকিৎসাবিদ্যা অর্জন করা ইসলামি বিধান মোতাবেক ফরজে কেফায়া। এজন্য প্রতিটি দেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মানুষের চিকিৎসাবিদ্যায় পরিপূর্ণ ব্যুৎপত্তি অর্জন করাও ফরজে কেফায়া। (আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যা আল-কুয়েতিয়া : ১২/১৩৫)

প্রশিক্ষণের জন্য মৃতদেহ

শরিয়তের দৃষ্টিতে মানবদেহ জীবিত হোক বা মৃত, মুসলিম হোক বা অমুসলিম, নারী বা পুরুষ সবার সম্মান বজায় রাখা জরুরি। মৃতদেহের প্রতি অসম্মানজনিত আচরণ থেকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। তাই ডাক্তারি প্রশিক্ষণের জন্য অন্য কোনো উপায়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া সম্ভব হলে মৃতদেহের কাটাছেঁড়া করা গুনাহ। কেননা এটি একটি অমানবিক আচরণ, যা ইসলাম সমর্থন করে না। ডাক্তারি প্রশিক্ষণ অতি জরুরি বিধায় অতি প্রয়োজনে মানবদেহ ছাড়া অন্য প্রাণীর দেহ কাটাছেঁড়ার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া যায়। (শরহুস সিয়ারিল কাবির : ১/১২৮, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া : ১২/৪০৭)

চিকিৎসকের দায়িত্ব

ডাক্তারের দায়িত্ব হলো, পরিপূর্ণ মনোযোগসহকারে রোগীর রোগ শনাক্ত করা এবং সঠিক চিকিৎসা দেওয়া। অনেক ডাক্তারকে দেখা যায়, তারা রোগীর কথাই ঠিকমতো শোনেন না, রোগীর কথা শোনার আগেই ওষুধ লিখে ফেলেন, এমনকি রোগী কথা বললে বিরক্তি বোধ করেন এটি চরম অবহেলার নামান্তর। দায়িত্বের স্পর্শকাতরতা স্মরণ করে মনোযোগসহ চিকিৎসা দেওয়া হলো ইসলামের নির্দেশ। অন্য কারও সহযোগিতা গ্রহণের প্রয়োজন হলে তা-ও করতে হবে। নির্দিষ্ট রোগের ব্যাপারে তার অভিজ্ঞতা না থাকলে আমানতদারির সঙ্গে অন্য ডাক্তারের কাছে পাঠিয়ে দেবেন; এ ক্ষেত্রে অনধিকার চর্চা করবেন না। কেননা রোগী ডাক্তারের কাছে রোগবিষয়ক পরামর্শের জন্য আসে। আর হাদিসে এসেছে, ‘যার কাছে পরামর্শ চাওয়া হয়, সে আমানতদার।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৮২২)

আমানতদারি মানুষের আদর্শ গুণাবলির অন্যতম। আমানতের খেয়ানত করা মারাত্মক গুনাহ ও নিন্দনীয় স্বভাব। রাসুল (সা.) আমানতের খেয়ানত করাকে মুনাফেকির লক্ষণ বলে অভিহিত করেছেন।

রোগীর ক্ষতি হলে

যদি দক্ষ ও অভিজ্ঞ ডাক্তার পরিপূর্ণ সতর্কতার সঙ্গে চিকিৎসা করা সত্ত্বেও রোগীর কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, তাহলে ডাক্তার দায়ী হবেন না। আর যদি ডাক্তার অযোগ্য ও অনভিজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও চিকিৎসা করেন অথবা দক্ষ হলেও তার অবহেলায় রোগীর ক্ষতি হয়, তাহলে ডাক্তার দায়ী হবেন এবং তার ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হবেন। (ফাতাওয়ায়ে বাজজাজিয়া : ৫/৮৯; জাদিদ ফিকহি মাসায়েল : ৫/২২)

কমিশন-উপহার গ্রহণ

চিকিৎসা একটি সম্মানিত পেশা। অন্য যেকোনো পেশার তুলনায় এখানে মানবসেবার সুযোগ বেশি। তাই সমাজের মানুষ তাদের শ্রদ্ধার চোখে দেখেন; কিন্তু বর্তমানে কিছু অসাধু লোকের হাতে এ পেশাটির মর্যাদা ও সম্মান সীমাতিরিক্তভাবে আক্রান্ত। অনেক চিকিৎসক বিভিন্ন ক্লিনিক বা হাসপাতালে রোগী পাঠিয়ে সেখান থেকে নির্ধারিত পরিমাণে কমিশন নিয়ে থাকেন। অনুরূপ নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধ লিখে কোম্পানি থেকে বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণ করে থাকেন।

রোগীর দায়িত্ব হলো, সার্বিক অবস্থাদি ডাক্তারকে জানানো এবং নির্ধারিত ভিজিট ফি প্রদান করা। রোগীর কাছ থেকে চিকিৎসা ফি নেওয়া ডাক্তারের জন্য বৈধ। আর ডাক্তারের দায়িত্ব হলো, রোগীর জন্য প্রযোজ্য চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র প্রদান করা। রোগ শনাক্তের জন্য ডাক্তাররা রোগীকে যথাযথ মেডিকেল টেস্ট দিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কোত্থেকে পরীক্ষাগুলো করালে ভালো হবে, তা বলে দেওয়াও ডাক্তারের পেশাগত দায়িত্ব। তিনি নির্ধারিত ভিজিটের বিনিময়ে এ কাজগুলো পূর্ণাঙ্গরূপে করবেন। তাই মেডিকেল টেস্টে রোগী প্রেরণকারী ডাক্তারের জন্য কমিশন গ্রহণের সুযোগ নেই। কারণ ডাক্তার আগেই প্রয়োজনীয় কাজের জন্য রোগীর কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করেছেন। অতএব, ল্যাব বা হাসপাতাল কর্র্তৃক ডাক্তারদের প্রদত্ত কমিশন শরিয়তে নিষিদ্ধ, এটা উৎকোচের নামান্তর। (ফাতাওয়া রশিদিয়া, পৃষ্ঠা : ৫৫৮; ইমদাদুল ফাতাওয়া : ৩/৪১০)

এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিভিন্ন কোম্পানি থেকে ডাক্তাররা নানা উপঢৌকনও পেয়ে থাকেন। এর বিধান হলো, রোগীর সঠিক অবস্থা বিবেচনায় এনে তার জন্য ফলপ্রসূ ওষুধটিই প্রেসক্রিপশনে লেখা ডাক্তারের নৈতিক দায়িত্ব।

এ দায়িত্ব আদায়ে কোনো রকম ত্রুটি না হওয়ার শর্তে ডাক্তারের জন্য ওষুধ কোম্পানির স্বেচ্ছাপ্রদত্ত উপঢৌকন গ্রহণ করা বৈধ হবে। তবে যদি এর কারণে দায়িত্বে ত্রুটি তথা উপঢৌকন নিয়ে নিম্নমানের বা অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ইত্যাদি দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা-ও ঘুষের অন্তর্ভুক্ত হয়ে অবৈধ হবে। (আল-বাহরুর রায়েক, ৬/২৬২; রদ্দুল মুহতার : ৫/৩৬২; ফাতাওয়া রশিদিয়া, পৃষ্ঠা : ৫২৭)

কোম্পানির উপঢৌকন গ্রহণ করে নিম্নমানের বা অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেওয়া আমানতের খেয়ানত।

রোগীকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা

রোগ ভালো হওয়ার আশাবাদী হলে সাধ্যানুপাতে রোগীর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া জরুরি। তবে যদি কোনো রোগী এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে তার ব্রেইন ও হার্টের কার্যক্ষমতা লোপ পাওয়ার পরও শুধু মেশিনের মাধ্যমে হার্ট চালু রেখে নামেমাত্র বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে, মেশিন খুললে মুহূর্তেই মারা যাবে, এ অবস্থায় শ্বাস-প্রশ্বাস জারি রাখার জন্য মেশিনের ব্যবহার জরুরি নয়। বিশেষত, যখন মেশিন ছাড়া জীবিত থাকার সম্ভাবনা না থাকে এবং মেশিনের ব্যয়ভার বহন করাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে, তখন এটা জরুরি নয়। (ফাতাওয়ায়ে সিরাজিয়া, পৃষ্ঠা : ৭১; ফাতাওয়ায়ে উসমানি : ৪/২২৩)

নারীদের চিকিৎসা

চিকিৎসা করা বা শিক্ষার প্রয়োজনে কারও সতর-লজ্জাস্থান খোলার প্রয়োজন হলে শুধু প্রয়োজন পরিমাণ খোলার অনুমতি আছে, এর বেশি অনুমতি নেই। এ ক্ষেত্রে ডাক্তারদের জন্য জরুরি হলো যথাসম্ভব তার দৃষ্টিকে প্রয়োজন পরিমাণ সীমাবদ্ধ রাখা। (বাদায়েউস সানায়ে : ৫/১২৪)

নারী রোগীর রোগের চিকিৎসা নারী ডাক্তারকেই করতে হবে। তবে রোগের বিশেষজ্ঞ নারী ডাক্তার পাওয়া না গেলে প্রয়োজনে পুরুষ ডাক্তারও চিকিৎসা করতে পারবেন। সেখানে নারীর কোনো অভিভাবক তার সঙ্গে থাকবেন। (আল বাহরুর রায়েক : ৮/১৯২)