মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকার সাধনা করেছিলেন মুর্তজা বশীর|238784|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৫ আগস্ট, ২০২০ ১২:০৫
মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকার সাধনা করেছিলেন মুর্তজা বশীর
অনলাইন ডেস্ক

মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকার সাধনা করেছিলেন মুর্তজা বশীর

ছোটবেলায় বইতে পড়েছিলাম মানুষ মরণশীল। কিন্তু তখন আমার অন্তরাত্মা বলে উঠল, না, মানুষ মরণশীল না। মানুষ অবিনশ্বর…  আমি জীবনভর চেষ্টা করেছি এখন কী পেলাম, সেটি আমার কাছে কিছু না। মৃত্যুর পর বেঁচে থাকব কি-না, সেটি হলো আমার সাধনা। আমি বিশ্বাস করি, এখন কী পেলাম সেটি বড় কথা নয়। চিত্রকলা হোক, সাহিত্য হোক— সময়কে অতিক্রম করে যদি কেউ সৃষ্টি করতে না পারেন, সেটি লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট হবে না।

গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি সদ্য প্রয়াত মহান চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীরকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করে অবিন্তা কবির ফাউন্ডেশন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ওই অনুষ্ঠানে ওপরের কথাগুলো বলেন তিনি। 

এমন শর্ত নিয়ে বাঁচতে চাওয়া মানুষটি নাই হয়ে গেলেন আজ। বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। ৫ বছর আগে নিজের জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বলেছিলেন—

হৃদয়ের রক্তক্ষরণ বন্ধ হলে শিল্পী আর শিল্পী থাকে না। আমি এখন যখন কাজ করি, তখন আমি প্রাণমন ঢেলে দিয়ে কাজ করি। আমার মনে হয়, হয়তো এটিই আমার শেষ কাজ। মৃত্যুর পরে যদি আমাকে মনে রাখা হয়, তাহলে তা হবে আসল ভালোবাসা।

ব্যক্তি ও শিল্পী জীবনে বর্ণাঢ্য এক সময় পার করেছেন মুর্তজা বশীর। ভাষা আন্দোলন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, পরবর্তী সময়ের অনেক ঘটনার সাক্ষী তিনি। যা নানাভাবে উঠে এসেছে তার চিত্রকর্মে। যেমন; বিমূর্ত চিত্রকলা নিয়ে ২০১৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলছিলেন—

… সমাজের প্রতি আমার যে দায়বদ্ধতা যে অঙ্গীকার তার ফলে সম্পূর্ণ বিমূর্ত ছবি আঁকার কোনো তাগিদ অনুভব করিনি। সম্পূর্ণ বিমূর্ত ছবি একজন শিল্পীর মনোজগৎ, তার চিন্তা-ভাবনা, তার আনন্দ, সেখানে যা সে সৃষ্টি করছে। কিন্তু যেহেতু সমাজের প্রতি আমার অঙ্গীকার রয়েছে, বিমূর্ত চিত্রকলা ভালো লাগলেও বিমূর্ত চিত্রকলা আঁকার জন্য কোন তাগিদ বোধ করিনি।

এরপর অবশ্য বিমূর্ত চিত্রকলা নিয়ে বিস্তর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাকে ধরা হয় বাংলাদেশে বিমূর্ত ধারার চিত্রকলার অন্যতম পথিকৃৎ। ‘দেয়াল’, ‘শহীদ শিরোনাম’, ‘পাখা’, ‘রক্তাক্ত ২১ শে’ শিরোনামের চিত্রকর্মগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পেইন্টিং ছাড়াও ম্যুরাল, ছাপচিত্রসহ চিত্রকলার বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন তিনি। এ ছাড়া লিখেছেন বই এবং গবেষণা করেছেন মুদ্রা ও শিলালিপি নিয়েও। বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য দেয়ালচিত্রও করেছেন তিনি।  ছোটগল্প, উপন্যাস লেখার পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও তার অবদান রয়েছে।

২০১৪ সালের একই সাক্ষাৎকারে নিজেকে ‘সমাজসচেতন’ উল্লেখ করে বলেন—

আমি একজন সমাজসচেতন শিল্পী হিসেবে এবং মার্কসবাদে বিশ্বাসী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি— আগামীর একটা সুন্দর দিন আছে; কিন্তু পত্রিকায় দেখা যাচ্ছে মানুষ হতাশায়, তাই একজন সমাজসচেতন শিল্পী হিসেবে আমার কর্তব্য দাঁড়াল মানুষকে এই হতাশা থেকে মুক্তি দেওয়া। তখন আমার মাথায় আসলো প্রজাপতির খুব ক্ষণিকের জীবন, কিন্তু খুব ভাইব্রেন্ট, জীবন্ত, লাফাচ্ছে এবং তার ডানায় নানা রকম আলো। আমি প্রজাপতি, আমার এখানে আছে প্রজাপতির কালেকশন (ঘরে টাঙান ছবিগুলোকে ইঙ্গিত করে), আমি প্রজাপতির পাখায় যা আছে হুবহু আঁকলাম। এটার নাম হলো ‘দ্যা উইং’, পাখা, ডানা। এই ভাবেই আমার কাজ এখন পর্যন্ত করছি।

প্রখ্যাত ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ছেলে মুর্তজা বশীরের জন্ম ১৯৩২ সালের ১৭ আগস্ট। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণের পর রক্তাক্ত আবুল বরকতকে যারা হাসপাতালে নিয়ে যান, মুর্তজা বশীরও তাদের মধ্যে ছিলেন। ব্রিটিশ ভারত বিভাগের পর পূর্ববঙ্গের নিজস্ব শিল্পকলাকে যারা পথ দেখিয়েছেন তাদের অন্যতম মুর্তজা বশীর। চিত্রকলার নিয়ে পড়তে ও প্রদর্শনীতে গেছেন বিভিন্ন দেশে।

চিত্রকলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ১৯৮০ সালে একুশে পদক পান মুর্তজা বশীর, স্বাধীনতা পুরস্কার পান ২০১৯ সালে। কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

‘মৃত্যুর পরে যদি আমাকে মনে রাখা হয়, তাহলে তা হবে আসল ভালোবাসা’— এমন কথা বললেও দেশের শিল্প সমঝদাররা মনে করেন এক জীবনে এত এত কীর্তি রেখে গেছেন মুর্তজা বশীর, মহাকালে তার স্থান অনন্য হয়ে থাকবে।