পলাতক ক্যাসিনো কারবারিরা প্রকাশ্যে|245884|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০
অভিযানের ১ বছর ১৮ সেপ্টেম্বর
পলাতক ক্যাসিনো কারবারিরা প্রকাশ্যে
সরোয়ার আলম

পলাতক ক্যাসিনো কারবারিরা প্রকাশ্যে

রাজধানীতে গত বছর ১৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছিল ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান। প্রথম দিনই ফকিরাপুলের ইয়ংমেন্স ক্লাবে অভিযান চালানো হয়। ওইদিন সন্ধ্যায় গুলশানের বাসা থেকে যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের তৎকালীন সাংগাঠনিক সম্পাদক (বহিষ্কৃত) খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ৬ অক্টোবর গ্রেপ্তার হন যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। তাকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন ক্লাবকেন্দ্রিক ক্যাসিনো কারবারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজির তথ্য বেরিয়ে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রকাশ হয় গণপূর্তের আলোচিত ঠিকাদার এসএম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের টেন্ডার বাণিজ্যের চমকপ্রদ কাহিনী। এ তিনজনকে গ্রেপ্তার ও টানা অভিযানের মুখে ক্যাসিনো কারবারিদের অনেকেই পাড়ি দেন বিদেশে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভারতে আত্মগোপন করেন। কিন্তু দেশব্যাপী আলোড়ন তোলা ক্যাসিনোবিরোধী ওই অভিযানের বর্ষপূর্তির আগেই পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হয়েছে বিবেচনায় পলাতক ক্যাসিনো কারবারিদের অনেকেই ইতিমধ্যে দেশে ফিরে এসে প্রকাশ্যে চলাফেরা শুরু করেছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে যাদের বিরুদ্ধে ক্যাসিনো কারবারের অভিযোগ ছিল তাদের বেশিরভাগই থেকে গেছেন অধরা। হাতেগোনা কয়েকজন আটক হলেও তারাও জামিন নিয়ে এরই মধ্যে কারাগার থেকে বের হয়ে গেছেন। আর এ সুযোগে বন্ধ থাকা বেশিরভাগ ক্লাবও খোলা হয়েছে। এমনকি অভিযানে ভাটা পড়ায় কিছু ক্লাব ও বাসাবাড়িতে বর্তমানে ক্যাসিনোর কারবার ফের শুরু হয়েছে বলেও তথ্য পেয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্যাসিনো থেকে যারা নিয়মিত চাঁদা আদায় করতেন তাদের তালিকা আছে আমাদের কাছে। তাদের মধ্যে যারা দেশের বাইরে পালিয়ে গিয়েছিলেন তারা আবার দেশে ফিরে এসেছেন বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। তাদের তালিকা করা হচ্ছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘মতিঝিল, গুলশান ও উত্তরার কিছু ক্লাব খোলা হয়েছে এবং ক্যাসিনো খেলা হচ্ছে। ওইসব ক্লাব নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।’

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় তিন মাস ধরে ক্যাসিনোবিরোধী মোট ৪৯টি অভিযান পরিচালিত হয়। এর মধ্যে ৩২টি র‌্যাব এবং ১৭টি অভিযান পুলিশ পরিচালনা করে। এসব অভিযানে ২৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার মধ্যে ঢাকায় ২২২ এবং ঢাকার বাইরে ৫৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময়ের মধ্যে ১১টি ক্যাসিনো ও ক্লাবে অভিযান চালায় র‌্যাব। ক্যাসিনোকাণ্ডে আলোচিত ক্লাবগুলো হলো ফকিরাপুলের ইয়ংমেন্স ক্লাব, মতিঝিলের ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র, কলাবাগান ক্রীড়া চক্র, ধানমন্ডিক্লাব, ফু-ওয়াং ক্লাব, চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব, মোহামেডান ক্লাব এবং বনানীর গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ।

অভিযান শেষ হওয়ার পর দেশে ফেরেন যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক মমিনুল হক সাঈদ, কেন্দ্রীয় সদস্য মিজানুর রহমান, ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক সভাপতি এসএম রবিউল ইসলাম সোহেল, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্রের ইজারাদার আলী আহমেদ ও গুলিস্তান এলাকার দেলোয়ার হোসেন ওরফে দেলুসহ অন্তত ৩০-৩৫ জন। অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ ও মোহামেডান ক্লাবের পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া জামিনে বেরিয়ে গেছেন। অভিযান চলাকালে বাংলাদেশ ফিন্যানসিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক দপ্তর সম্পাদক আনিসুর রহমান ও সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের ব্যাংক হিসাব তলব করে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তিন সংসদ সদস্যসহ ২৩ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ওইসব অভিযানে ৮ কোটি ৪৫ লাখ নগদ টাকা, ১৬৬ কোটি টাকার এফডিআর, ১৩২টি বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই এবং ১১ কোটি ৭৭ লাখ টাকার চেক জব্দ করা হয়। এছাড়া আট কেজি সোনা, ২২টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ ও ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় করা হয় সর্বমোট ৩২টি মামলা। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ১৪টি মামলার তদন্ত করে র‌্যাব। এর মধ্যে ১৩টি মামলার চার্জশিট আদালতে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এখনো একটি মামলা তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে। বাকি ১৮টি মামলা তদন্ত করে পুলিশ। পুলিশের তদন্ত করা মামলাগুলোর মধ্যে সাতটি মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। তার মধ্যে গে-ারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক এনু ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুপন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের পাঁচটি মামলার মধ্যে চারটির চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মোহামেডান ক্লাবের পরিচালক মো. লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের ক্যাসিনো পরিচালনাকারী এনামুল হক আরমান, কলাবাগান ক্লাবের সভাপতি মোহাম্মদ শফিকুল আলম ফিরোজ, অনলাইনে ক্যাসিনো কারবারের প্রধান সমন্বয়কারী সেলিম প্রধান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান, মোহাম্মদপুরের ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব ও ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আওয়ামী লীগ নেতা ময়নুল হক ওরফে মনজু।

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় হওয়া মামলাগুলোর অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে ১৩টি মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। একটি মামলার তদন্ত চলছে। বাকিগুলোরও শিগগির চার্জশিট দেওয়া হবে।’

এদিকে ক্যাসিনোবিরোধী টানা অভিযানের মুখে সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ ক্লাব বন্ধ থাকলেও রাজধানীর কিছু ক্লাবে এরই মধ্যে ক্যাসিনোর কারবার ফের শুরু হয়েছে বলে জানতে পেরেছে গোয়েন্দারা। পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উত্তরায় এপিবিএন অফিসের উল্টো পাশে একটি ভবন ভাড়া করে চালু করা হয়েছিল ক্যাসিনো। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর ওই ক্লাবটি বেশ কিছুদিন বন্ধ থাকলেও তা আবার খোলা হয়েছে। মালিবাগ-মৌচাক প্রধান সড়কের পাশের একটি ভবন সৈনিক ক্লাব। অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের নামে চলে এ ক্লাব। ক্লাবটি এখন খোলা হয়েছে। ক্ল্যাবটি চালান যুবলীগ নেতা জসিমউদ্দিন ও এটিএম গোলাম কিবরিয়া। এরকম বেশ কয়েকটি ক্লাব ও বাসাবাড়িতে ক্যাসিনোর কারবার চলছে।’