করোনাকালে শিশুদের পারিবারিক শিক্ষা|246002|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০
করোনাকালে শিশুদের পারিবারিক শিক্ষা
আবু বিন ইহসান

করোনাকালে শিশুদের পারিবারিক শিক্ষা

আমাদের দেশের অনেকেরই হাবভাব আর গা-ছাড়া চলাচল দেখে ভাবা ঠিক হবে না যে করোনাভাইরাস ঝুঁকি থেকে আমরা মুক্ত। সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারের নির্দেশনাবলি মেনে চলে আমাদের নিজে সুস্থ থাকতে হবে, অন্যকেও নিরাপদে রাখতে হবে। সবাই নিরাপদ না হলে আমরা কেউই বিপদমুক্ত নই। মনে রাখতে হবে আমার হাতেই আমার সুরক্ষা। খুব কষ্ট পাই যখন দেখি আমাদের চারপাশে অনেকেই যত দ্রুত সম্ভব স্কুল খুলে দেওয়ার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী! কিন্তু কেন? চিকিৎসাবিজ্ঞান আমাদের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে। মেঘলা আকাশে সূর্য উঁকি দিল বলে। আমরা আশা করতে পারি নতুন বছর আমরা নতুন সম্ভাবনা ও শঙ্কামুক্তভাবে শুরু করতে পারব। একটা বছরের যদি ৭ থেকে ৮টা মাসই বাসায় থাকা গেল আর ২/৩টা মাস কি একটু সহ্য করা যায় না? নাকি এই সময়ে শিশুরা পুরো বছরের পড়া একবারে স্কুল থেকে শিখে নেবে! নিঃসন্দেহে পড়াশুনার ক্ষতি হচ্ছে সবারই, অনেক অভিভাবকের অভিযোগ শিশুরা বাসায় থাকতে থাকতে অধৈর্য হয়ে গেছে, চঞ্চলতা বেশি করছে, দুরন্তপনা বেড়ে গেছে, বাসা থেকে কোথাও যেতে পারছে না বলে বিরক্ত করছে ইত্যাদি। তাই বলে এই মুহূর্তে স্কুল খুলে দিয়ে এসব নিয়ন্ত্রণ করাটাই কি একমাত্র সমাধান? দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ দেওয়ার মতো সচেতন এখনো হতে পারিনি। স্কুল খুলে দিলে শিশুকে স্কুলে পাঠাতে হবে। যেখানে বাসের যাত্রী কমানোর জন্য ভাড়া বাড়িয়েও আমরা বড়রা নিয়ম মানতে পারি না, সেখানে কীভাবে শিশুদের কাছে আমরা আশা করব যে ওরা সব নিয়ম পালন করবে। দেখুন, শিশুরা অবুঝ ও নিষ্পাপ, ওরা বড়দের মতো করে বুঝতে পারবে না। কী ঘটতে পারে যদি বড়রা এক্ষেত্রে সচেতন না হয়? শিশুরা অনুকরণপ্রিয়, অনুসরণ প্রিয় নয়। আধুনিকায়নের সঙ্গে সঙ্গে যেখানে আমাদের পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হওয়ার পথে, আমরা কি পারি না এই সময়ে কোমলমতি শিশুদের পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী বিদ্যালয় ‘পরিবারের’ গুরুত্ব আরেকটু ভালো করে বোঝাতে?

আমরা বা আমাদের অগ্রজরা পরিবার থেকে যে সময়টা পেয়েছি, আসুন আমরা সেই সময়টা আমাদের সন্তানকে দেওয়ার চেষ্টা করি। আধুনিক জীবনের কর্মব্যস্ততার চাকায় আমাদের যে ছুটে চলার প্রতিযোগিতা চলছিল, করোনার জন্য তো তার লাগাম অনেকটাই টেনে ধরতে হয়েছে। ঠাণ্ডা মাথায় একবার চিন্তা করুন তো করোনাপূর্ববর্তী সময়ে আমরা কতটা সময় সন্তানকে বা পরিবারকে দিতে পেরেছি। সর্বদা সীমাহীন ব্যস্ততায় সময় পার করেছি। আজ শিশুর যে দুরন্তপনা আর অস্থিরতাতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছি, জীবনের কোনো এক মুহূর্তে এই দিনগুলোই আমাদের শ্রেষ্ঠ দিন বলে মনে হবে। তখন হয়তো মনে হবে যদি আরেকটু সময় পেতাম। আমাদের শিশুর অসুস্থতা বা অসুবিধা আমাদেরই সামাল দিতে হবে, অন্য কেউই এর প্রকৃত ভুক্তভোগী হবে না। হোক না পড়াশুনার একটু ক্ষতি, হোক না একটু দুরন্তপনা, তাতে কী? আমাদের শিশুরা তো সুস্থ থাকছে, আমাদের চোখের সামনে আছে, আর কয়দিনই বা থাকবে? সর্বোচ্চ ১০ বছর, ১২ বছর? তারপর যখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাবে, কর্মক্ষেত্রে যাবে, তখন তো আর ফিরিয়ে আনতে পারব না এখনকার একটা মুহূর্তও। তাই আসুন সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই আমাদের জীবনে সুন্দর কিছু মুহূর্ত উপহার দেওয়ার জন্য, শিশুদেরও ভয়াবহ যান্ত্রিক জীবনে একটু দম নেওয়ার সময় দেওয়ার জন্য।

আশা করব সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিদ্যালয় খুলে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই সবকিছু বিবেচনায় নেবেন, যেমনটা শিশুদের সুরক্ষার কথা ভেবে তারা এখনো বিদ্যালয় বন্ধ রেখেছেন। করোনাকে অভিশাপ দিয়ে নয় বরং এই সময় থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। দেশের উন্নয়নের যাত্রায় এখন সময় হয়েছে সঠিক জনশক্তিকে সঠিক জায়গায় রেখে, দক্ষ জনগোষ্ঠীকে আরও ভালোভাবে কাজে লাগানোর। আমরা অনেকেই দেশের জনগণের কষ্টার্জিত করের অর্থে পড়াশুনা শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাই। আমরা অবশ্যই দেশের প্রতি কৃতজ্ঞ এবং অবশ্য অবশ্যই কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত বলে মনে করি। আমরা বাবা-মা, ভাইবোন, পরিবারের ঋণ যেমন শোধ করতে পারব না, তেমনি কোনো কিছুর বিনিময়েই আমরা দেশের প্রতিদান দিতে অক্ষম। আবার এটাও দুঃখজনক, যেই সৃজনশীলতাকে ভিত্তি করে উচ্চশিক্ষার প্রয়াস, গবেষণাকে ভালোবাসা, গবেষক হয়ে ওঠা, আমাদের দেশ কি সেসব সম্ভাবনার যথাযথ লালন করছে? আমরা সৃজনশীল জনগোষ্ঠীকে কি প্রাপ্য সম্মান দিচ্ছি অথবা তাদের চিন্তাশীল প্রজন্ম তৈরিতে কি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছি? 

স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গঠনে এখন সময় হয়েছে শুধু শিক্ষানির্ভর না থেকে গবেষণার গুরুত্ব বাড়ানোর। ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিক কোলাবরেটিভ কাজের পরিবেশ তৈরির কথা দয়া করে ভাবুন। দেশে যারা প্রশিক্ষিত-যোগ্য গবেষকমণ্ডলী আছেন, দয়া করে তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে কার্পণ্য করবেন না। তারা কত রঙিন স্বপ্ন ত্যাগ করে দেশের টানে ফিরে এসেছেন, একটু অনুধাবনের চেষ্টা করুন। দেশের বাইরে দক্ষ যারা আছেন তাদের দেশে ফিরিয়ে কীভাবে জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নে অবদানে নিয়োজিত করা যায়, সেই লক্ষ্যে বিজ্ঞ গবেষকমণ্ডলীর পরামর্শ নিন। উন্নত দেশের গবেষণা কীভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে, তুলে ধরুন। চীনসহ বিশ্বের গবেষণানির্ভর দেশগুলা যেখানে তাদের উচ্চতর যোগ্যতাসম্পন্ন সৃজনশীল জনগোষ্ঠীকে ফিরিয়ে আনার জন্য পোস্ট-ডক্টরাল পজিশন থেকে গবেষণার সবরকম সুযোগ-সুবিধা দিয়ে পূর্ণ অধ্যাপনার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে, আমরা সেখানে কোথায় আছি? প্রবাসে সম্মানের পাহাড়ে অফুরন্ত সম্ভাবনা থাকা একজন গবেষকের কাছে মাটির টানে মাতৃভূমিতে কর্মস্থলে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার জন্য সহানুভূতি কামনা করা কতটা লজ্জার, কতটা দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক ভাবুন। প্রার্থনা করি, যোগ্য ব্যক্তিরা যোগ্য স্থানে থেকে দেশকে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাবেন। ফার্মেসির একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যেকোনো কিছু চূড়ায় পৌঁছে গেলে তা নেমে আসবেই। সুদিন আসবেই, আমরা অবশ্যই পারব। স্বপ্ন দেখি, সেদিন আর বেশি দূরে নয় যখন আমরা সর্বস্তরে দূষণমুক্ত সোনার বাংলাদেশ দেখতে পাব। সেজন্য সবার আগে শিশুদের মেধাকে বিকশিত হতে দেওয়ার সুপরিবেশ খুব প্রয়োজন। আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ, আমরা যেন তাড়াহুড়ো করে বা অবহেলাভরে শিশুদের সোনালি ভবিষ্যৎকে জেনেশুনে বিপদের মুখে ঠেলে না দিই।

লেখক : ফার্মাসিস্ট ও গবেষক, তয়ামা প্রিফেকচারাল ইউনিভার্সিটি, জাপান

[email protected]