টিকার ট্রায়ালে স্বেচ্ছাসেবীর সুরক্ষা|246003|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০
টিকার ট্রায়ালে স্বেচ্ছাসেবীর সুরক্ষা
সায়ন্থ সাখাওয়াৎ

টিকার ট্রায়ালে স্বেচ্ছাসেবীর সুরক্ষা

করোনাভাইরাসের টিকা নিয়ে সারা বিশ^ উন্মুখ হয়ে আছে। কিন্তু টিকা তো আর এমনি এমনি আসে না। এর জন্য দরকার গবেষণা। সেই গবেষণার সূত্রপাতটা হয় ল্যাবে। তারপর অ্যানিমেল ট্রায়াল হয়ে হিউম্যান ট্রায়াল সম্পন্ন হওয়ার পরই ঠিক হয় টিকাটি বাজারজাতকরণের অনুমতি পাবে কি না।

কোন দেশ আগে ভ্যাকসিন আনতে পারল, কোন কোম্পানি প্রথমে এটা বাজারে আনতে পারল, তার প্রতিযোগিতা চলছে বিশ^জুড়ে। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার ৯ সেপ্টেম্বর দেওয়া তথ্য মতে, বিশ^ব্যাপী বর্তমানে করোনার ১৮০টি ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা অব্যাহত আছে। এর মধ্যে অন্তত ৩৫টি ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে বর্তমানে। এর মধ্যে তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল চলছে নয়টি ভ্যাকসিনের। আবার ভ্যাকসিন বাজারে এলে কোন দেশ আগে পাবে, কোন দেশ কতটা পাবে, সে নিয়েও আছে প্রতিযোগিতা। এ নিয়ে নানা রকম রাজনীতিও আছে বলে আলোচনা হচ্ছে।

আমেরিকার নির্বাচনে ভ্যাকসিন রাজনীতি যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নিতে পারে, সে কথাও বলছেন অনেকেই। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। করোনা ভ্যাকসিনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশও। বাংলাদেশের একটি কোম্পানি করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের দৌড়ে থাকলেও তা এখনো হিউম্যান ট্রায়াল বা মানবদেহে পরীক্ষার পর্যায়ে আসেনি। কিন্তু বাংলাদেশে করোনার ভ্যাকসিনের মানবদেহে ট্রায়াল বা তৃতীয় ধাপের পরীক্ষার কাজ শুরু হতে যাচ্ছে শিগগিরই। সেটা চীনের কোম্পানি সিনোভ্যাকের ভ্যাকসিন। এর সরকারি অনুমতি মিলে যাওয়ার পর চুক্তি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। আইসিডিডিআর-বি হিউম্যান ট্রায়ালের অংশ হিসেবে ৪ হাজার ২০০ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর এই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবীর সুরক্ষা ও সম্মানী নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবীরা কি অন্যান্য দেশের স্বেচ্ছাসেবীদের মতোই সুরক্ষা পাচ্ছেন এ প্রশ্নটিও উঠছে বেশ জোরেশোরেই। আমেরিকার ওহাইয়ো ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মোস্তাক মাহমুদ। ফাইজারের করোনাভাইরাস ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে অংশ নিয়েছেন তিনি। তার অভিজ্ঞতা তিনি তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনে। তিনি বলেন, ২৬ পাতার একটি চুক্তিপত্র আমাকে পড়তে হয়েছে। তারপরও তারা আমাকে বুঝিয়ে বলেছেন, এই ভ্যাকসিন ট্রায়াল নেওয়ার কারণে আপনার যদি কোনো শারীরিক অসুস্থতা হয় এবং সেটা যদি প্রমাণিত হয় যে এই ভ্যাকসিনের কারণেই সেই অসুস্থতাটা হয়েছে, তাহলে তার দায়-দায়িত্ব ও তার চিকিৎসার খরচ সবকিছু আমরা বহন করব। ...এই ট্রায়ালে অনেক ঝুঁকি আছে। এই ট্রায়ালের কারণে আপনার মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এই কথাটা জেনেই তুমি ট্রায়ালে অংশ নিচ্ছো। এটা আপনাকে আমরা ভালো করে বললাম। আপনি যাচাই করে দেখুন। মোস্তাক মাহমুদ আরও বলেন, ট্রায়ালের জন্য আমি যে ছয়টা ভিজিটে যাব, তার একেকটা ভিজিটে তিন-চার ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। এর কমপেনসেশন হিসেবে আমাকে প্রতি ভিজিটে ১২০ ইউএস ডলার দেওয়া হবে। আর প্রতি সপ্তাহে যে ডেটা এন্ট্রি করতে হবে, তার জন্য সপ্তাহে পাঁচ ইউএস ডলার করে দেওয়া হবে। এটা চলবে দুই বছর পর্যন্ত। বাংলাদেশের চ্যানেল টোয়েন্টিফোর টিভির সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন ডাক্তার মোস্তাক মাহমুদ। তার কথায় এটা স্পষ্ট, ফাইজারের ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে যারা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে অংশ নেবেন, তাদের ইনস্যুরেন্স থাকবে। যেকোনো সমস্যা হলে তার দায়দায়িত্ব নেবে যারা ট্রায়ালটি চালাবে সেই প্রতিষ্ঠান। আর এতে অংশগ্রহণকারী আর্থিক সম্মানীও পাবেন অন্তত ১ হাজার ২০০ ইউএস ডলার বা প্রায় এক লাখ টাকা।

ডেঙ্গুর ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে অংশ নিতে গিয়ে ফিলিপাইন্স ২০১৭ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত অন্তত ৬০০ মানুষ মারা যায়, যার অধিকাংশই শিশু। আফ্রিকায় এইচআইভি ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের সময়ও মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ফলে ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে যারা অংশ নেবেন, তারা সব জেনে-বুঝে মানবকল্যাণে এগিয়ে আসবেন এটা যেমন সত্য, আবার তারা যে একেবারেই ঝুঁকিমুক্ত নন, এটাও ঠিক। অনেকেরই হয়তো জানা আছে, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ^বিদ্যালয়ের করোনার টিকার ট্রায়ালে অংশ নেওয়া একজন স্বেচ্ছাসেবীর গুরুতর পাশর্^প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ায় এ ট্রায়াল তিন দিন বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু মানবতার খাতিরে যারা বাংলাদেশে করোনা ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে অংশ নেবেন, তাদের ক্ষেত্রে কী কী সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকছে? এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলে গবেষক, বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও ইন্ডিপেনডেন্ট বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, আমাদের দেশে কি স্বেচ্ছাসেবীদের কাছে ভ্যাকসিনের ঝুঁকি ঠিকমতো হাইলাইট করা হয়? আমাদের দেশে কি তাদের জন্য হেলথ ইনস্যুরেন্সের ব্যবস্থা আছে? এগুলো নিশ্চিত করার বডিতে যারা আছেন, তারা কি এই বিষয়গুলো সত্যি সত্যি মনিটর করেন?

বাংলাদেশে মানুষের দেহে করোনা ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের দায়িত্বে থাকা আইসিডিডিআর-বি এ বিষয়ে কতটা সতর্ক এবং এ ট্রায়ালে স্বেচ্ছাসেবীদের নিরাপত্তা ও সম্মানীর বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সে বিষয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয় ৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ দৈনিক ভোরের কাগজে। রাশেদ আলীর করা এ প্রতিবেদনে লেখা হয়, বাংলাদেশে চীনের তৈরি করোনার ভ্যাকসিন ট্রায়ালের অনুমোদন দেওয়া হলেও এর নিরাপত্তা ইস্যুতে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভ্যাকসিন মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে, তেমনি কখনো তা শারীরিক জটিলতা বা মৃত্যুর কারণও হতে পারে। সে কারণে ভ্যাকসিন প্রয়োগের আগে ভ্যাকসিন বা টিকার মান, ট্রায়ালে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যবীমা, সম্মানীসহ বিভিন্ন বিষয় নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু দেশে এসবের কিছুই হচ্ছে না। প্রতিবেদনটিতে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের ইমিউনোলজিস্ট ও স্টাফ সায়েন্টিস্ট ড. মো. শামছুল আলম, ড. জুবায়ের রহমান এবং নেদারল্যান্ডসের ডব্লিউএইচও-ইউট্রেক সেন্টার অব এক্সেলেন্স ফর এফোরডেবল বায়োথেরাপিউকিক্সের ইমিউনোলজিস্ট ও প্রজেক্ট লিড ড. রেজাউল করিমের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে লেখা হয়, ভ্যাকসিন অন্যান্য ওষুধের মতো নয়। শুধু নিরাপত্তা ইস্যুতে বিশ্বে ভ্যাকসিন তৈরির অনেক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। অথচ এজন্য সরকার ও প্রাইভেট ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে থাকে। ট্রায়ালের সব খরচ চীনা কোম্পানিটি দেবে। এতে লাভবান হবে আইসিডিডিআর-বি। কিন্তু যারা ট্রায়ালে অংশ নেবেন, তাদের নিরাপত্তায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।

বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেনকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনটিতে লেখা হয়, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশই যাদের ওপর ভ্যাকসিন ট্রায়াল করছে, তাদের কয়েক হাজার ডলার সম্মানী দিচ্ছে। সঙ্গে থাকছে ইনস্যুরেন্স। এটা নৈতিকতার প্রশ্নে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত পন্থা। কাউকে ট্রায়ালে অংশ নিতে বাধ্য করা যায় না। স্বেচ্ছায় অংশ নেওয়ার পরও কোনো ক্ষতি হলে বা মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানিগুলো অনেক ক্ষেত্রেই গরিব দেশের লোকজনের ক্ষেত্রে তা করে না। কৌশলে শুধু পরীক্ষার ফলাফলটা নিয়ে যায়।

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ প্রথম আলোকে আইসিডিডিআর-বির সিনিয়র সায়েন্টিস্ট কে জামান বলেছেন, আমাদের গবেষণায় আমরা যে টিকাটি ব্যবহার করব, তা একটি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ভাইরাসনির্ভর টিকা, পদ্ধতিটি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত এবং বহুল ব্যবহৃত। এ পদ্ধতিটি নিরাপদ বা খুবই কম ঝুঁকির বলেই মনে করা হয়। আমাদের গবেষণায় ব্যবহৃত টিকাটি ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়ায় তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের আওতায় হাজার হাজার মানুষ গ্রহণ করেছে এবং অনেক চীনা নাগরিককে জরুরি ব্যবহারের অধীনে ইতিমধ্যে এই টিকা দেওয়া হয়েছে।

কে জামান এই টিকার ঝুঁকি কম বললেও একেবারে যে ঝুঁকিমুক্ত তা কিন্তু বলেননি। তাই যতটুকুই ঝুঁকি থাকুক, তাও বিবেচনায় নিয়ে স্বেচ্ছাসেবীদের নিরাপত্তার বিষয়টি সবার আগে বিবেচনায় নিতে হবে। কারও কোনো ধরনের ক্ষতি হলে তার দায়ও নিতে হবে আইসিডিডিআর-বিকেই। পাশাপাশি অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশেও স্বেচ্ছাসেবীদের যাতে আর্থিক সম্মানী দেওয়া হয়, সে বিষয়টিও ভেবে দেখা উচিত।

স্বেচ্ছাসেবীরা তো আর চীনা কোম্পানি সিনোভ্যাকের সঙ্গে চুক্তি করছে না। যদি একটা লোকেরও ক্ষতি হয়, তার দায় সরকারকেই নিতে হবে। সরকারকেই আইসিডিডিআর-বিকে বলতে হবে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে তারা দাঁড়ায়, সব দায়িত্ব নেয়। কিন্তু সে আইনি ধারই যদি না থাকে, অর্থাৎ কোনো ইনস্যুরেন্সই যদি না থাকে, তবে কীসের ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি আইসিডিডিআর-বির কাছে ক্ষতিপূরণ চাইবে?

লেখক

চিকিৎসক ও কলামনিস্ট

[email protected]il.com