ফেঁসে যেতে পারেন অনেক থানা নির্বাচন কর্মকর্তা!|247140|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০
ভুয়া এনআইডি তৈরি চক্র
ফেঁসে যেতে পারেন অনেক থানা নির্বাচন কর্মকর্তা!
ইমন রহমান

ফেঁসে যেতে পারেন অনেক থানা নির্বাচন কর্মকর্তা!

নির্বাচন কার্যালয় থেকে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির ক্ষেত্রে থানা নির্বাচন কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলার তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এসব কর্মকর্তা আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ডাটা এন্ট্রি অপারেটরদের দেওয়া তথ্য সঠিকভাবে যাচাই না করেই ব্যবহারের অনুমতি দিতেন। আর এরই সুযোগ নিয়েছে জালিয়াত চক্র। কোনো কোনো থানা নির্বাচন কর্মকর্তা সরাসরি চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।

ঢাকার অন্তত তিনটি থানার নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পর এমন তথ্য পেয়েছেন ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, ঢাকার অন্তত ১৬টি থানা নির্বাচন অফিসে ভুয়া এনআইডি তৈরি চক্র সক্রিয় ছিল। এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে ডিবি। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ছাড়া ভুয়া এনআইডিতে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা জড়িত রয়েছেন বলে মনে করছে ডিবি। তাদের মধ্যে সিটি ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা আরিফ অন্যতম।

এদিকে গতকাল সোমবার আদালত ডিবির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) রিপোর্টের তথ্য প্রাপ্তি ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও ৭ থেকে ৮টি বেসরকারি বাংকের কাছে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সিআইবি রিপোর্ট চাওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। এসব ভুয়া এনআইডি দিয়ে ব্যাংক ঋণ নেওয়া ছাড়াও সিমকার্ড তোলা, রোহিঙ্গাদের কার্ড ইস্যু ও জমি বেচাকেনা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা ডিবির।

ডিবির লালবাগ বিভাগের সংঘবদ্ধ অপরাধ ও গাড়ি চুরি প্রতিরোধ টিমের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মধুসূদন দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার ভুয়া এনআইডি তৈরি চক্রের দুই সদস্য আদালতে তাদের অপরাধ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। দুদফা রিমান্ডেও তাদের থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে আমরা চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিবির আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা কয়েকজন থানা নির্বাচন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন, অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার কারণে অনেক সময় ডাটা এন্ট্রি অপারেটরদের দেওয়া তথ্য তারা যাচাই করতেন না। এরই সুযোগ নিত চক্রের সদস্যরা। আদালত অনুমতি দেওয়ায় এসব কর্মকর্তাকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করব। তারা দায়িত্বে অবহেলা করেছেন নাকি চক্রের কাছ থেকে সুবিধা পেতে এসব করেছেন, তা তদন্ত শেষে নিশ্চিত হওয়া যাবে।’

১২ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর মিরপুর থেকে ভুয়া এনআইডি তৈরি করে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে সহায়তাকারী একটি চক্রের ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির গোয়েন্দা লালবাগ বিভাগের (ডিবি) সংঘবদ্ধ অপরাধ ও গাড়ি চুরি প্রতিরোধ টিম। তাদের দেওয়া তথ্যে পরে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুদফা রিমান্ড শেষে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তারা হলেন মো. সুমন পারভেজ (৪০), মো. মজিদ (৪২), সিদ্ধার্থ শংকর সূত্রধর (৩২), মো. আনোয়ারুল ইসলাম (২৬), মো. আবদুল্লাহ আল মামুন (৪১) ও মহিউদ্দিন চৌধুরী।

তাদের মধ্যে সিদ্ধার্থ রাজধানীর সবুজবাগ থানা নির্বাচন অফিস ও আনোয়ারুল ইসলাম গুলশান থানা নির্বাচন অফিসের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর। গ্রেপ্তারের পর নির্বাচন কমিশনের আইডিইএ প্রকল্প থেকে তাদের সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয় বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন এনআইডি নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম। এ ঘটনায় গঠিত দুটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

এ ঘটনায় মিরপুর মডেল থানায় করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির এসআই আমিরুল ইসলাম দেশ রূপারন্তরকে বলেন, ‘ব্যাংকের সিআইবি রিপোর্ট বিষয়ে আদালতের আদেশের কপি হাতে পাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক ও ৭ থেকে ৮টি বেসরকারি ব্যাংকের কাছে তথ্য চাওয়া হবে। গ্রেপ্তার আসামিরা ভুয়া এনআইডি দিয়ে কতজনকে ঋণ পাইয়ে দিয়েছেন, তার কিছু তথ্য দিয়েছেন। এ বিষয়ে সিআইবি প্রতিবেদন চাওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সবুজবাগ থানা নির্বাচন কর্মকর্তা আবদুস সালাম, গুলশান থানা নির্বাচন কর্মকর্তা মোমিন ও আরেকজন থানা নির্বাচন কর্মকর্তার সঙ্গে প্রাথমিক কথা বলেছি। অনুমোদন পাওয়ায় তাদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চক্রের হোতা সুমন পারভেজ ও মজিদ ২০১৭ সাল থেকে এ কাজে যুক্ত। এখন পর্যন্ত ৪০ থেকে ৪৫টি ভুয়া এনআইডি তৈরির কথা তারা স্বীকার করেছেন। আর এই ভুয়া এনআইডি চক্রের মাধ্যমে আবদুল্লাহ আল মামুন ব্র্যাক ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা, সিটি ব্যাংকের নিকেতন শাখা থেকে সাড়ে ৯ লাখ টাকা ঋণ নেন। এ ছাড়া মো. মিল্টন রাজধানীর নর্থসাউথ রোডের সাউথবাংলা ব্যাংক থেকে ৩ কোটি টাকা, ইয়াছির সিটি ব্যাংকের প্রগতি সরণি শাখা থেকে ১০ লাখ টাকা, সালেহ আহমেদ ইউসিবি ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ১৫ লাখ টাকা, আবদুল মজিদ এনআরবি ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ২০ লাখ টাকা ঋণ নেন। এভাবে চক্রটি অন্তত ২০ জনকে ব্যাংক থেকে ঋণ করিয়ে দিয়েছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে ডিবি।